মা বিশালাক্ষীর নৌকা: লৌকিকতা পেরিয়ে এক যাত্রা…

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

ছোটগল্প এক যাত্রার কথা বলে। একটা খোঁজ। জার্নি। লেখক তাঁর পাঠককে নিয়ে তাঁর ছোটখাটো চেনা চৌহদ্দির পৃথিবীতে ঘুরেফিরেও নির্মাণ করতে পারেন এক ট্র্যাভেলগ। তাঁর চরিত্ররা, তাঁর বন্ধুরা গল্পের পরিসর পেরিয়ে হেঁটে বেড়ায় ইতিহাসে, বাংলার মাটির পরম্পরায়, কখনও অনেকটা দূরে বলিভিয়ায় এক ফ্যারিস্তার অন্তিম শ্বাসশয্যায়।

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘মা বিশালাক্ষীর নৌকা’। যার উৎসর্গ প্রপিতামহীকে। সোপান প্রকাশনার এই বইয়ে মানানসই সহজ আড়ম্বরহীন এক প্রচ্ছদ। লেখকের কথায় গল্পগুলির সঙ্গে, চরিত্রগুলির সঙ্গে লেখকের কিছু পূর্বপরিচয়ের সূত্র আছে। এই সূত্রের অনেকটাই অনুমান করা যায় গল্পগুলি পড়ে। লেখক হুগলি জেলার মানুষ। কৌশিকী নদীর জোলো গন্ধ মাখা মানুষ। মাঝির ভাষার সঙ্গে, নৌকার সঙ্গে অনিরুদ্ধর সরাসরি সহাবস্থান। মনে হয়…

কেন বলছি জানেন? প্রিয় পাঠক, প্রতিটি গল্পের সঙ্গে গল্পের প্রতিক্রিয়ারও একটা পাঠক থাকে। লেখকের সঙ্গে সেতু নির্মাণ যার সূত্র। ‘মা বিশালাক্ষীর নৌকা’র সেই সূত্র এই সহাবস্থান। লেখক যেন চষে বেরিয়েছেন তাঁর গ্রাম। তাঁর মন্দির। তাঁর সোনালী ডানার ঈগল। কোথাও কোথাও গল্প নির্মাণে প্রথা ভেঙেছেন। প্রথম তিনটি গল্পকে যেমন বেঁধে রাখতে পারতেন একসঙ্গেই। তা না করে তাঁর মতো করে ভেঙেছেন। প্রসঙ্গত এখানে পাঠকের কিছুটা মনে হতেই পারে বাড়তি পড়ছি, অনেক গল্পই জানা। পরের গল্পের অনেকটা বীজ আগের গল্পেই প্রোথিত। অনিরুদ্ধ হয়ত জানতেন সেসব। তাও, এই রিস্কটা নিয়েছেন। এবং সেই রিস্কের মধ্যেই তাঁর নিজস্ব কথকতার জাল। কারণ তাঁর যে অনেক কথা বলার আছে। ‘রাতে তেঁতুলগাছের ছায়া কোথায় পড়ে?’ কিংবা একটা সময় পর কুপ্পুস মাঝি আর নৌকা চালায় না, নৌকা বানায়। কারণ অতীত তাকে এক ঘূর্ণির মধ্যে ফেলে দেয় বিশালাক্ষীর অভিশাপ, মনে পড়ে বরণমালিকার চপল পায়ের ধ্বনি, হারিয়ে যাওয়া নূপুরের গন্ধ আর তক্ষকের ডাক। সজনে ফুলের বনে খেলা করা যে মেয়ে গানের ধারক ও বাহক, তাকে নিয়েই গল্প এগোয় অন্য পরিসরে। আর সেই গান যখন সবুজ পাতার ভেতর দিয়ে আসে, তখন ফুরফুর করে বিড়ি টানা শূন্যতার ভেতর কুপ্পুস মাঝি আর থাকা-না’থাকার ভেতর সুরহীন অভিশপ্ত এক গ্রাম পরাবাস্তব চেহারা গড়ে তোলে। লেখকের এই নিজস্ব ‘ছোট উঠোন, বৃক্ষহীন বাড়ি’ পরে ‘তেঁতুলগাছ’ গল্পেও পাই। জলে ছায়া দেখতে ছোটেন সাদা থানশাড়ি, পান দোক্তা, অশীতিপর মানবীরা। কারণ, ‘মানুষের ছায়ার দরকার না থাকতি পারে, জলের তো আছে’। গাছের সঙ্গে লেখকের মায়াবী এক আত্মীয়তা আছে। সজনে, তেঁতুল, ডুমুর, কৃষ্ণচূড়া— এদেরকে চরিত্র করে জল-হাওয়া দেন লেখক। কারণ এমনই এক কৃষ্ণচূড়ার কাছে বিড়ালবিহীন এক পাড়ায় দেখা দেয় দুটি বেড়ালছানা। ক্রমশ গল্প স্বাভাবিক ড্রামা ছেড়ে পরাবাস্তবে এগোয়, স্যাটায়ার চলে আসে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে বলে শেয়াল পিটিয়ে মারা হয়। শুরু হয় শেয়াল স্তব। ‘ওরা পণ্ডিত ব্যক্তি। দেশজ’। উড়ন্ত মানুষের চুলে চড়ুই বাসা বাঁধে। রুমাদি, সুধীর দত্তের কবিতা বলা লোকটা, কালু, জিনিয়া, বুড়োদা— মরণের এপারে ওপারে তাঁদের ম্যাজিক রিয়েল কথোপকথন। লেখকের এই ম্যাজিক রিয়েল পরিসরে অনেক চরিত্রের ওঠানামা। ব্যাংডুবি। মৃতদের জায়গা। নাজমুল, রেশমা, মীরাতুন— সংখ্যালঘু জীবন সঙ্কটের করুণতম আঙ্গিককে পরাবাস্তবতার মোড়কে মুড়ে ফেলেছেন অনিরুদ্ধ। সাপেদের চিৎকার, অতৃপ্ত পুরুষ আত্মা, আত্মহত্যার ছায়ায় যা কাঁপে পাতার পর পাতায়। অশীতিপর এক চরিত্র উঠোনে কালপুরুষ নামতে দেখেন, বউবসন্তী, কুমীরডাঙা আর বৃষ্টির গন্ধে ম ম করে মা বিশালাক্ষীর সন্ততিরা। পাতার বাঁশি শোনার গল্পে মিলে যায় বরণমালিকাকে খুঁজে পাওয়ার ছবি। এই ওভারল্যাপিং খেলা হয়ত অনিরুদ্ধ ইচ্ছে করেই খেলেছেন। কারণ তাঁর নিকোনো উঠোনে হলুদ ফুলের রেণু, হিজড়েদের চিৎকার, আর নদনদীর মিলনের শব্দে এতটাই তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতাপুষ্ট, কোথাও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব মনে হয় না। সেখানে ‘অনন্ত চকচকে বালির মধ্যে কাঁকড়া ঢুকে যাচ্ছে। মাথার ওপর স্থির হয়ে আছে এক বৃহৎ চাঁদ।’

একটু অন্য কোথাও আরেকটি বিষয়ও ভেবে দেখার মতো। অনিরুদ্ধ যে গ্রামবাংলাকে হাতের তালুর মতো চিনেছেন, তাঁদের কথাই বলিয়েছেন বিশ্বজনীনতার মোড়কে, বেশ কিছু গল্পে। প্রকৃতই এক পরিব্রাজকের মতো। এনেছেন পল গগ্যা, ভ্যান গখকে। তাঁর কথায়— ‘গখ করত কি সূর্যমুখী বনে গিয়ে বসে থাকত, সেটা কি যৌনতা নয়?’ এঁকেছেন ইন্টি, পাবলিটো, বেনিগনো-দের গল্প। পাহাড়ের নিচ থেকে ঠেলে নিয়ে আসা হচ্ছে একটা জিপ। দেখা যাচ্ছে না। কারণ ‘নিচেরটা অন্ধকার, কমরেড’। স্বপ্নের আন্দোলনের করুণতম পরিসমাপ্তির ইশারা। আসে সাম্প্রতিকতা। চলে আসেন আয়লান কুর্দি, সম্রাট জিউস, ম্যাসিডোনিয়ার বীর— অঘ্রাণ মাসে কুয়াশা জমা হওয়ার ইচ্ছেয় তাঁদের মিশিয়ে দেন লেখক। যুদ্ধবিহীন শান্ত এক পৃথিবীর নকশিকাঁথার জন্ম হয়। আবার কোথাও বৃদ্ধ তথাগত আলোকরশ্মি বিচ্ছুরণ করেন। জনক-সন্ততির নিজস্ব গল্পকথা, নাকি সত্যের পুনরাবিষ্কার? জানি না…

যে কথা না বললেই নয়, সেই প্রাককথন। একটি কাগজের খবর থেকে একটি গল্প নামানো। হাসপাতালের সুপারের ঘরে সাপ দেওয়া মুস্তাকিন, অম্বিকেশ এবং পাল— সাপের জায়গায় দুই পুরুষকে ভোলানো এক নারীজন্ম। প্রতিটি গল্প লেখার মুহূর্তগুলির বর্ণনা আছে। পাঠকের ভালো লাগবে। কখনও চমক লাগবে। কল্পনার পরিসরে, গল্পের প্রতি লেখকের এক তীব্র ভালোবাসাকে চিনতে সুবিধে হতে পারে।

সব মিলিয়ে উঠে যাওয়া যায় মা বিশালাক্ষীর নৌকায়। বেশ কিছু গল্পে ঋণস্বীকার করেছেন লেখক, এতেও ঋদ্ধ হবেন পাঠক। তবে, অনেকসময়ে কথার প্রাবল্যে, পুনরুক্তিতে স্রোত থমকে গেছে। গল্পের শেষে যে মোচড়ের প্রয়োজন ছিল, সেব্যাপারে আরেকটু জোরালো কিছু দাবি করতেই পারেন পাঠক। ‘ব্যাংডুবি’ গল্পটি চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও সে উল্লেখ নেই। এটুকু অপ্রাপ্তি থেকে যায়।

তবু, গল্পের পৃথিবীতে অনিরুদ্ধর নৌকা ভ্রমণ চলুক। মাটির ওপরের গল্প লেখার মানুষ অনেকেই, কিন্তু মাটির ভেতর, পাতালের ভেতর, অন্যলোকের হাঁটা কুপ্পুস মাঝি, মেজঠাকুমা, শান্তিময়ী, সরস্বতী, আবির শেখ— এদের কথা এই লেখককেই বলতে হবে।

অকিঞ্চিৎকর এই পৃথিবীর কথকতায় আপনাকে স্বাগত, অনিরুদ্ধ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1438 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*