অ্যাসাইলাম থেকে বলছি

শুভশ্রী পাল

 

বিশ্রীভাবে শল্কমোচন হওয়ায় নিজের কাছে নিজেই আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে গেলে দেখি মাথার ভেতরে অনেকগুলো আমিরা গোল টেবিল সাজায়। আমি ঘুমের ভিতর জেগে উঠি।

স্কুলে গিয়ে সিলেবাসের তোয়াক্কা না করেই সারল্যদের মধ্যে ইনজেক্ট করি বোধ। ওদের ধাক্কা দিই সুকুমার রায়ে। আমার ছাত্রছাত্রীরা অবাক হতে হতে মেতে ওঠে আমার ক্ষ্যাপামোয়। পড়া না পারলে আমাকে হিউমারের জাগলিং দেখিয়ে বোকা বানায়। সব ভুলে আমি শাল্লা বলে হো হো করে হেসে উঠি। প্রতিদিন একটা করে পাটভাঙা শাড়ি ঢুকে যায় গ্রামের শালীনতার সিস্টেমে আর আমি কুঁচির খাঁজে ব্যাট সেট করে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকাই ধেয়ে আসা বলের দিকে। মাসের প্রথম শিখিয়ে ফেলেছি বাচ্চাদের। মাসের শেষ কুড়িদিন ধরে ওরা লিখে রাখে ওদের চাহিদা। ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট, কর্ক, মাথামোটা পেন যার মধ্যে চার রকমের কালির রিফিল থাকে, পেনের মত দেখতে পেন্সিল, আনন্দমেলা, সন্দেশ, জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি যাবতীয়। আমি দিদিমনি হতে গিয়ে ক্যাপ্টেন হয়ে যাই রোজ রোজ।

স্কুলের জানালা বন্ধ করতে গিয়ে মরে যায় একটা বাচ্চা টিকটিকি। একটা প্রাণ হাওয়ায় ভর করে বেরিয়ে এলে আমার ভিতর একফোঁটা বিষাদ ক্রিস্টাল ফর্ম করে সিডেটিভের। আমি টলতে থাকি মনখারাপের ঘোরে।

বাড়ি ফিরে থম মেরে থাকতে থাকতে পুড়ে যেতে দেখি প্রত্যাখ্যাত সিগারেটের শরীর। আমাকে ঘিরে ধরে সন্দীপন, রামকিঙ্কর, ভাস্কর চক্রবর্তী, শক্তি। কিছুই করে উঠতে না পারায় কোর্ট মার্শালের নির্দেশ দেওয়ার আগে আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ভিক্ষা ছুড়ে দেওয়া হয়।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলি, প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা নয়, প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থেকে আমি ঘেঁটে দিতে চাই তার ওয়ান-ওয়ে ট্র্যাক। সমাজের তালে নাচতে নাচতে আমি ল্যাংটো করে দেব একদিন সামাজিকতাকে। আরও কীসব কথা বুজকুড়ি কাটে আমার গলায়। সাজাপ্রাপ্ত আসামির মুখ ফোটে না, এইভাবে স্বপ্ন দেখা যায় না বলে আমাকে কে যেন থাপ্পড় বসিয়ে দিল। আমার বোবায় ধরা ভদ্রতার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে অ্যাসাইলামে আটকে থাকা আমি। সে চিৎকার করে বলে— সব ধ্বংস করে দিয়ে আমি কুড়ানি হব ধ্বংসস্তূপে। কোর্ট মার্শালের স্থগিতাদেশ নেমে আসে ঠোঁটে।

আমি দেখি আমার ভিতর থেকে ওরা বের করে আনছে অসহ্য একটা জীব। যার ক্ষুদ্রান্ত্র-ভর্তি ক্ষিদে। টনসিলে জমে আছে শিলাজিৎ মজুমদার। যার ব্রেন স্ক্যান করার সাহস দেখিয়ে অকৃতকার্য হয়ে স্থবির হয়ে গেছে সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থা। সিস্টেমে রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাওয়ায় শহর আমাকে জোর করে ভদ্রতার ছেঁড়া জামা পরিয়ে পাঠিয়ে দিতে চাইছে রিহ্যাবে। যদিও কানাঘুষো চলছে আমার হ্যাবিট্যাট খুঁজে না পাওয়ার কথা।

এত শত পরিশ্রমে সৌজন্যবোধের ট্রাঙ্কুলাইজারের প্রভাব কমে আসে। আমি চলে যাই বেতার তরঙ্গ পৌঁছতে না পারা ফ্রিকোয়েন্সিতে। যেখানে হরমোনের প্রভাবে যৌনইচ্ছা নেই। ক্রিয়েটিভিটির ব্যর্থতায় শরীর হাতড়াতে চায় ঠোঁট। অথচ পারফেকশন না পেয়ে ছিটকে আসে যাবতীয় কামোত্তেজনা। শরীরের ক্লান্তি ঘুম পাড়াতে ব্যর্থ হলে এইসব ঘুমের ভিতর জেগে ওঠাদের নিয়ে দর্শনশাস্ত্রের অভিযোজন শেখাতে আমি ঢুকে পড়ি অ্যাসাইলামের রাতে। আমি এখন ঘুমাতে চাই। শুধু ঘুমাতে। আমি ঘুমের চরিত্র জানতে চাই।

মাঝে মাঝে যখন ভালো থাকতে ইচ্ছা করে বইয়ের পাতায় সেসব ম্যানিক ফেজ বলে মার্ক করা দেখি। এইসময় আমার ছেঁড়া ফাকফোঁকড় দিয়ে মাথা গলিয়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া আমিটার সামনে রেখে দিই দু পাত্তর রাম। ও হাত বাড়ায়। তারপর আসতে আসতে কুকুর ছানার মত এঁকেবেঁকে হাত পা ছুড়তে ছুড়তে বেরিয়ে আসে সার বাঁধা আমিরা। সবার সাথে আলাপ পরিচয় না থাকলেও আন্তরিকতার খামতি হয় না। এইসময় দুধের দাঁত সুড়সুড় করলে তারা কামড়ে ধরে আগ্রহ। একটা অনির্বচনীয় যাপন খুঁড়ে আনে মাটির তলা থেকে। যার কোনও ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির জামা নেই।

ঘুমের ভেতরে জেগে উঠে দেখি দরজা খোলা। পাশের ঘরে তখনও জ্বলে আছে আলো। এঘরে সব আলো-আঁধারি বুনে রাখে অস্তিত্ব। একটা আচম্বিত স্পর্শের চকমকি চিড়িক শব্দের স্পার্ক জন্ম দেয়। অন্ধকারের পরে আলো এসে নিরুদ্দেশ হলে সয়ে আসা চোখে ছানি অবশ্যম্ভাবী। হাঁকপাঁক করে হাতড়েও খুঁজে পাওয়া যায় না স্পর্শের উৎস। না কোনও জীবন্ত ছবি, না কোনও মৃতদেহ। একটা অবয়বের আশ্রয়টুকু না পেয়ে উত্তেজিত হতে থাকে ঝিমিয়ে থাকা স্নায়ু। ঘুম ভাঙে মাথার। তুমুল অপরাধবোধ বেয়ে পড়ে রগের দাগ বেয়ে। এ শরীর সন্ন্যাসের পথে তবুও ঝিম ধরে আসে স্পার্কের খোঁজ চেয়ে। এইসব সুখ উদযাপনের লোভ বড় ছোঁয়াচে। অতিচেতনের ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়ি পথে। সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের কোটরে রাখা আছে চেতনের জামা। আমাকে পৌঁছতেই হবে সেখানে। ঘটনাবৃত্তান্ত বুঝে নিয়ে দোল দেয় ঝুড়ি হয়ে নেমে আসা শিকড়। হাওয়ায় উড়িয়ে দেয় বটপাতাদের। শশব্যস্তে আমি কোটরে মুখ লুকিয়ে বলে উঠি, ওগো না গো, পায়ে পড়ি। আমার কোনও নশ্বর অবয়ব চাই না৷ আমি নষ্ট হয়ে গেছি। শরীরে বাসা বেঁধেছে ঘুণপোকার দল। আমাকে বাঁধার জন্য কাউকে ফিরিয়ে এনো না। এরপর নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়। শিথিল হতে হতে আমি বিপ্লব করে বলি আমার বাঁধনে অ্যালার্জি। আকাশ নেমে আসে মাটিতে আমাকে কোল পেতে দেয়। মন্থর পায়ে পৌঁছাই ঘরে। সেখানে বড় বড় করে লেখা আছে— এখানে রুগ্ন হৃদয়ের স্বেচ্ছামৃত্যুর সুব্যবস্থা আছে।

মাইকে জনস্বার্থে প্রচারিত হচ্ছে:

তামাক সেবন দুর্বলচিত্তের পক্ষে ক্ষতিকর।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1438 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*