মিঞা কবিতা — কবিতার মশাল

সুমনা রহমান চৌধুরী

 

লিখ
লিখে রাখ
আমি একজন মিঞা
এনআরসি-র ক্রমিক নং ২০০৫৪৩
দুই সন্তানের বাবা আমি
সামনের গ্রীষ্মে জন্ম নেবে আরও একজন
তাকেও তুমি ঘৃণা করবে কি
যেভাবে ঘৃণা কর আমায়?

মূল কবিতা—

লিখা
লিখি লোয়া
মই এজন মিঞা
এনআরসি-র ক্রমিক নং ২০০৫৪৩
দু’জন সন্তানর বাপেক মই
অহাবার গ্রীষ্মত লব আরু এজনে
তাকো তুমি ঘিন করিবা নেকি
যিদরে ঘিন করা মোক?

মিঞা কবিতা অসমের এক নতুন ধারার কবিতা। কিন্তু কী তীক্ষ্ণ তার ভাষা! প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অপমান, বিদ্রুপ, শোষণ, বঞ্চনা, প্রহার সবকিছুকে আগুনে পুড়িয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চর অঞ্চলের মুসলিম যুবক যুবতীরা হাতে তুলে নিলেন কবিতার মশাল। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা শোষণ আর বিদ্রুপে চর অঞ্চলের মুসলিম যুবসমাজের মধ্যে খুব নীরবে, নিভৃতে একটা বিপ্লব দানা বেঁধে উঠেছে। মিঞা কবিতাগুলি তারই বহিঃপ্রকাশ। নির্ভীক, নিষ্কম্প ভাষায় তারা জানান দিচ্ছে—

আমরাও কিন্তু বিপ্লবী হয়ে উঠেছি
আমাদের বিপ্লবে বন্দুক লাগবে না
বোমা-বারুদ লাগবে না
আমাদের বিপ্লব টিভিতেও দেখাবে না
খবরেও ছাপাবে না
কোনও দেওয়ালেও দেখবে না লাল-নীল রঙে আঁকা
আমাদের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত
আমাদের বিপ্লব তোমাদের অন্তর জ্বালাবে, পুড়াবে
পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলবে..

স্ফুলিঙ্গ যেভাবে মশালে পরিণত হল

‘মিঞা কবিতা’ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মিথোষ্ক্রিয়ার ফসল। তাই মিঞা কবিতা বুঝতে হলে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই ধারার কবিতার জন্ম সেটা জানা খুবই প্রয়োজন। অসমের ইতিহাস জানা প্রয়োজন।

প্রাচীনকাল থেকেই অসম নামক এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ড নানা ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির মানবগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। অসমের রাজনৈতিক সীমানা বারবার বদল হয়েছে, ফলত জনসংখ্যা এবং জনবিন্যাস ও বারবার পাল্টেছে। মোগলদের আগমন ও ঘটেছে এ রাজ্যে।  ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে মোগলদের অধীন থেকে ইংরেজদের অধীনে আসে করিমগঞ্জ, ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাও, কোকরাঝাড় এবং চিরাং জেলার কিছু অংশ এবং করিমগঞ্জ জেলাকে বাদ দিয়ে বাদবাকি সব অঞ্চল ইংরেজরা অবিভক্ত বাংলার রংপুর জেলার সাথে একত্রিত করে। ১৮২৬ সালে আহোম রাজা এবং ইংরেজদের মধ্যে ইয়ান্ডাবু চুক্তি হয় এবং করিমগঞ্জ বাদ দিয়ে উপরিক্ত সব অঞ্চল নয়া গোয়ালপাড়া জেলা হিসেবে উপনিবেশিক অসমে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৬৭ সালে নয়া গোয়ালপাড়া জেলাকে কোচবিহারের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৫৬২ সাল অব্দি কাছাড় এবং হাইলাকান্দি জেলা ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর পরে ১৭৬৫ পর্যন্ত এই দুই জেলাই কোচ রাজ্যের অংশ এবং তারপর ১৮৩২ সাল পর্যন্ত কাছাড়ি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৭৪ সালে সিলেট, কাছাড়, গোয়ালপাড়া— তিনটি বাংলাভাষী জেলাকে ঢাকা ডিভিশন থেকে কেটে এনে অসমের সঙ্গে সংযুক্ত করা হল। এবং এর ফলেই অসমে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠল। এবং মুসলমান সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে ২৮.৮ শতাংশে উঠে এল।

ইংরেজরা অসমে চা নিয়ে এল। এবারে চা-বাগানগুলোতে কাজ করার জন্যে প্রচুর শ্রমিকও তো চাই। তাই ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আগমন ঘটল আদিবাসী শ্রমিকদের। আবার অসমের জমিতে শস্য ফলানোর জন্য তৎকালীন পূর্ববাংলা থেকে আগমন ঘটল ভূমিহীন মুসলমান কৃষকদের।

১৯০৫ থেকে ১৯১২— এই সময়সীমার মধ্যে বাংলাভাষী মানুষদের অসমে অবাধে যাওয়া আসার ফলে স্বাধীনতার সময়ে অসম রাজ্য দেখা গেল বাংলাভাষীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আবার ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষকে দ্বিধাবিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করার সময়ে শ্রীহট্টের অঙ্গচ্ছেদ ঘটিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত সিলেট জেলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। তখন প্রায় তিন লক্ষ চা-বাগান শ্রমিক— যাদের অধিকাংশই হিন্দু— অসমে আশ্রয় নেয়। অনেক অবস্থাপন্ন হিন্দু পরিবারও সিলেট ছেড়ে অসমে উদ্বাস্তু হয়।

বাংলাভাষীদের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অসমিয়া জনজাতির কাছে অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিল। এবং অসমীয়া নেতাদের ছল, বল আর চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অভিবাসী মুসলমানেরা সরকারিভাবে অসমীয়াকে মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। এবং এরই ফলে ১৯৭১ সালের লোকগণনাতে অসমীয়া জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬০.৪৯ শতাংশে। এবং অভিবাসী মুসলমানদের নতুন পরিচয় হয়ে উঠলো “নব্য অসমীয়া”।

১৯৭৯ সালের আসুর নেতৃত্বে অসমে শুরু হয় “বিদেশি খেদাও আন্দোলন”। উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদ স্লোগান তুলল বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা অসম দখল করে নিচ্ছে বলে। বাংলাভাষী মানেই অসমে বহিরাগত, এটাই সামাজিক তত্ত্ব হিসেবে অসমীয়া সমাজে বহুলভাবে গৃহীত হল। ১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭— এই দীর্ঘসময়ের সমস্ত ইতিহাসকে অস্বীকার করে আসু হিসেব দিল অসমে ৯০ লক্ষ বিদেশি ঘাঁটি গেড়েছে, যার ৫০ লক্ষ বাঙালি হিন্দু এবং ৪০ লক্ষ চর অঞ্চলের নব্য-অসমীয়ারা।

উর্দু শব্দ ‘মিঞা’ একটি বহুল পরিচিত শব্দ। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশে ‘মিঞা’ সম্বোধনটি হিন্দুদের ‘বাবু’ সম্বোধনের ইসলামীয় সংস্করণ। যেমন ‘অতীনবাবু’ ও ‘জালাল মিঞা’। কিন্তু  স্বাধীন ভারতবর্ষের অসম রাজ্যে ‘মিঞা’ শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয় চর অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিমদের প্রতি। চর অঞ্চলের মুসলিমদের সাথে বাঙালি হিন্দু এবং অসমীয়াদের সাথে শ্রেণিগত দূরত্ব বৃটিশ শাসনকাল থেকেই স্পষ্ট। এইসময়ই সামে নমশুদ্র এবং চর অঞ্চলের মুসলিমদের ‘চরুয়া’ বলে অভিহিত করা হয়। ‘চরুয়া’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যারা চরে বসবাস করে এবং একই সাথে চুরি ডাকাতি সহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে অবশ্যই জড়াবে এইরকম প্রাকধারণা প্রকাশ করা শব্দ। এবং যেহেতু ধর্মীয় পরিচয়ে এরা মুসলিম, তাই ‘মিঞা’ বলে দেগে দেওয়া হয়। এবং আগেই বলেছি, এদেরকে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবেও জনমানসে প্রচার করা হয়।

চর অঞ্চলের মুসলিমদের ভাষা বাংলা নয়। এরা নিজেরাই নিজেদের স্বর তৈরি করেছে কামতাপুরী, রাজবংশীয়, অসমিয়া, সিলেটি, বাংলা সহ সব ভাষা থেকেই। এদের ডায়ালেক্ট এক মিশ্র চরাচর, যাকে খানিকটা বাংলা বা অসমীয়া বলে শোনালেও সেটাকে বাংলা বা অসমীয়া বলে দাবি করা যায় না। এদের ডায়ালেক্টের নাম ‘দোরান’।

২০০৫ সালের ভয়ঙ্কর বন্যায় ভেসে যায় ব্রহ্মপুত্রের চরগুলো। অসহায় মানুষগুলো যখন গুয়াহাটি ফুটপাতে এসে আশ্রয় নেন, তখন গুয়াহাটির নামকরা কলেজ, যা এখন ইউনিভার্সিটির মর্যাদা লাভ করেছে, সেই কটন কলেজের ছাত্ররা ওই সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোকে জোর করে তাড়িয়ে দেয় ফুটপাত থেকে। চর অঞ্চলের ‘মিঞা’দের প্রায়ই এরকম বহিষ্কারের সম্মুখীন হতে হয়। এতটাই সুতীব্র ঘৃণা অসমীয়াদের এই মিঞাদের প্রতি। এবং এই প্রতিনিয়ত অপমান, ঘৃণা, শোষণ, বঞ্চনা চর অঞ্চলের নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের প্রতিবাদী করে তুলেছে। প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে তাঁরা হাতে তুলে নিয়েছে কলম।

‘মিঞা’ কবিতা নির্মাণের প্রথম ধাপ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে। বন্দে আলির ‘এক চরুয়ার শপথ’ কবিতা দিয়ে এই ধারার যাত্রা শুরু। যদিও সমস্ত কবিতায় কোথাও ‘মিঞা’ শব্দটি  ব্যবহার করা হয়নি, কিন্তু কবিতাটি পড়লে বোঝা যায়, কোথাও একটি নতুন ধারা তার খাত খুঁজতে চাইছে, ব্যবহার করছে সেই স্বরের মাটির টান। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে যখন ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা নেলীতে হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে কবীর আহমেদ লেখেন “I Beg to State That” নামে একটি ইংরেজি কবিতা, এবং সেই কবিতারই একটি লাইন ছিল— “I am a settler, a hated Miya”। এই লাইনটিই বর্তমানের মিঞা কবিতার জন্মদাতা। ভ্রূণ অবস্থা থেকে শুরু হয় তার ব্যাপ্তি।

২০১৬ সালের শুরুতে অসমে সরকার বদল। সেইসময় থেকেই শুরু হল এনআরসি, বিদেশি, খিলিঞ্জিয়া, বাংলাদেশি, ডি-ভোটার, ১৯৭১-১৯৫১ বিতর্ক। চরম রাগ আর হতাশা থেকে ড. হাফিজ আহমেদ ফেসবুকের পাতায় লিখলেন “লিখি লোয়া, মই এজন মিঞা”। এই কবিতার হাত ধরেই একটা আন্দোলন জন্ম নিল অসমের বুকে। ব্রহ্মপুত্র এলাকার মুসলিম তরুণ প্রজন্ম, যাদের পূর্বপুরুষ বাঙালি ছিলেন, এই নবীন কবিরা ফেসবুকে একের পর এক মিঞা কবিতা লিখতে শুরু করেন। ফেসবুকের পাতায় ফুটে উঠে তাদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার ইতিহাস। কবি রেজওয়ান হুসেন সেই যন্ত্রনার বিষে নীল হয়েই লেখেন “আমাগো বিপ্লব” কবিতায়—

আমাদের তোমরা গালি দেও
হাতের নাগালে পেলে লাথিও মার
নীরবে কিন্তু আমরা তোমাদের
অট্টালিকা, রাস্তা, দালান বানাতে থাকব
তোমাদের অস্থির, ঘামে ভেজা, চর্বিযুক্ত
শরীরটাকে আমরা কিন্তু রিক্সায় টানতে থাকব
… 

অথবা চান মিঞা লিখেন “আইজকা আমি আমার নাম জানি না” কবিতায়–

আবার ডিটেনশন ক্যাম্পে বসে মনে পড়ল
হায়রে, এই বিল্ডিংটা তো আমিই বানিয়েছিলাম
এখন আমার কিছু নাই
মাত্র আছে একজোড়া পুরানো লুঙ্গি, আধপাকা দাড়ি
আর দাদার নাম থাকা ছেষট্টি’র ভোটার লিস্টের এফিডেফিট কপি।

চরের মুসলিম ছেলেরা আজ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করছেন—

কিছুই লাগবে না তোমার
মাত্র আমার যা প্রাপ্য তাই দাও
আমার নাম আমি নিজেই বানাব একদিন
নিজের দমেই…

সাতটি মিঞা কবিতার অনুবাদ

লিখে নাও আমি একজন মিঞা

ড. হাফিজ আহমেদ

[মূল কবিতা ইংরেজিতে লেখা]

লিখো
লিখে নাও
আমি একজন মিঞা
এনআরসিতে সিরিয়াল নং ২০০৫৪৩।
দুই সন্তানের বাবা আমি
সামনের গ্রীষ্মে জন্ম নেবে আরও একজন
তাকেও তুমি ঘৃণা করবে কি
যেভাবে ঘৃণা কর আমায়?

লিখো
আমি একজন মিঞা
সেই জলা জমিকে
আমি সবুজ ক্ষেত বানিয়েছি
তোমাকে খাওয়াতে,
ইটের পর ইট বয়ে এনেছি
তোমার বাড়ি বানাতে,
তোমার গাড়ি চালিয়েছি
তোমার আরামের জন্য,
খাল নালা পরিষ্কার করেছি
তোমার স্বাস্থ্যের জন্য,
তোমার খাটুনি খাটার জন্য
আমি হাজির যেকোনও সময়ে।
তবু যদি মন না ভরে
লিখে নাও
আমি একজন মিঞা।

এই গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রজাতন্ত্রের
অধিকারের জন্য অধিকার ছাড়া এক নাগরিক।
আমার মা’কে ডি ভোটার বানিয়ে দিল,
তার মা-বাপ ছিল যদিও ভারতীয়।
ইচ্ছে হলেই প্রাণে মেরে দিতে পার, লাথ মেরে
তাড়িয়ে দিতে পার আমার গ্রাম থেকে,
আমার সবুজ ক্ষেত কেড়ে নিতে পার,
বেলন দিয়ে পিষে দিতে পার আমাকে,
তোমার গুলি
আমার বুক ফুঁড়ে দিতে পারে,
জানি, তোমার কোনও শাস্তি হবে না।

লিখো
আমি একজন মিঞা
ব্রহ্মপুত্রে বেঁচে আছি
তোমার নির্যাতন সইতে সইতে,
আমার শরীর কালো হয়ে গেছে
চোখ আগুনে লাল।
দাঁড়াও!
রাগ ছাড়া ভাঁড়ারে কিছু নেই।
দূর হটো!
নাহলে
ছাই হয়ে যাও।

 

যদি আর কোনও ভাষা না থাকে দুনিয়ায়

কাজী নীল

[মূল কবিতা অসমীয়া ‘দোরানে’ লেখা]

যদি আর কোনও ভাষা থাকে না পৃথিবীতে
যদি হারিয়ে যায় সব অক্ষরমালা
যদি ভেসে যায় খাতা কলম, কবিতার উপমা
যদি কোনও সাঙ্কেতিক ভাষায় আর না বলতে পারি
তোমাকে আমার এই নীরব দুঃখ

এই মরে যাওয়া মন যদি
আর না পায় গানের ঠিকানা
যদি না লিখা হয় চিঠি এই আগুন জ্বলা বসন্তে
যদি বোবা হয়ে যাই, যদি আমাদের চোখ
আর না বলে কোনও কথা

যদি নদী থাকে নদীর মতন, ঢেউয়ের কোনও শব্দ নাই
যদি পাখি থাকে গাছের ডালে, ঠোঁটে কোনও বাঁশি নাই
যদি আমরা ছটফট করি সারা রাত
কথাগুলি উড়ে বেড়ায় শিমুল তুলার মতন
আর বুঝতে না পারি বুকফাটা মেঘের বিষাদ

যদি সব ভাষা হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে
যদি থেমে যায় এই কলম
ভালোবাসার কথা কি আমি বলব না, বলো?
আমি কি বলব না এই নীরব দুঃখের কথা
অন্য কোনও আদিম ভাষায়?

সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না

কাজী নীল

[মূল কবিতা অসমীয়া ‘দোরানে’ লেখা]

যে দেশ আমার বাবাকে বিদেশি বানায়
যে দেশ আমার ভাইকে গুলি করে মারে
যে দেশে আমার বোন মরে গণধর্ষণে
যে দেশে আমার মা বুকে আগুন চেপে রাখে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে দেশে লুঙ্গি পরার অধিকার নাই
যে দেশে কান্না শুনার মানুষ নাই
যে দেশে সত্য বললে ভূত কিলায়
যে দেশ আমার আজীবন দাসত্ব চায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে দেশে টুপি মানেই মৌলবাদী
যে দেশে মিঞা মানে নীচজাতি
যে দেশে ‘চরুয়ারা’ সব বাংলাদেশি
যে দেশ টাটা বিড়লা আম্বানির হাতে বিক্রি হয়ে যায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে দেশে আমাদের লাশের পর লাশ কুপিয়ে কেটে
নদীতে ভাসিয়ে দেয়
যে দেশে ৮৩তে মানুষ মেরে শালার বেটারা জল্লাদের
মতো উল্লাস নৃত্য নাচে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে দেশে আমার ভিটা বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়
যে দেশে আমার অস্তিত্বকে বাতিল করা হয়
যে দেশ আমাকে অন্ধকারে রাখার ষড়যন্ত্র চালায়
যে দেশ আমার থালাতে পান্তার বদলে পাথর ঢালতে চায়
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

যে দেশে আমি গলা ছিঁড়ে চিৎকার করলেও কেউ শুনে না
যে দেশে আমার খুনের জন্য কেউ দায়ী না
যে দেশে আমার ছেলের কফিন নিয়ে রাজনীতি চলে
যে দেশ আমার বোনের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলে
যে দেশে আমি জানোয়ারের মতো বেঁচে থাকি
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।

 

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর

কাজী নীল

[মূল কবিতা অসমীয়া ‘দোরানে’ লেখা]

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
আমার দম বন্ধ হয়ে আসে
আমার বাড়িতে দুইটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে
সাইকেলের শব্দ শুনার জন্য জেগে রয়েছে এখনও
ভাতের থালা নিয়ে আশা নিয়ে বসে রয়েছে
আমার আদরের বাহারুন নেসা

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
আমার আর বাড়ি যাওয়া হবে না
সকাল হলেই আমাকে আবার বেরোতে হবে
গরু দুটোকে মাঠে দিয়ে ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুলে
যাবে মজিদভিটার চরে।
সাইকেলে করে সব্জি নিয়ে দুপুরের আগেই
পৌঁছতে হবে বাজারে

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
আমার কেমন যেন ভয় ভয় করে
জাহাঙ্গীর তুমি কি লিখবে
লিখে এমন কি বিপ্লব ঘটাবে!

তোমার এক একটা শব্দে যদি
টনক নড়ত মানুষের দুনিয়া কবেই বদলে যেত
কাগজ-কলম ভাসিয়ে দেও পাগলদিয়ার জলে
এই দেশ আর মানুষের নাই সব পিশাচ হয়ে গেছে

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
বাজারে তোমাকে ধরার জন্য পুলিশ ঘুরঘুর করে
জাহাঙ্গীর তুমি লিখলে ওদের তক্ত কেঁপে উঠে
মানুষের বুকে তুষের আগুন থেকে দাবানল জ্বলে
তুমি লিখলে বিপ্লব আসে মজনু মিঞার লাঙলে
তুমি লিখলে স্বপ্ন দেখে মানুষ নতুন করে
এই খেত-খামার-গঞ্জ-গ্রাম
সব শ্মশান হয়ে যাক

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
তুমি যদি লেখো গেদারা পাহাড় ভাঙতে চায়
সোনার বরণ রোদ উঠে পাথর গলিয়ে ঝর্ণা নামায়
তুমি যদি লেখো গুয়াহাটির পূজা নিরালা
প্রেমে পড়ে ধুবড়ির আজিজুল হকের
তুমি জানোয়ারদের জানোয়ার থাকতে দাও
হিন্দু-হিন্দু মুসলিম-মুসলিম থাকতে দাও

তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
আমার গলা ধরে আসে আবেগে
তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর
মানুষের চিৎকারের শব্দ আমি শুনতে পারি না
আমার কান তালি লেগে যায়
হাত-পা থরথর করে কব্জিতে জোর নাই
পেডেলে জোর দিয়ে এগুতে পারি না
তোমার কলমের সামনে আমার মাথা নিচু হয়ে যায়
তুমি আর লিখো না জাহাঙ্গীর।

 

কবর খুঁদে

কাজী নীল

[মূল কবিতা অসমীয়া ‘দোরানে’ লেখা]

কবর খুঁদে আমি আমার
পূর্বজন্মের ফসিল বের করে আনি
দেখি দুইশ বছরের গোলামিতে
বাঁকা হয়ে গেছে আমার মেরুদণ্ড
দেখি আমার বুকের ভিতরে মাটির ভিজা গন্ধ
হাতের মুঠোয় লাঙলের ভগ্নাংশ

কবর খুঁদে আমি
বের করে আনি আমার অন্ধকার অতীত
দেখি সবারই এক একটা ভ্রমণের ইতিহাস আছে
মাথা নিচু করে হেঁটে যায় নিরন্ন মানুষের মিছিল
সবারই এক একটা কাহিনী আছে ভেসে যাওয়ার

কবর খুঁদলে আমি একটা রক্তাক্ত নদী পাই
দেখি অথৈ জলে ভাসছে আমার গুলিবিদ্ধ লাশ
কবর খুঁদলে
আগুন কি না আমি জানি না
একটা লাল টকটকে উত্তেজনা পাই

কবর খুঁদে আমি নিজেই নিজের লাশ নিয়ে
পৌঁছে যাই গোরস্থানে
ওরা আমাকে শহীদ ঘোষণা করুক আর না ই করুক
এই জমিন বিক্রি হওয়ার আগে এই বাতাস ফুরিয়ে যাওয়ার আগে এইসব নদী বিষাক্ত হওয়ার আগে
একবার, অন্তত একবার আমি তুমুল যুদ্ধে বিধস্ত হতে চাই…

 

হাত

কাজী নীল

[মূল কবিতা অসমীয়া ‘দোরানে’ লেখা]

চলন্ত মেশিনে ঢুকে
একটা হাত কাটা গেছিল আকবর আলির
তারপর তাকে ছাঁটাই করা হয়েছিল
কারখানা থেকে
একটা কানা পয়সাও সাহায্য করেনি কোম্পানি
উল্টে একমাসের বেতন কাটা গেছিল
দশদিন কাজের পরে হাতটা হারিয়েছিল আকবর আলি

আকবর আলি ফিরে এসেছিল কাটা হাত নিয়ে
সমস্ত চরের মানুষ তাকে দেখতে এসেছিল
বলেছিল – চিন্তা করিস না আকবর। আমরা আছি। ওপরে আল্লা আছে।
ভরসা পেয়েছিল আকবর আলি। ভেবেছিল কোম্পানি না থাক। মানুষ আছে।

তারপর না ছিল মানুষ। না আল্লা।
ছিল একটা হাটের দিন। ছিল ভিক্ষার থলি। গলা ভাঙ্গা গান।
একদিন আকবর আলিও আর ছিল না। পোকা ধরেছিল তার শরীরে।
এরকমই এক হাটের দিনে রাস্তার ধারে পড়ে ছিল সে।

আর তারপর মধ্যে মধ্যে জ্যোৎস্না রাতে
চাঁদ যখন উঠে আসত কারখানার চিমনির মাথায়
তাকে খপ করে হাতের মুঠোতে নেওয়ার জন্য
বের হয়ে আসত একটা বাঁশঝোপের ভিতর থেকে
আকবর আলির কাটা যাওয়া হাত….

 

কারা যেন

কাজী নীল

[মূল কবিতা অসমীয়া ‘দোরানে’ লেখা]

কারা যেন খসখস করে ঘরের পাশে
কারা যেন হেঁটে যায় রাতদুপুরে। মাঘ মাস। ধানের খেতে খড়ের পাহাড় পার হয়ে কারা যেন হেঁটে যায়
আমার হাত-পা কাঁপে—

কারা যেন টোকা দেয় বাঁশের বেড়া’তে। ফিসফিসিয়ে ডাকে – ওই রহিম কই! দরজা খোল।
আমি। আমি অম্লান!
ওরা নতুন দিনের কথা বলে। এই চরম আকালের দিনে স্বপ্ন দেখায়। বলে একণাত্র বন্দুকই দিতে পারে দু-মুঠো অন্নের ঠিকানা –

নতুন পতাকার জোয়ার আসে। মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতার স্লোগান –
জঙ্গলের ভেতরে কারা জানি মশাল জ্বালায়
গ্রামে গ্রামে বুটজুতার শব্দ সারা রাত
কার বোনের চিৎকার শোনা যায় – মা ঐ —
কার ভাইয়ের লাশ পাওয়া যায় –
রক্তে ভেসে যায় নব্বইয়ের অসম —

শুকনো বাতাসের শুমশুম শব্দে আমার ঘুম আসে না
কারা যেন হেঁটে যায় — কারা যেন টোকা মারে
বাঁশের বেড়ায় —

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...