সহযাপন

শতাব্দী দাশ

 

দ্বিজব্রতর কথা

জাকলবান্ধা বাজারের হট্টগোল পেরোনোর পর গাড়িটা হাইওয়ে ছেড়ে ডানহাতি একটা পথ ধরল। গ্রাম্য ঘরবাড়ি, পাড়া। বাড়িগুলোর ছাদ সুশৃঙ্খল সমবাহু ত্রিভুজ। দুই বাহু বেয়ে অতিবৃষ্টি গড়িয়ে নামবে। অহমিয়া ইস্কুলের উঠোন, ভাতের লাইন৷ ক্লাব-ঘরের চাতালে দুপুর-জাগানিয়া জটলা। ‘শিলঘাট কোনদিকে দাদা?’ ঊর্মি বাংলা বলছে। দ্বিজ ভয় পেল। পাঁচ বাঙালিকে মেরে ফেলেছে ক’দিন আগে, তিনশুকিয়ায়। এ জায়গা অবশ্য কয়েক শ’ কিলোমিটার দূরে। তাছাড়া তারা টুরিস্ট, রিফিউজি নয়৷ তাও ভয় পেল দ্বিজ৷ ঊর্মিকে নিয়ে সে প্রায়শ ভয় পায়। দাদা ভ্রু কুঁচকে তর্জনী তোলে দূরের দিকে। বলে, এই রাস্তাই।

পথ নির্জন হয় ক্রমশ। ঝাঁকুনি খেতে খেতে গাড়ি যাচ্ছে৷ গুগল ম্যাপ বলছে, আরও বেশ কয়েক কিলোমিটার। ড্রাইভার নেহাতই কিশোর। শহর গুয়াহাটির ছেলে৷ পাহাড়-নদী-জঙ্গলে মতি নেই৷ শিলঘাট ছিলও না ইটিনিরারিতে। হঠাৎ জানা গেল, কাছেই বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মার পুত্র, তেজস্বী পুরুষ। পথ চিনতে গুগলই ভরসা। ঊর্মি উশখুশ করছে।

রাস্তা একবগগা। ঘুরপ্যাঁচ নেই। সর্ষের খেত পড়ল দুপাশে৷ মেঘ করেছে। বৃষ্টি নামবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না৷ অনেক দূর এসে মাইকের আওয়াজ শোনা গেল৷ অহমিয়া গান। সুর চেনা৷ ‘মানুষ মানুষের জন্য’। হুবহু। কথাও এক, বোঝা যায়৷ ভাষা আলাদা৷ অপরিণত কিশোরী-গলা৷ বেসুরে ছিটকে চলার ঝোঁক। মাচায় বাঁধা স্টেজ দৃশ্যমান হয়েছে এইবার৷ বালিয়াড়িতে৷ বালিয়াড়িই তো, চিকচিক করছে অদূরে। তার মানে নদও আছে৷ বালিয়াড়ি থেকে ঊর্মির দিকে চোখ যায় দ্বিজর। ঊর্মির চোখে খুশি।

ঊর্মি কম কথা বলে। দ্বিজর চোরা অস্বস্তি আছে তা নিয়ে। খুঁটিয়ে ঊর্মির মুখ-চোখের ভাষা পড়তে হয়৷ ঊর্মিকে খুশি দেখে দ্বিজর মন ভালো হয়৷ গাড়িটা বালিয়াড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ে৷ দু চারটে ছড়ানো পসরা। এক পাশে স্টেজ। কোনও আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতা৷ গোলাপি জামা ইস্কুল বালিকারা। সবুজ প্যান্ট কিছু বালক। আরও কিছু নীল লাল ইউনিফর্ম। বালুচরের সাদার উপর ঝাঁক বাঁধছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে৷ ক্যালাইডোস্কোপে যেমন হত।

ঊর্মি বাহু জড়িয়ে ধরলে পরিপূর্ণ লাগে৷ ওরা এখন হাঁটছে ব্রহ্মপুত্রের দিকে৷ ক্ষীণকটি নদী নয়৷ এপার-ওপার দেখা যায় না, এমন দশাসই নদ৷ চাপল্য নেই৷ গম্ভীর ও গভীর৷

একটা সুসজ্জিত বজরা ভেড়ানো আছে। বিদেশি পর্যটকদের ব্রহ্মপুত্র ভ্রমণ। অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে ন্যাশনাল ওয়াটার-ওয়ে-র কারিকুরি৷ বজরার পাশে ঊর্মিকে দাঁড় করিয়ে একটা ছবি নেয় দ্বিজ৷ ফেনিল জলের ব্যাকড্রপ। ভাগ্যিস দ্বিজ এই জায়গার হদিশ পেয়েছিল হঠাৎ, ঊর্মি বলে। নাহলে ব্রহ্মপুত্র দেখা হত না। ঊর্মির ছোটখাটো ভালো লাগায় ভরে যায় দ্বিজ। পুরুষের সুপ্ত সুখ ব্রহ্মপুত্রের উচ্ছ্বাসে টের পাওয়া যায়৷

ঊর্মি দেখায়, পিছনের পাহাড়ে মন্দির। ঊর্মি মন্দির মাড়ায় না বড় একটা। আজ মন্দিরেই যেতে চাইল৷ রেলিং বাঁধানো খাড়াই সিঁড়ি উঠে গেছে৷ কিছু হলুদ পাতা ঝরে পড়েছে সে পথে। ইস্কুলের ছেলে-মেয়ে সিঁড়ির খাঁজে জটলা করেছে। ওদের গানের অনুষ্ঠান ওদিকে চলছে উচ্চৈস্বর৷ ‘দিল হুম হুম করে…. ঘবরায়’। কিন্তু হিন্দি নয়, অহমিয়া ভাষায়। মন্দির থেকে নেমে আসছে যারা, তাদের কপালে মেটে লাল সিঁদুর। তারা সিঁড়িতে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে, খাওয়া-দাওয়া সারছে৷ কমলালেবু-কেক-কুরকুরে৷ শিশুর হাত থেকে ফাঁকা বহুজাতিক প্যাকেট উড়ে গেল ঝাউ-এর বনের দিকে৷ ঘোমটার ভিতর থেকে মা ধমক দিল৷ ভগবানও ভক্তকে অমন মৃদু ভর্ৎসনা করেন হয়ত৷ ভক্তিমার্গের সুবিধা হল, ইষ্টদেবতার কাছে ভেঙে পড়া চলে, কান্নাকাটি চলে। ভুলচুক, বিচ্যুতি, তাও চলে৷

প্যানোর‍্যামিক ভিউ পাওয়া গেল সিঁড়ির এক বাঁকে। লেন্সে ছোট বড় সবুজ পাহাড়, হরিৎ উপত্যকা, ঢালে ছোট বাড়ি, ঝুম চাষ৷ নীল ফ্রিল দেওয়া সবুজের নানা শেড। ছবি তোলা শেষ হলে পিছন ফিরে উর্মিকে পেল না দ্বিজ। উপরে উঠে গেল কি? দ্রুত সিঁড়ি ভাঙে দ্বিজ। হাঁফ ধরে৷ ভয় ফিরে আসছে। নাম ধরে ডেকে সাড়া পাওয়া যায় না৷ অনেকটা উঠে মন্দিরের চাতাল৷ ইতস্তত চটি৷ ঊর্মির চটি তার মধ্যে দেখা যায়। আটকে যাওয়া দমটা ফেলতে পারে দ্বিজ অবশেষে৷ সামনে নাটমন্দির। পংক্তিভোজনের আসন পাতা চলছে। সেইসব ফেলে, গর্ভগৃহ। তার সামনে স্থানুবৎ ঊর্মি৷

দ্বিজ পিছন থেকে ঊর্মির কাঁধ চেপে ধরে আলতো৷ উত্তেজনাতেও সে উর্মির উপর বলপ্রয়োগ করতে পারে না৷ লেগে যাবে, ভয় হয়। কেন হয়? ঊর্মি পিছন ফিরে দ্বিজর মুখ পড়ে নেয়।

–এমা, আমি ঠিক আছি৷ আছি।

দ্বিজ স্বস্তি পায় ‘আছি’ শুনে৷ রাগ হয় না। ঊর্মির উপর কখনওই রাগ হয় না৷

গর্ভগৃহে প্রণামী শাড়ির বাহুল্যে প্রায় ঢাকা পড়েছেন দেবী৷ মন্দিরগাত্রে তাঁর নাম আকীর্ণ। কামাখ্যা। গুয়াহাটির প্রসিদ্ধ কামাখ্যা মন্দির থেকে অনেক দূরে অখ্যাত এই মন্দির৷ শাক্ত মতে পূজা হয়। সাধকেরা লোহিতবস্ত্র পরা পুরুষ৷ গলায় রুদ্রাক্ষ৷ ছাগশিশুর আর্তচিৎকার শোনা গেল৷ তাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যূপকাষ্ঠে৷ বাজনা বেজে উঠল। ঊর্মিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে৷ সে পছন্দ করবে না৷  যদিও দ্বিজ ভাবে, বলি আসলে মনুষ্যভোগেই লাগে৷ যা খাব, তার কিছুটা ঈশ্বরকেও উৎসর্গ করব, এই অনুশাসনে হয়ত সীমাহীন লোভকে খর্ব করার অভিপ্রায় থেকে থাকবে৷ দ্বিজ ধর্মমাত্রকেই মন্দ দাগিয়ে দিতে পারে না, ঊর্মিদের মতো৷ ঊর্মির ভাব ও ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, নিজেকে মন্দিরের অন্যদের থেকে ‘আলাদা’ জাহির করার চেষ্টা তার আছে। তার আগ্রহ বড়জোর তাত্ত্বিক৷ সে জুতোজোড়া খুলবে, মন্দিরেও ঢুকবে৷ প্রসাদ গ্রহণ করবে না, টিকাও লাগাবে না৷ দ্বিজ সপ্রশ্রয়ে তার কীর্তিকলাপ দ্যাখে। যেমন সপ্রশ্রয়ে ধর্ম নিয়ে তার উপলব্ধির কথা শোনে ঊর্মি। ঢাক-বাদ্য আর আর্তনাদের মধ্যে ওরা নামতে শুরু করে৷

 

ঊর্মিমালার কথা

মন্দির থেকে নেমে বাঁ দিকে গাড়ি রাখা৷ ডান দিকে রাস্তাটা অজানার দিকে চলে গেছে৷ ঊর্মি সেদিকেই যেতে চায়। আরও কিছুক্ষণ হাঁটা যাবে পাশাপাশি। আজকের গেলাসের শেষ বিন্দু পর্যন্ত জিভে উপুড় করে নিতে হবে। কাল বাড়ি ফেরা। বাড়ি ফেরা মানে গতানুগতিক ব্যস্ততা শেষে রাতে পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়া কোনওমতে৷

ঊর্মির পদক্ষেপে প্রফুল্লতা। একটু আগে দ্বিজ ঘেমে-নেয়ে একসা হয়েছিল তাকে হারিয়ে ফেলে৷ দ্বিজর প্রায় কেঁদে ফেলা তাকে আশ্বাস দেয়৷ অন্তত একজনের কাছে সে অমূল্য। দ্বিজ অতীতের অন্য পুরুষদের মতো নয়৷ প্রশস্ত বুকের ব্রহ্মপুত্র নির্মমভাবে ধ্বংস করে। আবার পলির আদরে ঢেকেও দেয় মাটিকে। অতীতের পুরুষদের সঙ্গে ছিল বিধ্বংসী ভালোবাসাবাসি। দ্বিজ হল পাললিক আদরটুকু।

ব্রহ্মপুত্র ঘেঁষে কিছু ক্ষীণ বাড়ি৷ চাঁছড়ার, টিনের, মাটির৷ পরিচ্ছন্ন বেড়া দেওয়া৷ সামনে সামান্য ফুলের কেয়ারি, সবজির বাগান। দুই বাড়ির ফাঁক গলেও ব্রহ্মপুত্রে পৌঁছনো যায়৷ চরে দাঁড়িয়ে বিশালাকার জাল ছুঁড়ছে কৃষকায় জেলে৷ কাপড় ধুচ্ছে এক বুড়ি৷ কোমরে ঘুনসি পরা উলঙ্গ শিশুরা উঠোনজ্ঞানে ব্রহ্মপুত্রের চরে খেলা করছে৷ বুড়ি উঠে আসছে৷ বুড়ির পায়ে পায়ে একটি বিড়ালছানা। বুড়ি ফোকলা মুখে হাসে৷ ওদের পাশ দিয়ে দ্বিজ এগিয়ে যায় নদের দিকে৷ জেলের ছবি তোলার জন্য হয়ত৷ বুড়ি পরিষ্কার বাংলায় বলে, দেখে যেও বাপ, গু-মুত আছে চরে।

–কী নাম আপনার?
–কল্যাণী, মা গো।
–কোন বাড়িটা আপনার?

চাঁছড়ার একটি বাড়ি দেখিয়ে কল্যাণী বলে,

–এইটে।
–কে কে আছে?
–ছেলেরা। বউরা। নাতি-নাতনী৷ বর মরেছে অনেকদিন৷ যৈবনকালেই। কোত্থেকে আসা?
–কলকাতা।
–আমার মামাবাড়ি হাওড়া জিলায়৷ বাড়ি হাসনাবাদ। খুব ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল। বাংলাদ্যাশে৷ উচ্ছিন্ন হয়ে হেথায়।
–তাই নাকি?
–হ। মামাবাড়ি মেলা হত। কতদিন মেলার মিষ্টি খাইনি গো। গজা, জিলিপি…

বালিকাবেলার অপূর্ণ লোভ বৃদ্ধার দৃষ্টিতে চকচক করে। ছাগল বলির সময় দ্বিজ লোভ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছু বলছিল। কল্যাণীর পরণে যৌবনকালে চাপিয়ে দেওয়া থান।

–বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে আপনার, না?
–অনেক জাগা ঘুরসি মা৷ নিজের বাড়ি কুনটা কে জানে!
–ওই যে বললেন হাসনাবাদ?
–ছোটবেলা আবছা মনে পড়ে। আমার কুনো বাড়ি নাই। ইখানেও ভালো লাগে না। পায়ে পা দিয়া ঝগড়া করে এরা। আমরা বোংগালি না! তাই। সবাই সবাইকে সন্দ করে।

‘অপর’-এর প্রতি সন্দেহ ও দ্বেষ সভ্যতার মজ্জাগত৷ ‘আমার কোনও ঘর নেই’ ঊর্মিকে এলোমেলো করে। ট্রেনে যেতে যেতে দেখেছিল, এনজেপির আগের ছোট নিঝুম স্টেশন। ‘নিজবাড়ি’। মনে হয়েছিল, নিজবাড়ি একটা বিরাট ‘নেই’৷ যতবার থিতু হতে চেয়েছে কোথাও, সেসব বাড়ি হয়ে ওঠেনি। কোথাও নেই, এমন একটা বাড়ির জন্য মনখারাপ হয় মাঝে মাঝে৷ ইংরেজিতে যাকে নাকি হিরাইথ বলে৷ দ্বিজ আলাদা। যতটা পুরুষ হলে ‘অপর’ হয় পুরুষমানুষ, ততটা পুরুষ সে নয়। কিন্তু দ্বিজর বাড়িকেও নিজের বাড়ি ভাবতে আটকায়। দ্বিজ তার গৃহহীনতা বুঝবে না।

বৃদ্ধা তাকে শিবমন্দিরের গল্প শোনায়। জল থেকে হরপার্বতী জেগে ওঠার গল্প৷ দ্বিজ ফিরলে ঊর্মি জানায়, যে পথ চলে গেছে ব্রহ্মপুত্রের তীর বরাবর, সেই পথে এরপর একদিকে খাড়া সবুজ পাহাড় আর অন্যদিকে নদ পড়বে৷ তিন কিলোমিটার হাঁটলে আছে প্রাচীন আর এক মন্দির। জঙ্গুলে শিবমন্দিরে দ্বিজ আগ্রহ পাবে, ঊর্মির মনে হয়৷ বৃদ্ধা পিছনে বিড়বিড় করেন,

–লিঙ্গ উঠসে জল থিকে৷ স্বসোক্ষে দেখা৷ পার্বতীরে মাথায় নিয়া শিবশম্ভু।

দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকায়৷

–কী ব্যাপার?
–কিছুই না। দেখছ না, কেমন সব বড় বড় পাথর জেগেছে নদীর বুকে? ওরকমই কোনও পাথর৷ বা জোড়া পাথর৷ স্থানীয় বিশ্বাস, জল থেকে দেবাদিদেব উঠেছেন৷ তাঁর কাঁধে পার্বতী৷

দ্বিজ বোঝায়, ঐশ্বরিক যুগল কল্পনা করা হয়েছে নিষ্প্রাণ পাথরে। যুগলের ধারণা ধর্ম ও দর্শনে ব্যপ্ত রয়েছে৷ পুরুষ ও প্রকৃতি৷ একজন নির্গুণ চেতনা৷ অন্যজন গুণসম্পন্ন, সদা ক্রিয়াশীল, কিন্তু অচেতন। দুই-এর সম্পৃক্তিতে নিহিত আছে সৃষ্টিরহস্য।

পিকনিক এদিকেও চলছে। যতটা প্রশান্তি আশা করা গেছিল, নেই ততটা৷ নদীর উপরে চর জেগেছে কোথাও কোথাও৷ পাথর থেকে পাথরে লাফ দিয়ে সেখানে পৌঁছেছে কিছু ছেলে৷ একজন হাত নেড়ে চেঁচিয়ে জানাচ্ছে বন্ধুকে, মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে নতুন মাথা তোলা চরেও। বক্সে বাজছে ‘কমওয়ক্ত ইশক’৷ একটা বড় অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় খানিক থমকে, রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে। গাছের নিচে কিছু অটো, স্কুটার, চার চাকা৷ এটাই মূল পিকনিক স্পট তাহলে৷ ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্লাস্টিক, বিছানাচাদর পাতা৷ কিছু গাড়ি ফেরার উপক্রম করছে।

অশ্বত্থ গাছ পেরোতে ভিড় পাতলা হতে লাগল৷ রাস্তাও সরু হয়ে এল৷ পাহাড়টা খাড়া দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে একদিকে দৃষ্টি রুদ্ধ করছে৷ অন্যদিকে নদের বিস্তার। শিবমন্দিরের তবু দেখা নেই৷ দ্বিজ ওকে জ্ঞান মার্গের বিষয়টা বোঝাচ্ছে এখন। জ্ঞানমার্গ, অর্থাৎ জ্ঞানের অন্বেষণে নির্মোহ যাত্রা৷ শিব তো আসলে জ্ঞানমার্গেরই পথিক৷ ভক্তিমার্গের মতো নয় বিষয়টা। সেখানে ঈশ্বর আশ্রয় হন না, সহায় হন না৷ ঈশ্বরকেও অতিক্রম করে অজানা সত্যের দিকে নির্মমভাবে এগিয়ে যেতে হয়। দ্বিজ বলছিল, জ্ঞানমার্গ নারী-পুরুষ ভেদ করে না৷ ঊর্মি ভাবছিল, কাগজে পড়েছিল, দেবতা আয়াপ্পা যেখানে সাধনায় রত, সেখানে নারীর প্রবেশ নিষেধ।

ঊর্মি খানিক এগিয়ে গেছিল৷ একটা বাঁক ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ তিনজন যুবক। তাদের বাইকটা পাহাড়ের গায়ে কাত করে রাখা৷ এদিক ওদিক দু চারটে বিয়ারের ক্যান, মদের বোতল। প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই দাঁড়িয়ে পড়ল ঊর্মি৷ প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই মাথার মধ্যে লালবাতি জ্বলে উঠল তার। ওরা মাপছে ঊর্মিকে। ফিসফাস। হাসাহাসি৷ ঊর্মির পা মাটিতে গেঁথে গেছে।

পিঠে দ্বিজর স্পর্শ পায় সে। মন্দিরের মতো আরেকবার৷ দ্বিজ ওকে বাঁ পাশে ঠেলে দেয়৷ আড়াল করতে চায়। ওরা এগিয়ে যায়। শিব মন্দির এসে গেছে। বাইরে শিং বাগিয়ে নন্দী মহারাজ হাঁটু মুড়ে বসেছেন। পিছন থেকে সিটির আওয়াজ শোনা যায়৷ ঊর্মির চরাচর বিষিয়ে যায়৷ সে ঘৃণায় ফিরে তাকায়৷ এক গোঁফওয়ালা ইঙ্গিতপূর্ণভাবে জিভ বোলাচ্ছে নিজের ঠোঁটে৷ অন্যরা হাসছে। কামাখ্যা মন্দিরের ছাগল মনে হয় নিজেকে। কিংবা নর্দমা থেকে এক আঁজলা জল তুলে কেউ যেন ছুঁড়ে মেরেছে তার মুখে। নোংরা লাগে। বমি পায়৷ ঝটিতি মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া। তারপর আবার পাঁক মাখা৷ আবার পরিষ্কার হওয়া। এভাবে জীবন কেটে গেল।

পাহাড়-জঙ্গলে কোনও সাধক একাকী সাধনক্ষেত্র গড়েছিলেন। তেমন করে কোনও নারী কীভাবে পারত? হয় না৷ ওভাবে হয় না, ঊর্মি জানে। বড়জোর একটা ঘর কেড়েকুড়ে নেওয়া যেতে পারে। আ রুম অফ ওয়ানস ওন৷ চরাচর তার নয়। তার আর দ্বিজর স্থানাঙ্ক আলাদা। কার উপর রাগ করা উচিত, ঊর্মি জানে না৷ কিন্তু অসহায় রাগ হয়৷ দু-চারটে অযাচিত লোক তার গত তিনদিনের স্থিতিকে, স্মৃতিকে ধূলিসাৎ করতেই পারে। তারা পারে।

মন্দিরে যখন ঢুকল তারা, তখন দ্বিজর কথা ঊর্মির কানে আর ঢুকছে না৷ সবেতেই আক্রোশ হচ্ছে তার। মন্দিরে লিঙ্গচিহ্নের আধিপত্যে রাগ হচ্ছে৷ ঈর্ষা হচ্ছে। মন্দিরের বাইরে নদের বুকে হর-পার্বতী দেখায় দ্বিজ তাকে। সুবৃহৎ পাথরের উপর অপেক্ষাকৃত ছোট পাথর৷ নারী-পুরুষের সম্পৃক্তির কল্পনা৷ তার উপর ভিত্তি করে সৃষ্টিরহস্যের দার্শনিক ব্যাখ্যার চেষ্টা যুগ যুগ ধরে। ঊর্মি আগ্রহ হারিয়েছে পুরোপুরি। দূর থেকে মোটরবাইকের শব্দ পায় সে। ওরা এখানেও এসে পড়েছে। রাগ আর ঈর্ষা ভুলে ঊর্মি এবার স্পষ্টত ভয় পায়। চারপাশ দেখে নেয়। কতটা নির্জন? মন্দির ঘিরে স্থানীয় মানুষ আছে কয়জন৷ গোঁফওয়ালা নিজের প্যান্টে হাত দিয়ে অশ্লীল ভঙ্গি করে। তার সঙ্গীরা বাইক পার্ক করছে। পুরো পথটা ফিরতে হবে তাদের দুজনকে। বৃষ্টি নামেনি৷ আকাশ প্রমাদ গুনছে।

দ্বিজ তাকে প্রাণ থাকা অবধি বাঁচাতে চাইবে, সে জানে৷ শুনশান রাস্তায় দ্বিজকে শেষ করে নদে ভাসিয়ে দেওয়া কঠিন হবে না, তাও জানে৷ তারপর তার চিৎকার পাহাড়ে মিলিয়ে যাবে৷ লোকগুলো মন্দিরে ঢুকছে এবার, ঊর্মি নদের ধারে দাঁড়িয়ে দ্যাখে৷ দ্বিজর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়।

দ্বিজ ছুটতে বারণ করে৷ বলে, ভয় যে তারা পেয়েছে, তা দেখানো যাবে না৷ দ্রুত পা চালায় তারা। অতি দ্রুত। দেড় কিলোমিটার ডিঙিয়ে অশ্বত্থ গাছটার কাছে পৌঁছতেই হবে। পিকনিক করতে আসা মানুষের জটলা এখনও আছে হয়ত। ঊর্মির হাঁফ ধরছে৷ ছাতের কাঠগোলাপ গাছে এ মরসুমের ফুল আসা বাকি। আলমারি ভরা বই। পড়া বাকি। কতকিছু না-জানা থেকে গেল৷ কত কিছু দেখা হল না৷ দ্বিজকে ভালো করে বলা হল না, ভালোবাসি৷

মহীরুহ দেখা গেল শেষে। ওই তো নতুন চর! কারও রিজার্ভের অটোয় লিফট চাইলে, দেবে না? ঊর্মির মনে হল, বেঁচে গেল এ যাত্রা! ঝুঁকে পড়ে, দুই হাত নিজের হাঁটুতে রেখে হাঁফাচ্ছিল সে৷ পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল দ্বিজ৷ সেই সময় মোটরবাইকটা হুশ করে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে৷ তিনজন আরোহী। শেষজন সেই গোঁফওয়ালা৷ ঊর্মি দেখল, লোকটার ডান চোখ বুজে এল, বাঁ চোখে নিষ্ঠুর কৌতুক। চোখ মেরে গেল ঊর্মিকে। দ্বিজ ছুটতে যাচ্ছিল বাইকের পিছনে, ঊর্মি ধরে ফেলল।

 

তাহাদের কথা

একটা অটো তাদের পৌঁছে দিয়েছিল গাড়ি পর্যন্ত৷ গাড়িতে ওঠার পর ঊর্মি খেয়াল করেছিল, ঘাড়ে আর কাঁধে যন্ত্রণা। টেনশনে মাসল স্টিফ হয়ে যায় তার, আগেও দেখেছে। দ্বিজ যথারীতি তার শরীর-ভাষা পড়ে। দ্বিজ মাসাজে দক্ষ৷ তার আঙুল ঊর্মির ঘাড়ে নেমে আসে কিছু বলার আগেই। নির্দিষ্ট চাপে, সুতীক্ষ্মভাবে, এদিক ওদিক চলাফেরা করে।

–ঘাড়ে ব্যথা, সেটাও বলা যায় না? নাহয় কিছুই পারি না করতে তোমার জন্য…

ঊর্মি দ্বিজর কোলের কাছে সরে আসে। বুকে মাথা রাখে। আপাত-স্থিতির তলায় ভীষণ লাব-ডাব টের পায় সে। দ্বিজকে কাছের মনে হয়। তাও ঠিক না। নিজের অংশ মনে হয়।

–তুমি ভয় পেয়েছিলে না? ভয় পেয়েছিলে তো? আমি জানি আমার থেকেও বেশি ভয় পেয়েছিলে। আমাকে নিয়ে৷

‘অপর’-এর বুকে এভাবে মিশে যাওয়া যায় না৷ পাথরযুগলের মতো তারা পরস্পরকে জড়িয়ে থাকে। কিশোর ড্রাইভার স্পিডোমিটারে পঁয়ষট্টি তুলে জাকলবান্ধা পেরিয়ে এল৷ বৃষ্টি নেমেছে অবশেষে। বৃষ্টি বাড়লে বন্যা হবে। ছারখার হবে কূল-উপকূল। ব্রহ্মপুত্র পলি ঢেলে দেবে পৃথিবীর বুকে তারপর।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. চমৎকার গল্পটি। শতাব্দী দাশের এই জঁরে লেখা ভালো লাগল।

আপনার মতামত...