মৃত পাখিদের গান — ৪র্থ পর্ব

অবিন সেন

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

ছয়

“কীভাবে পেয়েছি তার মৃতদেহ বৃষ্টিজলে ধোয়া”

অন্ধকার বাড়তে বাড়তে এমন হয়ে গিয়েছে তার কাছে, যেন অন্ধকার সমুদ্রের মতো মনে হয়। চার দিকে অন্ধকারের ঢেউ। শুধু ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে অন্ধকার যেন ক্রমশ তাকে ঘিরে ধরছে। তার উপরে আবার সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শুরুতে তা টিপ টিপ করে ঝরছিল এখন তার প্রবল বেগ যেন সাপের মুখ থেকে বিষ ছিড়ে নিয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে দেবে। সে কি বৃষ্টির ভিতরে গিয়ে দাঁড়াবে? সে কি বৃষ্টির অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়াবে? বৃষ্টির তোড়ে তার বুকের ভিতর থেকে জমে থাকা বিষ কি বেরিয়ে গিয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়বে, আর ভেসে ভেসে তারা ম্যান-হোলের ঝাঁঝরি বেয়ে নর্দমায় নেমে যাবে! না না তা কী করে হবে? তা হতে পারে না। তা সে হতে দিতে পারবে না। তার বুকের ভিতরে যে বিষ জমা হয়েছে তা একদিন বুক থেকে নেমে গিয়ে তার পেটের মধ্যে নাড়িভুঁড়ির মধ্যে মিশে গিয়ে তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। আহা কী কষ্ট! কষ্টে কষ্টে তার সমস্ত অন্তঃস্থল ছিন্ন ভিন্ন হবে যাবে। আহা কষ্টের ভিতর মরে যেতে যেতে কী যে শান্তি পাবে সে! ভাবলেই তার সারা শরীরে পুলক দিয়ে ওঠে।

এত বড় বাড়িটা এখন খাঁ খাঁ করছে। শুধু তার শূন্যতাকে ঘিরে আছে বৃষ্টির অন্ধকার। কাছেই একটা টিনের চালের ওপর বৃষ্টিপাত অদ্ভুত সুরের মাধুর্যে সুর তুলেছে। সে কি সেই সুরের দিকে তাকিয়ে বাসে থাকবে? না না, সে তা পারবে না। সে যে কোথাও স্থির হয়ে বসতে পারে না। তার সামন্ত শরীরের ভিতর কে যেন এক অস্থির ঘড়ির স্প্রিং লাগিয়ে দিয়েছে। সেটা তাকে অস্থির হয়ে ছুটিয়ে মারছে কেবল। এর থেকে কি সে মুক্তি পাবে না? পাবে তো! নিশ্চয়ই মুক্তি পাবে সে।

তিতলি খুব বৃষ্টি ভালোবাসত। সে জানত বৃষ্টির ঘর কাকে বলে। তবু বাইরে কড়াৎ করে বাজ পড়ত আর বিছানার উপর লাফিয়ে উঠে সে চিৎকার করত। বজ্রপাতে তার কী যে ভয় ! ‘কী ভিতু, কী ভিতু’! বলতে বলতে সে খাটের কিনারায় দাঁড়ালে তিতলি তার কোলের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তখন ছিল ছেলেবেলা। সেও কি বড় হতে পেরেছে? কোনওদিন? তার পরে বড় হতে হতে অনেক বড় হতে হতে তিতলি একদিন নদীর কথা বলল। তখন সে আর বজ্রপাতের ভূতে ভয় পেত না। সে একটা পেল্লায় বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, সেই আয়নায় দূরের জানালাটা দিয়ে মেঘের ছায়া এসে প্রতিফলিত হত, সে বলত মেঘের ঘর। আহা! তার পরে যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামত তখন তিতলি বলত ‘বৃষ্টির ঘর’।

সে বৃষ্টির ভিতরে একটা খাঁ খাঁ মাঠ দেখতে পায়। সেই মাঠের কোনও শেষ নেই সীমানা নেই, কিন্তু যখন বৃষ্টি নামে তখন সেই মাঠ কী বৃষ্টির ঘেরাটোপে কেমন সীমাবদ্ধ হয়ে যায় না! ভাবতে তার অবাক লাগে। এত সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। তিতলির সঙ্গে সে কি একটু কথা বলে আসবে? না থাক! সে তার মত পরিবর্তন করে। সে আবার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে।

একতলার নরম সোফার ভিতরে নিজেকে ডুবিয়ে সে বসে পড়ে। ড্রয়ার থেকে রুপোর বাক্স বার করে সে তার থেকে একটা লম্বা চুরুট জ্বালিয়ে নেয়। পর পর কয়েকটা টান দেয় দারুণ আরাম করে। কিছু যেন ভাবছে সে।

মিস গোমসকে সে আজ ছুটি দিয়ে দেবে। রাত তো বেশী হয়নি। সবে নটা। কিন্তু মিস গোমস কি এই বৃষ্টিতে বাড়ি ফিরতে পারবে? সে আবার ভাবল। না সেটা মিস গোমসের সমস্যা। এই নিয়ে সে কেন ভাবতে যাবে? বাড়ি যেতে পারবে কি পারবে না সেটা মিস গোমসের সমস্যা।

সে বেল বাজিয়ে মিস গোমসকে ডেকে এই কথাটাই বলে দেয়। মিস গোমস কোনও প্রত্যুত্তর করে না।

মিস গোমস বেরিয়ে গেলে সে বসার ঘরে বসে বসে অপেক্ষা করে। আজ বদ্রিনারায়ণ আসবে। বদ্রিনারায়ণের জন্যে তাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

সে বসে বসে চুরুট টানতে থাকে। বাইরে বোধ হয় বৃষ্টি থেমে গিয়েছে, তরঙ্গহীন চারপাশ বড় নিভৃত আবেশে তাকে ক্লান্ত বসিয়ে রেখেছে। ত্বরা-হীন ভাবে সে চুরুট টানে। মাঝে মাঝে অনেক বিষয় তার ভাবতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে ভেবে কুল পায় না বলে ভাবনার সবকিছু কেমন ভণ্ডুল হয়ে যায়। যেমন সে ভাবে, মিস গোমস, মিস ডরোথি গোমস কি তাকে ভালোবাসে? এমন যেন একটা অদ্ভুত ভাবনা তার মাথার ভিতরে খেলা করে। ডরোথি সুন্দর নয়, কিন্তু একটা চটক আছে যেটা চট করে চোখে পড়ে না কিন্তু তাকিয়ে থাকলে ক্রমশ তা বোঝা যায়। সে বুঝতে পারে। সে সেটা বুঝে আরাম পায়, আস্কারা পায়। ডরোথি কথা বলে কম. সারাদিন ছায়ার মতো তার ব্যবসার বিষয় আসায় দেখাশোনা করে। কোনও দিন সে বাড়ি চলে যায়। আবার কোনও দিন রাত্রে থেকে যায় যদি তেমনটা তারা দু-জন মিলে ঠিক করে। সে ডরোথিকে জোর করে না কখনও। তবু কি যেটা সে করে সেটা তার জোর নয়? তারা দুজনে এমনি অনেক জোর-হীন নিভৃত রাত কাটিয়েছে। সে সব যেন বড় যান্ত্রিক বলে তার মনে হয়। যন্ত্রের মতো ডরোথি তার শরীরের নীচে অনাড়ম্বর ঘর্মাক্ত হতে হতে শেষে যেন নিস্পন্দ হয়ে যায়। সে তারপরে ক্লান্তিকে প্রতিহত করবার অছিলায় একটা চুরুট জ্বালিয়ে নেয়। সারা রাত এমনি চুরুট হাতে নির্ঘুম সে বসে থাকে। যৌনতা একটা অভ্যাস, যেন দুই আর দুইয়ের অঙ্ক, সহজ বলে সে ভাবে অথচ কোথায় যেন সে ঠিক অঙ্কের উত্তর মেলাতে পারে না।

বসে বসে সে আবার ভাবে, ডরোথি কি তাকে ভালোবাসে? ভালোবাসার মতো এমন জটিল সিঁড়ি-ভাঙা অঙ্ক সে একদিন ঠিক বুঝতে পারবে, সে বিশ্বাস করে।

বদ্রি এল আরও রাত করে।

তারা দু জনে একটা দামি স্কচের বোতল নিয়ে বসে।

সে বলে,

বাড়িটার কী খবর?

কোনও সমস্যা নেই। সব ঠিকঠাক।

কী সমস্যা?

মিঃ দলরাজ বলছিল তার নাকি অনেক লস হয়ে গেছে। আমরা যদি কিছু ক্ষতিপূরণ করে দিই, সে চাইছিল।

সে দপ করে জ্বলে ওঠে। রেগে গেলে তার চোখ দুটো হায়নার মতো হয়ে যায়। হিস হিস করে সে বলে,

বটে!

তার পরে অকারণে সে শান্ত হয়ে যায়। ধীরস্থিরভাবে বলে,

দলরাজকে একবার আমার কাছে আসতে বল।

সে তার পেগটা এক চুমুকে শেষ করে দিয়ে বলে,

বদ্রি, তুমি ফাঁসি দেওয়া দেখছ?

বদ্রি মাথা নাড়ে।

সে চুরুট ধরায়। বলে,

আমি দেখেছি। আমার বয়স তখন ছয়। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেছি, চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে আমার মা গলায় ফাঁসি লাগিয়ে ঝুলে পড়ল। চেয়ারটা উল্টা পড়ার একটা খট করে শব্দ। পা দুটো কাঁপতে থাকল, কাঁপতে থাকল, ওঃ বদ্রি…. সে চিৎকার করে উঠল।

তার পরে সহসা সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিল। শান্ত হয়ে বলল,

বদ্রি আজ এসো। আর হ্যাঁ, কাজটা ঠিক ঠিক হওয়া চাই।

বদ্রি চলে গেলে সে সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকে। ভাবে, মা মারা যাবার কয়েক মাস ঘুরতে না ঘুরতেই বাবা আবার বিয়ে করে এক মহিলাকে বাড়িতে নিয়ে এসে তাকে ডেকে বলেছিলেন ‘ইনি তোমার নতুন মা, প্রণাম করো’। সে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একবার মুখ তুলে মহিলাকে দেখেছিল। সুন্দর মিষ্টি দেখতে। তার যেন খারাপ লাগেনি। ভালো আর খারাপের দোলাচলের ভিতরে সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

বাবা ধমক দিয়ে উঠেছিল।

‘কই প্রণাম করো।’

বাবার কথায় সেই মহিলা যেন বিরক্ত হয়েছিলেন।

‘আহ! থাক না!’

তার পরে তার কাছে এগিয়ে এসে সস্নেহে তার মুখ তুলে ধরে বলেছিলেন

‘আমাকে মা বলে ডেকো, কেমন !’

সেই মহিলাকে তার খুব খারাপ লাগেনি। যদিও ‘মা’ বলে ডাকতে আরও কিছুদিন সময় লেগেছিল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই মা’র কোল আলো করে এল তিতলি। জীবনের সবচেয়ে বড় খেলনাটা যেন সে পেয়েছিল। তিতলি আর মা’কে সে আঁকড়ে ধরেছিল। সে এক আলোর সময় ছিল তার।

আজকাল এমনি সব পুরনো ভাবনা তার মনে ছায়া ফেলে বসে থাকে। ভাবনার ছায়ার ভিতরে বসে সে বিষণ্ণ হয়ে যায়। তার মাথার ভিতরে প্রিয় কবিতারা ভিড় করে আসে। সোফায় এলিয়ে বসে থেকে সবচেয়ে প্রিয় একটা কবিতা সে আবৃত্তি করে,

“ধায় রাত্রি ধায় রাত্রি আয় ধাত্রী ভাণ্ড খুলি তোর
লিখেছি সাতকাণ্ড আমি খণ্ড করে ফ্যাল আমাকে খণ্ড হাড় খণ্ড ঊরু
দ্বিখণ্ডিত বস্তিদেশ, অণ্ডকাটা শিখণ্ডিত মুন্ডুঅলা দেহ
জগত্ভূমে নৃত্য করে হাত পা ছুঁড়ে নৃত্য করে
অগ্নিভুঁড়ি ফাটিয়ে শেষকৃত্য করে তোর
করে না, কেউ করায় তাকে…”

 

সাত

নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অর্ককে পরীক্ষা করে চেয়ারে এসে বসতে বসতে বলল ডাঃ অম্বর বাগচি,

কাজের চাপটা একটু কমা, অর্ক। ইউ নিড অ্যা ব্রেক। ওষুধের থেকেও যেটা বেশি জরুরি।

অর্ক জামার বোতাম লাগাচ্ছিল। বলল,

সেটা তো আমিও জানি। সেটা সম্ভব হচ্ছে না বলেই তোর কাছে আসা। তুই ভালো করে ওষুধ দে দেখি, যাতে করে অন্তত আরাম করে ঘুমাতে পারি।

দ্যাখ, অর্ক তুই নিজেও জানিস সবকিছু ওষুধে সারে না। তবে ব্রেক বলতে আমি তোকে কাজ বন্ধ করে ছুটি নিয়ে বসে থাকতে বলছি না।

সে যেন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনি তার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা কেটে দিয়ে সে পেসক্রিপশানের প্যাডটা টেনে নেয়।

অর্ক জিজ্ঞাসা করল,

তুই কী বলতে চাইছিস বল তো?

অম্বর প্যাডে কিছু লিখল না। দু মুহূর্ত ভাবল। স্মিত মুখে বলল,

ইউ নিড অ্যা ওয়াইফ।

সে হেসে ফেলল।

অর্ক তার মজাটা গ্রহণ করল। ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলল,

ভাগ শালা। কাজের চাপই সামলাতে পারছি না, তার উপরে বউয়ের চাপ পড়লে তো মাথা ব্লাস্ট করে যাবে রে।

অম্বরও ছাড়ার পাত্র নয়। বলল,

তুই শালা চিরকাল গাম্বাট রয়ে গেলি। আরে বউয়ের প্রেশারটা আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ওয়ার্ক প্রেশারের অপোজিট ডিরেকশানে। সেটা কাজের প্রেশারটা কমায় রে গাম্বাট।

তুই ডাক্তারি ছেড়ে ঘটকালি শুরু কর। যাক, তুই এ সব বাদ দে। ভালো দেখে কটা ওষুধ দে দেখি যাতে পিসফুলি ঘুমাতে পারি। দু চোখের পাতা এক করলেই এখন নানারকম স্বপ্ন দেখি।

অম্বর ঘস ঘস করে দুটো ওষুধ লিখল। তারপরে সেটা অর্কর হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল,

অর্ক, তোকে খুব সিরিয়াসলি বলছি, এভাবে চললে খুব তাড়াতাড়ি তুই ডিপ ট্রাবলে পড়ে যাবি। ওষুধ দুটো খা, একটু রিলিফ পাবি। কিন্তু তোকে নিজের জন্যে কিছু সময় বার করতে হবে। অনলি ফর ইউ। বই পড়, গান শোন, ডেটিঙে যা, মানে আমি বলতে চাচ্ছি সারাদিন খুনখারাপি অপরাধ নিয়ে ভাবা বন্ধ কর।

একটু থেমে বলল,

আর প্রবালের কী খবর রে! মালটা বিয়ে করে ফোন টোন করা বন্ধ করে দিয়েছে। সারাদিন বউ নিয়েই ব্যস্ত নাকি!

সে হাসে।

অর্কও হাসতে হাসতে বলে,

সামনের রবিবার সন্ধ্যার পরে প্রবালের ওখানে আয়। তপতীকেও নিয়ে যাস। অনেকদিন আড্ডা হয়নি, জমিয়ে আড্ডা হয়ে যাক।

অম্বর স্মিত মুখে বলে,

প্রবালকে কোনও কেসে ফাঁসিয়েছিস বলে মনে হচ্ছে!

দু-জনেই হো হো করে হেসে ওঠে।

আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে অর্ক যখন অম্বরের চেম্বার থেকে বের হল তখন বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। দুপুরের গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে একটা ঠান্ডার আমেজ বইছে বাতাসে। চারপাশে ভিজে ভিজে গন্ধ, বৃষ্টির রোঁয়া ভাসছে যেন। অনেকদিন পরে একটা নির্মল আড্ডা হল। অর্কর খুব হালকা লাগছিল নিজেকে।

বাড়ি ফিরেও তার সেই হালকা মেজাজটা বজায় রইল। মা’র সঙ্গে সে অনেকদিন পরে গল্প করল খেতে বসে। তার মেজাজ ভালো দেখে মা আবার তার বিয়ের প্রসঙ্গটা তুলল। অর্ক কিন্তু রাগ করল না। সে হাসতে হাসতে সেটা ছক্কা মেরে উড়িয়ে দিল।

ঘরে ফিরতে না ফিরতেই তার ফোনটা বেজে উঠল। সে একটু বিরক্ত হয়। অচেনা নাম্বার। ধরবে কি ধরবে না এমন দোটানায় সে ফোনটা ধরে।

ফোনের ওপারে মিষ্টি একটা গলা।

হ্যালো, আমি রুচিরা বলছি।

অর্কর বিরক্তিটা কি উধাও হয়ে যায়?

আরে, বলুন!

এত রাতে আপনাকে বিরক্ত করলাম।

না, না, একটুও না।

বিকেলেই আপনাকে রেখা দাশের ঠিকানা পাঠাব বলেছিলাম। কিন্তু আমাদের কাছে যেটা ছিল সেটা তার পুরনো অ্যাড্রেস। নতুনটা জানার জন্য ওকে ফোন করছি কিন্তু সেই বিকেল থেকে ফোন সুইচ অফ পাচ্ছি। গত দু দিন ওর সঙ্গে আমাদের সংস্থার কারও যোগাযোগ হয়নি। ও বলেছিল ওর আউটডোর আছে। আজ ওর ফেরার কথা ছিল। আমাদের তো ভয় লাগছে।

রুচিরা একটানে বলে গেল কথাগুলো।

না না একেবারে ভয় পাবেন না। হয়তো কোনও কারণে ফোন সুইচ অফ করেছে। কাল নিশ্চয়ই ফোনে পাওয়া যাবে। অন্য কেউ জানে না ওর অ্যাড্রেস?

আর একজন মেয়ের কথা বলেছিলাম, যে ক্যাটারিং সংস্থায় কাজ করে, রুবি পাল, ও জানত মনে হয়। কিন্তু ওকেও ফোনে পাচ্ছি না। নট রিচেবল বলছে।

আপনি কিন্তু একেবারেই চিন্তা করবেন না। ওদের দু জনের নাম্বার আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিন। আমি দেখছি।

অর্ক ভরসা দেবার চেষ্টা করে।

ফোনের ওপারে রুচিরার গলায় উদ্বেগ টের পায় অর্ক।

আমার কিন্তু খুব ভয় লাগছে স্যার।

রুচিরার কাছ থেকে স্যার শুনতে অস্বস্তি বোধ করছে সে। তবু বারণ করতে পারছে না। কোথাও যেন বাধছে।

অর্ক বলল,

আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি। আমার দিক দিয়ে সমস্ত রকম হেল্প পাবেন।

রুচিরা যেন একটু নিশ্চিন্ত হয়।

সেটা কি অর্ক তার গলা শুনে টের পায়!

অর্ক ঠিক বুঝতে পারল না।

সে ফোন রেখে কিছুক্ষণ বসে থাকল। রুচিরার নাম্বার সে তার মোবাইলে সেভ করে নেয়। মিনিটের মধ্যেই রুচিরা হ্যোয়াটসঅ্যাপে ফোন নাম্বার দুটো পাঠায়।

অধীর গাঙ্গুলিকে ফোন করে অর্ক ফোন নাম্বার দুটো ট্র্যাকিং-এ দিতে বলল। সেই সঙ্গে টালিগঞ্জ থানাকেই সে এই ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নিতে বলল।

ওদিকে যে প্রবালের ওখানে যাবার কথা ছিল সেটা সে একবারেই ভুলে মেরে দিয়েছিল। প্রবালের মিস কল দেখে সেটা তার মনে পড়েছিল। কিন্তু সে কলব্যাক করেনি পাছে আর একটা কেস ঘাড়ের উপরে চেপে বসে।

অনেকদিন পরে সে একটা বই নিয়ে বসেছিল। কিন্তু কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছিল না। এমনটা এখন তার হয়ে গিয়েছে। একটা সময় সে অ্যাভিড রিডার ছিল, যাকে বলে বইপোকা, কিন্তু এখন দু-পাতাও মন দিয়ে সে পড়তে পারে না। তবু ক্রাইম থ্রিলারের পাতায় সে অনেক কষ্টে মন দেবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তখনই আবার ফোনটা বাজল। আবার মনোযোগের দফারফা হয়ে গেল।

ফোনের ওপার থেকে অধীর গাঙ্গুলি বলল,

স্যার, রেখা দাশের ফোন গত দু-দিন ধরে বন্ধ আছে।

লাস্ট কোথায় ট্রেস হয়েছে?

বাবুঘাটের কাছে।

অর্ক যেন একটু চিন্তায় পড়ে গেল। বলল,

ওই দিনের পুরো টাওয়ার লোকেশনের ডিটেল আমার চাই। কালকেই। দরকার হলে একটা স্কেচ ম্যাপ বানিয়ে নিন।

অধীর আরও কিছু বলার আগেই অর্ক বলল,

আর রুবি পালের নাম্বারটা ট্রেস হয়েছে?

হয়েছে। টালিগঞ্জ এলাকায়।

লোকেশনটা আমার নাম করে লোকাল থানায় দিয়ে দিন। বলুন রুবি পালের বিষয়ে ডিটেল খোঁজখবর নিতে।

ঠিক স্যার। স্যার এটা কি আমাদের কেসের সঙ্গে রিলেটেড?

অধীর একটু ইতস্তত করে কথাটা জানতে চায়।

অর্ক তাকে ভেঙে কিছু বলল না। শুধু বলল,

আরে না না। এটা সিপি সাহেবের রেকোমেন্ডেশানের একটা ব্যাপার। সময় মতো আপনাকে বলব।

অর্ক ফোন রেখে দেয়।

সে যেন একটা আনক্যানি কিছু টের পাচ্ছে। এমনটা সে টের পায়। এবং অনেক সময়েই সেটা সত্যি হয়ে গিয়েছে। সে মনে মনে বলল,

সামথিং হ্যাজ হ্যাপেন্ড।

 

ক্রমশ

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...