ভোটের সময়ে পরিবেশ সম্পর্কে যত কম উল্লেখ হয়, তত ভালো

কাজল সেনগুপ্ত

 

একটা পাহাড়ি আদিবাসী গোষ্ঠী, বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। বিদেশি প্রভুরা একদল অনুগত দেশীয় সৈনিককে সেখানে আদিবাসী আটকানোর জন্য পোস্ট করেছিলেন। সংখ্যায় অনেক কম, সেই অনুগত দেশী সৈনিকরা, তাঁদের প্রভুভক্তি ও বীরত্বের পরিচয় দিয়ে, আমৃত্যু লড়লেন, এবং সকলেই মারা গেলেন। ওই আদিবাসী গোষ্ঠীরও অনেককে মারলেন, সংখ্যায় নয় বা দশগুণ। এবং বিদেশি প্রভুর অনুগত ও কর্তব্যপরায়ণ বীর দেশি সৈনিকরা নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে, যে সময়টুকু আদিবাসী গোষ্ঠীকে আটকে রাখতে পারলেন, ততক্ষণে বিদেশি সৈন্যরা এসে পৌঁছলেন এবং সেই পোস্ট পুনরুদ্ধার করলেন। অনুগত মৃত দেশীয় সৈনিকরা সেই সময়ের দেশীয় সৈন্যদের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ গ্যালান্ট্রি সম্মান পেলেন। এবং এই দেশীয় সৈনিকদের বীরগাথাকে (প্রভুভক্তি, আনুগত্য ইত্যাদি উহ্য) ইতিহাসে অমর করে রাখার জন্য যথাসম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হল।

এবং ক্রমে, এই বীরগাথা, সেই লড়াই-এর একশো কুড়ি বছর পরে, সেই একদা উপনিবেশের বিদেশি শাসকদের থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের বাহাত্তর বছর পরে, দেশপ্রেমের সবথেকে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে উঠল। একটি ওয়েব-সিরিজ হল। তারপরে একটা সিনেমা। সিনেমায় প্রোটাগনিস্ট-এর ভূমিকায় যিনি অভিনয় করলেন, তিনি দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে উঠলেন। এতটাই, যে দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও তার সবচেয়ে বড় ক্ষমতাধর নেতা সেই নায়ককে চোখে হারাতে থাকলেন। নায়ক, নেতার সাক্ষাৎকার নিলেন, এবং এই সব দেখেশুনে বোঝা গেল, নেতার আত্মজীবনীমূলক সিনেমা যদি বা আটকেও যায়, এই ধরনের বিষয়ের মার নেই। ফলে একই বিষয়ে দেশপ্রেম-এর ধ্বজা উড়িয়ে আরও দুটি সিনেমা বানানোর প্রস্তাব পাইপলাইনে চলে এল।

এই ভীষণ সব প্রকল্পের মধ্যে কেউ খেয়াল করলেন না, এই লড়াই-এর সময়, ওই আদিবাসী গোষ্ঠীর এক বালক, যাঁর বয়স তখন সাত, তিনি পরবর্তীতে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নেতা হয়ে উঠবেন, তিনি দেশভাগের বিরোধিতা করবেন, আদিবাসী গোষ্ঠীকে জোর করে পাকিস্তানে ঢুকিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করবেন, এবং দেশভাগের পরে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে বারবার জেলে পুরবেন, এবং শেষে গৃহবন্দি করে রাখবেন, এবং গৃহবন্দি অবস্থাতেই তিনি মারা যাবেন।

দেশপ্রেমের এই গাথার মধ্যে কোথাও নেই, ১৮৪৬ বা ১৮৪৯-এর শিখ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যুদ্ধের কথা, যেগুলো কিনা আজকের কাশ্মির ইস্যুর একটা গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক; নেই ১৮৪৯-পরবর্তী বৃটিশ বিরোধী শিখ স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। ফলে পরবরর্তীতে, পাখতুনস্তান বা খালিস্তান-এর দাবীগুলো কীভাবে মাথাচাড়া দিল, কাশ্মির ইস্যুই বা কীভাবে তৈরি হল, এই সমস্ত জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে, একটা অতি সরলীকৃত গল্প তৈরি হল, দেশপ্রেম-এর, যেখানে, মূলত ব্যবহার করা হল ইসলামোফোবিয়াকে। পুলওয়ামা পরবর্তী যুদ্ধজিগিরের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেওয়া হল একটা দেশভক্তির শোরগোলে, যেখানে, দেশ-এর ধারণাটাই বেজায় গোলমেলে।

আসলে, আমার কাছে প্রশ্ন এসেছে, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এবং তার অধিবাসীরা ২০১৯-এর এই লোকসভা নির্বাচনের মতো গণতন্ত্রের উত্তাল মোচ্ছবের মাঝে ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন? এবং এই পূর্ব কলকাতা বা এই ধরনের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষরা, এক কথায় ইস্যু হিসেবে পরিবেশ, ভারতের মতো একটি দেশের কোনও সাধারণ নির্বাচনে নির্ধারক ভূমিকায় উঠে আসতে পারে কি, অদূর অথবা সুদূর ভবিষ্যতে?

সুদূর অত দেখতে পাই না, এমনিই চোখ নিয়ে ভুগছি, অদূরে? না!

কারণটা হল আমাদের নির্বাচনী ইস্তেহারের বয়ানগুলো ওই বলিউডি মশলা গল্পের মতো। আর এই অতিসরলীকরণের মধ্যে, যেকোনও কিছু যা দীর্ঘমেয়াদি, বা নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট কোনও একটি নির্বাচনী ক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেকটা বড় ভূগোল বা অনেকটা বড় সময়কে নিয়ে কথা বলে সেরকম কিছুর ঠাঁই হওয়া দুষ্কর।

বলুন তো, দেখেছেন, কোনও দলের ইস্তেহারে পরিবেশ নিয়ে একটিও লাইন? শুনেছেন, কোনও নেতানেত্রীর বক্তব্যে পরিবেশ নিয়ে সুচিন্তা দুশ্চিন্তা… কোনও রকম চিন্তারই কোনও কথা?

ফলে এই ২০১৯-এর ভোট মরসুমে দাঁড়িয়ে, আসুন, আমরা বরং একটু পেছনে যাই। বাদিয়া মুন্ডাকে মনে করি।

বলে রাখি, পূর্ব কলকাতা জলাভূমির সঙ্গেই যেহেতু আমার ওঠবোস পরিচয় সখ্যতা, ফলে আমি এখানকার কিছু কথাই বলব। কিন্তু পাঠক সহজেই সেটাকে বিস্তৃত করে সামগ্রিকভাবে পরিবেশ ইস্যুতে প্রতিস্থাপিত করতে পারেন। ভুল হবে না। দায়িত্ব নিয়েই বলছি।

সঙ্গের এই খবরের ক্লিপিংটা ৩০ এপ্রিল, ২০০৫-এর। আনন্দবাজার আর্কাইভ ইউনিকোড হওয়ার আগের সময়ের কাগজ, ফলে স্ক্যান কপিই ভরসা।

এই কুমারপুকুর বা কুমারপুকুরিয়া গ্রাম-টা সোনারপুরে। জলাভূমি বলে চিহ্নিত অঞ্চলের মধ্যে। শেষ কলাম-টা পড়ুন। বক্তব্য, খেয়াদহ ১ এবং ২ এই দুটো গ্রাম পঞ্চায়েত, জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত বলে, পাট্টা বিতরণ বন্ধ। কোনও এক অমোঘ কারণে, জলাভূমির ঘোষণা, ভূমিসংস্কারের গতিরোধ করে দাঁড়িয়েছে। ফলে, স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ কম। ফলে অনাহার, অপুষ্টি।

এটা ফলো আপ স্টোরি। পরেরদিন, ১লা মে, ২০০৫।

একদম শেষ কলাম-এ যে চিকিৎসার সুযোগের কথা বলা হয়েছে, স্থানীয়দের বক্তব্য, সেটাও নাকি এখনও আটকে আছে, জলাভূমির ঘোষণার কারণেই।

ফলো-আপ শেষ হচ্ছে, এই খবরটাতে এসে, ৪মে, ২০০৫।

এই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার কারণ একটাই। জলাভূমি, জলাভূমির মানুষের সমস্যা, এবং ভোটপ্রার্থী রাজনৈতিক দলগুলোর তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করা।

এই শেষ ছবিটা বাদিয়া মুন্ডার সঙ্গে আমার যখন শেষবার দেখা হয়েছিল, তখনকার। তাও বছর কয়েক আগের।

এখানে, দুটো ব্যাপার খুব মজার।

‘তোমরা জলাভূমিতে পড়েছ, তো আমরা কী করব? আমাদের যা সব প্রকল্প আছে, সেগুলো এখানে খাটছে না। সে কি আমাদের দোষ!’— রাষ্ট্রের পরিচালন বন্দোবস্তের যুক্তিশৃঙ্খলটা অনেকটা এইরকম।

জলাভূমির জন্য আলাদা পরিকল্পনা করার বদলে, ব্যাপারটা কেন ব্যতিক্রমী হতে গেল, এই দোষারোপে হাত ধুয়ে ফেলা যায় বেশ সহজে।

আর অন্য ব্যাপারটা এই খবরে উল্লেখ নেই। পরিবেশের সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা যে সমস্ত সংগঠন জলাভূমির দাবী নিয়ে কাজ করছিলেন, মূলত কলকাতার নাগরিক পরিসরে, তাঁদেরও অধিকাংশই মনে করতেন, এবং এখনও করেন, এই অঞ্চলের মানুষদের জন্য কোনও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়া মানে, জলাভূমির বিরোধিতা করা। এবং এই দাবী কেউ করলে, তাকে প্রোমোটারের লোক বলে দাগিয়ে দিতেও এঁদের অধিকাংশই দুবার ভাবেন না। তাই, জলাভূমির মধ্যে, স্বাস্থ্য পরিষেবা হোক বা কালভার্ট বা ইলেকট্রিকের পোল, সেগুলো নিয়ে এঁদের আপত্তি থাকে।

তাহলে, যদি এরকম একটা দাবী আসে—

কলকাতাকে আরও বেশ কিছুদিন বাসযোগ্য রাখতে, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি সংরক্ষণ-এর জন্য ভোট দিন

আসবে কি? আমাদের দেশের নির্বাচনী রাজনীতির পরিসরে, এই ধরনের দাবী করতে পারেন এরকম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আদৌ কেউ আছেন কি? কারণ, থাকতে গেলে, তার পূর্বশর্তগুলো এরকম—

  1. পূর্ব কলকাতা জলাভূমি নিয়ে কলকাতার নাগরিকদের জানাবোঝা থাকতে হবে।
  2. জলাভূমি রক্ষায়, পূর্ব কলকাতার জলাভূমির অধিবাসীদের ভূমিকার স্বীকৃতি থাকতে হবে।
  3. রাজনৈতিক দলের স্বীকৃত ভূমিকা থাকতে হবে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির সংরক্ষণে।
  4. জলাভূমির জমির মালিকানা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান হতে হবে।
  5. জলাভূমির মানুষরা, নিজেরা সমবায় তৈরি করে, বিভিন্ন ভেড়িতে মাছচাষের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
  6. জলাভূমির মধ্যে ঠিকঠাকভাবে জমির চরিত্র নির্ধারণ করতে হবে। এবং এই জমি যাতে ব্যক্তিমালিকদের জীবন জীবিকার উৎস হিসেবে কাজে লাগে, সেরকম প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত করতে হবে।

এই তালিকাটা এভাবে বেড়েই চলতে পারে। কিন্তু কার্যত, এই প্রত্যেকটি কাজ যেগুলো হওয়া দরকার ছিল, সেগুলোর কোনওটাই যেহেতু হয়নি, কোনও রাজনৈতিক দল-ই করেনি, ফলে, কারও পক্ষেই পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ইস্যুতে ভোট চাওয়ার কোনও সঙ্গত কারণ নেই। বরং উল্টোটা, ভোটের সময়, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, তার মানুষ, কলকাতার জন্য তার গুরুত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে যত কম উল্লেখ হয়, তত ভালো।

এবারে ভাবুন, শ্রীমতী মিমি চক্রবর্তী, তিনি যখন রেগে নেই এরকম সময়ে, বা অধ্যাপক শ্রী অনুপম হাজরা কেষ্টকাকুর বরাভয় পেয়ে, বা শ্রী বিকাশ ভট্টাচার্য তাঁর মেয়রশিপ-এর রেফারেন্স দিয়ে, বাদিয়া মুন্ডা বা তার পরবর্তী প্রজন্মকে গিয়ে বলছেন, এই যে জলাভূমি হয়েছে, তার জন্য আমাকে ভোট দাও।

ফলাফল-টা খুব একটা কষ্টকল্পনা কি?

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1438 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*