বর্ণমালার পোস্টমর্টেম এবং যুদ্ধকালীন

প্রিয়ক মিত্র

 

ক-বর্গ

মাথাটা নীচু ছিল। মাথার ওপর ছিল চড়া রোদ। একগাদা ফড়িং আর প্রজাপতি উড়ছিল মাথার ওপর। রোদ্দুরে ছায়ার অযাচিত নির্মাণ ঘটছিল এ ওড়ার দৃশ্যের। ওপরে তাকালাম। তীব্র সার্চলাইট। প্রবল শব্দে ফড়িংগুলো হয়ে উঠল হেলিকপ্টার। আমার মাথা প্রদক্ষিণ করছে সেগুলো। আমায় ঘিরে ফেলছে। অথচ প্রজাপতিগুলোর কোনও পরিণতি নেই।

ছাদের ওপর দাঁড়িয়েছিলাম। এখন নো ম্যানস ল্যান্ডে। যুদ্ধ আসবে। প্রায়ান্ধ চোখে তাকিয়েছিল মেষপালকের দল। তাদের চোখে ভর দিয়ে আমি সমস্ত আলোর তীব্রতা সহ্য করে নিচ্ছি। জানি, খুব শিগগিরি যুদ্ধ আসবে। খেলা শুরু হবে।

চ-বর্গ

লুলুর প্যান্টে পেচ্ছাপ হয়ে যায়। ও কাউকে বলতে পারে না। ওর প্রচণ্ডভাবে পেচ্ছাপ করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আর অসময়ে প্যান্ট ভিজে যায়। প্যান্ট ভিজবে বুঝতে পারলেই ও ছুট্টে যায় বাথরুমে। কিন্তু কোনও লাভ হয় না।

রাত্তিরে ওর ঘুম হয় না। যদি বিছানা ভিজে যায়। ওর কান্না পায়। কাঁদতে কাঁদতে ও ঘুমিয়ে পড়ে আস্তে আস্তে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও দেখে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। মিলিটারি হাসপাতাল। যুদ্ধকালীন তৎপরতা। ওর ঘুম ভেঙে যায়। লুলু তখনও দেখে চলে একটা ইলেকট্রিক চেয়ার। ওর হাত পা বাঁধা। ওর প্যান্ট ভিজে চলেছে। মূত্র রক্ত মিশে যাচ্ছে। লুলু দেখে চলে একরাশ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। মাইন পাতা অনাবাদি জমি।

ট-বর্গ

রগরগে পানু এবং গরগরে মাংসের ঝাল সমেত মদ গিলে লোকটা ক্লান্ত হয়ে খালি গায়ে ভুঁড়ি বাগিয়ে বসে হাঁপাচ্ছিল। ঘরে ইতিউতি এঁটো থালা। খালি গেলাস গড়াচ্ছে। আধা ভর্তি গেলাস সামনে। রামের বোতল খোলা অবস্থায় পড়ে। সারা ঘর জুড়ে ইঁদুর এবং পিঁপড়ের স্কোয়াড মিছিল করছে। কারুর সঙ্গে কারুর সংঘাত নেই। নিয়ম। শৃঙ্খল। লোকটার ঘামে ভেজা চ্যাটচ্যাটে দেহে পোকামাকড়ের অবাধ আনাগোনা। একমাত্র আরশোলাদেরই কোনও ডিসিপ্লিন নেই।

দূরে অনেকগুলো কুকুর ডাকছে। রাত বাড়লে মানুষের কাশি আর কুকুরের হাসি মিলে যায়। দূরে কুকুরের ডাকের কোরাস সমবেত স্লোগানের মিছিল হয়ে যায়। সেই মিছিল যেন ক্রমশ এগিয়ে আসে গেরস্থালির দিকে। লোকটা দেখে খাদ্যের সন্ধানে ইঁদুর এবং পিঁপড়ের মিছিল। রেজিমেন্টেড। পাশের বাড়ির টিভির আওয়াজ ভেসে আসে। ইংরেজিতে ভাষণ শোনা যায়। যুদ্ধ হবে। লোকটা দেখে পিঁপড়ে এবং ইঁদুরদের মিছিল। সংঘাত নেই। খাদ্যশৃঙ্খল। ইকোসিস্টেম।

ত-বর্গ

ছেলেটি মেয়েটির দিকে তাকায়। মেয়েটি সদ্যপ্রেমিকা। প্রথমবার দেখা হওয়া। এখনও পর্যন্ত ছেলেটি তাকে স্পর্শ করেনি। এবার তৈরি হয়েছে একটি ব্যবহারযোগ্য নীরবতা। মেয়েটি আপত্তি করবে না তো? ছেলেটি দুকদম এগোয়। হাত রাখে হাতে। আঙুলে আঙুল ঠেকায়। ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। প্রচণ্ডভাবে চুমু খেতে থাকে। মেয়েটি এনজয় করছে। উল্লাস!

সময় এগোয়। ঘড়ির কাঁটা চলে। মেয়েটির ব্রা এর হুক খুলতে গিয়ে ছেলেটি চমকায়। ‘সাইকো’-র প্রথম দৃশ্য মনে পড়ে। বন্ধ জানলা বা বন্ধ দরজার আইহোলের ওপারে কেউ নেই তো? এরকম অজস্র খুপরি জানলা এবং আইহোলকে সাক্ষী রেখে দূরে কোনও দৈত্য দাঁড়িয়ে নেই তো? দূরবীনে চোখ রেখে, জনহীন পাহাড়ে কোনও ওয়াচ টাওয়ারে? ছেলেটির ভয় হয়। সে পিছিয়ে আসে। ‘অল অ্যালং দ্য ওয়াচ টাওয়ার, প্রিন্সেস কেপ্ট দ্য ভিউ’। গানটা মনে পড়ে। কেউ না কেউ নজর রাখছে। কেউ নজর রাখে। এর পর কী প্রত্যাশিত? সঙ্গম না পরমাণু বোমা?

প-বর্গ এবং…

একটা দিন সুন্দরভাবে কাটল। কাল থেকে আবারও বিচ্ছিন্নতা। বিশাল কোর্টরুমে একাকী জবানবন্দি হাওয়ায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরবে। ঘর ভর্তি লোক শুনেও শুনবে না। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে জন্ম নেবে নিরবচ্ছিন্ন সন্ত্রাস। দানা বাঁধবে ঘৃণা।

লাশের সংখ্যা বাড়ে। মৃত্যু ক্রমে সংখ্যা হয়ে ওঠে স্তালিনের কথা মেনে। আমরা খাবি খাব এসবের মাঝে? আমরা যারা বিচ্ছিন্ন, উদাসীনতার আঘাত, ক্ষত দেহে মনে বয়ে নিয়ে বেড়াই? আমরা মরব। মারব। যুদ্ধ হোক। সব পুড়ুক। এবং ব্রহ্মাণ্ড অক্ষত থাকুক।

সহজে শেষ হবে না কিছুই। গীতায় বলেছে আত্মা খুঁজবে নতুন দেহ। আমরা নতুন শিকার এবং শিকারী খুঁজছি। এবং খুঁজছি তাদের লুকোবার মতন জঙ্গল।

সহজে শেষ হবে না কিছুই। বা বলা যায় সহজে কিছুই শেষ হয় না।

 

 

(ছবি: ইন্টারনেট)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2200 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...