নরেন্দ্র মোদির ভারত জয়: কী হতে পারে, কী হতে পারে না

শুভাশিস মৈত্র

 

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে বিজেপি খুবই ভালো ফল করেছে। এছাড়া অন্ধ্রের ওআইএসআর কংগ্রেস-ও বিজেপির পক্ষের একটি দল। তারাও ফল করেছে চমকে দেওয়ার মতো। তামিলনাড়ুর ডিএমকে, তৃণমূল বা কংগ্রেসের মতো পাকাপাকি বিজেপি-বিরোধী দল নয়। ফলে এমন বলাই যায়, এবারের ভোটে, উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম এবং মধ্যভারত, এমনকী দক্ষিণেরও বড় অংশ, বহু ভাষাভাষী এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড একই ভাষায় একই সুরে কথা বলেছে। তাদের সংখ্যাটা সব মিলিয়ে ৬০-৬৫ কোটি বা তার কিছু কম-বেশি হবে। উত্তরপ্রদেশ, বিহারের বেশ কিছু জায়গা থেকে যে প্রাথমিক রিপোর্ট এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ভোট বিজেপি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জাত-পাতের অঙ্ক, হিসেব, কাজ করেনি মোদির দলকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে।

এই যে বিপুল জনসংখ্য, এরা কিছু বোঝে না, নির্বোধ, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় উন্মাদ, মুসলিম বিদ্বেষী এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। এদের মধ্যে একটি অংশ বিজেপির বিদ্বেষ-নির্ভর রাজনীতির সমর্থক হতেই পারে, কিন্তু বড় অংশই তা নয়। আমাদের বরং ভাবা উচিত কীসের টানে বিপুল সংখ্যক ভোটের এই মোদি অভিমুখে যাত্রা।  অনেক রাজনীতিক, অভিজ্ঞ সাংবাদিক, সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে বালাকোট, জাতীয়তাবাদ যেমন কাজ করেছে এই সিদ্ধান্তের পিছনে তেমনই খুব জোরালোভাবে কাজ করেছে ‘শক্ত-পোক্ত’ সরকারের ধারণা। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরতে হয়েছে নানা সময়ে। একটা বিষয় সর্বত্র দেখেছি। সেটা হল, গরিব মানুষ এটা-সেটা টুক-টাক সাহায্য আশা করে নেতা বা সরকারের কাছ থেকে, কিন্তু মোটেই ভাবে না সরকার তাদের জীবন বদলে দেবে। সর্বোপরি প্রায় সব দলকেই তারা অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ মনে করে। তফাৎ কিছুটা দেখেছি দিল্লিতে আপ সম্পর্কে গরিব মানুষের ধারণায়। লোকসভায় দিল্লিতে বিজেপি যতই ভালো ফল করুক না কেন, বিধানসভায় প্রবল সম্ভাবনা আছে আপ-এর ফিরে আসার। যেমন লোকসভায় পিছিয়ে পড়লেও নবীন পট্টনায়ক ফিরে এসেছেন ওড়িশায়। ১৯৫২ সাল থেকে এই যে দীর্ঘ গণতন্ত্রের চর্চা সুশৃঙ্খলভাবে দেশে জারি আছে তার প্রভাব থেকে মোটেই মুক্ত নয় দেশের সব থেকে গরিব মানুষটিও। এদেশের গরিব মানুষ মনে করে ভোট-দান তার অধিকার। সরকার গঠনে তার ভাগিদারি সম্পর্কে সে সচেতন। ২০১৮তে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক কোটি মানুষকে গুন্ডারা ভোট দিতে দেয়নি। ‘আনকনটেস্টেড’ জয়ের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এবারের ভোটে একটা বিরল দৃশ্য চোখে পড়ল। ভোট দিতে গিয়ে বাধা পেয়ে গরিব মানুষ পথ অবরোধ করছে। দাবি করছে ভোট দিতে চাই, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুক সরকার। উত্তরবঙ্গে এবং দক্ষিণবঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সরকার গঠনে গরিব মানুষ তার অধিকার ছাড়তে যে রাজি নয় এই সব ঘটনা তারই প্রমাণ। আর যেহেতু অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ব্যবহার, টিভি দেখার সুযোগ বেড়েছে, তার প্রভাবও এই ‘শক্ত-পোক্ত’ সরকারের ধারণা গড়ার পেছনে থাকা স্বাভাবিক। এবং এই ধারণাকে পুষ্ট করেছে কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের চূড়ান্ত ভাঙা-চোরা ছবিটা, কিছুটা হয়তো অতীতে বার-দু’য়েকের বিরোধী-সরকারের অভিজ্ঞতাও। ইভিএম হ্যাকিংয়ের প্রসঙ্গে আমি যাচ্ছি না। ফল বেরোনোর পর মায়াবতী-মমতা ছাড়া এই নিয়ে তেমন কেউ সরব নয়। তা নিয়ে বিজেপি নেতাদের ব্যঙ্গ-মন্তব্য কানে এসেছে। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভালো। সেটা হল, ইভিএম ষড়যন্ত্রের কথা ২০০৯ সালে ভোটে পরাজয়ের পর যিনি প্রথম বলেছিলেন, তাঁর নাম লালকৃষ্ণ আদবানি। প্রয়োজনে ইন্টারনেটে যে কেউ তথ্যটা যাচাই করে নিতে পারেন।

কী হতে পারে বিজেপির এই বিপুল জয়ে? বিজেপি এবারে ভোটে জিতেছে কার্যত কোনও প্রতিশ্রুতি না দিয়ে। কল্যাণ প্রকল্প বা ওয়েলফেয়ার স্কিম যা সব চালু আছে এর বাইরে নতুন করে খুব একটা কিছু করা সম্ভব বলে মনে হয় না। স্বচ্ছ ভারত, স্মার্ট সিটি, মেক-ইন্ডিয়ার মতো প্রকল্প নতুন করে কতদূর এগোয় দেখার আছে। কৃষকের আয় দ্বিগুণ করার কথা এই সরকার রাখে কি না সেটাও দেখার। যারা ভোট দিয়েছে তাদের অনেকে এখন চাইবে লাদেন হত্যার মডেলে আক্রমণ করা হোক অন্য দেশে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী নেতাদের। কান ধরে টেনে আনা হোক নীরববাবু বিজয়বাবুদের। এই সব দাবি, চাহিদা, প্রতিশ্রুতির কথা বিজেপির নতুন সরকার ফের কবে নতুন করে বলে সেদিকে আনেকেই তাকিয়ে আছে। বিজেপি নেতারা কাশ্মির নিয়ে যে পথে ভাবেন তাতে মনে হয় না এই দীর্ঘ পুরনো সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এই দলের আছে। গত পাঁচ বছরের নানা ঘটনাও সেকথাই বলে। এই প্রসঙ্গে অবশ্যই বলা উচিত যে কাশ্মির আজ যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে তার পেছনে কংগ্রেসের ‘অবদান’ অনেক বেশি। আর খুব অল্প সময়ের জন্য বিরোধীরা দু’বার ক্ষমতায় এলেও এই নিয়ে স্থায়ী সমাধানের কোনও উদ্যোগ তাদের মধ্যে দেখা যায়নি।

গত পাঁচ বছরের রেকর্ড বলছে আরও শক্তিশালী বিজেপি ‘ভিন্ন’ চিন্তার মানুষদের জন্য আগের থেকেও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সংবাদ মাধ্যমের বড় অংশ বিজেপি জমানায় (অ-বিজেপি জমানায় এই রাজ্যেও) বেড়ালে পরিণত হয়েছিল। বেড়াল এবার রুমালে পরিণত হতে পারে। দিকে দিকে ব্যাকরণ সিংদের জয়জয়কার শুরু হতে হয়ে পারে। বিজেপি যদি এই পথে হাঁটে, সবকা সাথ সবকা বিনাশ কেউ ঠেকাতে পারবে না। ভারতের সংবাদ মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা সেভাবে হয় না। হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো কিছু পত্র-পত্রিকা বাদে। তবে বিদেশে টাইম ম্যাগাজিনে যখন কভার স্টোরিতে নরেন্দ্র মোদিকে বলা হয় ‘বিভাজনের নায়ক’ বা ভোটের পর নিউইয়র্ক টাইমসে পঙ্কজ মিশ্রের প্রতিবেদনের শিরোনাম যখন হয়, ‘হাউ নরেন্দ্র মোদি সিডিউসড ইন্ডিয়া উইথ এনভি অ্যান্ড হেট’, তখন এই ভেবে আনন্দ হয়, যাক্ আমাদের পেশার কেউ তো কোথাও, যে বিষয়ে আমরা চুপ করে আছি, স্বাধীনভাবে কথা বলছে তা-ই নিয়ে।

এবার জিতে এসে নরেন্দ্র মোদি সুশাসনের কথা বলেছেন দলের সভায়। এবারের নরেন্দ্র মোদি সংখ্যার জোরে অনেকটাই আরএসএসের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এবার আর কোনও কাজ না করতে পারার জন্য কাউকে দোষারোপের কোনও সুযোগ থাকছে না। দেখা যাক, জয়শ্রীরাম বনাম স্বাধীনতা এবং খিদের দ্বন্দ্ব আমাদের কোন চৌরাস্তায় নিয়ে দাঁড় করায়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...