পিনাজ

সাম্য সরকার

 

‘আয়াম্ প্রেগন্যান্ট’।

ঘরের মধ্যে সময় থেমে যায় এক মুহূর্তে।

পিন পতনের নিঃস্তব্ধতার মধ্যে শুধু ম্যাথুর হাতঘড়ি শব্দ করে চলেছে টিক্ টিক্টিক্। প্রায় এক যুগ পর শ্রী কাঁধ ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। খুব বিরক্তির সঙ্গে পিনাজের দিকে একবার তাকিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। ধারা তাকে অনুসরণ করে। যাবার আগে ‘এটা কী হল?’ ধরনের চাহনি দিয়ে যায়। ম্যাথু দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। অভ্র কেক হাতে নিয়ে। হয় সে কেক খেতে ভুলে গেছে, নয় এ অবস্থায় খাওয়া উচিত হবে কিনা বুঝতে পারছে না। সন্দীপ মেঝেয় ঘড়ি নিয়ে বসে, তার স্থির দৃষ্টি শশাঙ্কের দিকে। শুভ্র আর স্বাহা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ছিল। কথাটা কানে না গেলেও কিছু একটা গুরুতর এইমাত্র ঘটে গেল বুঝতে পেরে ব্যাপারটা ধরার চেষ্টা করে।

পিনাজ শশাঙ্কের দিকে তাকিয়ে। কাঠিন্যের আড়ালে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে পরিচিত চোখের না বোঝার কথা নয়। শশাঙ্কও বুঝত যদি সে তাকিয়ে দেখত। ওই একটা ইংরেজি বাক্যে তার পৃথিবী টলে গেছে। কাঁধের ওপর উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করে শশাঙ্ক। তার বিশাল হাতে শশাঙ্কের পিঠে হাল্কা চাপড় মেরে উঠে দাঁড়ায় ম্যাথু।

অবশেষে যখন পিনাজের দিকে মুখ ফেরায় শশাঙ্ক সে তখন চোখ নামিয়ে নিয়েছে। শশাঙ্ক বোঝে পিনাজ বুঝেছে শশাঙ্ক এখন তাকেই দেখছে। তাও সে মুখ তোলে না। দ্বিতীয় কোনও কথা বলে না। সময় বয়ে যায়। সে তেমনি শশাঙ্কের হাঁটুর দিকে চেয়ে থাকে।

নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শশাঙ্কের কানে ঢাকের মত বাজছে। আরও বেশি বসে থাকার অর্থ নিজের চোখে দেখা নিজের মেরুদণ্ডের ক্ষয়ে যাওয়া। পিনাজের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে উঠে দাঁড়ায় সে। পিনাজ স্থির, চোখের পলকটা নড়ে ওঠে মাত্র। দৃষ্টি শশাঙ্ককে অনুসরণ করে না। পাশের ঘর থেকে ম্যাথু এসে দাঁড়ায় দরজার কাছে।

*****

রাতের সাদার্ন এভিনিউ। অভিজাত এলাকার নিস্তব্ধতা মিলে গিয়েছে শশাঙ্কের শূন্যতার সঙ্গে। রাস্তায় আলোর বড্ড বাড়াবাড়ি। রাত আছে, রাতের অন্ধকার নেই। অন্ধকার বড় প্রয়োজন মানুষের জীবনে। অন্ধকারের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া যায়। অন্ধকারে মুখ লোকানো যায়। আলোয় সব কিছু বড্ড বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়ে, উলঙ্গ হয়ে পড়ে। শশাঙ্কর হাতে, পায়ে, আঙুলের ডগায় ঝিঁঝিঁ করে। সারা গায়ে, শিরায় উপশিরায় রক্ত দুরন্ত গতিতে ছুটে বেড়ায়। গলা শুকিয়ে আসে। কান গরম হয়ে ওঠে। কাঁধ দিয়ে হাত বেয়ে, মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামতে থাকে।

দিনের শেষে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসা মনিব অনেক সময়ে নিজেকে আবিষ্কার করেন বাড়ির উঠোনে। শশাঙ্করও অনেকটা সেরকম হল। তার পা দুটো তাকে কোথা দিয়ে, কীভাবে, কোথায় নিয়ে চলল সে টের পেল না। টের যখন পেল তখন সে হাওড়া স্টেশনে হাজার মানুষের ভিড়ে একা দাঁড়িয়ে।

কোনও কিছু না ভেবেই সে ট্রেনে উঠে পড়ল। অন্তত সে সেরকম ভাবল। আসলে তার সচেতন মন বোঝেনি সে কাজ করে চলেছে তারই অবচেতনের নির্দেশে।

*****

তথাগত বুদ্ধের প্রামাণ্য মূর্তির সামনে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ে থেকে শশাঙ্কর মনে হল শান্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। বুদ্ধের বিশাল মূর্তির মুখটা তার পাথুরে, গুরুগম্ভীর ঠেকল। চোখের দৃষ্টি শুষ্ক, শীতল। হায়রে অনামী অজন্তা শিল্পী! কোন জাদুতে তোমাদের সৃষ্টি আজও কথা বলে, অবলোকিতেশ্বরের চোখ দিয়ে আজও করুণা ঝরে পড়ে। সই-য়ে সই-য়ে, নখের আঁচড়ে ছবিগুলোর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটানো জাতির জন্য করুণা ছাড়া আর কী বা থাকতে পারে!

কলকাতায় থাকলে অবশ্য মা, দিদি তার বদন দেখে হাজারটা প্রশ্ন করত, অফিসে সহকর্মীরা খোঁচাখুঁচি করত। সে সবের থেকে দূরে এই শান্ত পরিবেশটা প্রয়োজন ছিল তার। থেকে থেকে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে। কথায় বলে মহাকাল সব ধারণ করেন। আজ, এই মুহূর্তে যা এতটা যন্ত্রণা দিচ্ছে, এতটা অসহ্য লাগছে, দশ বছর পর সেটা স্রেফ একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়াবে। মাঝের এই সময়টা টপকে সরাসরি সেই অবস্থায় যাওয়া যায় না?

এখানে আসার পর থেকে বার, তারিখ গুলিয়ে গেছে শশাঙ্কর।

‘কোথায়?’ ‘মহাবোধি মন্দির’। ‘কোথায়?’ বিস্ময় স্বাহার গলায়। ‘বুদ্ধগয়া’। ‘ও, আচ্ছা’। আর কিছু না। কী বা বলবে? লাইনে আছে কিনা বুঝতে পারছিল না। ফোনের দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। মোবাইল স্ক্রিনে চারটে তিপ্পান্ন বাজে। তলায় ছোট করে লেখা ‘ফ্রাইডে’। ও, সেজন্যই এই ফোন। কাল রওনা হবার কথা ছিল। যার করার কথা এই কদিনে তার একটা ফোনও আসেনি। একটা ম্যাসেজও না।

*****

অনেক উঁচু থেকে দেখলে একটা দার্শনিকতা জাগে। একটা নিরাসক্তি আসে মনে। জগৎ, সংসার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়। মনে হয় যে তুচ্ছ হিংসা, ঘৃণা, দ্বেষ নিয়ে মানুষ যে বোকার মত লড়ে যায় এই জগতে তার নিজেরই স্থান কতটুকু? কতটুকু স্থান তার জীবনের? মান অভিমান, ক্ষোভের?

এখানে এসে বসবার পর থেকেই মনটা অন্যরকম লাগছে শশাঙ্কর। উদাস উদাস। নির্জন পাহাড়ে যেখানে বাতাসেরও শব্দ হয় না, পাতায় পাতা ঘষা খায় না, মুখে বুকে নিজের অশরীরী স্পর্শ বুলিয়ে যায় বাতাস নিঃশব্দে সেখানে শশাঙ্ক নিজেকে অন্যরকম করে খুঁজে পেল।

ডানদিকে কিছুটা দক্ষিণে খাড়াইয়ে রাস্তাটা সরু ফিতের মতো পাহাড়ের ভাঁজে মিলিয়ে গেছে। শশাঙ্ক দেখতে পেল একদল ছেলে মেয়ে হইহই করতে করতে উঠে আসছে। অবয়ব দেখে দূর থেকেই চেনা যায়— ম্যাথু, শ্রী, অভ্র, শুভ্র, সন্দীপ, শশাঙ্ক আর—। সবই মায়া!

সামনে বহুদূরে দিগন্তের কাছাকাছি আবছা হয়ে আসা শহরতলি, ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ, মাঝে অনন্ত শূন্যতা। সে শূন্যতা দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। অনুভব করতে হয়। হৃদয়ের গভীর থেকে। পেছনের ঝোঁপ থেকে একটা বুনো গন্ধ আসছে। চোখ বন্ধ হয়ে এল শশাঙ্কর। ক্লান্তিতে নয়, অন্য কিছুতে।

এখানে বাতাসে শব্দ ভেসে আসে না। গন্ধ আসে। আজও এল। চিরপরিচিত সেই গন্ধটা। দূর থেকে কাছে ক্রমশ প্রকট হয়ে। গন্ধ এসে পেছনে দাঁড়াল। তারপর পাশে এসে বসল। দূরত্ব রেখে। বেশ খানিকক্ষণ পর গন্ধ উঠে দাঁড়াল। কে জানে বিরক্তিটা শশাঙ্কের মুখেই লেখা ছিল কিনা।

গন্ধ চলে যাচ্ছে।

দূরে। আরও দূরে। মিলিয়ে যাচ্ছে।

ঠেস দিয়ে বসা পাথরটার উপরে উঠল শশাঙ্ক।

‘পিনাজ!’

*****

এ কী চেহারা হয়েছে! শশাঙ্ক দ্রুত নীচে নামতে থাকল। এই কদিনেই ওজন অনেকটা কমে গেছে। মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখ বসে গেছে সেটা আলাদা, যেটা তাকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করে রাখে তার সেই ব্যক্তিত্বে যেন অসহায়তা ফুটে উঠল।

অভ্র আর সন্দীপ তাদের থেকে একটু দূরে, শ্রুতিসীমার বাইরে হাঁটছিল। বন্ধুকে একা ছাড়েনি তাহলে। দলের বাকিরা নীচে গাড়ির আশেপাশেই ছিল। তাদের দুজনকে দেখেই স্বাহা এগিয়ে আসে। মৃদু স্বরে কিছু বলে পিনাজকে। সে মাথা নাড়ে। শশাঙ্ক দোকানের দিকে এগিয়ে যায়, ম্যাথু ভেতর থেকে হাত নাড়ছিল। স্বাহা বিরক্ত হয়, পিনাজকে ভর্ৎসনা করে একটা এসপার ওসপার ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে শশাঙ্কর দিকে। পিনাজ পেছন থেকে তাকে আটকায়। স্বাহা হাত ছাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসে।

খাবার সময় শ্রী শশাঙ্কর পাশে বসল যেমন বসে থাকে। পিনাজ উল্টোদিকে শ্রীর মুখোমুখি। পিনাজের বন্ধুদের মধ্যে শ্রীর সঙ্গেই শশাঙ্কর সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা। দুজনকে দেখে লোকে প্রায়ই ভুল ভাবে। অন্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও শ্রীর এমনিতে মেয়েদেরকেই বেশি পছন্দ, ধারার প্রতি একটা চাপা অধিকারবোধ কাজ করে ওর। সেটা অবশ্য তার প্রতিও আছে কিন্তু সেটা প্রকাশ্য, তার চরিত্র আলাদা। কতবার শ্রীর ব্রার ফিতেও খুলে দিয়েছে শশাঙ্ক। কোনও উত্তেজনা বোধ করেনি, অস্বস্তিও হয়নি। আজ হচ্ছে। নির্বাক ছবির আবহসঙ্গীতের মত কাঁটা চামচের শব্দটা কেবল তাদেরকে জুড়ে রেখেছে। পিনাজ নিজের চরিত্রে ফিরে এসেছে। মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। খাবারটা শুধু দেরিতে খাচ্ছে। ম্যাথু পিনাজের কানের কাছে মুখ নিয়ে যায়। পিনাজ বোধ হয় আন্দাজ করে, শোনার আগেই ঘাড় নেড়ে নিষেধ করে। বন্ধুদের আগের দিনের প্রতিক্রিয়া মনে পড়ে যায় শশাঙ্কর। আজ এরা সকলে পিনাজকে ঘিরে রেখেছে। পার্থক্যটা লক্ষণীয়।

*****

বাইরে কোথাও ছাউনির ওপর ঝম্ ঝম্ করে বৃষ্টি পড়ছে। পিনাজ দুহাত জানালার ওপর রেখে হাঁটু মুড়ে দাঁড়িয়ে দূরে কোথাও দেখছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। ওর চুলে বিন্দু বিন্দু জল জমছে।

ভাষার আবিষ্কারই বোধহয় মানুষের থেকে মানুষের দূরে সরার প্রধান কারণ। সংযোগ তো হল, অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেল। পাহাড়ের মাথায় পিনাজ যখন প্রথমবার মুখ তুলে তাকাল তখন শশাঙ্ক জানল আশা, প্রত্যাশা দেখতে কেমন হয়।

মুখোমুখি যখন দাঁড়াল তখন জানল বিহ্বলতা কাকে বলে। তারপর মায়া। কেন? মায়ারই বুঝি পাত্র সে? তারপর আকুলতা। আকুলতা এমন যেন এখুনি বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু তেমন মেয়ে নয় সে। তাকে বুকে টেনে নিতে হয়। সবেতেই যখন এত কুণ্ঠা তখন…?

‘কেন, পিনাজ?’

পিনাজ প্রথমে উত্তর দেয় না। দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ায়। তারপর তাকায়। সেই দৃষ্টি। নিজের না দেওয়া উত্তরের উত্তর খুঁজছে শশাঙ্কর চোখে। তার জন্য অনুভূতিটা এখনও কেমন বুঝে নিতে চাইছে।

‘কেমন মেয়ে পছন্দ জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলে এমন একজন যাকে তুমি সম্মান করতে পারবে।’

‘ওটা অর্ধেক ছিল। তিনিও যেন আমাকে সম্মান করতে জানেন।’

পিনাজ অন্য দিকে তাকায়। মুখটা কেঁপে যায়। কয়েকটা মুহূর্ত কিছু ভাবে সে। তারপর বড় একটা শ্বাস নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে, ‘আমি কিছু বলি সেটা শুনে তুমি কিছু বলো তার আগে তুমি একটা কথা বলো, আমি যেমন আমাকে কী তেমনভাবেই মানতে পারো?’

দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ হয়। ম্যাথু। পিনাজ এগানোর আগেই শশাঙ্ক গিয়ে দরজা খোলে।

ম্যাথু কোনওরকম ভণিতা না করেই বলে, ‘উই নিড টু টক’।

‘উই?’

‘তোমরা দুজনেই অপরের চেহারাটা দেখছ। নিজেদেরটা দেখতে পাচ্ছ না। সেটা আমরা পাচ্ছি।’ ধারা কম কথার মানুষ। সে যখন বলে তখন ফেলা যায় না।

‘আমরা সবাই কম বেশি প্যানসেক্সুয়াল। ছোটবেলা থেকেই নিজেদের মধ্যে এক্সপেরিমেন্ট করে আসছি। শরীর নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন ছুঁৎমার্গ নেই তুমি জানো।’

শশাঙ্ক হাত তুলে ম্যাথুকে থামিয়ে দেয়।

ম্যাথু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে, ‘আচ্ছা একটা কথা বলি। একটা কথা?’

শশাঙ্ক হ্যাঁ, না কিছু বলে না।

‘যে মেয়ে নিজে গাইনোকলজিস্ট তার পক্ষে খুব সহজ ছিল এটা টার্মিনেট করা।’

স্বাহা শুরু করল, ‘আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কোনও গোপনীয়তা নেই। সবাই সবার সব কিছু জানে। না জানালেও বুঝে নেয়।’

‘তোমার সামনে বলার আগে কিন্তু ও কিছু ভাবেনি। বরং বলাটা আরও বেশি জরুরি মনে করেছে। তুমিও আমাদের একজন বলেই। যদিও তোমরা—।’

ম্যাথুর কথার মাঝেই বাচাল অভ্র বলে উঠল, ‘তুমি আসার পর থেকেই ও আর কারও সঙ্গেই— এমনকি আমার সঙ্গেও…।’ ধারা আর ম্যাথু যে চাহনিটা দিল সেটা তাকে বাকি সময়টা চুপ করিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। পিনাজ এতক্ষণ আলোচনায় অংশ নেয়নি, বাধাও দেয়নি। এবার জানালার দিকে ঘুরে গেল। ‘না’, মুখের কথাটা শেষ করল অভ্র।

শশাঙ্কর কান লাল হয়ে গেল। পিনাজ বিরক্ত সেটা তার মুখে বলবার প্রয়োজন হয়নি। শশাঙ্ক না বলে পারল না, ‘কিছু বলার থাকলে আমাকে পিনাজ বলবেন।’

স্বাহা আরও বেশি বিরক্ত, ‘যে মেয়ে নিজের আম্মীর কাছে তার অধিকারটাই কোনওদিন দাবি করতে পারেনি সে তোমার কাছে নিজেকে কি ব্যাখ্যা করবে?’

‘স্বাহা!’ পিনাজের গলা মৃদু অথচ দৃঢ়। আলোচনার ওখানেই ইতি।

তীব্র বিদ্বেষ নিয়ে পিনাজের দিকে তাকাল শশাঙ্ক। এতটা অপমানিত সে আগে বোধ করেনি। নিজেকে হঠাৎই উলঙ্গ মনে হতে লাগল। এতটা ছোট নিজেকে তার আগের দিনও মনে হয়নি।

*****

শশাঙ্ক পিনাজের দিকে এভাবে কোনওদিন তাকায়নি। পিনাজ যেন এটা প্রত্যাশা করেছিল। সকলে বেরিয়ে যেতে সে কাছে এসে দাঁড়াল, ‘জানো?’

‘ডোন্ট্’। শশাঙ্কর বিদ্বেষ তীব্রতর। ‘নিজেরটা ব্যক্তিগত, আমারটা নয়?’

পিনাজ বোধহয় এই তুলনাটা আশা করেনি। সে মর্মাহত হল। শশাঙ্কর একটু স্বস্তি হল। সেটাও পিনাজের চোখ এড়াল না। ‘ওরা আমার বন্ধু নয়। ওরা আমার পরিবার। ওরাই আমার সব। আমাদের মধ্যে কোনও—’

‘গোপনীয়তা নেই’। শশাঙ্কর গলায় শ্লেষ, ‘আমার পরিবার আছে, থাকার মতো করেই আছে। তারাও আমার সব কিছু জানে না। একটা ছেলের কাছে তার অক্ষমতা শুধুই শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার নয়। সেটা—’

‘সেটা? সেটা কী শশাঙ্ক?’ রেগে গেলে আর লোকজনের সামনে পিনাজ শশাঙ্ককে নাম ধরে ডাকে। ‘লজ্জা? হুঁ? সেটা লজ্জা?’

শশাঙ্ক মুখ ঘুরিয়ে নিল।

‘তুমি একথা বলছ? তুমি? এটা তোমার ভাবনা?’

পিনাজ অপেক্ষায় থাকে। শশাঙ্ক উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করে না। পিনাজ শশাঙ্কর কোল ঘেঁষে বসে। তার বুকে হাত রাখে। তারপর মাথা।

প্রায় একযুগ পর পিনাজ যখন শশাঙ্ককে দুহাতে আঁকড়ে ধরে আছে আর শশাঙ্কর হৃৎস্পন্দনও স্বাভাবিক হয়েছে পিনাজ বলে, ‘সময়টা যেটা দাঁড়াচ্ছে সেটা আমাদের ওই মুম্বই কনফারেন্সের সময়। সেখানে মিটিং, সেমিনার বাদে সকালে দাঁত মাজা থেকে শুরু করে রাতে পুল পার্টি সবই তোমার চোখের সামনে। এখানেও রোজকার রুটিন, কোনদিন কোথাও অজ্ঞান হইনি। জগিং, হসপিটাল, সাঁতার, চেম্বার, আড্ডা, বাড়ি— এর কোনটা তোমার অজানা? কিন্তু এই কৈফিয়ৎটা কি তোমাকে দেওয়ার প্রয়োজন আছে?’

শশাঙ্ক মুখ নামিয়ে দেখে পিনাজের দু চোখ বোজা, মুখে গভীর প্রশান্তি। কী অদ্ভুত এই মেয়েটা! এত অচঞ্চল, এত স্থির সমাহিত, এত শক্তি কোথায় পায় ও!

‘আই নেভার লেফ্ট ইউ, পিনাজ।’

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1378 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...