তিনটি অণুগল্প

নাহার তৃণা

 

প্রাক্তন

বৃষ্টিটা নামবার আগেই কোনও একটা শেডের নীচে আশ্রয় নেবার চেষ্টায় দ্রুত পা চালিয়েও লাভ হল না। হুড়মুড় করে আচমকা বৃষ্টি নেমে গেল। ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো গোত্তা খেয়ে একটা দোকানে ঢুকে পড়লাম। দোকানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জটলাটা আমাকে ঢুকতে দেখে যে যতটুকু পারল সরে গেল দ্রুত। না, আমাকে জায়গা করে দেবার আন্তরিকতায় না। বরং আমার ভিজে যাওয়া শাড়ি কাপড়ের ছোঁয়ায় তাদেরটাও যেন ভিজে না ওঠে, সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই দূরত্ব তৈরির এই তাগিদ। অনেকের বিরক্তি ধরা দৃষ্টির কার্ণিশ ঘেঁষে, ভিজে শাড়ি-আঁচল, যতটা সম্ভব শরীর বৃত্তে জড়ো করে ভিড়ের একদম কোণায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কোথায় ঢুকে পড়েছি চোখ তুলে সেটা পর্যবেক্ষণে বোঝা গেল, এটি একটি কনফেকশনারি। নানা জাতীয় কেক, বিস্কুট, চানাচুর ইত্যাদিতে সুসজ্জিত ভদ্রস্থ পরিবেশ দোকানের। মায়ের জন্য নোনতা কিছু বিস্কুট নিলে কেমন হয়? কিছু কেনাকাটা করলে হঠাৎ অনাহূতের মতো ঢুকে পড়ায় বিরক্তমাখা মুখগুলোর উদ্দেশ্যে একটা জবাব দেওয়া যাবে। কিন্তু সেটারই বা প্রয়োজন কেন! হঠাৎ বৃষ্টি থেকে তারা যেমন নিজেদের রক্ষায় এখানে উপস্থিত হয়েছেন, আমিও তাই। খামোখাই ভাবনা! এই এক দোষ আমার। নিজের মন গড়া ভাবনায় শুধু শুধু কাবু হই।

দোকানের লোকটার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যেই মাত্র হাত তুলতে যাব, খেয়াল করি হাতটা শূন্য। রিস্টওয়াচটা হাতে নেই! স্পষ্ট মনে আছে অফিস থেকে বের হবার মুখে রিস্টওয়াচটা হাতেই ছিল। আমি সময়ও দেখেছি। বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে।

–হ্যালো, হ্যাঁ আটকা পড়েছি পাখি। এদিকে প্রচণ্ড বৃষ্টি। না, না, গাড়ি পাঠানোর দরকার নেই। বৃষ্টি ধরে এলে কিছু একটা পেয়ে যাব। গাড়িটা তুমিই রাখো। নইলে তোমাদের ফিরতে সমস্যা হবে। ওদিকে গাড়ি পাওয়া দুষ্কর। চিন্তা কোরো না পাখি… বাড়ি পৌঁছে যাব ঠিকই, বাড়তি সময় লাগবে এই যা। কী… আজও নতুন এক পেশেন্ট দাঁত তোলা শেষে টুনটুন তোমাকে বিরক্ত করছে না দেখে, প্রশংসা করে গেছেন! করবেনই তো। কার ছেলে বলো? আবারও বাবাইকে এঁকেছে টুনটুন! হা হা গোঁফওয়ালা বাবাই… হা হা হা…..

ঠিক বুঝতে পারি না প্রিয় বুলোভা ঘড়িটা হারিয়ে যাওয়ার শোক, নাকি মাত্র শোনা ফোনালাপের কণ্ঠস্বরটি আমার শরীরকে অবশ করে দিল। চোখ দুটোও বুঝি পাথর হয়ে গেছে। নইলে কেন চোখ তুলে দেখে নিতে কষ্ট হচ্ছে এতক্ষণ ফোনে কথোপকথনে রত মানুষটিকে! এক মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের কণ্ঠস্বরে মিল থাকতেই পারে। কিন্তু এতটা মিল থাকে কী!

পাখি নিশ্চয়ই বউ। ওই নামেই ডাকতে অভ্যস্ত। ছেলের নামও টুনটুন হবার কথা….

 

টার্গেট

হাতের সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো শফি। ল্যাম্পপোস্টের বাতিটা ঢিল মেরে ভেঙে ফেলার চিন্তা মাথায় এলেও শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছে। পরিচিত পথের হঠাৎ অন্ধকার টার্গেটকে সর্তক করে দেবে। দ্বিতীয়পক্ষের অসর্তকতা ওদের কাজে সফলতা এনে দেয়। তাছাড়া অতটা ধক্ নেই ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোতে। চারপাশের পরিবেশ প্রায় আলো অন্ধকার বলা যায়। হাত ঘড়িতে এখন সাড়ে ছ’টা বাজে। শীতের বেলা অতি দ্রুত ঢলে যাওয়ায় এখনই চারপাশে ঘন অন্ধকার। গ্রামাঞ্চলের সন্ধ্যা, রাতের বুকে নিজেকে সঁপে দেবার জন্য যেন বেশরম প্রেমীর মতো ছটফট করে।

এই নিয়ে গোটা তিন সিগারেট ফুঁকেছে। আর ধরানো ঠিক হবে না। আলো-অন্ধকারে সিগারেটের আগুন ফিটকি চেহারায় জেগে থাকে। আপাতত নিঃশব্দে অপেক্ষার পালা। প্রায় মাস ছয়েক পর আজকের কেসটা হাতে এসেছে শফির। তাই বলে এমনটা ভেবে নেবার কোনও কারণ নাই, মানুষের দিলে মানুষের জন্য খুব পিরিতি জেগে ওঠায় এ লাইনের কাজ কমে গেছে। কাজ চলছে পুরোদমেই। বাজারে চাহিদার তুলনায় কামেল লোকের যোগান বেশি হওয়ায় শফির কাজে ইদানিং মন্দা চলছে।

মনে মনে আরেকবার পরিকল্পিত ছকটা আওড়ে নেয় শফি। কোমরে গোঁজা রিভলবারটা একবার ছুঁয়ে দেখে। রংধনু ডেলি প্যাসেঞ্জার ট্রেন এতক্ষণে প্লাটফর্মে এসে গেছে। ট্রেনযাত্রী হিসেবে তার টার্গেট এই পথে পৌঁছে যাবে যে কোনও মুহূর্তে। প্রতিমাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিনে টার্গেট সোহেল কাজী রংধনু ডেলি প্যাসেঞ্জার থেকে নেমে সোজা এই পথে গ্রামে ঢুকে। গ্রামে বুড়ো বাবা মায়ের সঙ্গে একটা দিন কাটিয়ে আবার শহরে নিজের বাড়ি ফিরে যায়। শফি বরাবরই টার্গেট সম্পর্কিত খবরাখবর নখদর্পণে রাখার চেষ্টা করে।

হঠাৎ আলোর ফুটকি দেখা যায়। সিগারেট কিংবা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে এদিকটায় আসছে কেউ। স্নায়ুতে মৃদু চাপ অনুভব করে শফি। এমনটা প্রতিবার কাজের আগে টের পায় সে। কোমরের খাঁজ থেকে রিভলবারটা বের করে হাতে নেয়। লোকটার বেঁটেখাটো অবয়ব দেখে বুঝে যায় আগন্তুক তার টার্গেট নয়। শফির কাঙ্খিত টার্গেট লম্বা চওড়া মানুষ। একমুখ দাড়ি আছে।

শফির উপস্হিতিতে হাতের বামদিকের পচা ডোবাটায় চাষ হওয়া হাজারে বিজারে মশাদের আজ বুঝি উৎসব লেগেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বহুক্ষণ রাক্ষুসে মশাদের কামড় সহ্য করছে শফি।

বেঁটেখাটো লোকটা চলের যাবার মুহূর্তকাল পরেই লম্বা চওড়া একজনকে দেখতে পায় শফি। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে এগিয়ে আসছে। শফি গাছের আড়ালে সর্তক হয়ে দাঁড়ায়। টার্গেট নাগালের মধ্যে পৌঁছানো মাত্র, সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার নির্ভুল নিশানা ভেদ করে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মৃতদেহটার কাছে এসে দাঁড়ায় শফি। ছবি তুলে পার্টিকে মাল খালাসের খবরটা জানাতে হবে। ত্রস্তে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে, ফটাফট ছবি তুলতে থাকে। ফ্লাশের আলোয় মৃতের মুখটা দেখে চমকে ওঠে শফি। একি! এই লোকের মুখে তো দাড়ির নাম নিশানাও নাই। বসন্তের দাগে ভরা একটা মুখ। এই লোক কোনওভাবেই তার টার্গেট সোহেল কাজী নয়। হারামজাদা গলায় মাফলারটা এমন কায়দায় পেঁচিয়েছে দূর থেকে সেটাকে দাড়ি বলে ভুল করেছে শফি। এত বছরের পেশাগত জীবনে এমন মারাত্মক ভুল শফির কখনও হয়নি। বারদু’য়েক লক্ষ্য ফস্কালেও এমন আজিব কাণ্ড ঘটেনি অতীতে। এমন মুহূর্তে কী করা কর্তব্য সে বিষয়ে শফির সব কেমন গুলিয়ে যায়। পার্টি এখবর জানলে তাকে ছিঁড়ে খাবে।

এসময়ে এপথে লোকজনের তেমন চলাচল নাই। তারপরও এখানে দাঁড়িয়ে থাকা বোকামি। শফি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে বাজারের দিকে হাঁটা দেয়। এ অঞ্চলের আশপাশটা মোটামুটি চেনা শফির। কাজের খাতিরে দুদিন এসে ঘুরে গেছে। এত করেও শেষরক্ষা হল কই! কীভাবে এমন ভুল হয়ে গেল ভাবতেই মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে। কিন্তু সে উপায়ও নাই। শফির মাথাভরা চকচকে টাক। অস্থির পায়ে বাজারের সবচে বড় মিষ্টির দোকান অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভান্ডারে ঢুকে পড়ে। কিছু না খেলেই নয়। আগে পেট শান্ত করে, ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। খালি পেটে শফির চিন্তা সেভাবে খুলে না। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে। শালার মশার গুষ্টি রক্ত খেয়ে শরীর ঢিলা করে ফেলেছে। খান কয়েক মিষ্টি, নিমকি আর এককাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে, পার্টিকে কী বলা যায় সেটা নিয়ে ভাবতে থাকে। আরে! ওই তো শফির সোহেল কাজী, ওপাশে আঙুল তুলে মিষ্টির দোকানের লোকটাকে দেখিয়ে দিচ্ছে কোন মিষ্টি নেবে। তার মানে লোকটা আজ সরাসরি বাড়ির দিকে না গিয়ে বাজারে এসেছে। তার হাতে খান কতক প্যাকেট দেখতে পায় শফি। লোকটার দিকে চোখ আটকে পরবর্তী কর্তব্য ভেবে নেয়।

মিষ্টির দাম দিয়ে লোকটা দোকান থেকে বেরোতেই শফিও টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

 

উলট পুরাণ

কফির মগ দুটো আলগোছে সরিয়ে রেখে কৌশিক আমার হাতদুটো নিজের হাতে তুলে নেয়। চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে, ‘তোমাকে কিছু বলার আছে ইরা।’ আমার ভেতরটা কেঁপে ওঠে কৌশিকের গাঢ় স্বরের ধাক্কায়। কৌশিক কী বলতে চায় সে আমি জানি। গেল কয়েকদিন ধরেই আজকের দিনটির জন্য নিজেকে তৈরি করেছে কৌশিক। আমিও। তবে কৌশিক ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি আমার প্রস্তুতি। আমি যেমন টের পেয়ে গেছি ওরটা। অয়নের জন্য সবটা সম্ভব হয়েছে, নইলে কৌশিককে ধরা সহজ ছিল না।

জরুরি কল রিসিভের তাগিদে এসময়ই অয়নকে উঠে যেতে হল ভেবে বিরক্তিতে আমার নাক কুঁচকে যায়। কৌশিকের দিক থেকে চোখ সরিয়ে কফিশপের পশ্চিমদিকের কোণটাতে তাকাই। অয়ন কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফোনে কথা সেরে নিচ্ছে। ওর সাবলীল অথচ নির্লিপ্ত ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই সন্তর্পণে এখানে কী ভয়ানক ব্যাপার ঘটে চলেছে। অয়নের এই সহজাত গুণটির ভীষণ ভক্ত আমি। ইদানিং অয়নের সমস্ত চলনবলনেই কেমন মুগ্ধতা খুঁজে পাচ্ছি। অথচ একদিন এই অয়নকে প্রত্যাখান করে জীবনসঙ্গী হিসেবে কৌশিককে বেছে নিয়েছিলাম। অয়ন আমাদের দু’জনেরই কমন ফ্রেন্ড। আমরা একসঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কৌশিকের আলাভোলা আর সাহিত্যপ্রেমী স্বভাব যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, দাম্পত্য জীবনের আবর্তে এসে সেগুলোকে বাতিলযোগ্য আবেগ হিসেবে উড়িয়ে দিতে সময় লাগেনি। একই বিষয়ে পাশ করে অয়ন চাকরিতে একের পর এক উন্নতির ধাপ টপকে সামনে এগোলেও, কৌশিকের সেসবে মনই ছিল না। আমিও চাকরিতে যথেষ্ট এগিয়েছি। কিন্তু ক্যারিয়ার নিয়ে কৌশিক বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। বৈষয়িক ব্যাপার বা সংসারের চেয়ে সাহিত্যেই কৌশিক স্বাচ্ছন্দ্য। লেখালেখি নিয়ে নিরীক্ষা, নতুন ভাষাভঙ্গি খুঁজে নেবার তাগিদে কৌশিকের যত ছটফটানি। চাকরিতে তেমন উন্নতি করতে না পারলেও লেখক হিসেবে কৌশিক বাজারে যথেষ্ট নাম কিনেছে।

কৌশিকের লেখালেখি বিষয়ে আমি আকর্ষণ হারিয়েছি, সেটা বুঝে নিয়েই কিনা জানি না, এখন আর কৌশিকের কোনও লেখার প্রথম পাঠিকা আমি নই। তাতে আমার খুব যায় আসে না। ওর ওসব প্যানপ্যানানির চেয়ে অয়নের বুদ্ধিদীপ্ত জোকসও অনেক আরামদায়ক। অন্তত প্রাণখুলে হেসে ওঠা যায়। মানুষ হিসেবে অয়ন যে বেশ উঁচুদরের, প্রত্যাখানের পর এখনও সে বন্ধু হিসেবে থেকে গিয়ে প্রমাণ করেছে। মাঝে মাঝে নিজের বোকামির জন্য হাত কামড়াতে ইচ্ছে করে। ইশ্ কেন যে অয়নটাকেই বেছে নিলাম না! তাহলে অয়নের সঙ্গে আজ সিঙ্গাপুর, কাল ব্যাঙ্কক উড়ে উড়ে বেড়ানো যেত। অবশ্য সেটাও যে একেবারে হয় না তাও না। মাস ছয়েক আগে অফিস ট্যুরে সিঙ্গাপুর ঘুরে এসেছি। কাকতলীয়ভাবে অয়নও সেসময় সিঙ্গাপুরে ছিল। হুটহাট ঢাকা কিংবা ঢাকার বাইরের যৌথ ভ্রমণ তো আছেই। সামনের মাসে অয়ন ফ্রান্স যাচ্ছে। আমি চাইলে ওর সঙ্গী হতে পারি, ঠাট্টাচ্ছলে কথাটা বললেও বুঝতে অসুবিধা হয় না অয়ন মনেপ্রাণে চায় আমি ওর সঙ্গে যাই। অয়ন এখনও আমাকে চায়। কৌশিকের উদাসীনতার ফোকর গলে অয়নে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি ক্রমশ। ব্যাপারটা নিয়ে নিজের মধ্যে চাপা একটা অস্বস্তি ছিল। গত মাসে অয়নের দেখানো ছবি, আর তথ্যগুলো পাওয়ার পর আমার মধ্যে আর কোনও ছুঁৎমার্গ নেই।

গত সপ্তাহে কৌশিক অফিস ট্যুরে ঢাকার বাইরে গেলে অয়ন এসেছিল। সেদিন রাতে দু’জনের সময় শুধু সুখের মদিরাতেই ভাসেনি, নিজেদের যৌথ ভবিষ্যত জীবনের অনেক পরিকল্পনার কথাও শুনিয়েছে অয়ন। সে রাতে প্রথমে ঠিক হয় কৌশিককে ডির্ভোস দেব। কৌশিকের বিবাহবর্হিভূত সম্পর্কের সমস্ত তথ্যতালাশ বিচ্ছেদের জন্য যথেষ্ট। ভেবেচিন্তে অয়ন ঠিক করে আইনি ঝামেলায় না গিয়ে, নিজেরাই বরং ব্যাপারটার সুরাহা করা যাক। এক্ষেত্রে আমার কাজ শুধু নির্ধারিত দিনে কৌশিককে নিয়ে নির্দিষ্ট কফিশপে উপস্থিত হওয়া।

আজ সেই কাঙ্খিত দিন। ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির জিএম অয়নের পক্ষে এমন কিছু যোগাড় করা কোনও ব্যাপারই না। যেটা খাবার কিংবা পানীয়তে মিশিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টার ভেতর আক্রান্ত মানুষটির মৃত্যু হবে, অথচ পরীক্ষায় মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদযন্ত্র বন্ধে মৃত্যু বলে বিবেচিত হবে। সাপও মরল, লাঠিও অক্ষত থাকল। নিঁখুত পরিকল্পনা। অয়নের দিকে মুগ্ধতা ছুঁড়ে দিয়ে কৌশিক কী বলতে চায় সেটা শোনার জন্য সরাসরি ওর দিকে তাকাই। মুখে একটু হাসি টেনে বলি, ‘কী বলতে চেয়েছিলে যেন?’

‘আমাকে মুখ ফুটে বললেই পারতে ইরা। আমি নিজে থেকেই সরে যেতাম। যুথীকে নিয়ে অয়ন তোমাকে যা যা বুঝিয়েছে তার কোনোটাই সত্যি না। হ্যাঁ, যুথী আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার লেখার প্রথম পাঠিকাও এখন সে। কিন্তু ওর সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক নেই। যুথী একজন সমপ্রেমী। আর ছবিগুলো? এত বুদ্ধিমতী হয়েও বোঝোনি, ওগুলো ফটোশপ? রাইটার্স ব্লকের যন্ত্রণায় পাগলের মতো আমি ছুটে ছুটে ঢাকার বাইরের কোনও নিরিবিলি জায়গায় চলে যেতাম। তাতে যদি লেখা ফিরে পাই। কিন্তু … যাইহোক, তোমার জীবন থেকে আমি সরে যাচ্ছি ইরা।’ কৌশিক তার ব্যারিটোন স্বরে মেপে মেপে কথাগুলো বলে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়।

যেতে গিয়েও ঘুরে এসে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে,

‘কাউকে খুনের ষড়যন্ত্র করলে সেসব টুকে রাখতে নেই। রাখলেও যথেষ্ট সাবধান থাকা চাই। বোকামিটা না করলে আমার অবস্থা তোমাদের মতোই হত। অয়নের সঙ্গে আমার কফি মগটা বদলে নিয়েছিলাম, তোমাদের অলক্ষ্যে। তোমারটা সম্ভব হয়নি। ইচ্ছেও করেনি। আচ্ছা, চলি!’

আমাকে সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি করে লম্বা লম্বা পা ফেলে কৌশিক কফিশপ থেকে বেরিয়ে গেল।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1378 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...