ভারত যুঝছে ভারতাত্মাকে বাঁচাতে

অরুন্ধতী রায়

 

গবেট বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণ, ফ্যাসিস্টদের উদ্ধত অভিযান আর ফেক নিউজ-এর দখলদারদের দাপটে একটি জাতির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এই সঙ্কটে সাহিত্যের কোনও স্থান আছে কি? গত ১২ই মে নিউ ইয়র্কে বিউলফ শিহান এবং PEN আমেরিকা আয়োজিত আর্থার মিলার ফ্রিডম টু রাইট লেকচারে এবারে বললেন অরুন্ধতী রায়। ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর পাঠকদের জন্য রইল সেই বক্তৃতার ভাষান্তর

তর্জমা: সত্যব্রত ঘোষ

 

এই বছরের আর্থার মিলার ফ্রিডম টু রাইট লেকচারে বলবার জন্য PEN আমেরিকা-র আমন্ত্রণে আমি সত্যিই সম্মানিত। আর্থার মিলার এবং আমি একই প্রজন্মের হলে, অথবা আমি আমেরিকার একজন নাগরিক হলে হাউস আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিস কমিটিতে জবাবদিহি করবার সময়ে এক ছাদের নিচে আমাদের দুজনের নিশ্চয়ই দেখা হত।

ভারতে আমার কার্যকলাপ একেবারে মার্কামারা। প্রথম শ্রেণির “অ্যান্টি-ন্যাশনাল”-দের তালিকার উপরের দিকে আমার নামটি জ্বলজ্বল করছে। এই কারণে নয় যে আমার নাম “A” দিয়ে শুরু। নামের তালিকাটি বেড়েই চলছে প্রতিদিন। শিগগির তা হয়তো দেশপ্রেমীদের তালিকাকে ছাড়িয়ে যাবে।

আজকাল অ্যান্টি-ন্যাশনাল হিসেবে দাগিয়ে দেওয়াটা সোজা। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যদি ভোট না দেন তাহলে আপনি একজন পাকিস্তানিএই বাড়তি জনসংখ্যা নিয়ে পাকিস্তান কী ভাবছে তা আমি অবশ্য জানি না।

দুঃখের বিষয় এবারে আমি ভোট দিতে পারছি না। কারণ, আজ ১২ই মে আমার শহর দিল্লিতে ভোট। আমার বন্ধু এবং কমরেডরা (জেলবন্দি যারা, তাঁদের বাদ দিয়ে) এখন নির্বাচন কেন্দ্রের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে। ভয়ে তাঁদের বুক ঢিপঢিপ করছে। টার্কি এবং ব্রাজিলে যা ঘটেছে, তাঁদের কপালেও তেমন দুর্ভোগ হবে না তো। আমার বিশ্বাস, হবে না। ফর দ্য রেকর্ড, এখানে বলে নিই যে, ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই আমি এই বক্তৃতার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি। তাই, মোদি একটি ভোটেও জিতলে, তার দায় কিন্তু আপনাদেরও।

যাই হোক, আজ এখানে হার্লেম-এর অ্যাপোলো থিয়েটারে আমরা সমবেত হয়েছি। যার দেওয়ালগুলি শুনেছে হৃদয়ে ঝঙ্কার তোলা সেই সব সঙ্গীত, হয়তো সংরক্ষণও করেছে গোপনে। শূন্য প্রেক্ষাগৃহে হয়তো তারা আপন মনে গুনগুন করে সেইসব সুর। খানিকটা অ্যারেথা ফ্র্যাঙ্কলিন, একটু জেমস ব্রাউন, স্টিভি ওয়ান্ডার বা লিটল রিচার্ডের জ্যাজের রিফ। সাহিত্যের অবস্থান নিয়ে একত্রে ভাবনার জন্য এই ইতিহাসমুখর প্রেক্ষাগৃহটির চেয়ে উপযুক্ত জায়গা আর কীই বা হতে পারত এখন, যখন আমরা খানিকটা হলেও বুঝছি যে একটি যুগের অবসান ঘটতে চলেছে।

তুষার শীর্ষগুলি যখন গলছে, উত্তপ্ত হচ্ছে সমুদ্র, জলতল ক্রমশ ধসছে, যখন আমরা পারস্পরিক নির্ভরতার সেই জালটিকেই ছিঁড়ে ফালাফালা করছি যা এই গ্রহের প্রাণস্পন্দন বজায় রেখেছে, যখন দুর্দান্ত বুদ্ধিবলে আমরা মানুষ আর যন্ত্রের ভেদরেখা মুছে দিতে চাইছি এবং দুর্জয় ঔদ্ধত্যে আমরা সেই যোগসূত্রকেই তাচ্ছিল্য করছি, যা এই প্রাণময় গ্রহের সঙ্গে একটি প্রজাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের গ্রন্থি বেঁধেছে, যখন আমরা অ্যালগরিদমকে শিল্পের স্থানে বসিয়ে তাকিয়ে আছি সেই ভবিষ্যতের দিকে যেখানে মানুষকে আর কোনও অর্থোপার্জনকারী কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে না (অথবা সেই শ্রমের মূল্য সে পাবে না)— তেমন একটা সময়ে হোয়াইট হাউসের গোরা সাহেবদের অবিচলিত হাত ধরে, চিনের নতুন সাম্রাজ্যবাদী, ইউরোপের রাস্তায় ভিড় জমানো নিও-নাজি, ভারতের ক্রমবর্ধমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং অন্য দেশগুলির এক গুচ্ছ কসাই রাজকুমার এবং ক্ষুদে ডিক্টেটরদের দেখানো পথে আমরা অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছি।

আমাদের অনেকে যখন স্বপ্ন দেখছি “বিকল্প এক দুনিয়া”-র। এই নিষ্ঠুর মানুষগুলিও কিন্তু স্বপ্ন দেখছে। তাঁদের সেই স্বপ্ন, যা আমাদের কাছে দুঃস্বপ্ন— বিপজ্জনকভাবে বাস্তব হতে চলেছে।

পুঁজিবাদের অনর্থক যুদ্ধ এবং লালসায় বিপন্ন এই গ্রহে এখন উদ্বাস্তুদের ভিড়। এর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দায়ী। আফগানিস্তানে আক্রমণের সতেরো বছর পরে, তালিবানদের নিশ্চিহ্ন করবার জন্যে অবিরত বোমাবর্ষণে দেশটিকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন সরকার ফের তালিবানদের সঙ্গেই আলোচনায় বসছে। ইতিমধ্যে ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়াকে ধ্বংস করা হয়েছে। যুদ্ধ আর বলবত্তায় শত সহস্রের প্রাণ গেছে, অঞ্চলগুলিতে চলছে অরাজকতা। প্রাচীন শহরগুলি ধূলায় ধূসরিত। জনহীন সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আইসিস (আইএসআইএস) নামে যে দানবের উৎপত্তি, তা আজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। অকারণে যে সাধারণ মানুষদের মারা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধবাজদের সুদূরতম সম্পর্কই নেই। গত কয়েক বছরে যেভাবে যুদ্ধগুলি ঘটানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সন্ধির শর্তগুলি ভাঙা হয়েছে, তাতে নিজের তৈরি পরিভাষা অনুযায়ী আমেরিকাই আজ একটি rogue state। এখন, সেই ভয় দেখানোর পুরনো কৌশল, ঘিষাপিটা মিথ্যাচার এবং পারমাণবিক বোমার ফেক নিউজগুলি ব্যবহার করে ইরানে বোমা ফেললে সে সব চেয়ে বড় ভুল করবে।

তাহলে, মূর্খদের এই ঝটিকা আক্রমণ দেখে, ফেসবুকে লাইক দিয়ে, ফ্যাসিস্টদের কুচকাওয়াজ শুনে আর ফেক নিউজের আচমকা আঘাতগুলি সয়ে আমরা যখন ভবিষ্যতের দিকে হেলছি এবং দেখেশুনে মনে হচ্ছে যখন একটি জাতির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন, তখন সাহিত্যের অবস্থানটা কোথায়?

সাহিত্য কী? কে ঠিক করবে? এমন প্রশ্নের কোনও একটি জবাব হয় না। সেটাই স্বাভাবিক। তাই এখন, বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো একটি দেশে, যেখানে একই সঙ্গে বহু শতাব্দী বেঁচে আছে, সেখানে একজন লেখক হওয়ার অপরাধে আমাকে কেমন জর্জরিত হতে হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতাটুকু এখানে বলি, আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে।

কয়েক বছর আগে ট্রেনের অপেক্ষায় একটি স্টেশনে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। ভিতরের পাতায় দেখি ছোট্ট একটি সংবাদ। দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই অপরাধে যে তাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা নিষিদ্ধ কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট) দলের ক্যুরিয়ার। যে জিনিসগুলি তাঁদের থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তার মধ্যে আছে “অরুন্ধতী রায়ের লেখা কিছু বই”। এর কয়েক দিন পরে কলেজের এক লেকচারারের সঙ্গে আলাপ হয়। পড়ানোর বাইরে অধিকাংশ সময়টা তিনি জেলবন্দি অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করেন। তাঁদের অনেকেই হয় ছাত্রছাত্রী, নয়তো দরিদ্র গ্রামবাসী। “অ্যান্টি ন্যাশনাল” হবার অভিযোগে এঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর অর্থ হল কর্পোরেট মাইনিং এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল প্রজেক্টগুলির কারণে হাজার হাজার মানুষের বাস্তুহারা এবং জমিহারা হওয়ার বিরুদ্ধে এই মানুষগুলি প্রতিবাদ করেছেন। লেকচারার মহিলাটি আমাকে জানান যে এনাদের থেকে জবরদস্তি যে স্বীকারোক্তিগুলি আদায় করা হয়েছে তাতে আমার লেখার উল্লেখ আছে। পুলিশের মতে আমার লেখাগুলি পড়াটাই এনাদের “বিপথে” যাওয়ার একটি কারণ।

“ওরা কিন্তু আপনার গতিবিধি অনুসরণ করছে— আপনার বিরুদ্ধে কেস সাজাচ্ছে।”

এখানে যে বইগুলির প্রসঙ্গ উঠছে, তা আমার উপন্যাস নয় (সেই সময়ে আমার একটি উপন্যাসই ছাপা হয়েছে— গড অফ স্মল থিংস)। এগুলি প্রবন্ধের সংগ্রহ। যদিও এক অর্থে গল্প— অন্য ধরনের গল্প, কিন্তু গল্পই। জঙ্গল, নদী, শষ্য, বীজ, জমি, কৃষক, শ্রম আইন, দেশের নীতিগুলির উপর কর্পোরেট সংস্থার বিশাল হামলার গল্প। এবং হ্যাঁ, ৯/১১-র পরে একটির পর একটি দেশে আমেরিকা এবং NATO-র হামলার গল্প। অধিকাংশই সেইসব মানুষের গল্প যারা এই হামলাগুলির বিরুদ্ধে লড়েছেন। গল্পগুলির মতো নদী, পাহাড়, কর্পোরেশন, জন আন্দোলনগুলিও নির্দিষ্ট। যার প্রত্যেকটাকেই নির্দিষ্ট উপায়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই পরিবেশযোদ্ধারা সব রক্তমাংসের স্থানীয় মানুষ, যারা সমগ্র বিশ্বে সঙ্কটের বার্তা পৌঁছে দিতে চান। যারা সঙ্কটের স্বরূপটিকে উপলব্ধি করেছেন সঙ্কট হিসেবে তা স্বীকৃতি পাবার ঢের আগে। তবুও তাঁরা ভিলেন। কারণ, প্রগতি এবং উন্নয়নের পথে তাঁরা বিঘ্নকারী রাষ্ট্রবিরোধী ছাড়া আর কিছুই নয়। মুক্তবাজার নীতির প্রচারক ভারতের পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এই গেরিলারাই ভারতের “সিঙ্গল লার্জেস্ট ইন্টারনাল সিকিউরিটি চ্যালেঞ্জ।” এঁদের অধিকাংশই ভূমিজ সন্তান, আদিবাসী। যাঁরা মধ্যভারতের জঙ্গলে কর্পোরেট মাইনিং প্রজেক্টগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অপারেশন গ্রিন হান্ট। জঙ্গলগুলিতে সেনাবাহিনীর ঢল নামে। যাদের শত্রু পৃথিবীর দরিদ্রতম মানুষ। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, লাটিন আমেরিকা— অন্য দেশগুলির গল্প এর চেয়ে আলাদা নয়।

আর এখন সবচেয়ে বড় কৌতুক এটাই যে আবহাওয়া পরিবর্তনকে পৃথিবীর অন্যতম সিকিউরিটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখবার জন্য সারা বিশ্বে ঐক্যমত তৈরি করা হচ্ছে। এই বিষয় ঘিরে তৈরি শব্দভাণ্ডারের সামরিকায়ন প্রক্রিয়াও চলছে। এবার যে অন্তহীন যুদ্ধ অতি শীঘ্র বাঁধবে, তাতে পীড়িতদেরকেই যে “শত্রু” চিহ্নিত করা হবে, সেই ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে কর্মসূচিকে ‘জরুরি’ ঘোষণা করবার উদ্দেশ্যটি ভালো। তাতে হয়তো যে প্রক্রিয়াগুলি শুরু হয়েছে তা গতি পাবে। তবে ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (UNFCC) থেকে বিতর্কটিকে সরিয়ে ইউনাইটেড নেশনস সিকিউরিটি কাউন্সিলে আনবার জন্য চাপও দেওয়া হচ্ছে। অন্যভাবে বললে, বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলকে এই বিতর্কের আওতা থেকে বাদ দেওয়ার পর সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হল সেই দেশগুলিতে, যাদের উপর গোড়া থেকেই সন্দেহ ছিল। সমস্যার হোতা যে গ্লোবাল নর্থ, সে এখন সবাইকে সমাধানের পথ দেখাবে। এবং নিশ্চিত করবে তার লাভের অঙ্ক যেন না কমে। এমন সুন্দর সমাধান যাদের মাথা থেকে বার হয়েছে, তাদের হৃদয় বাজারকেন্দ্রিক। এমন উপায় তাঁরা উদ্ভাবন করেছেন যাতে বিভিন্ন দেশে কেনাবেচা বাড়বে, সেই সঙ্গে উপভোগও। কিন্তু লাভের অঙ্কটি জমা হবে যতদূর সম্ভব কম মানুষের ঘরে। অর্থাৎ, পুঁজিবাদের রমরমা আরও বাড়বে।

আমার প্রবন্ধগুলি প্রথমে বহুল-প্রচারিত পত্রিকায়, তারপর ইন্টারনেটে এবং শেষে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। কিছু মহল শুরু থেকেই সেগুলিকে বিপজ্জনক হিসেবে সন্দেহ করে। এঁদের মধ্যে অনেকে আমার রাজনীতিকে নস্যাৎ করেন না।

প্রচলিত অর্থে সাহিত্য হিসেবে যা ভাবা হয়, তাতে এক কৌণিক অবস্থান নেয় লেখনী। তা পড়ে কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়া হতে পারে এটি অলক্ষুণে। বিশেষ করে যারা শ্রেণিবিন্যাস মানেন। কারণ তাঁরা ধরতে পারেন না লেখাটি কোন শ্রেণির। প্যামফ্লেট না পলেমিক্স, অ্যাকাডেমিক না সাংবাদিকতা, ভ্রমণ-বৃত্তান্ত না স্রেফ সাহিত্যিক হঠকারিতা? কিছু মানুষ আবার ওগুলিকে লেখা বলেই মনে করেন না। “তুমি কি লেখালেখি করছ না আজকাল? আমরা তোমার আগামী বইয়ের অপেক্ষায় আছি।” অন্যরা মনে করেন কলম ভাড়া দিই আমি। তাই বিভিন্নরকম প্রস্তাব আসে আমার কাছে। “ডার্লিং, ড্যাম নিয়ে যে লেখাটি লিখেছ, খুব ভালো লেগেছে। শিশুনিগ্রহ নিয়ে আমার জন্য কিছু লিখে দেবে?” (এটা সত্যিই ঘটেছে।) উঁচু জাতির অনেক পুরুষ কঠিন মুখে শেখাতে চেষ্টা করেন কেমন করে আমার লেখা উচিৎ, কী বিষয় নিয়ে লেখা উচিৎ এবং আমার লেখার মেজাজ কেমন হবে।

কিন্তু অন্যত্র, ধরে নেওয়া যাক, হাইওয়ে থেকে বেশ দূরে, এই প্রবন্ধগুলি অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় দ্রুত অনুবাদ হয়ে যায়, প্যামফ্লেট হিসেবে ছাপা হয়, বনাঞ্চলে, নদী-উপত্যকায় এবং গ্রামগুলিতে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। যে সব জায়গায় হামলা হয়েছে, অথবা ইউনিভারসিটি ক্যাম্পাসগুলিতে, যেখানে মিথ্যা শুনতে শুনতে ছাত্রসমাজ বীতশ্রদ্ধ, সেখানেও

কারণ এই পাঠক-পাঠিকারা সামনে থেকে লড়াই করতে গিয়ে ছড়িয়ে পরা আগুনে নিজেদের শরীর ঝলসেছে। সাহিত্য কী এবং তা কেমন হওয়া উচিৎ– এই ব্যাপারে তাঁদের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কথাটি বললাম এই কারণে যে এর থেকে আমি শিখেছি সাহিত্যের স্থানটি লেখক এবং পাঠকেরা মিলে তৈরি করেন। ভঙ্গুর হলেও চিরকালের জন্য তা ধ্বংস হয় না। জায়গাটি ভাঙলে আমরা সবাই তা আবার তৈরি করে নিই। কারণ, আমাদের আশ্রয় চাই। আমার বিশেষ পছন্দ সেই সাহিত্য ভাবনা যে প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। সাহিত্য আশ্রয় দেয়। সব ধরনের আশ্রয় দেয়।

সময় গড়িয়েছে, অব্যক্ত এক আপসও হয়েছে। ‘রাইটার-অ্যাক্টিভিস্ট’ বলে আমাকে সম্বোধন করা হয়। এমন শ্রেণিকরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে আমার গল্পগুলি রাজনৈতিক নয় এবং আমার প্রবন্ধগুলির সাহিত্যমূল্য নেই।

মনে আছে হায়দ্রাবাদের একটি কলেজের লেকচার হলে পাঁচ-ছয়শো ছাত্রছাত্রীর সামনে বসে আছি। আমার বাঁদিকে অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে উপবিষ্ট ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর। ডানদিকে কাব্যসাহিত্যের এক প্রফেসর। ভাইস-চ্যান্সেলর আমার কানে ফিসফিস করলেন, “উপন্যাস লিখে সময় নষ্ট করবেন না আপনি। আপনার রাজনীতি নিয়ে যে লেখালেখি করেন, তাতে মন দিন।” অন্যদিকে বসা প্রফেসর জনান্তে বললেন “কবে আবার উপন্যাস লেখায় ফিরবেন আপনি? ওটাই আপনার আসল জায়গা। বাকি যা লেখেন তা কিন্তু ক্ষণস্থায়ী।”

আমার কখনও মনে হয়নি যে আমার উপন্যাস আর প্রবন্ধগুলি পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনও অধিরাজ্য দখলের জন্য লড়ালড়ি করছে। ওরা যে এক নয় তা আমি জানি, কিন্তু ওদের মধ্যে ফারাকটা ঠিক কোথায় তা বের করা যে এতটা মুশকিল তা কল্পনাও করিনি। সত্যি কথা আর কল্পিত কাহিনী একে অপরের বিপরীত নয়। একটি আরেকটির চেয়ে বেশি সত্যিও নয়। বেশি তথ্যনির্ভরও নয়। অথবা বেশি বাস্তবিকও নয়। অথবা যেমন আমার ক্ষেত্রে, বেশি পঠিতও নয়।

শুধু এটুকু বলতে পারি, আমার শরীরটা দুইয়ের পার্থক্য অনুভব করতে পারে।

দুই প্রফেসরের মাঝখানে বসে তাঁদের পরস্পরবিরোধী উপদেশ শুনতে ভালই লাগছিল। হাসছিলাম আর মনে পড়ছিল জন বার্জার-এর লেখা মেসেজটি। লেখক হিসেবে তিনি বহু বছর আমার হিরো ছিলেন। সুন্দর হস্তাক্ষরে আমাকে লেখা প্রথম চিঠিটিতে তিনি বলেছিলেন, “তোমার ফিকশন আর ননফিকশন একে অপরের সঙ্গে এই বিশ্বে ঘুরে বেড়ায় তোমার দুটি পায়ের মতো।” এটাই আমার কাছে শেষ কথা।

আমার বিরুদ্ধে যে কেসই তৈরি করা হোক না কেন, এখনও অবধি তা ফলপ্রসূ হয়নি। বহাল তবিয়তে এখানে দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি। কিন্তু আমার লেকচারার বন্ধুটি এখন রাষ্ট্রবিরোধিতার অভিযোগে জেলে বন্দি। রাজনৈতিক অপরাধীতে ভারতীয় জেলগুলি এখন ঠাসা। অধিকাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয় তাঁরা মাওবাদী, অথবা ইসলামিস্ট সন্ত্রাসবাদী। এই শব্দগুলিকে এতটা ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হচ্ছে যে এর মধ্যে এমন যে কোনও মানুষই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যিনি সরকারী নীতি সমর্থন করেন না।

এবারে ভোটের আগে যে শিক্ষক, আইনজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট এবং লেখকদের জেলবন্দি করা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যা করতে পারেন। প্লটটি এতই খেলো যে একটি ছয় বছরের শিশু এর চেয়ে ভালো কিছু ভাবতে পারে। ফ্যাসিস্টরা ফিকশন রাইটিং কোর্সে ভর্তি হলে ভালো হয়।

রিপোর্টার উইথআউট বর্ডার বলছে সাংবাদিকদের পক্ষে বিপজ্জনক দেশ হিসেবে ভারতের স্থান আফগানিস্থান, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং মেক্সিকোর পরে। এখানে একটু জিরিয়ে নিয়ে PEN–কে ধন্যবাদ জানাই লেখক এবং সাংবাদিকদের রক্ষা করবার জন্য। যারা জেলে বন্দি আছেন, দণ্ডাদেশ পেয়েছেন, সেন্সরড হয়েছেন বা তার চেয়েও খারাপ অবস্থা ভোগ করছেন। এক দিন থেকে পরের দিন— এই সময়টুকুর মধ্যে আমাদের মধ্যে যে কেউ লাইন অফ ফায়ারে চলে আসতে পারেন। একটি সংগঠন যে আমাদের হালহদিশ নিয়ে চিন্তিত তা ভেবে আশ্বস্ত হই।

ভারতে যারা জেলে বন্দি, তাঁদের ভাগ্য ভালো। দুর্ভাগা যারা, তাঁদের মৃত্যু হয়। গৌরী লঙ্কেশ, নরেন্দ্র ডাভোলকর, এম এম কালবুর্গি, এবং গোবিন্দ পানসারে— অতি ডানপন্থার সমালোচক যারা, তাঁদের হত্যা করা হয়েছে। এগুলি হাই-প্রোফাইল কিলিং। এমন বহু অ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন যারা রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী বিভিন্ন দুর্নীতির ঘটনাকে জনসমক্ষে আনবার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাঁদের মেরে ফেলা হয়েছে অথবা রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁদের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে।

গত পাঁচ বছরে লিঞ্চিং নেশন হিসেবে ভারতের নাম হয়েছে। মুসলিম এবং দলিতদের নজরদার হিন্দু জনতা প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় সবার সামনে পিটিয়ে মারবার পর সেই ‘লিঞ্চ ভিডিও’-গুলিকে পরম উল্লাসে ইউটিউবে আপলোড করছে। নিদারুণ এই প্রকাশ্য হিংস্রতা একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত নয়। মুসলিমদের উপর আক্রমণ যদিও নতুন বিষয় নয় এবং প্রাচীনকাল থেকেই দলিতদের উপর অত্যাচার হয়ে আসছে— তবুও এই গণপিটুনিতে মেরে ফেলার মধ্যে স্পষ্ট একটি চিন্তাধারার ছাপ আছে।

গণপিটুনি সংগঠিত করে যারা মারছে তারা জানে উঁচু-মহল থেকে তাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা হবে। শুধু সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর দ্বারাই নয়, ভারতের সেই অতি ডান, অতি গোপন, মহাশক্তিশালী, প্রোটো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মতো সংগঠনই এদের বাঁচাবে যা এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯২৫-এ প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটির আদি ভাবাদর্শীরা ইউরোপিয়ান ফ্যাসিজম দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত ছিলেন। হিটলার এবং মুসোলিনিকে খোলাখুলি প্রশংসা করে তাঁরা ভারতীয় মুসলিমদের সঙ্গে ‘জার্মানির ইহুদি’-দের তুলনা করেছিলেন। গত পঁচানব্বই বছর ধরে সংস্থাটি ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষিত করবার লক্ষ্যে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম, খ্রিস্টান এবং কম্যুনিস্টরা এই সংস্থার ঘোষিত শত্রু।

এই দেশে আরএসএস একটি ছায়া সরকার চালায়। কয়েক হাজার শাখার মাধ্যমে যার চিন্তাধারা কার্যায়িত হয়। তার ভাবাদর্শ মেনে যে অসংখ্য সংগঠন বিভিন্ন নামে সারা দেশে ছড়িয়ে আছে তাদের হিংস্রতা বিস্ময়জনক।

পশ্চিমতটের চিৎপাবন ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণে যে ঐতিহ্যশালী আরএসএস ক্রমশ সমৃদ্ধ হয়েছে, সেখানে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী এবং বর্ণবাদীদের বোলবোলা। হিন্দুধর্মের মহান পরম্পরার অন্তর্গত জাতিপ্রথার প্রশংসায় এরা পঞ্চমুখ হয়ে লেখালেখি করেন। 

সঠিকভাবে বললে, এরা ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত। কারণ, প্রাচীন কাল থেকে এই ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতাকে টিঁকিয়ে রাখতে পেরেছে। অবিশ্বাস্য মহল থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদের স্তুতি হয়েছে। দুঃখের হলেও কথাটি সত্যি এদের মধ্যে মোহনদাস গান্ধিও আছেন— যিনি মনে করতেন জাতিপ্রথার প্রচলনে হিন্দু সমাজের প্রতিভা প্রমাণিত হয়। জাতি ও বর্ণব্যবস্থাকে গান্ধি কী চোখে দেখতেন, তা নিয়ে আমি একটি বই লিখেছি, “The Doctor and The Saint”। তাই এই বিষয়ে এখন বিশদে বলছি না।

শুধু এটুকু জানাই: মাদ্রাজে ১৯১৬ সালে একটি মিশনারি কনফারেন্সে গান্ধি বলেছিলেন, “জাতিপ্রথার বিশাল সংগঠনটি যে শুধুমাত্র সম্প্রদায়ের ধার্মিক আকাঙ্খাগুলিই পূরণ করে না, তার রাজনৈতিক প্রয়োজনগুলিও মেটায়। গ্রামবাসীরা তাদের ঘরোয়া বিবাদগুলিকে জাতিব্যবস্থার মাধ্যমে মিটিয়ে নেন, এবং সেটির মাধ্যমেই আবার শাসক বা শাসকদের অত্যাচারের মোকাবিলা করেন। একটি রাষ্ট্রের সেই সাংগঠনিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করে লাভ নেই যা জাতিপ্রথার মতো বিস্ময়কর ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে পারে।”

এখন আরএসএস জাহির করে বলে, তাদের যে ষাট লক্ষ প্রশিক্ষিত সৈন্য সদস্য আছে তারা গর্বের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় দেয় ‘স্বয়ংসেবক’ বলে। প্রধানমন্ত্রী সহ তাঁর ক্যাবিনেটের অনেকেই এই তালিকায় আছেন। আরএসএস-এর সংসদীয় রাজনীতির দপ্তর হিসেবে কাজ করছে শাসক বিজেপি। তার সম্পাদক রাম মাধব আরএসএস-এর সদস্য। ভারত এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের পাশাপাশি বহু ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদারমনস্ক মানুষ এখনও বিজেপি-কে সাধারণ একটি ডানপন্থী, সংরক্ষণবাদী, স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখেন। এই দেখার উপর জোর দিতে গিয়ে তাঁরা অজ্ঞানে বা জ্ঞানত আরএসএস-এর সঙ্গে তার জৈবিক যোগটিকে ক্ষুদ্র করেন বলেই বিজেপি-র রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের পথ মসৃণ হয়েছে।

মুলস্রোতের রাজনীতিতে মোদির কেরিয়ার শুরু হয় (সমাপতন হতে পারে, অথবা নয়) ৯/১১-র কয়েক সপ্তাহ পরে, যখন বিধানসভার নির্বাচিত সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হল। কয়েক মাসের মধ্যেই মোদির তত্ত্বাবধানে গুজরাটে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে হিংস্র কার্যকলাপ শুরু, তাতে প্রকাশ্য দিবালোকে দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তার কয়েক মাস পরেই তিনি নির্বাচন ডাকেন এবং তাতে জিতে যান। গুজরাটের ব্যবসায়ী এবং উদ্যোগপতিদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ভারতবর্ষের অনেকগুলি বড় বড় কর্পোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে সমর্থন জানান। ফ্যাসিজম এবং ক্যাপিটালিজমের এই বিবাহ-অঙ্গীকার নিশ্চুপে ঘটেনি। পরবর্তীকালে তারা একসঙ্গেই পথ চলে। গুজরাটে তিন দফায় মুখ্যমন্ত্রী থাকবার পর ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন মোদি। টিপ্পনী রচয়িতারা উদার মনে তাঁকে স্বাগতম জানান। তিনি যে বারাক ওবামা, এমান্যুয়েল ম্যাক্রন এবং অবশ্যই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতাদের বুকে জড়াতে সারা দুনিয়া চষে বেড়াবেন, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

মোদির পরিচয় কী— সেই ব্যাপারে এনারা কেউই অজ্ঞ নন। কিন্তু এদের প্রত্যেকেই এই লক্ষ কোটি মানুষের ‘বাজার’-টিতে কিছু না কিছু বেচতে আগ্রহী। আর এখন পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করবার পর তিনি এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা বিদ্বেষভরা প্রচার চালিয়ে পুনর্নির্বাচিত হতে চাইছেন।

প্রার্থীদের মধ্যে আছেন গেরুয়াধারী সাধ্বী প্রজ্ঞা, যিনি একটি সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে ছয়জনকে হত্যা করবার অভিযোগে আদালতে বিচারাধীন এবং বর্তমানে জামিনে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ঘটনাক্রম বিপজ্জনক দিকে ঘোরে যখন মোদির ক্যাবিনেটের রাষ্ট্রমন্ত্রী মেনকা গান্ধি একটি ভাষণে জনগণকে হুঁশিয়ারি দেন যে তাঁর নির্বাচনী ক্ষেত্রের গ্রামগুলিকে শ্রেণিকরণ করা হবে। বিজেপি-কে যে গ্রাম যত সংখ্যক ভোট দেবে, সেই অনুযায়ী তাকে পুরস্কৃত করা হবে অথবা শাস্তি দেওয়া হবে উন্নয়নের মাপকাঠিতে। বিজেপির প্রতি গ্রামবাসীর বিশ্বস্ততার অনুপাতে সেই গ্রামগুলিতে উন্নয়নের হার বাড়িয়ে বা কমিয়ে। এই ভাষায় তিনি যে একা কথা বলেছেন, তা নয়। তিনি একমাত্র প্রার্থী নন যিনি খোলাখুলি জানিয়েছেন পার্টির পক্ষে বা বিপক্ষে কে ভোট দিয়েছেন সেই তথ্য পার্টির কাছে আছে। এবং সে অনুযায়ী প্রতিফল মিলবে। এবং তিনিই একমাত্র প্রার্থী নন যিনি ইঙ্গিত করেছেন রাজনৈতিক দলগুলির কাছে সেই তথ্যও পৌঁছে যায়, যা গোপন ব্যালট হওয়া উচিৎ। সেই তথ্যকে তাঁরা নিজের সুবিধার জন্য এমন বিপজ্জনকভাবে ব্যবহার করতে পারেন যা নির্বাচন তথা গণতন্ত্রকেই অস্বীকার করে।

নজরদার পুঁজিতন্ত্রের এই যুগে গুটি কয়েক মানুষ আমাদের আদ্যোপান্ত জেনেছে। এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে তাঁরা এবার আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

ভারত যুঝছে ভারতাত্মাকে বাঁচাতে। অন্য রাজনৈতিক দলের মোট যত টাকা আছে, তার চেয়েও বেশি টাকা খরচ করে, মেনস্ট্রিম মিডিয়ার প্রায় গোটাটা নিয়ন্ত্রণে এনেও বিজেপি যদি নির্বাচনে হেরে যায়— তাতে আমাদের বিপদ দূর হবে না। আরএসএস বহুরূপী। লক্ষ পা নিয়ে সে এগিয়ে চলেছে। পাঁচ বছর আগে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতা দখল করবার পর তার পায়ে এখন লোকযন্ত্রের জোর। নির্বাচনে হারলেও নরকের উদ্দেশ্যে তার অনন্ত যাত্রা থামবে না। দরকার বুঝে সে রং পাল্টাবে, যুক্তি এবং ইনক্লুসিভনেস-এর মুখোশ পরবে। শুধুমাত্র আন্ডারগ্রাউন্ড থাকাকালীনই নয়, প্রকাশ্য সংগঠন হিসেবেও সে নিজের ক্রিয়াকলাপে যথেষ্ট দড়। ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী এক জন্তুর মতো সিধিয়ে ঢুকে সে আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সংবাদ বিপণিতে, সুরক্ষা বল এবং গোয়েন্দা সংস্থা সমেত দেশের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে নিজের বাসা বেঁধেছে।

ভঙ্গুর হলেও জোটবদ্ধ একটি নন-বিজেপি সরকার যদি শপথ নেয় তাহলে তাকে সম্মুখীন হতেই হবে উসকে দেওয়া বিক্ষিপ্ত সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং নিরন্তর মিথ্যাচারের পতাকা আক্রমণের। এতে আমরা অভ্যস্ত। গরুর মৃতদেহগুলি আবিষ্কার হবে হাইওয়ের ধারে, মন্দিরে মিলবে গোমাংস আর মসজিদে ছুঁড়ে দেওয়া হবে শুয়োরের মাংস। দেশ যখন আবার জ্বলবে, অতি ডানপন্থীরা তখন আবার আমাদের বোঝাবে একমাত্র তারাই শক্ত হাতে সব সমস্যার সমাধান করে দেশ চালাতে পারে। গভীরভাবে মেরুকরণে প্রভাবিত একটি রাষ্ট্র কি এই খেলাগুলির মধ্যে দিয়ে মূল উদ্দেশ্যটি বুঝতে সক্ষম? বলা মুশকিল।

এসব নিয়েই বহু বছর ধরে আমি ফিকশন আর ননফিকশন লিখে যাচ্ছি।

*****

১৯৯৭-এর গ্রীষ্মে দ্য গড অফ স্মল থিংস প্রকাশিত হয়। শৈশবে যে পরিবেশে বড় হয়েছি, তার ভাষা এবং আঙ্গিককে নিজের জন্য এবং কেরল যাদের কাছে অজানা, সেই প্রিয়জনদের খুঁজে বার করবার ফলশ্রুতি এই উপন্যাস। আমি আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশুনা করেছি, চিত্রনাট্য লিখেছি এবং তারপর একটা উপন্যাস লিখতে চেয়েছি। যে উপন্যাস শুধু উপন্যাসই হবে— যে উপন্যাস একটি সিনেমা, বা একটি ম্যানিফেস্টো, অথবা একটি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা হবে না। কিছু সমালোচক যখন উপন্যাসটিকে ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে একটি কাজ হিসেবে বর্ণনা করেন, আমি আশ্চর্য হই— কী করে তা হবে? যে জায়গাটিকে নিয়ে আমি লিখেছি— আয়েমেনম পাহাড়ে পুরনো বাড়িটা, আমার দিদিমার আচারের কারখানা যেখানে আমি বড় হয়েছি, (কিছু বয়াম আর লেবেল এখনও রেখে দিয়েছি), মীনাচল নদী— এগুলি তো কঠোর বাস্তব আমার চোখে। অথচ পাশ্চাত্যের অনেক সমালোচকদের চোখে তা অদ্ভুত এবং জাদুময়। হতেই পারে। কিন্তু নিউ ইয়র্ক এবং লন্ডনকে ওই চোখে দেখবার অধিকার কিন্তু আমার রইল।

কেরলের মানুষজন কিন্তু কোনও জাদুর খোঁজ পায়নি বইটিতে। ১৯৫৯ থেকে পাঁচ বছর অন্তর শাসন করে আসা সিপিআই(এম) দুঃখ পেয়েছে এই ভেবে যে দ্য গড অফ স্মল থিংস-এ তাদের দলের সমালোচনা করা হয়েছে।

সময় নষ্ট না করে আমাকে তাই কম্যুনিস্ট বিরোধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হলতাদের চোখে আমি হয়ে গেলাম সেই ষড়যন্ত্রের অংশ যে শয়নে স্বপনে জাগরণে সোচ্চারে সাম্রাজ্যবাদের হয়ে কথা বলে।

এটা সত্যি, আমি সমালোচনা করেছি। এবং তার সূচ্যগ্রমুখ ছিল সেই বামপন্থা যা ভারতের বিভিন্ন কম্যুনিস্ট দল বিশ্বাস করে, যা জাতিভেদের প্রতি শুধু অন্ধই নয়, অনেক ক্ষেত্রে জাতপাতের সমর্থকও বটে। উপন্যাসটিতে সিরিয়ান ক্রিশ্চান মহিলা আম্মুর সঙ্গে ভেলুথা নামে দলিত ছেলেটির রীতিবিরোধী সম্পর্কের বয়ান পড়ে ত্রস্ত হয়েছেন তাঁরা। এই ত্রাসের কারণ উপন্যাসটির রাজনীতিতে জাতপাতের মতো লিঙ্গ-সম্পর্কিত প্রশ্নগুলিও উত্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসের একটি মুখ্য চরিত্র কমরেড কেএনএম পিল্লাইয়ের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী কল্যাণী এবং ডিভোর্সড মহিলা আম্মুর সম্পর্কের বর্ণনা আছে। যে আম্মুর চরিত্রে “কোমল মাতৃত্বের সঙ্গে সুইসাইড বোম্বারের বিক্ষিপ্ত ক্রোধের মিশেল” ঘটেছে, যে আম্মুকে “রাতে সেই পুরুষ ভালোবাসে যাকে দিনের আলোয় তার সন্তানেরা চোখে হারায়”। এসব পড়ে কেউ উৎফুল্ল হয়নি, প্রশংসাও করেননি। পাঁচজন পুরুষ আইনজীবী মিলে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাতে অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে বলা হয় আমি “জনগণের নৈতিকতা নষ্ট করছি।”

উপন্যাসের বাইরে অন্য কিছু ব্যাপার নিয়েও জলঘোলা করা হয়েছে। আমার মা মেরী রায় একটি মামলায় জেতেন। তাতে সুপ্রিম কোর্ট সেই সিরিয়ান ক্রিশ্চান ইনহেরিটেন্স ল-টিকে বাতিল করে যা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাঁদের বাবার এক-চতুর্থাংশ সম্পত্তি বা পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে যেটি কম হবে, তা দেওয়ার কথা বলে। এখন মেয়েরা সমান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে। এতে ছেলেদের ক্ষোভ বেড়েছে। বেশ বোঝা যায় মা এবং মেয়েদের উচিৎ শিক্ষা দিতে চায় তারা। মায়ের মামলাটির যখন তৃতীয় বা চতুর্থ শুনানি চলছে তখন খবর আসে দ্য গড অফ স্মল থিংস বুকার প্রাইজে সম্মানিত হয়েছে। এতে জনমত ভাগ হয়ে যায়। স্থানীয় এক মালয়ালি মেয়ে সাহিত্যে এত বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। এই সত্যিটাকে তো সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তাকে লজ্জায় এড়িয়ে যাব না গর্বে বুকে জড়িয়ে ধরব?

আমি তখন আদালতে আমার উকিলের সঙ্গে হাজির। জনান্তিকে তিনি আমাকে বললেন বইটির কিছু অংশ কিন্তু “যথেষ্ট অশ্লীল”। তবে সঙ্গে এও বললেন আইনের চোখে শৈল্পিক কাজকে সামগ্রিকভাবে দেখা হয়। যেহেতু সম্পূর্ণ বইটা অশ্লীল নয়, তাই লড়ে জেতার সুযোগ আছে আমাদের। বিচারক নিজের আসনে বসে বললেন, “যখনই এই মামলা শুনতে বসি তখনই আমার বুকে ব্যথা হয়।” তিনি শুনানি পিছিয়ে দিলেন। ওনার পরে যে বিচারকেরা মামলা শুনতে বসলেন, তাঁরাও তাই করলেন। ইতিমধ্যে রীতিবিরোধিতার বাইরে বইটিতে যা ফুটে উঠেছে, বইটির ভাষা, শৈশবের রোমন্থন ইত্যাদি— তা নিয়ে মানুষ মাতামাতি করছে। অথচ এখনও অনেকে আম্মু আর ভেলুথার সম্পর্কের কথা পড়তে অস্বস্তি বোধ করেন। এবং অশ্লীলতার মামলাটি খারিজ হতে দশ বছর লেগে যায়।

দ্য গড অফ স্মল থিংস প্রকাশিত হবার এক বছর বাদে ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কেন্দ্রে শাসনক্ষমতায় আসে বিজেপি-র জোট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী আরএসএস-এর একজন সদস্য। প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি আরএসএস-এর একটি দীর্ঘকালের স্বপ্নকে সত্যি করেন। ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি নিউক্লিয়ার টেস্ট ঘটিয়ে। পাকিস্তান পাল্টা টেস্টগুলি চালিয়ে জবাব দেয়। এভাবে একের পর এক নিউক্লিয়ার টেস্টের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততা শুরু, যা আজ ভারতে জনগণের উদ্দেশ্যে নেতাদের দেওয়া জুমলাবাজির স্বাভাবিক অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

নিউক্লিয়ার টেস্টের বীভৎসতা নিয়ে এমন মাতামাতি আর হুল্লোড় দেখে আমি হতচকিত। যেসব মহলে এমনটা হয় না ভেবেছিলাম, সেখানেও দেখি একই দৃশ্য। সেই সময়ে আমি আমার প্রথম প্রবন্ধটি লিখি নিউক্লিয়ার টেস্টগুলির প্রতি আমার নিন্দা জানিয়ে। দ্য এন্ড অফ ইমাজিনেশন       

আমি বলি নিউক্লিয়ার রেস-এ অংশ নিয়ে আমরা আমাদের কল্পনাশক্তিকে ঔপনিবেশিক করলাম। আমি তাতে লিখেছি, “আমার মগজে একটি নিউক্লিয়ার বোমা স্থাপন না করাটা যদি ভারতবিরোধী এবং হিন্দুবিরোধী হয়, তাহলে আমি নিজেকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করলাম। এবং ঘোষণা করছি আমি একটি চলমান প্রজাতন্ত্র।”

কথাটির প্রতিক্রিয়া কেমন হয়েছিল আপনারা ভেবে নিন।

দ্য এন্ড অফ ইমাজিনেশন দিয়ে যা শুরু, গত কুড়ি বছর ধরে সেই নন ফিকশন রচনা চলছে। যে সময়ে লিখছি ভারত তখন অতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে। প্রত্যেকটি রচনার ক্ষেত্রে আমি উপযুক্ত একটি আঙ্গিক এবং ভাষা খুঁজেছি। সেচব্যবস্থা নিয়ে লেখাটা কি প্রেম, বিরহ বা শৈশব রোমন্থনের মতো আকর্ষণীয় হবে? অথবা লবণাক্ত হয়ে যাওয়া মাটি নিয়ে লেখা? অথবা নিষ্কাশনব্যবস্থা? বাঁধ? শস্য? স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট এবং প্রাইভেটাইজেশন? বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে লেখা? যে সব কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যয় নেমে আসে? সংবাদ সরবরাহ নয়, গল্প বলার ভঙ্গিতে তা কি বলা যায়? এই বিষয়গুলিকে কি সাহিত্যে রূপান্তর করব? যে সাহিত্য সবার জন্য হবে— যে মানুষগুলি পড়তে বা লিখতে না পারলেও আমাকে চিন্তা করতে শেখায়— তাঁদেরও কি তা পড়ে শোনানো যায়?

আমি চেষ্টা করেছি। এবং একটির পর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওই পাঁচজন পুরুষ আইনজীবীর মতো (সেই আগের পাঁচজন নন, আবার আলাদাও নন। এনারা সবাই একত্রে শিকারে বার হয়) এবং আমার বিরুদ্ধে করা তাঁদের ফৌজদারি মামলাগুলির মতো, যার অধিকাংশই হল আদালত অবমাননা। একটিতে আমার স্বল্প সময়ের জন্য কয়েদবাসের হুকুম হয়, অন্যটি এখনও চলছে। তর্কাতর্কির উপক্রম হলে প্রায়শই লোকজন মেজাজ হারান। কিছু ক্ষেত্রে হিংস্রও হয়ে ওঠেন। কিন্তু তবুও বিতর্কের গুরুত্ব আছে বইকি।

প্রায় প্রত্যেকটি প্রবন্ধের জন্য আমাকে যে ঝামেলা সামলাতে হয়েছে, তাতে আমি বারবার প্রতিজ্ঞা করেছি, আমি আর লিখব না। কিন্তু অবশ্যম্ভাবী এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে চুপ করে বসে থাকলেও আমার মাথায় দুরমুশের এমন ঘা পড়ছে, আমার রক্ত চলাচলে এমন বেদনা অনুভব করেছি শরীরে যে আমি প্রতিজ্ঞা ভুলে আবার লিখেছি। গত বছর আমার প্রকাশক যখন আমার সব লেখাকে এক মলাটের ভিতর সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করলেন, চমকে দেখলাম মাই সেডেশিয়াস হার্ট’ নামে বইটা এক হাজার পাতার বেশিই হয়ে যাবে।

গত কুড়ি বছর ধরে লেখালেখি করে, বিদ্রোহের মর্মস্থানগুলি ঘুরেফিরে, বহু অসামান্য এবং সংবেদনশীল সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ওঠাবসা করবার পর উপন্যাস আবার ফিরে এসেছে আমার কাছে।

স্পষ্ট বুঝেছি যে উপন্যাসটির মধ্যে সেই ব্রহ্মাণ্ডটি সমাহিত হবে যা আমার ভিতর তৈরি হয়েছে। যে জায়গাগুলিতে এতদিন ধরে আমি ঘুরে বেরিয়েছি, সেই জায়গাগুলিই মাথার মধ্যে চড়কির মতো ঘুরে একটি আখ্যান-ব্রহ্মাণ্ড রচনা করছে। আমি জানি উপন্যাসটি অক্ষমনীয়ভাবে জটিল হবে, রাজনৈতিক হবে এবং একই সঙ্গে হবে আন্তরিক।

আমি জানতাম দ্য গড অফ স্মল থিংস যদি ঘরবাড়ি নিয়ে হয়, ভগ্নহদয় নিয়ে বাস করা এক পরিবারকে নিয়ে হয়, দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস শুরু হবে এমন বাড়িতে যার ছাদ উড়ে গেছে, ভগ্নহদয়গুলি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকায় আর শহরের রাস্তায়। এটি এমন এক উপন্যাস হবে যার আখ্যান-ব্রহ্মাণ্ড সেই সব পোষ্যতা এবং রীতিনীতিকে নস্যাৎ করবে যা উপন্যাসের ক্ষেত্রে সাধারণত অনুসরণ করা হয় বা হয় না। যে দুনিয়ায় আমি থাকি, সেখানকার একটি মহানগর হবে আমার উপন্যাস। আমার পাঠকেরা সেখানে এসে পৌঁছবেন নতুন অভিবাসীদের মতো। একটু ভয় থাকবে তাঁদের মনে, বুক কাঁপবে আশঙ্কায়, কিন্তু উত্তেজনাও থাকবে অঢেল। এই ব্রহ্মাণ্ডকে জানবার একটি মাত্র উপায় হল, এর মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে পথ হারাতে হবে এবং এই শহরে মানুষরা কেমনভাবে বাঁচেন, তা শিখতে হবে। এদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে পাঠকদের— সে যত ক্ষুদ্রই হোক বা মহান। ভিড়কে ভালোবাসতে হবে। এই উপন্যাসে এমন কথা বলা হবে যা অন্য কোনওভাবে বলা সম্ভব নয়।  বিশেষ করে কাশ্মির নিয়ে যেখানে গল্পটাই সত্যি, কারণ সত্যিটা সেখানে বলা অসম্ভব। কাশ্মির প্রসঙ্গ নিয়ে ভারতে সৎভাবে কথাই বলা যায় না যদি না আপনি শারীরিক আঘাতের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করতে পারেন।

কাশ্মির আর ভারত এবং ভারত আর কাশ্মির নিয়ে গল্প বলতে হলে জেমস বল্ডউইনকে উদ্ধৃত করাটাই আমার পক্ষে শ্রেয়, “এবং ওরা আমাকে বিশ্বাস করে না শুধুমাত্র এই কারণে যে ওরা জানে আমি যা বলব তা সত্যি।”

কাশ্মিরের গল্প কিন্তু মানবাধিকার রিপোর্টের সংগ্রহ নয়। সেই গল্প শুধুমাত্র হত্যাকাণ্ড, অত্যাচার, আচমকা অদৃশ্য হওয়া এবং গণকবরের গল্পই নয়। যারা সেই অত্যাচারের শিকার অথবা যারা অত্যাচারী তাদেরও নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাশ্মীরে যে ভয়ানক ঘটনাগুলি ঘটেছে, তার সবকটাতেই যে মানবাধিকার উলঙ্ঘন করা হয়েছে তা নয়।

একজন লেখকের জন্য কাশ্মির এমন এক জায়গা যেখানে মানবিক উপাদানগুলি সম্পর্কে শেখবার জন্য প্রচুর উপাদান আছে। ক্ষমতা, ক্ষমতাহীনতা, বিশ্বাসঘাতকতা, বিশ্বস্ততা, প্রেম, কৌতুক, আস্থা… যে মানুষগুলি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সামরিক অধিকারের অধীন, কী ঘটে তাঁদের জীবনে? সন্ত্রাসের বীজ যেখানে হাওয়ায় বয়, সেখানে মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়াই বা কেমন? ভাষার স্বরূপটাই বা কী সেখানে?

কাশ্মিরে প্রথম থেকেই যাওয়ার পর আমি যা করতে থাকি তা দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ গ্রন্থিত হয়েছে। “The Kashmiri-English Alphabet” হিসেবে যার শুরু “A” দিয়ে:

A: Azadi/army/Allah/America/Attack/AK-47/Ammunition/Ambush/Aatankwadi/Armed Forces Special Powers Act/Area Domination/Al Badr/Al Mansoorian/Al Jehad/Afghan/Amarnath Yatra

B: BSF/body/blast/bullet/battalion/barbed wire/brust (burst)/border cross/booby trap/bunker/ bite/begaar (forced labour)

C: Cross-border/Crossfire/camp/civilian/curfew/Crackdown/Cordon-and-Search/CRPF/ Checkpost/Counter-insurgency/Ceasefire/Counter-Intelligence/Catch and Kill/ Custodial Killing/Compensation/Cylinder (surrender)/Concertina wire/Collaborator

এভাবে চলতে থাকে…

তাছাড়াও, যে মানুষগুলি আতঙ্ক সঞ্চার করে, আতঙ্ককে হজম করে এবং তার ন্যার্যতা প্রমাণ করে, তাঁদের কী ঘটে? কী ঘটে সেই মানুষদের যারা নিজেদের নামে এমন আতঙ্ক চালাতে দেন? কাশ্মিরের আখ্যান একটি জিগ-স পাজলের মতো যার টুকরোগুলি খাপে খাপে বসে না। শেষ কথা বলে এখানে কিছু নেই।                   

অদ্ভুত সব মানুষেরা পথ খুঁজে ভিড় করেছে আমার উপন্যাসের পাতায়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হল বিপ্লব দাশগুপ্ত নামে এক গোয়েন্দা। এখানে এসে সে যখন প্রথম পুরুষে কথা বলে আমি বিচলিত হই। ভাবলাম আমি বোধহয় তার মাথায় বাসা বেঁধেছি। তারপর বুঝেছি ও আমার মাথার মধ্যেই আছে। ওর শয়তানি দেখে গা শিরশির করে না, করে ওর যুক্তিবোধে, ওর বুদ্ধিমত্তায়, ওর কৌতুকে, ওর আত্ম-অবমাননায়, ওর অরক্ষিত ব্যক্তিত্বে।

তবুও বিপ্লব দাশগুপ্তের পরিশীলতা এবং পাণ্ডিত্যের পরিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণে যা দেখা যায় না, তা বিল্ডিং কনট্রাক্টর মিঃ ডি ডি গুপ্তা নামে দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর একটি ছোট চরিত্র দেখতে পেয়েছে। মিঃ গুপ্তা বহু বছর ইরাকে ব্লাস্ট ওয়াল বানিয়ে অনেক টাকা জমিয়ে ভারতে এসেছে। বিস্ফোরণ প্রাচীরের সেই সব ছবি গর্বভরে সে নিজের মোবাইলে জমিয়েছে। ইরাকে এযাবৎ যা সে দেখেছে এবং যেভাবে বেঁচেছে তা ভাবলেই অসুস্থ মনে হয় নিজেকে। এমন বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় সে দেখছে কাশ্মিরকে, যা তার নিজের দেশ। যা কিছু এখানে ঘটছে তা দেখে শুনে বুঝে সে বুঝতে পারে আগামী দিনে এই দেশেও ব্লাস্ট ওয়ালের একটা বাজার তৈরি হবে।

উপন্যাস লিখতে বসে লেখক প্রায় উন্মত্ত হন। উপন্যাসই লেখককে আশ্রয় দেয়।

একজন লেখক হিসেবে আমি দ্য গড অফ স্মল থিংস-এর চরিত্রদের রক্ষা করেছি কারণ ওরা অরক্ষিত ছিল। দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ অধিকাংশ চরিত্র বহু জায়গায় আরও বেশি অরক্ষিত। কিন্তু ওরা আমাকে রক্ষা করেছে। বিশেষ করে অঞ্জুম, যার জন্ম হয় আফতাব নামে, পুরনো দিল্লির এক জীর্ণ কবরখানার দেওয়ালের ওধারে জন্নাত গেস্ট হাউসের মালিক এবং ম্যানেজার হিসেবে যার শেষ। নারী ও পুরুষ, জন্তু ও মানুষ, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে যে ভেদরেখাগুলি আছে, অঞ্জুম তা মুছে দেয়। ক্রমশ কর্কশ হয়ে ওঠা এই পৃথিবীর ভেদরেখাগুলির যে স্বৈরাচার, তার প্রকোপ থেকে দূরে কোথাও আশ্রয় নিতে হলে আমি অঞ্জুমের কাছে ফিরে যাই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...