ভারতে বামপন্থীদের কেন চাই

প্রভাত পট্টনায়েক

 

অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়েক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমেরিটাস। ২০১৭ সালে রচিত এই নিবন্ধের অনুবাদ প্রকাশ করার অনুমতি দিয়ে, ও এই সময়ের পাঠকের জন্য প্রাক্‌ কথনটি লিখে দিয়ে অধ্যাপক পট্টনায়েক আমাদের বাধিত করেছেন। মূল নিবন্ধটি ইংরিজিতে লিখিত এবং দ্য ওয়্যার পত্রিকায় প্রকাশিত। নিবন্ধের শেষে মূল রচনার লিঙ্ক দেওয়া হল।

নিচের নিবন্ধটি ২০১৭ সালে লেখা হলেও আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ভারতের অর্থনীতিকে গ্রাস করতে আসা যে বিপদের আভাস এই লেখায় দেওয়া হয়েছে, তা আজ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দেশের বেকারত্ব পঁয়তাল্লিশ বছরে সবথেকে বেশি। এই বিপদের থেকে মুক্তি দেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠিত দুটি বুর্জোয়া জোটের শোচনীয় বিফলতাও আমরা বহন করছি। এ-বিষয়ে মোদি সরকারের বিফলতা এতটাই মারাত্মক যে ২০১৪ সালের মত ‘বিকাশ’-এর কথা এবারের প্রচারে আমরা শুনতেই পেলাম না। ন্যায়-এর মত একটি উদ্ভাবনী প্রকল্পের কথা ম্যানিফেস্টোতে রেখেও কংগ্রেস একে প্রচারের বিষয়ই করে তুলতে পারল না। এই অবস্থায় নির্বাচনে ভরাডুবি সত্ত্বেও বামেরাই এমন একমাত্র শক্তি যারা নব্য-উদারপন্থাজাত এই বিপদের থেকে দেশকে উদ্ধার করতে পারে। কারণ সামাজিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে বামেদের সদর্থক ভূমিকা প্রশ্নাতীত— সম্প্রতি শবরীমালার ক্ষেত্রেও আমরা তা দেখেছি।

অক্টোবর বিপ্লবই এই দেশের বাম-আদর্শের উৎস বলে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এই আদর্শের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধেও নানান সন্দেহমূলক প্রশ্ন তোলা শুরু হয়ে যায়। এই ধরনের আলোচনাগুলিতে, বলাই বাহুল্য, সঠিক প্রশ্নগুলো তোলা হয় না। আমাদের দেশের বাম-আদর্শের, বামপন্থীদের ভবিষ্যৎ আছে না নেই, এটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল, বামপন্থা ব্যাতিরেকে আমাদের দেশের কোনও ভবিষ্যৎ আছে কি না।

নব্য-উদারপন্থী পুঁজিবাদ, অন্যান্য অনেক দেশের মতই আমাদের দেশও যাকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করেছে, তা আজ এক অন্ধগলিতে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা, যার সূত্রপাত ২০০৮ সালের গোড়ার দিকে, তা আর কেবলমাত্র প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারত ও চিনের মত দেশ, গোড়ার দিকে যাদের এই বিপদের থেকে মুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল, আজ মন্দার শিকার। এই নব্য-উদারপন্থী ব্যবস্থার মধ্যে, যেখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাজস্ব নীতির দ্বারা চাহিদার ব্যবস্থাপনাকে অভিশাপ বলে গণ্য করা হয়, সেখানে নতুন করে সমৃদ্ধি আনতে গেলে সম্পদমূল্যের কৃত্রিম বুদ্বুদ (asset-price bubble) তৈরি করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু এই বুদ্বুদ চাইলেই তো পাওয়া যায় না। তা ছাড়া, কৃত্রিমভাবে বানিয়ে তোলা এই অবস্থায় ধ্বস অবশ্যম্ভাবী, এবং তার ফলশ্রুতি বিশ্বপুঁজিবাদের পুনরায় সঙ্কটে পড়া। আমাদের সামনে, সুতরাং, বিশ্বপুঁজিবাদের অসহায় নিশ্চলতার এক দীর্ঘায়িত কাল, যার কবলে পড়তে চলেছে আমাদের দেশীয় অর্থনীতিও। নরেন্দ্র মোদি সরকারের ডিমনিটাইজেশন ও জিএসটি-র (যার সবথেকে নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য হল অসংগঠিত ক্ষেত্রে তুলনায় ভারি করারোপণ) নির্বিচার হস্তক্ষেপ এই সমস্যাকে কেবল আরও বাড়িয়েই তুলবে।

আগেও, যখন ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার অভূতপূর্ব গতিতে বাড়ছিল, ক্ষুদ্রকৃষি সহ সমস্ত ক্ষুদ্র উৎপাদন ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল ক্রমশ, তখন গত দু’দশকে তিন লক্ষেরও বেশি কৃষক আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। এর কারণ নব্য-উদারপন্থা দেশীয় অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রত্যাহার মোটেও সুনিশ্চিত করে না এবং সমস্ত বিষয়-আশয় কোনওমতেই বাজারের হাতে ছাড়ে না, যদিও সাধারণভাবে এর উল্টোটাই মনে করা হয়ে থাকে। বরং, নব্য-উদারপন্থার প্রধান কাজ বিশ্বায়িত পুঁজির সমর্থনে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাজে লাগানো, যে ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে কর্পোরেট-ফাইনান্সিয়াল অলিগার্কি। নব্য-উদারবাদ প্রতিষ্ঠার প্রকৃত অর্থ, তার মানে, ক্ষুদ্র উৎপাদন ক্ষেত্রের সহায়কের ভূমিকার থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। নব্য-উদারবাদী ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র উৎপাদন ক্ষেত্রকে ‘মুক্ত’ করে দেওয়া হয়, যাতে সহজেই বৃহৎ পুঁজি একে গ্রাস করে নিতে পারে। ঔপনিবেশিক সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এই প্রকরণকে কার্ল মার্ক্স বলছেন ‘পুঁজি স্তূপীকরণের আদিম পন্থা’— primitive accumulation of capital.

পূর্বের সরকার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার তুলনায় এখন ক্ষুদ্রচাষের লভ্যাংশের পরিমাণ অনেকটা কম। এই ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্রে গভীর কুপ্রভাব ফেলেছে বিশ্ববাজারে দামের উত্থানপতন। কারণ আগের মত সরকার এসব আঘাত থেকে কৃষক বা অন্য উৎপাদনকারীকে বাঁচাতে আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নন। বিপুল সংখ্যায় অসহায় চাষি কাজের সন্ধানে শহরাঞ্চলে চলে আসছেন। এদিকে সেখানেও যথেষ্ট কাজ নেই, কারণ কাজের সুযোগের বৃদ্ধি শ্লথ। এর ফলে জমতে থাকা অব্যবহৃত শ্রমের পাহাড়ে যুক্ত হচ্ছে আরও আরও শ্রম, যার ফল ফলছে অনিয়মিত ও সবিরাম কর্মসংস্থান, ছদ্মবেশী বেকারত্ব এবং ‘ক্ষুদ্র উদ্যোগ’-এ (যা ছদ্মবেশী বেকারত্বের কোমলতর প্রয়োগমাত্র)।

কৃষকদের দুর্দশার ফল, সুতরাং, সুদূরপ্রসারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ শ্রমিকগোষ্ঠীর মধ্যেও। এর থেকে বাদ যাচ্ছেন না তথাকথিত সংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকেরাও। কারণ, ক্রমবর্ধমান শ্রমপর্বতের কর্মসংস্থানের চাহিদার ধাক্কায় ট্রেড ইউনিয়নগুলির দরাদরির ক্ষমতা কমে আসছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যে এই নব্য-উদারবাদ ক্ষুদ্র উৎপাদনক্ষেত্রকে দুইদিক দিয়েই প্রভাবিত করছে। যোগানের দিক দিয়ে, কারণ উৎপাদকের আয়হ্রাসের সঙ্গে উৎপাদনের পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। চাহিদার দিকে দিয়ে, কারণ কর্মরত জনগোষ্ঠীর আয়হ্রাসের ফলে হ্রাস পাচ্ছে চাহিদা। একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ১৯৯০-৯১ থেকে ২০১৩-১৪ (দুটিই সুফসলী বছর) এই সময়ে জনপ্রতি খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রায় একই রয়ে গেছে। এর অর্থ যোগানে সঙ্কোচন। আবার এই একই সময়ে দেখা যাচ্ছে জনপ্রতি খাদ্যলভ্যতায় চার শতাংশ হ্রাস, যা কিনা কর্মরত জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দ্যোতক।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট (আইএফপিআরআই) তাঁদের সূচকে একশো উনিশটি ক্ষুধাপীড়িত দেশের (প্রাগ্রসর দেশগুলিকে ধর্তব্যের বাইরে রেখে) মধ্যে ভারতকে শততম স্থানে রেখেছেন। ভারতে ক্ষুধার ব্যাপ্তির কিছুটা এর থেকে আমরা ধারণা করতে পারি। যে কথাটা স্বল্প-জানা, তা হল এই বছরগুলির মধ্যে— যখন ক্ষুধায় দেশের মানুষ কষ্ট পেয়েছেন— আমাদের দেশ ছিল খাদ্যশস্যের রপ্তানিকারক হিসাবে সামনের সারিতে। আমরা আমাদের খাদ্যশস্য রপ্তানি করেছি সেইসব ধনী দেশে, যেখানে এগুলো ব্যবহার করা হয় মূলত পশুখাদ্য হিসাবে।

ভারতে দারিদ্র্য ধারণাগতভাবে ক্যালরি মানের সঙ্গে যুক্ত: গ্রামে ২,২০০ ক্যালরি প্রতিদিন প্রতিজন এবং শহরে ২,১০০। ২,২০০ ক্যালরির নিচে গ্রামীণ জনসংখ্যার শতকরা ভাগ, যা ১৯৯৩-৯৪ সালে ছিল ৫৮, ২০১১-১২তে হয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ (সুফসলী বছর)। শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় একইরকম। এই নব্য-উদারপন্থার যুগে দারিদ্র্যে হ্রাসের কথাগুলো, সুতরাং, একেবারেই ভিত্তিহীন।

বিশ্ববাজারের মন্দা ভারত পর্যন্ত ছড়িয়ে আসার পর ক্ষুদ্র উৎপাদনক্ষেত্রের সঙ্কোচন ত্বরান্বিত হয়েছে। ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৬-১৭, মোদি সরকারের শাসনকালের এই তিন বছরে কৃষিনির্ভর জনসংখ্যার— যা আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক— জনপ্রতি আয় একটুও বাড়েনি, বরং অল্প হলেও কম হয়েছে। ডিমনিটাইজেশনের কারণে কৃষকের দুর্ভোগ এই হিসাবে ধরা নেই। ডিমনিটাইজেশন কৃষকের উপর ঋণের বোঝা বৃদ্ধির কারণ হয়েছে।

আমরা ভালো করেই জানি, অন্যদিকে জনসংখ্যার উচ্চতম এক শতাংশের আয় ও সম্পদ কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের আয়ের ভাগ ১৯২২ সাল থেকে ধরলে এখনই সবথেকে বেশি (১৯২২ সালে আয়কর চালু করা হয়)।

এই মন্দা যে কেবলমাত্র ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীদের ক্ষতি করেছে তা নয় (প্রাথমিক পণ্য ও শিল্পজাত পণ্যের মধ্যকার টার্মস অফ ট্রেড এখন প্রাথমিক পণ্যের থেকে সরে আসছে)। এই মন্দা ক্ষতি করছে মধ্যবিত্তেরও, যাঁদের এক অংশ আবার নব্য-উদারপন্থার সুবিধাভোগী। সরকারের শ্রম অধিকার প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী পনেরো বছরোর্ধ্ব জনসংখ্যায় ‘ইউজুয়াল প্রিন্সিপাল স্টেটাস’ কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ৩৭.৪ লক্ষ— ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৫-১৬ সময়ের মধ্যে। শহুরে মধ্যবিত্তেরাও এখন কাজের সুযোগ কমে আসার চাপ অনুভব করছেন।

এমন একটা অবস্থা থেকে বিশ্বজোড়া ফ্যাসিজমের উত্থান। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র এখনও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকই, তবু আমাদের মত আরও অনেক দেশের ক্ষমতার শীর্ষে যে ফ্যাসিস্টরা সক্রিয় তা আমরা সকলেই কমবেশি টের পাচ্ছি। সমস্ত বুর্জোয়া সমাজেই সাধারণভাবে ফ্যাসিস্ট উপাদান থাকে। এরা আত্মপ্রকাশ করে বিপদের সময়, বিশেষত তখন, যখন চোখের সামনে থাকা অন্য সব বুর্জোয়া রাজনৈতিক বিন্যাসগুলো বিপদ থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়, এবং শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যও তার দুর্বলতাজনিত কারণে এই শূন্যস্থান পূরণ করতে অসমর্থ হয়। এই ফ্যাসিস্টদের উত্থানের আড়ালে থাকে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের হাত, যাঁরা এই ফ্যাসিস্টদের সাহায্যে সমস্ত সম্ভাব্য বাধা দূর করে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে চান। এই ফ্যাসিস্টরা বিপদের থেকে রক্ষা পাবার কোনও নির্দিষ্ট পথ দেখান না। তার বদলে তাঁরা অপেক্ষাকৃত দুর্বলতর বিরোধীদের ওই বিপদের জন্য দায়ী করতে থাকেন, এবং এক-একটি মুশকিল আসান মসীহাকে হাজির করেন।

ত্রিশের দশকের ফ্যাসিজমের চেহারা আমরা এখনও দেখিনি, এ-কথা সত্য। তা ছাড়া এক-এক দেশে ফ্যাসিজমের চেহারা এক-একরকম হয়। তবু মূল বৈশিষ্ট্যগুলি একইরকম থাকে: আধিপত্যবাদের প্রচার ও প্রসার (পশ্চিমে শ্বেত সুপ্রিমেসিজম আর এখানে হিন্দু সুপ্রিমেসিজম); যুক্তিহীনতাকে মহিমান্বিত করা (আধিপত্যবাদে যা প্রতীয়মান, এবং একটি মসীহার প্রতিষ্ঠা); তৃণমূল স্তরে আন্দোলন (যা একে নিছক কর্তৃত্ববাদের থেকে আলাদা করে) এবং বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে আঁতাত (ভারতে মোদি সরকারের প্রকৃত সাফল্য আরএসএস ও বৃহৎ পুঁজির মধ্যে সখ্যতার অনুঘটন)।

ত্রিশের দশক ও এখনকার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। ত্রিশের দশক ছিল আন্তর্সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের সময়। এই কারণে ফ্যাসিজম যেখানে যেখানে ক্ষমতায় এসেছে, সেখানে সামরিক খাতে খরচ হয়েছে বিপুল পরিমাণে। এই বিপুল পরিমাণ সরকারি ব্যয় ঐ সমস্ত দেশকে অর্থনৈতিক সমস্যার থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করেছে। সামরিকীকরণের মাধ্যমে ১৯৩১ সালে জাপান এবং ১৯৩৩ সালে জার্মানি মহামন্দার থেকে রক্ষা পেয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধে ভূমিকা নেওয়া অন্য উদারবাদী পুঁজিবাদী দেশগুলি বিপদ কাটিয়ে উঠেছে অনেক পরে, ত্রিশের দশকের শেষ দিকে। এই সময়ে বিশ্বায়িত পুঁজি চায় না বিশ্বের দেশগুলি নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে আলাদা আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলুক, কারণ তাতে বিশ্বায়িত পুঁজির চলাচলে বাধা পড়বে। এই কারণে আন্তর্সাম্রাজ্যবাদী মারামারি এখন আর নেই। বিভিন্ন দেশে, যেখানে বৃহৎ পুঁজি সাহায্য করছে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে, তাই নব্য-উদারবাদকে খাটো করার প্রবণতা চোখে পড়ে না। ভারতের ক্ষেত্রেও এই লক্ষণ সুস্পষ্ট। পার্থক্য শুধু এই, যে মোদি সরকার কেবলমাত্র নব্য-উদারবাদ নয়, তার থেকেও বেশি অতি-নব্য-উদারবাদের প্রতি সমর্পিতপ্রাণ। বিপদের থেকে মুক্তির রাস্তা এ নয়।

আমাদের দেশ বর্তমানে এক বন্ধ রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকা অর্থনৈতিক সঙ্কট, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের কণ্ঠরোধ। আর একদিকে (১৯৩১-এর করাচি কংগ্রেসের সঙ্কল্পপত্রে বিধৃত সিদ্ধান্ত-অনুযায়ী) গত শতকের যেটুকু সামাজিক সাফল্য আমাদের অর্জন, তার মুখ ঘুরিয়ে এমন একটা সামাজিক প্রতিবিপ্লবের অবস্থা সৃষ্টি করা যার ফলে আমরা ফিরে যেতে পারি জাতপাতের সমাজে। সফল করতে পারি হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক কার্যক্রম।

উদারবাদী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি এবং তাদের বিন্যাস এই বিপদে পথ দেখাতে ব্যর্থ, কারণ তারা নিজেরাই নব্য-উদারবাদের প্রতি মোহমুগ্ধ। এই অবস্থায় একমাত্র বামপন্থীদের কাছেই এই মোহ অতিক্রম করে নতুন সঙ্কল্পের আশা রাখা যায়। বামপন্থীদের আশু কর্তব্য ফ্যাসিবিরোধী শক্তিকে একজোট করে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর নামিয়ে আনা আক্রমণকে প্রতিহত করা, এবং মানুষের পীড়ালাঘবের লক্ষ্যে একটি ন্যূনতম সাধারণ প্রকল্প তৈরি করা। এই প্রকল্পকে পরিণতি দিতে গিয়ে এই নব্য-উদারপন্থী ব্যবস্থায় যে বিরোধিতা ও অসঙ্গতির মুখোমুখি হতে হবে, তাকে অতিক্রম করার লক্ষ্যে নতুন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গঠনের মাধ্যমে এগিয়ে চলার পথ তৈরি করে নিতে হবে।

আমার মতে, গণতান্ত্রিক অধিকাররক্ষার কথা ছাড়াও এই প্রকল্পে রাখতে হবে বিশ্বজনীন, ন্যায়ানুগ, অর্থনৈতিক অধিকাররক্ষার কথা। খাদ্য, কর্ম, জাতীয় চিকিৎসা পরিষেবার মাধ্যমে সকলের জন্য সুচিকিৎসা, সরকার-পরিচালিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে শিক্ষা এবং বার্ধক্যভাতা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতার অধিকারগুলি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের জাতীয় আয়ের আর দশ শতাংশ খরচ করলে এ-সবই নিশ্চিত করা সম্ভব, এবং বর্তমান দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বামপন্থীরা, একমাত্র বামপন্থীরাই পারেন দেশকে এই পথে এগিয়ে নিয়ে চলতে।

 

এইখানে ক্লিক করলে মূল নিবন্ধটি পড়তে পারা যাবে – https://thewire.in/economy/india-left-future-economy-social-policy

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...