রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চেতনা

ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

 

… “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো”।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পৃথিবীর সবথেকে বেশি দূষিত ২০টি শহরের মধ্যে ১৪টিই আছে ভারতে। এক সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে ‘হু’ জানিয়েছে, সবথেকে দূষিত শহর হল উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের কানপুর। সেখানে শূন্যে ভাসমান কণার পরিমাণ নিরাপদ স্তরের থেকে প্রায় ১৭ গুণ বেশি। পিছিয়ে নেই জাতীয় রাজধানী দিল্লি আর তার লাগোয়া ফরিদাবাদ, বা উত্তরপ্রদেশের প্রাচীন শহর বারাণসী। বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীরা বলছেন দূষণ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর না দিয়ে উন্নয়ন আর শিল্পায়ন হয়েছে এই ভারতীয় শহরগুলোতে- আর এটাই ব্যাপক বায়ুদূষণের একটা বড় কারণ।

এমনকি কলকাতা শহরের ফুসফুস বলে পরিচিত যে অঞ্চল, গাছপালায় ঘেরা সেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এলাকাতেও দূষণের মাত্রা ছিল ৩১০ দশমিক ৭৫।অর্থাৎ, গাছপালা, জলাশয় -এগুলোও কোনও সাহায্য করছে না শহরের দূষণ কমাতে। কলকাতা শহরের দূষণ হার বিপজ্জনকের থেকেও বেশি বিপজ্জনক৷ বলছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা৷ কলকাতার দূষণ পরিস্থিতি, যতটা জানা যায়, তার থেকে অনেক বেশি খারাপ৷ খারাপ, খুব খারাপ, বিপজ্জনকের সীমারেখা পেরিয়ে এই শহরের দূষণ এখন সহ্যসীমার অনেক ওপরে৷ ব্যস্ত এলাকাগুলোতে তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া লেকের মতো গাছেভরা জায়গাতেও দূষণের মাত্রা কখনও কখনও অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়৷ কাজেই কলকাতার রাস্তায় চলাফেরা করা এখন কার্যত প্রাণ হাতে নিয়ে ঘোরার সামিল, বলছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা৷ বাতাসে অস্বাভাবিক মাত্রায় রয়েছে মারাত্মক দূষণকণা, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আমাদের ফুসফুসে গিয়ে জমে যায়, রক্তে মিশে যায়৷

চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের যুগে বসে যখন রবীন্দ্রনাথের নিসর্গচিন্তা নিয়ে ভাবতে যাই, দেখি রবীন্দ্রযুগের পরিবেশ ছিল আজকের তুলনায় স্বর্গ-উদ্যান বা নন্দনকানন। ফলে পরিবেশ নিয়ে ভাবলেই মনে হয় অতীত সবসময়ই স্বর্গ। আমরা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। মানে আমরা ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ করেছি। ‘প্যারাডাইজ রিগেইন’ করার আকুতি যাদের ভেতর ছিল তারা চিরকালই ভাবকেন্দ্রিকতার প্রতি আকুল ছিল। ‘রোমান্টিক’ যুগকে বিতাড়িত করে স্বর্গে পাঠানো হল, মর্তে পড়ে রইল ক্ষমতা পূজারিরা। তাদের দৌড়-ঝাপে আজ পৃথিবী কম্পিত। পৃথিবীতে ‘আধুনিক’ যুগের নিষ্পত্তি ‘বোধহয়’ পরকাল ছাড়া সম্ভব হবে না। কারণ যে নদী মরে গেছে, যে ঘুঘু ঝরে গেছে, তাদের জিন্দা করে তাদের গান শোনা হবে কী ফের?

বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলস্বরূপ আমরা জানতে পেরেছি, মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বিশ্বজুড়েই পরিবেশ মানুষ এবং প্রাণীর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। যে জন্য গবেষকরা বেশি দায়ী করছেন উন্নত দেশগুলোকে, যারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে যাচ্ছেতাইভাবে পরিবেশের উপর আধিপত্য দেখাচ্ছে। যার কারণে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। আর এর পেছনে মানুষের অরাজকতা, অসচেতনতা এবং লোভই সর্বাংশে দায়ী। সাম্প্রতিক গবেষণার এ গুরুত্ববহ বিষয়টি অর্থাৎ পরিবেশ ভাবনার বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় অনেক আগেই লক্ষ্য করা গেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমন উপলব্ধি ছিল বলেই তিনি ‘অরণ্য দেবতা’ প্রবন্ধে এমন মন্তব্য করেছেন,

“….মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের হাত থেকে অরণ্যসম্পদ্‌কে রক্ষা করা সর্বত্রই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। …..বিধাতা পাঠিয়েছিলেন প্রাণকে, চারিদিকে তারই আয়োজন করে রেখেছিলেন– মানুষই নিজের লোভের দ্বারা মরণের উপকরণ জুগিয়েছে। বিধাতার অভিপ্রায়কে লঙ্ঘন করেই মানুষের সমাজে আজ এত অভিসম্পাত। লুব্ধ মানুষ অরণ্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতিকে ডেকে এনেছে; বায়ুকে নির্মল করবার ভার যে গাছপালার উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে। বিধাতার যা-কিছু কল্যাণের দান, আপনার কল্যাণ বিস্মৃত হয়ে মানুষ তাকেই নষ্ট করেছে”।….

আমরা বর্তমানে আসলে কী দেখতে পাচ্ছি? আমাদের এই যে নানাবিধ জটিল রোগবালাই, পরিবেশের উষ্ণায়ণ, আবহাওয়ার বিরূপ আচরণ ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যার পেছনে কি আমরাই (মানুষেরা) দায়ী নই? আমাদের লোভই আমাদেরকে পরিবেশের সাথে অন্যায় আচরণ করতে প্রলুব্ধ করছে। এই যেমন, ক্ষতিকর জেনেও বেশি লাভের জন্য আমরাই ফলে, সবজিতে, মাছে এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনসহ নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে দিচ্ছি। কৃষি জমিতে অধিক উৎপাদনের নিমিত্তে কীটনাশক, রাসায়নিক সার প্রয়োগ করছি ইত্যাদি। ফলাফল, আজকের এই পরিবেশের বিপর্যয় বা ভারসাম্যহীনতা। যে বিষয়টি বর্তমানে পরিবেশবিদদের অত্যন্ত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিই রবীন্দ্রনাথ অনেক আগে উপলব্ধি করেছিলেন এবং সেই প্রকৃতিবাদী দর্শনচিন্তার প্রতিফলন রেখে গেছেন বিভিন্ন কাব্যে-সাহিত্যে। তাঁর ‘আত্মশক্তি’ নামক রচনায় নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি পাওয়া যায়

….আমরা লোভবশত প্রকৃতির প্রতি ব্যভিচার যেন না করি। আমাদের ধর্মে-কর্মে ভাবে-ভঙ্গিতে প্রত্যহই তাহা করিতেছি, এইজন্য আমাদের সমস্যা উত্তরোত্তর জটিল হইয়া উঠিতেছে—আমরা কেবলই অকৃতকার্য এবং ভারাক্রান্ত হইয়া পড়িতেছি। বস্তুত জটিলতা আমাদের দেশের ধর্ম নহে। উপকরণের বিরলতা, জীবনযাত্রার সরলতা আমাদের দেশের নিজস্ব—এইখানেই আমাদের বল, আমাদের প্রাণ, আমাদের প্রতিভা।…..

রবীন্দ্রনাথ ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় প্রকৃতির অপরূপ রূপের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,

…নমোনমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।
অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।…

তিনি এখানে কেবল প্রকৃতির রূপ বর্ণনা করেছেন, আমরা যদি কেবল এতটুকু উপলব্ধি করি- তবে তা অপর্যাপ্ত থেকে যাবে এজন্য যে, তিনি এখানে প্রকৃতির রূপ বর্ণনার পাশাপাশি প্রকৃতিকে মায়ের সাথে তুলনা করেছেন। যার মাধ্যমে আসলে তিনি প্রকৃতির মর্যাদা বা গুরুত্বকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর ‘বৃক্ষ’ নামক কবিতায় মানুষকে নয় বরং বৃক্ষকেই ‘মৃত্তিকার বীর সন্তান’ এবং ‘আদিপ্রাণের’ স্বীকৃতি দিয়েছেন।

“….মৃত্তিকার হে বীর সন্তান,
সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তিদান
মরুর দারুণ দুর্গ হতে; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে ;
সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে”….

পৃথিবীব্যাপী এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে। কার্বন নিঃসরণ, পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। আমরা প্রতিনিয়তই হা-পিত্যেশ করতে থাকি আমাদের নগর জীবন নিয়ে। যে উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথ আগেই করে বলেছিলেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’ তাছাড়া তিনি প্রকৃতির সমন্বয় ও ঐক্যের পক্ষে ছিলেন বলেই শহরকে উদ্দেশ্য করে বলতে পেরেছিলেন,

“…ইঁটের ‘পরে ইঁট, মাঝে মানুষ-কীট–
নাইকো ভালোবাসা, নাইকো খেলা।
কোথায় আছ তুমি কোথায় মা গো,
কেমনে ভুলে তুই আছিস হাঁগো।
উঠিলে নব শশী, ছাদের ‘পরে বসি
আর কি রূপকথা বলিবি না গো”!…

একইসঙ্গে গ্রামকে নিয়েও বলেছিলেন, “…লোকে অনেক সময়ই আমার সম্বন্ধে সমালোচনা করে ঘরগড়া মত নিয়ে। বলে, ‘উনি তো ধনী-ঘরের ছেলে। ইংরেজিতে যাকে বলে, রুপোর চামচে মুখে নিয়ে জন্মেছেন। পল্লীগ্রামের কথা উনি কী জানেন। ‘ আমি বলতে পারি, আমার থেকে কম জানেন তাঁরা যাঁরা এমন কথা বলেন। কী দিয়ে জানেন তাঁরা। অভ্যাসের জড়তার ভিতর দিয়ে জানা কি যায়? যথার্থ জানাই ভালোবাসা। কুঁড়ির মধ্যে যে কীট জন্মেছে সে জানে না ফুলকে। জানে, বাইরে থেকে যে পেয়েছে আনন্দ। আমার যে নিরন্তন ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে আমি পল্লীগ্রামকে দেখছি তাতেই তার হৃদয়ের দ্বার খুলে গিয়েছে।”

রবীন্দ্রনাথের মতন আরেক প্রকৃতি প্রেমী কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ কে তার “‘টিনটার্ন এবে’ কবিতায় দেখা যায়- ওয়ে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এর মর্মর ধ্বনি নয় বরং কান্নার ধ্বনি শুনতে পান; শিল্প বিপ্লবের যে বিষাক্ত পরিণাম ওয়ে নদী বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাই যেন বিষাদময়তায় শুনেন।

Tintern Abbey – WILLIAM WORDSWORTH

“Five years have past; five summers, with the length
Of five long winters! and again I hear
These waters, rolling from their mountain-springs
With a soft inland murmur.—Once again”…

কীটস, শেলী, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হুহটম্যান, রবার্ট ফ্রস্ট ও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতায় সচেতন বা প্রচ্ছন্নভাবে প্রকৃতি ধ্বংসের প্রতি সহমর্মিতাবোধ এসেছে। রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা নাটকে আধুনিক যন্ত্রদানবের কথা পরিষ্কারভাবে এসেছে এবং মানুষ কিভাবে বাঁধ নির্মাণ করে প্রকৃতির জলধারাকে বাগে এনে প্রকৃতির উপর অবিচার করে এতে তার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর ডাক-

ফিরে চল্‌, ফিরে চল্‌, ফিরে চল্‌ মাটির টানে–
যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে॥…

বা

“এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্নান নবধারাজলে॥
দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ, পরো দেহ ঘেরি মেঘনীল বেশ–
কাজলনয়নে, যূথীমালা গলে, এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে”॥…

রবীন্দ্রনাথ প্রথম পরিবেশ বিষয়ে নাড়া খান জাপান যাবার পথে ১৯১৪ সালে একটি জাহাজের থেকে তেল চুঁইয়ে পড়তে দেখে। আধুনিক মানুষের এই উদাসীন মনোভাব প্রকৃতিপ্রেমী রবিকে তীব্র নাড়া দেয়। এর ফলে, রবীন্দ্রনাথের অজস্র লেখায় পরিবেশ সচেতনতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়াও তার প্রবন্ধ -‘পল্লী প্রকৃতি’, ‘শহর ও নগর’, ‘বিলাসের ফাঁস’, ‘অরণ্য দেবতা’, ‘হলকর্ষণ’, ‘উপেক্ষিতা পল্লি’ , তার কবিতা ‘দুই পাখি’, ‘বসুন্ধরা,’ ‘প্রশ্ন’ ও গীত নাট্য ‘রক্তকরবী’ ও ‘মুক্তধারা’য় ও তার চিঠিপত্র ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে তাঁর গভীর পরিবেশ সচেতনতা ও তাঁর পরিবেশ ভাবনাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবার তাগিদ যোগায়। তাই“‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় কবি উদাত্তভাবে শহুরে জীবন ত্যাগ করতে আহ্বান জানান:

দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,
দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি,…

পরিবেশকে বিপর্যস্ত ও বিপন্ন হতে দেখে কবি বিচলিত হয়ে পড়েন। তাই ‘তপোবন’ প্রবন্ধে তিনি বলেন,

“…মানুষকে বেষ্টন করে এই যে জগৎপ্রকৃতি আছে, এ যে অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে মানুষের সকল চিন্তা সকল কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে। মানুষের লোকালয় যদি কেবলই একান্ত মানবময় হয়ে ওঠে, এর ফাঁকে ফাঁকে যদি প্রকৃতি কোনওমতে প্রবেশাধিকার না পায় তাহলে আমাদের চিন্তা ও কর্ম ক্রমশ কলুষিত ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে নিজের অতল-স্পর্শ আবর্জনার মধ্যে আত্মহত্যা করে মরে। এই যে প্রকৃতি আমাদের মধ্যে নিত্যনিয়ত কাজ করছে অথচ দেখাচ্ছে যেন সে বেচারা নিতান্ত একটা বাহার মাত্র, এই প্রকৃতিকে আমাদের দেশের কবিরা বেশ করে চিনে নিয়েছেন। এই প্রকৃতি মানুষের সমস্ত সুখদুঃখের মধ্যে যে অনন্তের সুরটি মিলিয়ে রাখছে সেই সুরটিকে আমাদের দেশের প্রাচীন কবিরা সর্বদাই তাঁদের কাব্যের মধ্যে বাজিয়ে রেখেছেন”।…

তাই কবি প্রকৃতির প্রতি সচেতন হয়ে ‘বৃক্ষরোপণ’ নামে গাছ লাগানোর একটি উৎসবের সূচনা করেছিলেন। ‘হলকর্ষণ’ নামে রচনা করেছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। তিনি লিখলেন-

“পৃথিবী একদিন যখন সমুদ্রস্নানের পর জীবধাত্রীরূপ ধারণ করলেন তখন তাঁর প্রথম যে প্রাণের আতিথ্যক্ষেত্র সে ছিল অরণ্যে। তাই মানুষের আদিম জীবনযাত্রা ছিল অরণ্যচররূপে। পুরাণে আমরা দেখতে পাই, এখন যে-সকল দেশ মরুভূমির মতো, প্রখর গ্রীষ্মের তাপে উত্তপ্ত, সেখানে এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্ত পর্যন্ত দণ্ডক নৈমিষ খাণ্ডব ইত্যাদি বড়ো বড়ো সুনিবিড় অরণ্য ছায়া বিস্তার করেছিল। আর্য ঔপনিবেশিকেরা প্রথম আশ্রয় পেয়েছিলেন এই-সব অরণ্যে, জীবিকা পেয়েছিলেন এরই ফলে মূলে, আর আত্মজ্ঞানের সূচনা পেয়েছিলেন এরই জনবিরল শান্তির গভীরতায়”।…

১৯২৫ সালের পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মোৎসব পালিত হয় শান্তিনিকেতনে। বৃক্ষরোপণ উপলক্ষে সেদিন কবির সদ্য রচিত গান গাওয়া হয়। যা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ সচেতনতা প্রকাশ করে দারুণভাবে:

“মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ।
ধূলিরে ধন্য করো করুণার পুণ্যে হে কোমল প্রাণ॥
মৌনী মাটির মর্মের গান কবে উঠিবে ধ্বনিয়া মর্মর তব রবে,
মাধুরী ভরিবে ফুলে ফলে পল্লবে হে মোহন প্রাণ”॥…

তার বেশ কিছু অনবদ্য প্রবন্ধে গ্রামের প্রতি অনুরাগ আর তা রক্ষার তাগিদ ফুটে উঠেছে। এইসব প্রবন্ধে তাঁর পরিবেশ সচেতনতা তাঁকে নিঃসন্দেহে পরিবেশবাদীরূপে তুলে ধরেছে। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবাদী প্রবন্ধগুলো হল: ‘পল্লী-প্রকৃতি’ ‘ভূমিলক্ষী’ ‘দেশের কাজ’ ‘শ্রীনিকেতন’ ‘পল্লী সেবা’ ও ‘উপেক্ষিতা পল্লী’ ইত্যাদি।

শিল্পায়ন, নগরায়নের নামে ফসলি জমির যে ক্ষতি হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ তা দেখে বিচলিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও তেমনিভাবে সতর্কবাণী দিয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ শত বছর আগেই পরিবেশের ক্ষীয়মাণ রুগ্ন দশা দেখে তা রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছিলেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। ‘পল্লী প্রকৃতিতে’ তিনি বিষাদের সুরে-হারিয়ে যাওয়া গ্রাম্য সৌন্দর্য আর শহর ও শিল্পের উত্থানে ব্যথিত হন। কারণ তিনি তখনি বুঝতে পারছিলেন যে এই নগরায়ন আর প্রকৃতির বিনাশ আমাদের সঙ্গে পরিবেশের যে ভারসাম্য তা একসময় আমাদের হুমকির মুখে ফেলবে।

“…বর্তমানে আমরা সভ্যতার যে প্রবণতা দেখি তাতে বোঝা যায় যে, সে ক্রমশই প্রকৃতির সহজ নিয়ম পেরিয়ে বহুদূরে চলে যাচ্ছে। মানুষের শক্তি জয়ী হয়েছে প্রকৃতির শক্তির উপরে, তাতে লুঠের মাল যা জমে উঠল তা প্রভূত। এই জয়ের ব্যাপারে প্রথম গৌরব পেল মানুষের বুদ্ধিবীর্য, কিন্তু তার পিছন-পিছন এল দুর্বাসনা। তার ক্ষুধা তৃষ্ণা স্বভাবের নিয়মের মধ্যে সন্তুষ্ট রইল না, সমাজে ক্রমশই অস্বাস্থ্যের সঞ্চার করতে লাগল, এবং স্বভাবের অতিরিক্ত উপায়ে চলেছে তার আরোগ্যের চেষ্টা। বাগানে দেখতে পাওয়া যায় কোনও কোনও গাছ ফলফুল-উৎপাদনের অতিমাত্রায় নিজের শক্তিকে নিঃশেষিত করে মারা যায়– তার অসামান্যতার অস্বাভাবিক গুরুভারই তার সর্বনাশের কারণ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিকে অতিক্রমণ কিছুদূর পর্যন্ত সয়, তার পরে আসে বিনাশের পালা। য়িহুদীদের পুরাণে বেব্‌ল্‌’-এর জয়স্তম্ভ-রচনার উল্লেখ আছে, সেই স্তম্ভ যতই অতিরিক্ত উপরে চড়ছিল ততই তার উপর লাগছিল নীচে নামাবার নিশ্চিত আকর্ষণ”…।

“…আমাদের পল্লী মগ্ন হয়েছে চিরদুঃখের অন্ধকারে। সেখান থেকে মানুষের শক্তি বিক্ষিপ্ত হয়ে চলে গেছে অন্যত্র। কৃত্রিম ব্যবস্থায় মানবসমাজের সর্বত্রই এই-যে প্রাণশোষণকারী বিদীর্ণতা এনেছে, একদিন মানুষকে এর মূল্য শোধ করতে দেউলে হতে হবে। সেই দিন নিকটে এল”…।

আজ থেকে শতবর্ষ আগেই তিনি যন্ত্রের ব্যবহার যাতে মঙ্গলময় হয় তা বলে গেছেন ‘পল্লী প্রকৃতিতে’: মানুষ যেমন একদিন হাল লাঙ্গলকে, চরকা তাঁতকে, তীর ধনুককে, চক্রবান যানবাহনকে গ্রহণ ক’রে তাকে নিজের জীবনযাত্রার অনুগত করেছিল, আধুনিক যন্ত্রকেও সেইরকম করতে হবে।’

কিন্তু এতদিন পরে এসে আমরা যা দেখছি প্রাকৃতিক শক্তির প্রাধান্য নয় বরং যান্ত্রিক শক্তির প্রাবল্যে প্রকৃতি আজ সত্যিই অসহায়। ‘অরণ্য দেবতা’ নামক প্রসিদ্ধ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন, কিভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট হল তিনি বলেন,

“এ সমস্যা আজ শুধু এখানে নয়, মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের হাত থেকে অরণ্যসম্পদকে রক্ষা করা সর্বত্রই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। … বিধাতা পাঠিয়েছিলেন প্রাণকে, চারি দিকে তারই আয়োজন করে রেখেছিলেন– মানুষই নিজের লোভের দ্বারা মরণের উপকরণ জুগিয়েছে। বিধাতার অভিপ্রায়কে লঙ্ঘন করেই মানুষের সমাজে আজ এত অভিসম্পাত। লুব্ধ মানুষ অরণ্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতিকে ডেকে এনেছে; বায়ুকে নির্মল করবার ভার যে গাছপালার উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে। বিধাতার যা-কিছু কল্যাণের দান, আপনার কল্যাণ বিস্মৃত হয়ে মানুষ তাকেই নষ্ট করেছে”।….

তাই রবীন্দ্রনাথ ‘তপোবন’ প্রবন্ধে বেদনার সঙ্গে বলেন, একসময় মানুষ আর গাছপালা একে অপরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে থাকতো তা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।

…রামের প্রতি সীতার ও সীতার প্রতি রামের প্রেম তাঁদের পরস্পর থেকে প্রতিফলিত হয়ে চারি দিকের মৃগ পক্ষীকে আচ্ছন্ন করেছিল। তাঁদের প্রেমের যোগে তাঁরা কেবল নিজেদের সঙ্গে নয়, বিশ্বলোকের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়েছিলেন। এইজন্য সীতাহরণের পর রাম সমস্ত অরণ্যকেই আপনার বিচ্ছেদবেদনার সহচর পেয়েছিলেন। সীতার অভাব কেবল রামের পক্ষে নয়– সমস্ত অরণ্যই যে সীতাকে হারিয়েছে। কারণ, রামসীতার বনবাসকালে অরণ্য একটি নূতন সম্পদ পেয়েছিল– সেটি হচ্ছে মানুষের প্রেম। সেই প্রেমে তার পল্লবঘনশ্যামলতাকে, তার ছায়াগম্ভীর গহনতার রহস্যকে, একটি চেতনার সঞ্চারে রোমাঞ্চিত করে তুলেছিল।

শেক্‌স্‌পীয়রের As you Like It নাটক একটি বনবাসকাহিনী– টেম্পেস্ট্‌ও তাই, Midsummer Nignt’s Dream ও অরণ্যের কাব্য। কিন্তু সে-সকল কাব্যে মানুষের প্রভুত্ব ও প্রবৃত্তির লীলাই একেবারে একান্ত– অরণ্যের সঙ্গে সৌহার্দ্য দেখতে পাই নে।

অরণ্যবাসের সঙ্গে মানুষের চিত্তের সামঞ্জস্যসাধন ঘটেনি। হয় তাকে জয় করবার, নয় তাকে ত্যাগ করবার চেষ্টা সর্বদাই রয়েছে; হয় বিরোধ, নয় বিরাগ, নয় ঔদ্যাসীন্য। মানুষের প্রকৃতি বিশ্বপ্রকৃতিকে ঠেলেঠুলে স্বতন্ত্র হয়ে উঠে আপনার গৌরব প্রকাশ করেছে।

মিল্‌টনের ‘প্যারাডাইস লষ্ট্‌’ কাব্যে আদি মানবদম্পতির স্বর্গারণ্যে বাস বিষয়টিই এমন যে অতি সহজেই সেই কাব্যে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির মিলনটি সরল প্রেমের সম্বন্ধে বিরাট ও মধুর হয়ে প্রকাশ পাবার কথা। কবি প্রকৃতি সৌন্দর্যের বর্ণনা করেছেন, জীবজন্তুরা সেখানে হিংসা পরিত্যাগ করে একত্রে বাস করছে তাও বলেছেন, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাদের কোনও সাত্ত্বিক সম্বন্ধ নেই। তারা মানুষের ভোগের জন্যেই বিশেষ করে সৃষ্ট, মানুষ তাদের প্রভু। এমন আভাসটি কোথাও পাই নে যে এই আদি দম্পতি প্রেমের আনন্দ-প্রাচুর্যে তরুলতা পশুপক্ষীর সেবা করেছেন, ভাবনাকে কল্পনাকে নদী গিরি অরণ্যের সঙ্গে নানা লীলায় সম্মিলিত করে তুলছেন। এই স্বর্গারণ্যের যে নিভৃত নিকুঞ্জটিতে মানবের প্রথম পিতামাতা বিশ্রাম করতেন সেখানে”Beast, bird, insect or worm dust enter none; such was their awe of man।”– অর্থাৎ পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ কেউ প্রবেশ করতে সাহস করত না, মানুষের প্রতি এমনি তাদের একটি সভয় সম্ভ্রম ছিল”।…

রবীন্দ্রনাথ নিসর্গের যে সৌন্দর্য নান্দনিকভাবে এঁকে গিয়েছিলেন তা অতুলনীয়। এখানে উচ্ছ্বাস আছে, প্রেম আছে, আধ্যাত্মবাদ আছে, উপনেষেদিক চিন্তা আছে, অজানাকে পাবার আকুতি আছে, আছে প্যান্থেয়িজম। কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের ভিতরেই যে উইলিয়াম ব্লেকের “‘সিক রোজ’ এর মতো কদর্য রূপ আছে তাও তিনি বলে গেছেন।

The Sick Rose – WILLIAM BLAKE

O Rose thou art sick.
The invisible worm,
That flies in the night
In the howling storm:

Has found out thy bed
Of crimson joy:
And his dark secret love
Does thy life destroy.

আর প্রকৃতির এই মৃতপ্রায় অবস্থার জন্যে যে দায়ী আমরা সচেতন মানুষেরা তা বুঝতে কষ্ট হয় না। কারণ মানুষ কখনওই প্রকৃতির সঙ্গে নৈতিক আচরণ করেনি। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেন:

…আমি যেভাবে প্রকৃতিকে এঁকেছি তা তার বাইরের রূপ মাত্র। এখন বাকি ভাবনাটা আপনাদের ওপর- প্রকৃতির যে কি করুণ আর বিপর্যস্ত অবস্থা!…

বনবাণীর ‘বৃক্ষবন্দনা’ পরিবেশবাদী চিন্তাবিদদের কাছে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা; কারণ গাছ রক্ষা বর্তমান পরিবেশবাদীদের কাছে অন্যতম প্রধান বিষয়। একদিকে গাছ আমরা নির্বিচারে নিধন করছি; আবার বলছি এই গাছকে রক্ষা করতে হবে আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় নেন গাছের কাছে তার সংগীতময় উৎসবে: “বৃক্ষবন্দনা”

…বাণীশূন্য ছিল একদিন
জলস্থল শূন্যতল, ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন–
শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয়,
যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয়,…

কবি ছুটে যান বৃক্ষের তলদেশে কারণ বৃক্ষ শান্তির বাণী ধরে রাখে যুগ যুগ ধরে,

…তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে
শুনিতে মৌনের মহাবানী; দুশ্চিন্তার গুরুভারে
নতশীর্ষ বিলুণ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব–
প্রাণের উদার রূপ, রসরূপ নিত্য নব নব,…

কবিতাটি আমাদের বর্তমান কালের কবি চার্লটে মিউয়ের কবিতা ‘দ্য ট্রিজ আর ডাউন’ এর কথা মনে করিয়ে দেয়।

The Trees are Down – CHARLOTTE MEW

“They are cutting down the great plane-trees at the end of the gardens.
For days there has been the grate of the saw, the swish of the branches as they fall,
The crash of the trunks, the rustle of trodden leaves,
With the ‘Whoops’ and the ‘Whoas,’ the loud common talk, the loud common laughs of the men, above it all”….

কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো গাছের নিচে শুধু সান্ত্বনা পান না বেদনাহত মনে দেখেন গাছেদের করুণ অন্তর্ধান। এই বেদনার মাঝেই তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো বৃক্ষপ্রেম রেখে যান; চার্লটের চাওয়া এই গাছ নিধন বন্ধ হোক।

‘রক্তকরবী’ নাটকটি মানুষের অপরিসীম লোভ আর প্রতীকীভাবে পুঁজিবাদের চরিত্র ফুটিয়ে তোলে। মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কতোটা অমানবিক আর দুর্বল হয়ে পড়ে রাজা মকররাজ তার উদাহরণ। রাজা মকররাজ তার ‘যক্ষপুরী’ কারাগারে মাটির তল খুঁড়ে একদল ক্রীতদাস দিয়ে সোনা আহরণে মগ্ন। রাজার এই সোনা আহরণের নেশায় প্রকৃতি হতে থাকে ক্ষতবিক্ষত। চলে প্রকৃতির প্রতি অন্যায় অবিচার। রাজার নাগপাশে বন্দী একদল লোক। খুবই লোভী রাজার লোভের আগুনে পুড়ে মরছে তার নিযুক্ত সোনার খনির শ্রমিকরা। পুঁজিবাদী সমাজের অসহায় প্রতিনিধি তারাই রাজার স্বর্ণলাভের একমাত্র মাধ্যম। পুঁজিবাদের কালো থাবা যেভাবে খনি খুঁড়ে, শিল্পায়ন আর শহরায়নের নামে প্রকৃতিকে বিদীর্ণ করছে আধুনিক কবিরাও তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।

…নন্দিনী। আমাকে তোমার কিসের দরকার।

অধ্যাপক। দরকারের কথা যদি বললে, ঐ চেয়ে দেখো। আমাদের খোদাইকরের দল পৃথিবীর বুক চিরে দরকারের-বোঝা-মাথায় কীটের মতো সুড়ঙ্গর ভিতর থেকে উপরে উঠে আসছে। এই যক্ষপুরে আমাদের যা-কিছু ধন সব ঐ ধুলোর নাড়ির ধন— সোনা। কিন্তু সুন্দরী, তুমি যে-সোনা সে তো ধুলোর নয়, সে যে আলোর। দরকারের বাঁধনে তাকে কে বাঁধবে।

নন্দিনী। বারে বারে ঐ একই কথা বল। আমাকে দেখে তোমার এত বিস্ময় কিসের অধ্যাপক।

অধ্যাপক। সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আর-এক কথা। যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো। তুমিই বা এখানকার কথা কী ভাবছ বলো দেখি।

নন্দিনী। অবাক হয়ে দেখছি, সমস্ত শহর মাটির তলাটার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে অন্ধকার হাতড়ে বেড়াচ্ছে। পাতালে সুড়ঙ্গ খুদে তোমরা যক্ষের ধন বের করে করে আনছ। সে যে অনেক যুগের মরা ধন, পৃথিবী তাকে কবর দিয়ে রেখেছিল।

অধ্যাপক। আমরা-যে সেই মরা ধনের শবসাধনা করি। তার প্রেতকে বশ করতে চাই। সোনার তালের তালবেতালকে বাঁধতে পারলে পৃথিবীকে পাব মুঠোর মধ্যে।…..

রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ একটি গীতিনাটক। ‘মুক্তধারা’ নাটকে আধুনিক যন্ত্রদানবের কথা পরিষ্কারভাবে এসেছে এবং মানুষ কীভাবে বাঁধ নির্মাণ করে প্রকৃতির জল ধারাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে প্রকৃতির উপর অবিচার করে এতে তার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। নাটকটিতে প্রতীকীভাবে একচ্ছত্র শাসকদের অপশাসন আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে চরম উদাসীনতা প্রকাশ পেয়েছে গভীরভাবে।

দূত। যন্ত্ররাজ বিভূতি, যুবরাজ আমাকে পাঠিয়ে দিলেন।

বিভূতি। কী তাঁর আদেশ?

দূত। এতকাল ধরে তুমি আমাদের মুক্তধারার ঝরনাকে বাঁধ দিয়ে বাঁধতে লেগেছ। বার বার ভেঙে গেল, কত লোক ধুলোবালি চাপা পড়ল, কত লোক বন্যায় ভেসে গেল। আজ শেষে—

বিভূতি। তাদের প্রাণ দেওয়া ব্যর্থ হয় নি। আমার বাঁধ সর্ম্পূণ হয়েছে।

দূত। শিবতরাইয়ের প্রজারা এখন এ খবর জানে না। তারা বিশ্বাস করতেই পারে না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন কোনো মানুষ তা বন্ধ করতে পারে।

বিভূতি। দেবতা তাদের কেবল জলই দিয়েছেন, আমাকে দিয়েছেন জলকে বাঁধবার শক্তি।

দূত। তারা নিশ্চিন্ত আছে, জানে না আর সপ্তাহ পরেই তাদের চাষের খেত—

বিভূতি। চাষের খেতের কথা কী বলছ?

দূত। সেই খেত শুকিয়ে মারাই কি তোমার বাঁধ বাঁধার উদ্দেশ্য ছিল না?

বিভূতি। বালি-পাথর-জলের ষড়যন্ত্র ভেদ করে মানুষের বুদ্ধি হবে জয়ী এই ছিল উদ্দেশ্য। কোন্‌ চাষির কোন্‌ ভুট্টার খেত মারা যাবে সে-কথা ভাববার সময় ছিল না।…..

মুক্তধারায় রবীন্দ্রনাথ গানের মাধ্যমে যন্ত্রের বিকটতা তুলে ধরেন- যন্ত্রকে বলেন, ‘ধ্বংসবিকট দন্ত’:

নমো যন্ত্র, নমো–যন্ত্র, নমো–যন্ত্র, নমো–যন্ত্র!
তুমি চক্রমুখরমন্দ্রিত, তুমি বজ্রবহ্নিবন্দিত,
তব বস্তুবিশ্ববক্ষোদংশ ধ্বংসবিকট দন্ত॥…

সেই যন্ত্রই আজ পৃথিবীর এ প্রান্ত্র থেকে ও প্রান্ত, ভূ-গর্ভ থেকে নদী-নালা, খাল-বিল, বন-জঙ্গল ধ্বংস করে চলছে। আর পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে। রবীন্দ্রনাথ যে সতর্কতার কথা বলে গিয়েছিলেন আগেই

রবীন্দ্রনাথ তার বিখ্যাত ‘দুই পাখি’ কবিতায়, দুটি পাখি- একটি বনের একটি খাঁচার পাখির দারুণ কথোপকথনের মাধ্যমে সভ্যতা ও প্রকৃতির মাঝে যে চিরায়ত দ্বন্দ্ব তা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। দুই পাখির খাঁচার পাখি হচ্ছে সংস্কৃতি যাকে মানুষ বন্দী করে রাখে আর নিজের মতো চালনা করে; আর এক পাখি বনের পাখি হচ্ছে মুক্ত প্রকৃতির প্রতীক; দুই পাখি একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয় কিন্তু দুই দ্বান্দ্বিক জীবন তাদের মিলনের প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখানে মানুষের দুটো বিছিন্ন রূপ কবি মনোবৈজ্ঞানিকভাবে রূপায়িত করেন। দুই পাখির দ্বন্দ্বভরা কথোপকথনে বেরিয়ে আসে খাঁচার পাখির চরম অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা। যেমনভাবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক জীবন অভ্যস্ততা প্রকৃতিকে বন্দী দাসে পরিণত করে আমাদের অস্তিত্বকে নির্জীব আর দুর্বল করে দেয় তেমনিভাবে খাঁচার পাখি বনের পাখির আকুতি ভরা আহ্বান গ্রহণ করতে পারে না। প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা যে মানুষকে কতটা কৃত্রিম করে তোলে তার প্রমাণ মেলে প্রতীকীভাবে খাঁচার পাখির কৃত্রিমতায় রূপকভাবে।

… খাঁচার পাখি বলে– বনের পাখি, আয়
খাঁচায় থাকি নিরিবিলে।’
বনের পাখি বলে– “না,
আমি শিকলে ধরা নাহি দিব।’
খাঁচার পাখি বলে– “হায়,
আমি কেমনে বনে বাহিরিব!..

অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প “‘বলাই’ পরিবেশ সচেতনতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। গাছপালা আর প্রকৃতির প্রতি বলাই এর আকর্ষণবোধ আর ভালোবাসা পরিবেশ সচেতনতার একটি অনন্য সাহিত্যকর্ম। বলাই এর পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ দেখে বলা যায়, বলাই পরিবেশ সচেতন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য চরিত্র। একটি শিমুল গাছের প্রতি বলাই এর অনুরক্ততা, রবীন্দ্রনাথ যে পরিবেশ সচেতনতার খুব প্রথম সারির দার্শনিক ছিলেন তাই প্রমাণ করে। ঘাস, লতাপাতা, গুল্মের প্রতি বলাইয়ের ভালোলাগা কারও কাছে অদ্ভুত ঠেকতে পারে কিন্তু বলাই এর কাছে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমনটা গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক প্লান্ট বায়োলোজস্টিদের কাছে ও একবিংশ শতকের পরিবেশবাদী কবিদের কাছে। কবি তাই তাঁর ছোটোগল্পে বর্ণনা করছেন,

…কেউ গাছের ফুল তোলে এইটে ওর বড়ো বাজে। আর-কারও কাছে ওর এই সংকোচের কোনও মানে নেই, এটাও সে বুঝেছে। এইজন্যে ব্যথাটা লুকোতে চেষ্টা করে। ওর বয়সের ছেলেগুলো গাছে ঢিল মেরে মেরে আমলকি পাড়ে, ও কিছু বলতে পারে না, সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। ওর সঙ্গীরা ওকে খ্যাপাবার জন্যে বাগানের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে ছড়ি দিয়ে দু পাশের গাছগুলোকে মারতে মারতে চলে, ফস্‌ ক’রে বকুলগাছের একটা ডাল ভেঙে নেয়– ওর কাঁদতে লজ্জা করে পাছে সেটাকে কেউ পাগলামি মনে করে। ওর সব-চেয়ে বিপদের দিন, যেদিন ঘাসিয়াড়া ঘাস কাটতে আসে। কেননা, ঘাসের ভিতরে ভিতরে ও প্রত্যহ দেখে দেখে বেড়িয়েছে– এতটুকু-টুকু লতা, বেগনি হল্‌দে নামহারা ফুল, অতি ছোটো ছোটো; মাঝে মাঝে কন্টিকারি গাছ, তার নীল নীল ফুলের বুকের মাঝখানটিতে ছোট্ট একটুখানি সোনার ফোঁটা; বেড়ার কাছে কাছে কোথাও-বা কালমেঘের লতা, কোথাও-বা অনন্তমূল; পাখিতে-খাওয়া নিমফলের বিচি পড়ে ছোটো ছোটো চারা বেরিয়েছে, কী সুন্দর তার পাতা– সমস্তই নিষ্ঠুর নিড়নি দিয়ে দিয়ে নিড়িয়ে ফেলা হয়। তারা বাগানের শৌখিন গাছ নয়, তাদের নালিশ শোনবার কেউ নেই।…

প্রকৃতির শক্তিকে মানুষ যে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে পৃথিবীকে ভারসাম্যহীন করে তুলছে রবীন্দ্রনাথ সে কথাও বলে গিয়েছিলেন, অথচ এ ভারসাম্যের ব্যাঘাতের জন্যই আজ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, এই জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্ব-সমস্যা। জলবায়ুর এই অসম পরিবর্তন ও বিষ-উষ্ণতা যদি না ঠেকানো যায় তবে হয়ত আর অল্প কিছু কালের মাঝেই এ ধরিত্রী বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

এমনিভাবে আজ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এতদিন পরেও রবীন্দ্র সাহিত্য আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ চাননি মানুষ প্রভু হয়ে পরিবেশকে দাস করে নিয়ন্ত্রণ করুক। রবীন্দ্রনাথ ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতি তথা মানুষের সঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্যপূর্ণ সহ-অবস্থানের কথা বলে গেছেন; যা আধুনিক যান্ত্রিক যুগে খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ এখন সেই আকুল শ্রাবণ নেই, তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে দিনে দিনে, শীতকালে হচ্ছে অকাল বৃষ্টি, শরতের সেই মনোহর রূপ আজ উধাও হতে যাচ্ছে। মানুষের অপরিসীম লোভ প্রকৃতিকে করে তুলেছে ভারসাম্যহীন। নির্বিচারে বন উজাড়, গাছ কাটা, ব্যাপকহারে নগরায়ন ও শিল্পায়ন ও এর উদ্ভূত বিরূপ উপজাত- বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন পরিবেশের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথ তার কাব্যে, গানে, প্রবন্ধে খুব সচেতন হয়ে এই কথাটি বলে গেছেন; আজ তা বুঝবার দিন এসেছে তাই বহুমুখী রবীন্দ্র-সাহিত্য এখন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে ভালোবেসেছিলেন গভীরভাবে তার সঙ্গে যেন প্রকৃতির একটা আত্মিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতির উপর মানুষের লোভী আক্রমণ আর ধ্বংসযজ্ঞ রবীন্দ্রনাথকে বিচলিত করে গভীর বেদনায়। তিনি জানতেন মানুষের প্রকৃতির উপর এই অপরিসীম লোভ আর ক্ষুধা কখনও শেষ হবে না। তাই “‘প্রশ্ন’ কবিতায় কবি সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচারের ভার রেখে যান এইভাবে:

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছ ভালো?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...