জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন— কী প্রাপ্তি?

পুণ্যব্রত গুণ

 

কীভাবে অনেক মানুষকে নিয়ে আন্দোলন করতে হয় শেখাল নীলরতন মেডিকেল কলেজের আন্দোলন৷ না, কেবল নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ নয়, শেষ অবধি পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজগুলোর জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের একটা পর্ব শেষ  হল ১৭ই জুন নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকের মধ্য দিয়ে।

আন্দোলন এত বড় হত না যদি মুখ্যমন্ত্রী এনআরএস-এর জুনিয়র ডাক্তারদের দাবি মেনে ১১ই জুন হাসপাতালে এসে প্রতিশ্রুতি দিতেন যে জুনিয়র ডাক্তারদের উপর আক্রমণকারী দুষ্কৃতীদের শাস্তি দেওয়া হবে, হাসপাতালে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি এলেন না।  আর ১১ই জুন দুপুর ১২টার মধ্যে কর্মবিরতি ছড়িয়ে পড়ল সবকটা মেডিকেল কলেজে। আউটডোর বন্ধ হল। গণ্ডগোলের জেরে বন্ধ হল কিছু ইমার্জেন্সি।

গত আড়াই বছর ধরে রাজ্যের সিনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনগুলো কর্মক্ষেত্রে হিংসার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সত্যি বলতে কী, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম নামের সংগঠনটি গড়েই উঠেছে হিংসার মোকাবেলা করতে। আমি আর ডাবলুবিডিএফ-এর সভাপতি অর্জুন দাশগুপ্ত ১১ তারিখ থেকেই প্রায় প্রতিদিন অনেকটা সময় কাটিয়েছি এনআরএস-এ। দেখেছি কীভাবে ওরা আন্দোলন করছে, কীভাবে ভাবছে। শুরুর দিনগুলোতে ওরা আমাদের জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস বা ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম হিসেবে বক্তব্য রাখতে দেয়নি। অর্জুন বক্তব্য রেখেছে ব্যক্তি হিসেবে। আমাদের চিন্তা ছিল কীভাবে ওরা আন্দোলনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মেডিকেল কলেজের এমসিডিএসএ ছাড়া অন্য কলেজে টিএমসিপির সংগঠন, নির্বাচন হয় না, সেই অর্থে কলেজভিত্তিকভাবে এরা সংগঠিতও নয়।

কী দেখলাম? সমঝোতা বৈঠকের আগের দিন সব কলেজ থেকে প্রতিনিধিরা এল, প্রত্যেক কলেজের থেকে ৫ জন করে প্রতিনিধির নাম নেওয়া হল সমঝোতা বৈঠকে প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে, প্রত্যেক কলেজ পাঁচটা করে দাবি দিল নিজ নিজ ক্ষেত্রের। তা থেকে তৈরি হল বারো দফা দাবি সনদ। আমরা অনেকেই টিভির পর্দায় বৈঠকটি দেখেছি। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল প্রত্যেককে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া আছে কে কোন বিষয় নিয়ে বলবে। ঠান্ডা মাথায় শান্তভাবে প্রত্যেকে নিজের কথাগুলো বলেছে। মুখ্যমন্ত্রী কোনও অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেননি। কথার কথা হলেও,  তিনি বাধ্য হয়েছেন সমস্যাগুলো সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিতে।

বাংলার বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের সাংবাদিক জুনিয়র ডাক্তারদের কটাক্ষ করেছেন এমন ‘বিপ্লবী’ বলে যাদের বিপ্লব মমতার কাছে এসে শান্ত হয়ে গেছে। কী হলে খুব খুশি হতেন তিনি? যদি প্রতিনিধিরা মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করত? যেমনভাবে, যে ভাষায় তিনি ডাক্তারদের আক্রমণ করেছিলেন এসএসকেএম হাসপাতালে ১৩ই জুন? তাতে আলোচনা ভেস্তে যেত। আন্দোলন চালিয়ে যেতে বাধ্য হত ডাক্তাররা, মানুষের দুর্ভোগ বাড়ত।

একত্রিশজন ছেলেমেয়ে যারা পাঁচ-ছয় দিন আগেও একে অপরকে চিনত না, তারা এক শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈন্যদলের মত যুদ্ধ জয় করে এসেছে, হোক না ছোট সে জয়।

সিনিয়র ডাক্তারদের সাতটি সংগঠন আছে জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস-এ। এই যুক্ত মঞ্চ ১২ই জুন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা আউটডোর বন্ধের আহবান করে। এর আগে দুবছর আগে ঘটে যাওয়া কিছু হিংসার ঘটনার বিরুদ্ধে ডাবলুবিডিএফ আউটডোর বন্ধের ডাক দিয়েছিল। সেবার বন্ধ হয়েছিল কেবল কিছু বেসরকারি হাসপাতালের আউটডোর। এবার কী হল? সারা রাজ্য জুড়ে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালের আউটডোর, ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বার সব বন্ধ রইল।

১১ তারিখ রাতে প্রেস কনফারেন্স, প্রেস বিজ্ঞপ্তি আর ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ-এ খবর ছড়িয়ে দেওয়া। তাতেই প্রায় ১০০% বন্ধ, এমনটা আমার ছত্রিশ বছরের চিকিৎসক জীবনে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

১২ তারিখের হরতালেও মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক হননি। উল্টে ১৩ তারিখ তিনি গেলেন এসএসকেএম -এ। হ্যাঁ এনআরএস নয়, বাড়ি থেকে নবান্ন যাওয়ার পথে তিনি এসএসকেওএম-এ গেলেন‌।

ডাক্তারদের ভয় দেখালেন চার ঘণ্টার মধ্যে কাজে যোগ না দিলে ইন্টার্নশিপ অসম্পূর্ণ  থেকে যাবে, হোস্টেল ছেড়ে দিতে হবে, কাজে যোগ দিতে বাধ্য করার জন্য এসেনশিয়াল সার্ভিসেস মেনটেনেন্স অ্যাক্ট লাগু করা হবে। তিনি বোধহয় ভুলে গেছিলেন বাংলার ডাক্তার ও মেডিকেল স্টুডেন্টদের স্বাধীনতা সংগ্রামে, স্বাধীনতা উত্তর গণআন্দোলনগুলোতে অল বেঙ্গল জুনিয়র ডাক্তার ফেডারেশনের অংশগ্রহণের ঐতিহ্যের কথা।

বলা হল ডাক্তাররা বহিরাগত। মুখ্যমন্ত্রীর কী মনে ছিল না এখন ডাক্তারিতে ভর্তি হওয়া এক অভিন্ন সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায়, যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমাদের রাজ্যের একজন অন্য রাজ্যে পড়তে যেতে পারে আর অন্য রাজ্যের কেউ আমাদের রাজ্যে পড়তে আসতে পারে? আর দেশের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার অধিকার তো সংবিধান-স্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

তিনি বললেন ডাক্তাররা পদবী দেখে চিকিৎসা করে অর্থাৎ ধর্ম অনুসারে রোগীর চিকিৎসা ভেদাভেদ করে। মুখ্যমন্ত্রী তো স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। তিনি কি জানেন না যে ডাক্তারদের শিক্ষা শেষে হিপোক্রেটিক ওথ নিয়ে পেশায় প্রবেশ করতে হয়? পৃথিবীর কোথাও ডাক্তার জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি বিচার করে চিকিৎসা করেন না, করতে পারেন না।

ফল কী হল? ইমারজেন্সি থেকে এসএসকেএমের জুনিয়র ডাক্তাররা সরে গেলেন অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এ, জিবি মিটিং করলেন, বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করলেন অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর সামনে। বিক্ষোভ প্রদর্শনে যোগ দিলেন সমস্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকরা, কর্তব্যরত নার্স ও নার্সিং স্টুডেন্টরা।

সেদিন রাতে পদত্যাগ করলেন এনআরএস-এর প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপাল। পরের দিন এসএসকেএম, মেডিকেল কলেজ, আরজিকর, ন্যাশনাল, মুর্শিদাবাদ, নর্থ বেঙ্গল, এমনকি কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ও শিক্ষক চিকিৎসকদের পদত্যাগের খবর আসতে লাগল। সংখ্যাটা পৌঁছল ৯০০-তে প্রায়।

ডাক্তারদের সংযুক্ত মঞ্চ ডাক দিয়েছিল ১১ই জুন সকাল ১১টা থেকে এনআরএস-এ বিক্ষোভ অবস্থানের আর সাড়ে চারটে থেকে এনআরএস থেকে ন্যাশনাল মিছিল। আমরা ছিলাম এগারোটা থেকেই, একজন দুজন করে সিনিয়র ডাক্তার আসছেন। মিছিল কেমন হবে বুঝতে পারছিলাম না। তিনটের সময় জনসমাগম বাড়তে শুরু করল। এনআরএস-এর মধ্যে ইমারজেন্সির সামনে জায়গা ধরছে না। সোয়া চারটে থেকে মানুষজন কে দাঁড় করানো শুরু হল হাসপাতালের বাইরে। শেষ অবধি মিছিল এমন আকার নিল যে শুরু যখন ন্যাশনালে ঢুকছে শেষ তখনও এনআরএস থেকে বেরোয়নি। সিনিয়র ডাক্তার, জুনিয়র ডাক্তার, নানা স্তরের স্বাস্থ্যকর্মী, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ কে ছিলেন না সেই মিছিলে? যাঁরা ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম গণহত্যা বিরোধী মিছিল দেখেছেন, তাঁরা আন্দাজ করতে পারবেন মিছিলের আয়তন এবং স্পিরিট সম্পর্কে।

এ মিছিল প্রমাণ করে দিল, আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে বাংলার মানুষ আছেন। প্রশাসন স্বীকার করুক আর নাই করুক, এতে তাদের উপর চাপ বাড়ল।

জুনিয়র ডাক্তারদের ঐক্য এবং অনড় আন্দোলনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এবং সিনিয়র চিকিৎসকদের ক্রমবর্ধমান সমর্থনই বোধহয় প্রশাসনকে বাধ্য করেছে সমঝোতা বৈঠকে।

জুনিয়র ডাক্তাররা বৈঠকে প্রধানত সুরক্ষার বিষয়টিই তুলে ধরেছে, কেননা তাদের আন্দোলন  ছিল সুরক্ষার দাবিতে। কিন্তু তার পাশাপাশি যেসব কারণে মানুষের চিকিৎসাকর্মীদের ওপর ক্ষোভ হয়, পরিকাঠামোর সেই অপ্রতুলতার কথাও এসেছে আলোচনায়।

এক বিছানায় চারজন রোগী, যন্ত্রপাতির অভাব, চিকিৎসাকর্মীদের অভাব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে দেরি, স্বাস্থ্যসাথীতে আউটডোর চিকিৎসার খরচ না পাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। আরও অনেক বিষয় হয়তো আসতে পারত। তা নিয়ে অনেকে বলছেন। আমার মনে হয় যতটা তারা বলতে পেরেছে তাই বা কম কী?

আমরা যারা স্বাস্থ্যের অধিকার আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক, আমাদের পরিকাঠামোর দাবিতে আন্দোলন তীব্রতর করতে হবে ভবিষ্যতে। আর সে আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে জুনিয়র ডাক্তারদেরও।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1747 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...