এক দেশ, এক নির্বাচন: সরকারের মতলব সুবিধার না

সুমন সেনগুপ্ত

 

১৭তম লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে এখনও এক মাস হয়নি। নতুন লোকসভা গঠন হওয়ার পর বেশ কিছু নতুন কথা শোনা যাচ্ছে। নতুন হয়তো নয় কিন্তু তাও নতুন লাগছে। একদিকে শোনা যাচ্ছে জয় শ্রী রাম ধ্বনি সহকারে সাংসদেরা শপথ গ্রহণ করছেন আর অন্যদিকে শোনা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি ভারতবর্ষকে আমেরিকার মতো গণতন্ত্রে উন্নীত করবেন তাই ভারতবর্ষে এবার থেকে একবারই ভোট হবে প্রতি ৫ বছর অন্তর এবং প্রতিটি রাজ্যের বিধানসভা ভোটও একইসঙ্গে হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এতে অসুবিধা কোথায়? এর মধ্যে দিয়ে তো দেশের উন্নতিই হবে। এর মধ্যে দিয়ে তো খরচ কমবে। মডেল কোড অফ কন্ডাক্টের দোহাই দিয়ে যে বিভিন্ন রাজ্যের প্রতি বছর ভোটের সময়ে উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ থাকে সেটা ৫ বছরে একবার হবে সুতরাং ‘ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’। আরও একটা যুক্তি আসছে যে এক দেশে একবার নির্বাচন হলে মানুষ সারাক্ষণ রাজনৈতিক আলোচনাতে ব্যস্ত থাকবেন না বাকি সময়টাতে তাঁরা দেশ গঠনের কাজে নামতে পারবে্ন। এই আলোচনা শুধুমাত্র এখন থেকে শুরু হয়েছে এমনটা নয়। এই আলোচনার শুরু যদি খেয়াল করা যায় বাজপেয়ির সময় থেকে। কিন্তু আবার কেন এই আলোচনা ফিরে আসছে, এর পিছনে কি অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে?

এখন বুঝে নেওয়া দরকার দেশ শব্দটার মানে কি? ভারত কি আদৌ কোনও একটি দেশ? নাকি এর কোনও অন্য ব্যাখ্যা আছে যা সকলে জানলেও মন থেকে বিশ্বাস করেন না বা বুঝতে চান না? আসলে গুজরাট থেকে অসম, কাশ্মির থেকে কেরল— ভারতের যে বৈচিত্র আছে তা সে ভাষাগত হোক বা খাদ্যাভ্যাসের বা পোশাকের বৈচিত্র— আগে সেটাকে স্বীকার করতে হবে। যখন কেরল বলে সে “ঈশ্বরের নিজস্ব দেশ” কিংবা কাশ্মির থেকে ‘স্বাধীনতার’ আওয়াজ ওঠে তখন কি এটা মেনে নেওয়া যায়? আসলে এটার মধ্যেই ভারতের শক্তি এবং দুর্বলতা নিহিত আছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পর এখনও কি আমাদের ভয় যে কোনও অঙ্গরাজ্য আমাদের থেকে আলাদা হতে চাইছে কেন? তাহলে কি সেখানকার মানুষদের আমরা আপন করে নিতে পারিনি। যাই হোক সেটা ভিন্নতর বিতর্ক। আমাদের ভাবনার বিষয় ভারত কি অখণ্ড কোনও দেশ না অনেক আলাদা আলাদা দেশের সমাহার না আরও অন্য কিছু? সত্যিটা হল ভারত নিজে একটা রাষ্ট্র যেখানে গুজরাট থেকে বাংলা আর কাশ্মির থেকে কেরল সহ অন্যান্য সমস্ত দেশ এক জায়গায় এসেছে তাঁদের নিজস্ব স্বকীয়তা বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে যাতে তাঁরা নিজেদের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে স্বাধীনভাবে। আলাদা করে স্বাধীন হতে চেয়ে নয়। ঠিক যেমন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার বিভিন্ন মাত্রার সম্পর্কের বিকাশ নিয়ে তাঁর পিতামহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন, সেইভাবে। সুতরাং ভারতবর্ষকে কখনওই কি একটি একমাত্রিক জাতীয়তাবাদ দিয়ে বা একমাত্রিক জাতীয়তাবোধ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা উচিৎ না সম্ভব?

১৯৫১ সাল থেকে ১৯৬৭ কিন্তু ভারতে নির্বাচন হত একসঙ্গেই। ১৯৫৭ সালে দেখা যায় প্রাথমিকভাবে যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেখানে বেশ কিছু সরকার বাতিলের পরে সেই একসঙ্গে ভোট বিষয়টা ৭৬ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। ১৯৬৭ সালে এটা ৬৭ শতাংশে থেকে এসে ঠেকে। ১৯৭০ সালে এই নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে বাজপেয়ির সরকারের সময় লালকৃষ্ণ আদবানি আবার এই প্রস্তাবকে সামনে আনেন।

যে যুক্তিগুলো সাজানো হচ্ছে এক দেশ এক নির্বাচনের স্বপক্ষে:

  1. সরকারি খরচ কমানো সম্ভব হবে কারণ নির্বাচন কমিশনের হাতে এমনিতেও লোক কম। ফলে একদিকে খরচও কমবে, সময়ও বাঁচবে।
  2. অভিন্ন নির্বাচনী বিধি লাগু হয় প্রতিটি নির্বাচনের সময়ে যার ফলে উন্নয়নের কাজ থমকে থাকে।
  3. প্রতিটি রাজনৈতিক দল যেন জনগণের কাছে তাঁদের খরচ সংক্রান্ত বিষয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।

এবার আসা যাক উল্টোদিকের যুক্তিতে:

  1. ভারতের যে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আছে তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলাটাই উদ্দেশ্য। এক দেশ এক নির্বাচন হলে কেন্দ্র শক্তিশালী হবে আর অঙ্গরাজ্যগুলো ক্রমে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে। জিএসটির মধ্যে দিয়ে এই কাজটি শুরু হয়েছে।
  2. নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মী কম এই অজুহাতে একসঙ্গে নির্বাচন করানো যায় না কারণ আলাদা নির্বাচন হলেও যতজন কর্মী লাগবে একসঙ্গে নির্বাচন হলেও সমসংখ্যক কর্মী লাগবে।
  3. বলা হচ্ছে যে খরচ কমবে কিন্তু যদি গত লোকসভা নির্বাচনের দিকে খেয়াল করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে যারা এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে তারাই সবচেয়ে উঁচু গলায় এই বিষয়ে আওয়াজ তুলছে। সরকারি খরচ কম হলেও ঘুরিয়ে যা আকাশছোঁয়া খরচ কিছু কিছু দল করেছে তা দেখিয়ে দেয় এই খরচ কমানোর বিষয়টির কোনও অর্থই নেই। একদিকে খরচ কমানো আর অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর খরচ বেড়ে যাওয়া এই দুটোর মধ্যে কোনও সামঞ্জস্যই নেই। ছোট দলগুলো কিছুতেই বড় জাতীয় দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠবে না।
  4. ১৯৮৯ সাল থেকে এ বছরেও এক সঙ্গে নির্বাচন হয়েছে বেশ কিছু রাজ্যে। দেখা গেছে যে ২০১৪ অবধি অন্তত ৩১ বারের মধ্যে ২৪ বার ভোটারেরা কেন্দ্রে যাকে ভোট দিয়েছেন রাজ্যেও একই দলকে ভোট দিয়েছেন অথচ বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী ইস্যু কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই ভিন্ন থাকে। যদি কোনও রাজ্যে গণতন্ত্র হয় তো কোনও রাজ্যে দুর্নীতি হতে পারে। যদি কখনও কেন্দ্রের নির্বাচনী ইস্যু দুর্নীতি হয় একটি অঙ্গরাজ্যে সেটা নাও হতে পারে। ফলে একসঙ্গে ভোট হলে ভোটারেরা একরকম করে ভাবতে বাধ্য হবেন।
  5. যেহেতু এই মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কোনও দৃশ্যমান বিকল্প চোখে পড়ছে না এবং ঘটনাচক্রে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলটি শুধুমাত্র তাঁর ক্যারিশমার ওপর নির্ভরশীল সুতরাং তাঁর পক্ষেও একসঙ্গে নির্বাচন হলে সুবিধা হবে। কর্মসংস্থানের মতো বিষয়কে পিছনে ফেলে জাতীয়তাবোধের মতো কোনও উত্তেজনাকর ট্যাবলেট খাইয়ে পুরো দেশকে নিজের কব্জায় নিয়ে আসাটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
  6. অভিন্ন নির্বাচনী বিধিকে অনেক সময়েই সরকারের তরফ থেকে আবেদন করে চলমান কাজকে চালু রাখা যায়।
  7. এমনিতেই শোনা যায় যে নির্বাচন হয়ে গেলে জনপ্রতিনিধিদের আর ৫ বছরে দেখা মেলে না। সুতরাং একসঙ্গে নির্বাচন না করে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন হলে কখনও লোকসভা কখনও বিধানসভার ভোটের প্রচারের জন্য হলেও জনপ্রতিনিধিদের আবার এলাকায় আসতে হবে সেটা দিয়েই তিনি নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে দায়বদ্ধ হবেন।

 

উপসংহারের পরিবর্তে:

আসলে এই ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ করার মধ্যে দিয়ে ভারতের গণতন্ত্রের যে মাধুর্য তাকে ভেঙে আমেরিকার মতো প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে যার মধ্যে দিয়ে আমাদের এই যে বহুদলীয় গণতন্ত্র সেটাই ধ্বংস করা হবে। কিন্তু আরও কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যেমন যদি দেখা যায় কেন্দ্রে কোনও দল সংখ্যাগরিষঠতা পাচ্ছে না তখন কী হবে? নাকি কোনওভাবে আপাতত কেন্দ্রের শাসকদল এটা বুঝতে পেরেছে যে তাঁরা যেভাবে ইভিএমকে এবং নির্বাচন কমিশনকে করায়ত্ত করেছেন আগামী ১০ বছরেও তাঁদের কেউ হারাতে পারবেন না। প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার— যার আমলে ৩২ কোটি আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযুক্তিকরণ হয়েছিল সেই ও পি রাওয়াত এই একসঙ্গে নির্বাচন করার অন্যতম প্রবক্তা। নাকি এবার আধার, যার কোনও বৈধতাই নেই, যেটা নিজেই কোনও পরিচয়পত্র নয়, তার সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযুক্তিকরণটা বাধ্যতামূলক করা হবে যার মধ্যে দিয়ে আর কখনওই এই বিজেপির মতো শক্তিকে হারানো সম্ভব হবে না? প্রাক্তন বিচারপতি কিছুদিন আগে একটি ইংরেজি দৈনিকে লিখেছিলেন যে ৫৮ কোটি ভুয়ো আধার হয়তো আছে কারণ আজ অবধি যত আধার আছে তার মধ্যে এই সংখ্যক আধার এখনও অবধি কোথাও কোনও দিন ব্যবহৃত হয়নি। তাহলে সেই আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ড যুক্ত করার মধ্যে দিয়ে এবং পাশাপাশি এক দেশ এক নির্বাচন করতে পারলেই সব সমস্যার ইতি ঘটানো হবে। কারণ ভারতবর্ষের নির্বাচকমণ্ডলীকে যদি শুধুমাত্র একটা সংখ্যায় পরিণত করে দেওয়া যায় তাহলে এই স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী সরকারকে কি কখনও পরাজিত করা সম্ভব হবে? এর থেকে কি ভালো হত না ভারতের নির্বাচনে যে এফপিটিপি পদ্ধতিতে হয় তার বিপরীতে অন্য কোনও ব্যবস্থাকে আনার? কী সেই পদ্ধতি? রিপ্রেজেন্টেটিভ পদ্ধতি বা চয়েস বেসড পদ্ধতি। এতে কীভাবে ভোট হয়? প্রত্যেকটি ভোটার তাঁর নিজস্ব পছন্দমতো প্রার্থীকে ১ থেকে ১০ অবধি (যদি ১০ জন প্রার্থী থাকেন) নম্বর দেবেন পছন্দ অনুযায়ী। সেই প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ভোট গোণা হবে। যে প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোটের বেশি পাবেন তাঁকে জয়ী ঘোষণা করা হবে। যদিও এই পদ্ধতিতেই জার্মানিতে হিটলার ক্ষমতায় এসেছিলেন তাও ভারতের মতো দেশে যেখানে মাল্টি পার্টি বা অনেক দলের রাজনীতি চলে সেখানে এই পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করাটা কি বাঞ্ছনীয় নয়? যদিও এই ক্ষেত্রে ভোট গণনার কাজটা যথেষ্ট জটিল হয়ে যায়। কিন্তু ভারতের মতো বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থাকে আগে টিকিয়ে রাখার জন্য এটা কি উচিৎ ছিল না যে এফপিটিপির বদলে রিপ্রেজেন্টেটিভ পদ্ধতি চালু করার?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...