ইভিএম রহস্য

আশিস সেনগুপ্ত

 

আমাদের দেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় এখন সম্ভবত বৈদ্যুতিন ভোটগণক যন্ত্র বা ইভিএম (Electoral Voting Machine)। মজার বিষয় হল, যে দল যখন বিরোধী শিবিরে থাকে, তখন তারাই কারচুপির অভিযোগে সরব হয়, আবার সরকারে এলেই, তারা শুধু নীরব হয়ে যায় তাই নয়, বিপক্ষকে কটাক্ষ করতেও ছাড়ে না। ২০১৪র আগে বর্তমানে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রবক্তারা কঠোর ভাষায় ইভিএম ষড়যন্ত্রের সমালোচনা করতেন। এদেরই একজন বিশেষজ্ঞ, তার নাম জি ভি এল নরসিংহ, ২০১০এ একটি তথ্যসমৃদ্ধ বই প্রকাশ করেছিলেন, “Democracy at Risk, Can We Trust EVMs?[1]” এটিতে তিনি বিশদ কারিগরি (Technological) ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছিলেন এই মেশিনের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য বিপদগুলি। বইটি কিন্তু সুলিখিত এবং এটি নিয়ে এক সময় অনেক চর্চাও হয়েছে। আশ্চর্য, আজ সেই বক্তারাও চুপ, বইটিও বিস্মৃত। এখন আবার অন্য পক্ষ সরব, আর স্বভাবতই, নির্বাচন কমিশন মেশিনের পক্ষ সমর্থনে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ।

বিতর্কের সুত্রপাত যদিও আগেই, তবে তা পুষ্ট হয়েছে মূলত ২০১৪র পরে। এই সময় থেকে ইভিএমকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মূলে রয়েছে কিছু  ফলাফল, যেগুলো সাধারণ বুদ্ধিতে ধাঁধা সৃষ্টি করেছে। একটু বিশদে যাওয়া যেতে পারে। ২০১৪তে মোদি সরকার ক্ষমতায় এল অনেক প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু ২০১৫ ও ১৬তে পরপর দিল্লি ও বিহারে দেখা গেল, বিজেপি ব্যর্থ। ২০১৬র শেষদিকে কালো টাকার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে নোট বাতিল হল। সাধারণ মানুষ, গ্রামীণ জনতা ও শহরের অসংগঠিত শ্রমিক কপর্দকশূন্য হয়ে গেলেন। অর্থনীতির চাকা বসে গেল। অগণিত শ্রমিক জীবিকাচ্যুত হলেন। গরীব জনতার ক্ষোভ তখন তুঙ্গে। ঠিক এর পর ২০১৭র গোড়ায় উত্তর প্রদেশের বিধানসভা ভোটে দেখা গেল কালো টাকার রমরমা (তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার স্বয়ং প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন), আর ভোটারাই অবাক হয়ে গেল ভোটের ফলে, মোদির দল অবিশ্বাস্য জয় হাসিল করল। এর পরেই, হায়দ্রাবাদের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হরিপ্রসাদ কোনও বাইরের ডিভাইসের সাহায্য ছাড়াই শুধু ভিতরে কন্ট্রোল প্যানেলে ম্যালওয়্যার ইনস্টল করে কীভাবে রেজাল্টকে পরিবর্তন করা সম্ভব, সেটা হাতেকলমে করে দেখিয়েছিলেন। তার এই টেকনিকাল চ্যালেঞ্জটির কিন্তু নির্বাচন কমিশন জবাব দেয়নি বা ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করার পাল্টা কোনও পাবলিক ডেমো দেয়নি। উল্টে মেশিন চুরির দায়ে ফাঁসিয়ে তাকে হয়রান করেছে।

ধাঁধার জট আরও পাকিয়েছে কতগুলো ঘটনা থেকে। ২০১৪তে মহারাষ্ট্রের বিজেপি মন্ত্রী গোপীনাথ মুন্ডে সদর্পে দাবী করেছিলেন, ইভিএমকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, সেটা তার দলের জানা আছে। এটা নিয়ে হৈ চৈ শুরু হওয়া মাত্রই তিনি অস্বীকারও করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পথ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হল। তারপর ধরা যাক, ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন কেন্দ্রে ৩০টি উপনির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে ২৬টিতে অবিজেপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বিগত লোকসভা নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত গোবলয়ের তিনটি (রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়) এবং দক্ষিণের কর্নাটকে অবিজেপি সরকার অধিষ্ঠিত হয়েছে। লোকসভা ভোটের পূর্বে সব সমীক্ষাতেই তাবড় বিশেষজ্ঞরা হাং পার্লামেন্টের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, অর্থাৎ কোনও দল বা জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। অথচ দেড় মাস ব্যাপী ভোটপ্রক্রিয়ার শেষ ওভারে ধুন্ধুমার ব্যাটিং করে খেলা ঘুরিয়ে দিল এক্সিট পোল। ২৩শে ফলপ্রকাশের পর সারা দেশ জুড়ে দেখা গেল জনজীবনে এক অভুতপূর্ব হতচকিত নীরবতা। ইভিএমকে ঘিরে এত বাদানুবাদের মূলেই কিন্তু আছে, ফলাফলের এই খামখেয়ালিপনা, আপাতবিরোধী, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী আচরণ। কাজেই ভিত্তিহীন অভিযোগ ও সন্দেহ উদ্রেককারী ঘটনাপঞ্জী দুটোরই অবসান দরকার। কিন্তু এ পর্যন্ত এরকম উদ্যোগ, যেটা নির্বাচনের কমিশনের তরফেই আসা উচিত ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু সেরকম কিছু নজরে আসেনি জনগণের।

নির্বাচন কমিশন অথবা অন্য ইভিএম সমর্থকদের বক্তব্য হল, ইভিএম অভ্রান্ত ও ত্রুটিহীন। এটি একটি পরিভাষায় যাকে বলে, স্বয়ংসিদ্ধ (Stand Alone) কম্পিউটার, যেটি কোনও নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে না, এবং এর ভিতরে কোনও ব্লু টুথ বা অনুরূপ কিছু নেই যা দিয়ে এটার ভিতরে প্রোথিত সফটওয়ারকে প্রভাবিত করা যেতে পারে। এই সফটওয়ারে যে প্রোগ্রাম দেওয়া থাকে সেটা একবারই প্রোগ্রাম করা যায়, কোনও পরিবর্তন বাইরে থেকে ঘটানো সম্ভব নয়। সবাই দেখেছেন যে ইভিএমের তিনটি অংশ। ভোটার যেটার বোতাম টিপে ভোট দেন, সেটা ইনপুট ডিভাইস। সেটা তারে সংযুক্ত। আর পোলিং অফিসারের কাছে যে তারে সংযুক্ত ইউনিট থাকে সেটা শুধু চাবি ঘুরিয়ে চালু করা ও স্থগিত করার কাজে লাগে। এহেন আধুনিক, নিরাপদ ও কাগজবিহীন প্রযুক্তি ছেড়ে অন্য কিছু গ্রহণ করা বা ব্যালটের যুগে ফিরে যাওয়ার কোনও যুক্তি নেই।

এবার দেখতে হবে ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ যারা করেন, তারা ঠিক কী বলেন। অভিযোগ হল দেখা গেছে ভোটার যে বোতামই টিপুন ভোট অন্যত্র বা একই জায়গায় চলে যাচ্ছে। মহারাষ্ট্রে সব দলের প্রতিনিধিদের সামনে মহড়া দেবার সময় এইরকমই অভিজ্ঞতা হয়েছিল সবার। অথবা আর একটি অভিযোগ হল মূল যে যন্ত্র যেখানে প্রদত্ত ভোট পঞ্জীকৃত (Register) হয় ও সঞ্চিত (Store) থাকে, সেখানেই ফলাফলের বোতাম টিপলে যেটা দৃশ্যমান হয় (Diplay) সেটা খুশিমত পরিবর্তন করে দেখানো যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের মতে এরকম দ্বিচারিতা মেশিন করতেই পারে না, কারণ ভেতরে Micro controller-এ যে সফটওয়ার প্রোথিত সেটা একবারই প্রোগ্রাম করার যোগ্য বা One Time Programmable (OTP)। বিতর্ক এই দাবী নিয়েই। ইঞ্জিনিয়ার হরিপ্রসাদ সেটাই হাতেকলমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে ভিতরের সফটওয়ার OTP— এটার কোনও প্রমাণ নেই।

পূর্বোক্ত জি এল নরসিংহের বই, আর সাম্প্রতিক কালে ভেঙ্কটেশ নায়েক নামে একজন তথ্যের অধিকার বিধি অ্যাক্টিভিস্ট আরটিআই আবেদনের ভিত্তিতে যা জেনেছেন, তার ভিত্তিতে এই অভ্রান্ততা ও OTP তত্ত্বের সারবত্তাকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই ভেঙ্কটেশ নায়েক আবার Commonwealth Human Rights Initiative (CHI)-এরও সদস্য। তার বয়ান থেকে যা জানা যাচ্ছে সেটা অস্বস্তিকর।

এই যে বলা হচ্ছে ইভিএমের ভিতরে যে প্রোগ্রাম সিলিকন চিপে প্রোথিত (installed) আছে সেটা “One Time Programmable” (OTP), এই যুক্তির সমর্থনে নির্বাচন কমিশন বা বিইএল কিংবা ইসিআইএল কেউ কোনও প্রযুক্তিগতভাবে উপযুক্ত (Technologically Sound) তথ্যপ্রমাণ দেয়নি বা দেওয়ার প্রয়োজন বিবেচনা করেনি। যদিও ইসিআইএল বলছে যে প্রোগ্রাম OTP, কিন্তু ভেঙ্কটেশ নায়েক নেদারল্যান্ডের NXP-র ওয়েবসাইট  থেকে উদ্ধৃত করে দেখাচ্ছেন, এটার মধ্যে তিন রকম Memory আছে বা থাকতে পারে— ১) Static Random Access Memory, ২) FLASH Memory বা ৩) Electronically Erasable Programmable Read Only Memory (EEPROM বা E2PROM)। কী আছে বা কী নেই, তা জোরের সঙ্গে কেউ প্রতিষ্ঠা করছে না, বা করার মত বিশদ কারিগরি তথ্য (Detail Technical Data) কারও কাছেই নেই এদেশে, এমনও হতে পারে। এটা তো জানাই আছে যে মেশিন বা সফটওয়ার কোনওটাই আমাদের নয়। বিইএল বা ইসিআইএল শুধু অ্যাসেম্বলিং করে ও কার্যকারিতা নির্দিষ্ট (Define) করে, তার বেশি নয়। ভারতে যে মেশিনগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর হার্ডওয়ার ও সফটওয়ার সরবরাহ করেছে বা করছে কারা, এ খবরও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার স্বার্থে, ভারতীয় সরবাহকারী সংস্থাগুলো জনসমক্ষে জানাতে চাইছে না। যদিও দুনিয়াতে নেদারল্যান্ডের NXP-ই এটা দেয়, এছাড়া বাজারে কেউ নেই, এটা কোনও গোপন বিষয় নয়। ত্রিশটি দেশে এদের অফিস আছে।

অমীমাংসিত বিষয়গুলো হল এইরকম:

  1. ১৯৯০ থেকে শুরু করে, যতগুলো কারিগরি মূল্যায়ন (Technical Evaluation) রিপোর্ট আছে, সেগুলো জনসমক্ষে আনা হয়নি আজও।
  2. ২০১৪তে মুম্বাই হাইকোর্টের নির্দেশে Central Forensic Science Laboratory (CFSL) ইভিএম-এর ফরেন্সিক পরীক্ষা করেছিল। তার রিপোর্ট গোপন রাখা হয়েছে। এই রিপোর্ট কোর্টের কাছে নির্বাচন কমিশন দাখিল করেছিল মুখবন্ধ খামে।
  3. কোন সংস্থা এই ইভিএম তৈরি করেছে, এর প্রোগাম সফটওয়ার কোন সংস্থা প্রস্তুত করেছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই। কারণ এ বিষয়ে অনাবশ্যক ঢাক ঢাক গুড় গুড় করা হচ্ছে। আরে বাবা, এটা তো কোনও সামরিক গোপনীয় বস্তু নয়। নির্বাচন কমিশন তথ্যের অধিকার আইনের আবেদনও অগ্রাহ্য করছে বাণিজ্যিক গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে।
  4. প্রোগ্রামের Source Code কার কাছে, কে তার মালিক, দেশবাসী জানে না, যদিও তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে এরই দ্বারা। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই নাম গোপন রাখলেও NXP-র ওয়েবসাইটে কারিগরি বিবরণ (Tecnical Details) পর্যালোচনা করে ভেঙ্কটেশ নায়েক প্রমাণ করেছেন, ইভিএমের প্রোগ্রাম One Time Programme (OTP) বলে দাবী করা হলেও, বাস্তবে তাতে Flash Memory আছে, যার দ্বারা সংরক্ষিত (Stored) ডেটা অপরিবর্তিত রেখে রেজাল্ট ডিসপ্লে অন্যরকম করে দেওয়া সম্ভব।
  5. ২০১৩তে নির্বাচন কমিশনের Technical Evaluation Committee সুপারিশ করেছিল মাইক্রো চিপের মধ্যেই Source Code লিখে দেবার জন্য যাতে বিতর্ক কমানো যায়। সে সুপারিশ কার্যকর হয়নি। নির্বাচন কমিশন আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দিয়েছে যে সোর্স কোড টেস্টিং করানো হয়েছে, ভারত সরকারেরই ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরের অধীন STQC নামক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। কিন্তু সে রিপোর্ট এত বিশালাকার যে জনসমক্ষে প্রকশের উপযুক্ত নয়। বিইএল, Intellectual Property Right অজুহাতে RTI আইনের 8(1)(d) ধারায় আবেদন অগ্রাহ্য করেছে। ইলেকট্রনিক্স কর্পোরেশন (ইসিআইএল) আবার একে ‘জাতীয় স্বার্থে’ ‘Classified’ বা গোপনীয় ঘোষণা করে তথ্যের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।
  6. একটি আমরিকার ও অন্যটি জাপানের দুটি সংস্থার কাছ থেকে মাইক্রোচিপ আসে, যাতে NXPর করা প্রোগ্রাম হয় Masked অথবা OTP ROM রূপে থাকে। এখানে বিইএল বা ইসিআইএল-এর ভূমিকা হল সেটাকে মাইক্রো কন্ট্রোলারের ভিতরে ফিউজ (FUSE) করা, তার বেশি কিছু নয়। অধ্যাপক পি ভি ইন্দরেসান হলেন নির্বাচন কমিশনের বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান। এনার শংসাপত্র (Certificate) অনুসারেই বর্তমানে ব্যবহৃত ইভিএম ছাড়পত্র পেয়েছে। তা তথ্যের অধিকার আইনে করা আবেদনের জবাব থেকে জানা গেছে যে তাঁরা (অধ্যাপক ইন্দরেসান এবং তাঁর সহকর্মীরা) কেবল ব্ল্যাক বক্স টেস্টিং (Black Box Testing)-এর ভিত্তিতে কাজ করেছেন। অর্থাৎ কার্যকারিতার বিষয়ে (Functionality Test) সন্তুষ্ট হয়ে শংসাপত্র জারি করেছেন। সোর্স কোডের বিষয়ে, অর্থাৎ সফটওয়ারে কোনও ম্যালওয়ার আছে কিনা, বা কোনও ট্রোজান সফটওয়ার (Trojan Software) আছে কিনা, যা পরে অটো ট্রিগার হয়ে ডিসপ্লে বদলে দিতে পারে, সেসব পরীক্ষার সুযোগ তাঁদের ছিল না।

আমি এখানে সমস্ত বিষয়টি সংক্ষেপে ও সহজভাবে পেশ করার চেষ্টা করলাম। পাঠক যদি আরও বিশদ তথ্যসম্বলিত বিশ্লেষণে আগ্রহী হন, তবে শ্রীমতী বিনীতা দেশমুখের ওয়েবপেজ[2] দেখার অনুরোধ করব। শ্রীমতী দেশমুখ পুনেনিবাসী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নির্ভীক সংবাদিকতার জন্য বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত, এখনও একজন সফল অধিকার কর্মী হিসাবে উচ্চ প্রশংসিত।

এই প্রযুক্তিগত দিক ছাড়াও, নির্বাচন কমিশনের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তও ইভিএমের অভ্রান্ততার তত্ত্বকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। একবার ভোটপর্ব মিটে যাবার পর, ব্যবহৃত মেশিনগুলো সাধারণত জেলা সদরে বা অন্য কোথাও গুদামজাত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরেরবার যখন কয়েক মাস/বছর পর আবার গুদাম খোলা হয়, বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় সিসি ক্যামেরার সমস্যা হয়েছে। হয় খারাপ নয়ত মেরামতে গেছে। এইবার পরের ভোটের জন্য মেশিনগুলোতে আবার ব্যাটারি চার্জ দিতে হয়। তারপর সেগুলো চলছে কিনা দেখা হবে, চালু করার চেষ্টা করতে হবে। দরকারে মেরামত করতে হবে, না হলে বাতিল করতে হবে। যেগুলো ঠিক আছে সেগুলো ব্যবহারযোগ্য বলে সার্টিফিকেট দিতে হয় বিইএল বা ইসিআইএল-কে। এই দুই সংস্থা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ করে পুরোপুরি বাইরের লোক দিয়ে আউটসোর্সিং করে। এই পুরো কাজটার শেষে এত মেশিনের কোনও টেকনিকাল অডিট হয় না, বোধহয় সম্ভবও না। সুতরাং যে কোনও স্তরে যে কোনও কারচুপির সম্ভাবনা থেকেই যায়।

শেষে রইল ভিভিপ্যাট মেলানোর বিষয়। প্রথমে নির্বাচন কমিশন সব বুথে ভিভিপ্যাট দিতেই চায়নি তারপর চাপের মুখে রাজী হল। এবার বিরোধীদের ৫০% মেলানোর দাবী প্রত্যাখ্যাত হল। নমুনা হিসাবে মাত্র ৫% স্লিপ গোনার ক্ষেত্রেও বিরোধীরা চাইলেন আগে ভিভিপ্যাট পরে মেশিন গোনা হোক। সেটাও অগ্রাহ্য হল। ইভিএমে একতরফা ফল বেরোনোর পর, কোনও পার্টির এজেন্টই আর নমুনা গণনার জন্য অপেক্ষা করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। হলও তাই। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ভিভিপ্যাট গোনা হল, আর শেষে কোনও অসঙ্গতিই নেই জানা গেল। শুধু নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে কেন্দ্র পিছু প্রার্থীতালিকাভিত্তিক ফলে দেখা গেল, অনেক জায়গাতেই, বিশেষত বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থীদের মোট প্রাপ্ত ভোটের যোগফল, মোট নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যার চেয়ে বেশি। অসঙ্গতি নজরে আনামাত্রই পুরোটাই গায়েব হঠাৎ!

২০১৭র উত্তরপ্রদেশের ভোটে অবিশ্বাস্য ফলের পর, ইভিএম কারচুপির আভিযোগ জোরালো হল। তখন নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানাল প্রমাণ করার জন্য। দুবার হ্যাকাথনের তারিখ বদলাবার পর জানা গেল, যে মেশিনগুলো এতদিন পরে ইউপি নির্বাচনে ব্যবহৃত বলে হাজির করা হবে সেটাই চূড়ান্ত। আর মেশিনে হাত দেওয়া যাবে না, সফটওয়ার পরীক্ষা করা মাইক্রো কন্ট্রোল ইউনিট ছোঁয়া যাবে না। এই শর্তে হেনস্থা হতে কেউ যায়নি। সেটাই কমিশনের বিজয় আর ইভিএম সন্দেহকারীদের পরাজয় বলে প্রচার পেল।[3]

এর পরে আবার এই লোকসভা নির্বাচনে হাইকোর্টের রায় ও RTI জবাব থেকে জানা গেছে, যে যত সংখ্যক মেশিন বিইএল (Bharat Electronics Limited) ও ইসিআইএল (Electronics Corporation of India Limited) সরবরাহ করেছে, তার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের জিম্মায় থাকা মেশিনের সংখ্যায় ফারাক আছে। কেন? কোনও ব্যাখ্যা নেই! দেড়মাস ব্যাপী নির্বাচন চলাকালীন দেশবাসী দেখল যত্র তত্র মেশিনের ছড়াছড়ি, ট্রাকভর্তি মেশিনের রহস্যজনক চলাচল। কমিশন অবশ্যই সব অভিযোগ নস্যাৎ করেছে। ভোটের আগে এও শোনা গিয়েছিল স্ট্রংরুম থেকে ইভিএম বহনকারী যানে জিপিএস ট্র্যাকিং থাকবে। পরে জানা গেছে, এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য কমিশনের কাছে নেই।

উপসংহারে পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার যে এই প্রবন্ধের বিষয় কিন্তু এটা প্রমাণ করা নয় যে সব অভিপ্রেত বা অনভিপ্রেত ফলাফল ইভিএম কারচুপি প্রসূত, সেটা কখনওই দাবী করা যাবে না ততক্ষণ যতক্ষণ সেই কারচুপি প্রমাণিত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, ইভিএম নিয়ে যাবতীয় বিতণ্ডা কিন্তু অভিযোগ, পাল্টা আক্রমণ, উত্তপ্ত বিতর্ক, ইত্যাদির স্তরেই সীমাবদ্ধ আছে। এই সমস্ত হাতেকলমে পরীক্ষা করা বা প্রমাণ করা যায়নি, সে সুযোগও দেওয়া হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও বাস্তব প্রমাণ (Concrete Proof) জনসমক্ষে কেউ হাজির করতে না পারছেন, ততক্ষণ বিতর্ক চললেও, ইভিএমকে অভিযুক্ত হিসাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গেলেও, দণ্ডাদেশ উচ্চারণ করা যাবে না, কারণ, তা বিপজ্জনক। তবে অতি সম্প্রতি ইভিএমের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মুম্বইতে ‘বয়কট ইভিএম, বয়কট ইলেকশন’[4] বলে একটি প্রকাশ্য সম্মেলন হয়ে গেল, যেখান থেকে ইভিএমের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গণআন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।

আমাদের গণতন্ত্রের প্রধানতম প্রতীকই যেখানে নির্বাচন, তখন নির্বাচন কমিশনের এগুলিতে কর্ণপাত করা উচিত অবশ্যই।

 

টীকা:

[1] https://www.indianevm.com/book_democracy_at_risk_2010.pdf

[2] https://www.moneylife.in/article/election-commissions-claim-that-micro-controller-of-evms-is-one-time-programmed-may-be-far-from-truth-reveals-rti/57358.html

[3] https://www.huffingtonpost.in/ankit-lal/dear-election-commission-here-s-why-your-evm-hackathon-is-a-j_a_22108571/

[4] https://www.thehindu.com/news/cities/mumbai/anti-evm-forum-calls-for-election-boycott/article27892343.ece

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...