অলীক সুনাট্য রঙ্গে

নিরুপম চক্রবর্তী

 

১। নেপথ্যকাহিনী

আমাকে গণ্ডার বিষয়ক একটি রচনা লিখিবার বায়না দিয়াছেন চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের একজন বকায়েত ইষ্টিশন মাস্টার। সংবাদে প্রকাশ ইদানীং কোনও প্রতিবেশী প্রদেশে গণ্ডারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে। তাঁহার ভ্রাতা যেহেতু সেই প্রদেশের বাসিন্দা, সঙ্গত কারণেই মাস্টার মহোদয় যৎপরোনাস্তি বিচলিত। পরন্তু কেন্দ্রীয় অরণ্যবিভাগের বক্তব্য অনুসারে, অনতিবিলম্বে এইসকল গণ্ডারের পাল পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটিকে বাসস্থান হিসাবে ঘোষণা করিতে পারে। মাস্টার মহাশয় বাল্যকালে কোন এক চিড়িয়াখানায় একটি গণ্ডার দেখিয়াছিলেন, সেই স্মৃতি অদ্যাবধি তাঁহার জাগরণে দুঃস্বপ্ন আনয়ন করে। গণ্ডার-লাঞ্ছিত স্বদেশ তাঁহার নিকট পরবাস সম। কোনও অজানা কারণে আমার নিকটে তিনি এই প্রসঙ্গে তথ্য সংগ্রহ করিতে চাহেন। আমি মেহেরবান প্রাণ: তাঁহাকে ফিরাইতে পারি নাই, অতএব এই গণ্ডার পরিচিতি রচিতেছি। হে পাঠক, মম সুমধুর বাণী শ্রবণ কর।

গণ্ডার বিষয়ক তথ্যসমৃদ্ধ মাত্র একটি কিতাবই আমি আজতক পাঠ করিয়াছি, তাহা অবশ্য রচা কথা, গণ্ডার বিষয়ক একটি নাট্য উপস্থাপনা। লেখকের নাম ইউজিন ইওনেস্কো, জন্মসূত্রে রোমানিয়ান, লিখিতেন ফরাসি ভাষায়। সে ভাষায় আমার অপরিচয় হেতু আমাকে তাহার ডেরেক প্রাউস অনূদিত ইংরাজি সংস্করণের উপর ভরসা করিতে হয়। ইহার বঙ্গীয় রূপান্তর নিদেনপক্ষে দুইটি, আমি ____নন্দীবাবুকৃত অনুবাদটি (হে পাঠক! আমি তাঁহার পিতৃদত্ত প্রথম নামটি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছি, আমাকে মার্জনা করিও, আর শূন্য স্থান পূর্ণ করিবার সংস্থান রাখিলাম, সম্ভবপর হইলে নামটি স্বহস্তে সেইস্থানে লিখিয়া নিও!) কৈশোরে পাঠ করি, এবং মঞ্চস্থ করিবার প্রয়াস পাই। সে এক বিপুল বিড়ম্বনা! সে প্রসঙ্গে আসিতেছি। সর্বাগ্রে ইওনেস্কো সাহেবকে একটি টেলিফোন করিয়া লই।

ইওনেস্কো সাহেবের বয়স হইয়াছে, জন্ম ১৯০৯ সালে, ইন্তেকাল ১৯৯৪ সালে। বহুকাল যাবত লেখকদিগের নিজস্ব স্বর্গের বাসিন্দা, যাহার কথা আমি ইতিপূর্বে আমার একটি প্রাক্তন চারনম্বরী লেখায় ব্যক্ত করিয়াছি। মর্তধাম হইতে সেইস্থানে টেলিফোন করা অতিশয় দুরূহ কর্ম। যাহাই হউক, বহু চেষ্টায় সফল হই। ইউজিনবাবুর সঙ্গে আমার এই প্রকার কথোপকথন হয়: (ইওনেস্কোর বাংলা আমার ফরাসির সমতুল্য, অতএব আমরা ফ্রিস্টাইল হিন্দি ভাষায় বাতচিত করি।)

ইওনেস্কো: কিন্তে ফালান? কিন্তে ফালান?
আমি: ম্যায় ভারত সে নিরুপম বোল রহা হুঁ। লেকিন আপ পর্তুগিজ মত বোলা কিজিয়েগা!
ই: কোন নিপ্পর? তু কেয়া ওহি যাদবপুরওয়ালে উল্লু কে পঠঠে?
আমি: ঔর কোন!
ই: বুরবক, বুদ্ধু কাঁহিকা! যাদবপুরমে তু হামরা নাম লাগাকে বঙ্গালীমে ‘গণ্ডার’ ইয়া কুছ ড্রামা লাগায় থা না? জনতা হাসনে লগি, সিটি বাজায়া, তেরে কি উপর কাগজ কি রকেট ফেকা! ম্যায় জিন্দা থা উসি ওয়াক্ত, ইতনা মুসিবতমে ম্যায় কভি নহী ফাঁসা! সবকুছ সির্ফ তেরি ওজেসে! লেকিন উহ তো বহুত পুরানী বাত হ্যায়, অভি তু কেয়া মাংতা, বেওকুফ?
আমি: মেরি সির্ফ এক ছোটিসি সওয়াল পুছনা থা, ওহি ‘গণ্ডার’ কি হিরো বেরেঙ্গার কি বারে মে। উহ তো সির্ফ ‘গণ্ডার’ মে নহী, আপকি আউর বহুত সারে নৌউটঙ্কি মে মজুদ হ্যায়। লেকিন হ্যায় কিস লিয়ে? আপ উসকো অমিতাভ্ বচ্চন সোচা হ্যায় কেয়া?
ই: শালে, হারামি! নৌউটঙ্কি থোড়ি হ্যায়, ইস্কো থিয়েটার অফ দ্য এবসার্ড কহা যাতা! ম্যায় সবহি মে মজুদ হুঁ, তব উহ ক্যা করেগা, উহ হামসে অলগ থোড়ি হ্যায়! লেকিন উস্কে সাথ তেরে কো কেয়া মতলব?
আমি: চার লম্বর লাটফর্ম মেরে কো বোলা আপকি ওহি কিতাব কে বারে মে কুছ লিখনে কে লিয়ে!
ই: চার লম্বর লাটফর্ম! ম্যায় বহুত শুনা উস্কে বারে মে। নৈপল করকে এক লড়কা ইধর আয়ে কুছ দিন পহেলে, লাগতা হ্যায় উস্কে বারে ভি কিসিনে লিখা থা উধার!
আমি: জরুর লিখা, ম্যায়নেই তো লিখা!
ই: তু নে লিখা! ক্যা হালত হ্যায় অভি দুনিয়া কি! ঠিক হ্যায়, মেরে বারে ভি তু হি লিখ লে! লেকিন তেরেকো ফ্রেঞ্চ বিলকুল নহী আতি, উধার যও চিজ লিখতি হ্যায়, বলতি হ্যায় কুছ অলগ! তু সবকো নাম বঙ্গালীমে লিখা কর, উসমে ফ্রেঞ্চ ডালনে কা কৌশিস মৎ কর।
আমি: জরুর! বঙ্গালী মেরেকো বিলকুল কণ্ঠস্থ আতি হ্যায়!
ই: ফোট তব! ভাগ শালে!

ইওনেস্কো সাহেবের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ মস্তকে ধারণপূর্বক আমি পরম পুলকিত চিত্তে লেখনী ধারণ করিয়াছি।

 

২। প্রথম অঙ্ক: যবনিকা উত্তোলন

মোট তিন অঙ্ক ও চারটি দৃশ্যে বিভক্ত গণ্ডার নাটকের প্রথম দৃশ্যটি আমার নিজের সবচেয়ে জটিল মনে হয়। বহু চরিত্রের সমাহার যাদের প্রত্যেককেই আমরা প্রথম দেখি, মঞ্চব্যবহার ইওনেস্কোর দুরূহ চিন্তা প্রসূত যা অনুধাবন করা সর্বদা সহজসাধ্য নয়। সংলাপে অসীম বুদ্ধিমত্তার ছাপ, নাট্যকারের পরিহাসপ্রিয়তা যথেষ্ট সংক্রামক; একই সঙ্গে একাধিক কথোপকথন চলতে থাকে, থেকে থেকে সেইসব আলোচনা একে অপরেরে সঙ্গে মিলে যেতে থাকে এবং পরমুহূর্তেই ভিন্ন অভিমুখ নেয়। এই প্রথম দৃশ্যেই আমরা পাই প্রধান চরিত্র বেরেঙ্গার ও তার বন্ধু জঁ-কে, এই দুজন ছাড়া এ নাটকের মুখ্য নারী চরিত্র ডেইসির আবির্ভাবও এখানেই। এছাড়া আছেন তর্কবাগীশ যিনি তর্কবিদ্যা চূড়ামণি ও তাঁর বান্ধব এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক যিনি তর্কশাস্ত্র আয়ত্ত করার চেষ্টা করছেন। এছাড়া রয়েছে বেশ কিছু পার্শ্বচরিত্র: কাফের পরিচারিকা মেয়েটি, কাফের মালিক, প্রতিবেশী মুদি এবং মুদিগিন্নি এবং জনৈক গৃহবধূ: আশ্চর্য নৈপুণ্যে এদেরকে নিয়ে মঞ্চ সাজিয়েছেন ইওনেস্কো। এ নাটকের প্রতিটি দৃশ্যেই অবশ্য তদুপরি গণ্ডারপুঙ্গবদের গতায়াত।

যবনিকা উত্তোলন হয় একটি ক্যাফেতে। পর্দা ওঠার আগে আমরা বরং সংক্ষেপে জেনে নিই এই নাটকে অতি বিশদভাবে বর্ণিত এর দৃশ্যপট। একটি দোতলা সাধারণ বাড়ি, তার একতলায় একটি মুদিখানা, দোতলায় মুদি দম্পতির বাসস্থান। অদূরে একটি ক্যাফে, তার চেয়ার টেবিল ইতস্তত ছড়ানো। একটি গির্জার চূড়া দ্যাখা যায়, একটি ধূসর গাছ; সব মিলিয়ে একটি ছোট শহরের অতি সাধারণ একটি চৌক। আকাশের রং নীল, তীব্র আলো, দেওয়ালে শাদার প্রাবল্য। রবিবার। গ্রীষ্মের মধ্য দুপুর। গির্জার ঘণ্টা বাজে।

পর্দা উঠলে আমরা দেখি গৃহবধূকে হেঁটে যেতে; তাঁর একহাতে ঝুড়ি ভর্তি কিছু সওদা, অন্যহাতে একটি বেড়াল। মুদি গৃহিণীর তাঁর প্রতি কটুকাটব্যও শুনি। ক্যাফেতে প্রবেশ করে বেরেঙ্গার ও তার সুহৃদ জঁ। সে সুসজ্জিত, আমরা ক্রমশ তার আত্মগর্বের পরিচয় পাব। পক্ষান্তরে বেরেঙ্গার বেশভূষায় অবিন্যস্ত, আপাত দৃষ্টিতে সুনির্দিষ্ট কোনও লক্ষ্যবিহীন, খুব সম্ভব বিগত রাতের মদ্যপানের খোঁয়াড়ি ভাঙছে। এই ক্যাফেতে পৌঁছেছে সে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে, জঁ-এর মতে যা তার স্বভাবগত দীর্ঘসূত্রতা। জঁ-এর উপদেশবর্ষণ অবিরাম চলতে থাকে। বেরেঙ্গার মৃদু প্রতিবাদের চেষ্টা করে মাত্র। জঁ জানায় যে বেরেঙ্গারের মতো সুহৃদের জন্য সে লজ্জিত, সে উন্নত স্তরের মানুষ, যারা কর্তব্যপরায়ণ ও কর্মঠ। তাদের এই কথোপকথন চলবার ফাঁকে কাফের পরিচারিকা প্রবেশ করে ও জানতে চায় তারা কী পান করবে। একটা আওয়াজ শোনা যায় পটভূমিতে ক্রমশ যা তীব্র হয়ে উঠতে থাকে।

শব্দটা তীব্রতর হয়ে ওঠে, যেন একটা বড়মাপের জন্তু দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জঁ বলে ‘এটা আবার কী!’ পরিচারিকা তার কথার পুনরুক্তি করে। বেরেঙ্গার নির্লিপ্ত। জঁ বলে ‘আরে একটা গণ্ডার!’, শব্দটা মিলিয়ে যেতে থাকে। তারপর পরিচারিকা বলে ‘আরে একটা গণ্ডার!’ মুদিগিন্নি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলেন ‘আরে একটা গণ্ডার!’, মুদি বলেন ‘কোথায়? কোথায়?’ তারপরে বেরিয়ে এসে বলেন ‘আরে একটা গণ্ডার!’ সমস্বরে এই ‘গণ্ডার! গণ্ডার!’ রবের মধ্যে তর্কবাগীশ আবির্ভূত হন এবং জানান যে উল্টোদিকের ফুটপাতে একটা গণ্ডার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে! ক্যাফের মালিক বলেন ‘কিছু একটা দেখলেই হল …আরে একটা গণ্ডার!’
জঁ-এর প্রথম সংলাপের পরে এইসব সংলাপগুলো প্রায় সমস্বরে অতি দ্রুতলয়ে বলা হতে থাকে।

গণ্ডারের আগমনকালে উত্তেজনায় গৃহবধূর হাত থেকে ঝুড়িটি খসে পড়ে, কাচের বোতল ভাঙে, কিন্তু অন্যহাতে বিড়ালটিকে তিনি ঠিকই ধরে রাখেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে প্রবেশ করতে দেখি এবার। তিনি সম্ভ্রান্ত, সুসজ্জিত। গৃহবধূকে তিনি সাহায্য করেন পড়ে যাওয়া জিনিসপত্র কুড়িয়ে নিতে, এবং জানান যে তিনি তর্কবাগীশের বান্ধব।

গণ্ডার সংক্রান্ত এই প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তে একমাত্র বেরেঙ্গারকে নিঃস্পৃহ মনে হয়। সে বলে হয়ত গণ্ডারটা কোনও সার্কাস থেকে পালিয়েছে, বা চিড়িয়াখানা থেকে এবং জঁ-এর বিপুল ভর্ৎসনার সম্মুখীন হয়। জঁ জানায় যে এখন শহরে কোনও সার্কাস নেই, চিড়িয়াখানাও দীর্ঘদিন বন্ধ। বেরেঙ্গার বলে যে সেই থেকে গণ্ডারটা হয়ত কোনও জলাভূমিতে লুকিয়ে ছিল। জঁ জানায় এই বিশুষ্ক শহরে জলাভূমি বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই! সে তার স্বাভাবিক উচ্চস্তরের বুদ্ধিমত্তার কথা আবার স্মরণ করিয়ে দ্যায়, শহরের গণ্ডার সংক্রান্ত বিপদের কথা ভেবে প্রবল উদ্বিগ্ন হয় এবং আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে নানান উপদেশের মাধ্যমে বেরেঙ্গারকে শোধরানোর। একই সময়ে তর্কবাগীশ বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে তর্কশাস্ত্রের সিলোজিসম শেখাতে থাকেন। ইতিমধ্যে দূর থেকে ডেইসিকে আসতে দেখে বেরেঙ্গার পালাবার পথ পায় না, এবং প্রত্যাশিতভাবেই জঁ-এর পরিহাসের শিকার হয়। জঁ-এর উপদেশাবলী অবিরাম বর্ষিত হতে থাকে। তর্কবাগীশও বিরামহীনভাবে বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে শিক্ষা দিতে থাকেন। তিনি জানান তর্কশাস্ত্র একটি অতীব নান্দনিক বিষয়, অবশ্য তার অপপ্রয়োগ না হলে। তিনি শেখান:

বেড়াল মাত্রেই মরণশীল। সক্রেটিস মৃত। অতএব সক্রেটিস বেড়াল। তাঁর মুগ্ধছাত্রও তর্কশাস্ত্রের প্রয়োগে পটু হয়ে ওঠেন। বেড়াল মাত্রেই মরণশীল। তাঁর কুকুরটি মৃত। অতএব কুকুরটিও বেড়াল। তাঁর শিক্ষক জানান যে তর্কশাস্ত্রের বিচারে তা অবশ্যই সঠিক এবং এর বিপরীতটিও সঠিক। তর্কবাগীশ এর পরে বৃদ্ধকে বেড়ালের থাবা সংক্রান্ত একটি জটিল সমস্যার সমাধান করতে বলেন। বৃদ্ধ ভেবেচিন্তে বলেন যে উত্তরটি হচ্ছে, একটা বেড়ালের ছটি থাবা, আরেকটির একটিও নয়। তাঁর শিক্ষক জানান যে উত্তরটি ভুল, কেননা তর্কশাস্ত্রের কাজ সুবিচারের, এখানে ওই দ্বিতীয় বিড়ালটির প্রতি অবিচার হচ্ছে।

এই সব কথোপকথনে জঁ এবং তর্কবাগীশ প্রায়ই একই কথা বলে ওঠেন। তর্কবাগীশ যখন তাঁর ছাত্রকে তার বুদ্ধিমত্তার একটু প্ৰয়োগ করতে বলেন তখন জঁ-ও বেরেঙ্গারকে প্রায় একই পরামর্শ দ্যায়। বেরেঙ্গার এবং বৃদ্ধর প্রত্যুত্তরও প্রায় একই গতে বাজে। জঁ বেরেঙ্গারকে পরামর্শ দ্যায় সংস্কৃতিবান হতে, জাদুঘরে যেতে বলে, ইওনেস্কোর আভাঁ-গার্দ নাটক দেখে আসতে বলে! তর্কবাগীশ জানান একটাও থাবা না থাকলেও বেড়ালকে ইঁদুর ধরতেই হবে, কেননা সেটা তার স্বভাব, থাবাহীন অবস্থায়ও সে বেড়ালই থেকে যাচ্ছে।

এই সব কথোপকথন চলতে চলতে আবার ধুলো ওড়ে, একটা ভারী জন্তুর ছুটে আসার শব্দ শোনা যায়। এবার বিপরীত দিক থেকে।

গণ্ডারের দ্বিতীয় আবির্ভাব ঘটে। আগের মতোই সেই সমবেত শোরগোল। বেরেঙ্গার নড়েচড়ে বসে, একমাত্র সেই লক্ষ করে যে এবার গণ্ডারটি এসেছে বিপরীত দিক থেকে। উত্তেজনায় পরিচারিকা মেয়েটির হাতের বাসন পড়ে ভেঙে যায়। মালিক এর মধ্যেও জানাতে ভোলেন না যে ক্ষতিপূরণ না দিলে তার অব্যাহতি নেই!

গণ্ডারটি দূরে চলে গেলে গৃহবধূকে আবার দেখি আমরা। রোরুদ্যমানা। হাতের বেড়ালটি রক্তাক্ত ও মৃত। গণ্ডারের আবির্ভাবজনিত প্রথম প্রকাশ্য ক্ষতি। তর্কবাগীশ এবং তাঁর শিষ্য মহিলাকে তর্কশাস্ত্রসম্মত সান্ত্বনা দ্যান। মহিলার বিলাপ প্রলম্বিত হয়।

ইতিমধ্যে প্রবল বিতর্ক শুরু হয় প্রথমে জঁ এবং বেরেঙ্গারের মধ্যে, ক্রমশ অন্যেরা তাতে যোগদান করে। গণ্ডার আদতে একটিই, না দুটি? তার বা তাদের শিং একটি না দুটি? একটি শিং হলে সেটি আফ্রিকার না এশিয়ার? আর দুটি শিং হলে?

প্ৰতর্কের উত্তেজনায় জঁ বলে যে বেরেঙ্গার আদতে এশীয় মোঙ্গল! উত্তরে বেরেঙ্গার বলে যে সে এশীয় নয়, তবে এশীয়রা ঠিক তাদের মতোই মানুষ। পরিচারিকা বলে অবশ্যই এশীয়রা ঠিক তাদের মতোই মানুষ। সে জানে কেননা তার একজন এশীয় বন্ধু ছিল। মালিক তাকে ধমকে বলেন যে তার মতামত কেউ চায়নি। ডেইসিও সেখানে উপস্থিত। সেও বলে এশীয়রা আর সবার মতোই মানুষ। বৃদ্ধ ভদ্রলোক জানান যে তাঁরও একজন এশীয় বন্ধু ছিল, তবে সে সত্যিকারের এশীয় নাও হতে পারে। বিক্ষুব্ধ জঁ জানায় যে এশীয়দের গায়ের রঙ হলুদ, কটকটে হলুদ। উত্তরে বেরেঙ্গার বলে যে, তা তারা যাই হোক না কেন, জঁ একদম টকটকে লাল। বৃদ্ধ জানান যে এশীয়রা কেউ কেউ একদম সাদা, কেউ কেউ কালো, অনেকে আবার নীল, আবার কারুর কারুর গায়ের রং তাঁরই মতো!

এরপর শিং সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে তর্কবাগীশ তাঁর পরিচয়পত্র সমেত এগিয়ে আসেন। তাঁর যুক্তিবিজড়িত বক্তব্যের সংক্ষিপ্তসার:

এমনও হতে পারে মোট দুটি গণ্ডার এসেছিল যার একটির একটি শিং এবং অপরটির দুটি।
এমনও হতে পারে যে মাত্র একটি গণ্ডারই এসেছিল, দ্বিতীয়বার আসার আগে তার একটি শিং ভেঙে যায়।
আবার এটাও সম্ভব যে দুটি শিংওয়ালা দুটি গণ্ডারই এসেছিল, দ্বিতীয়বার আসার আগে দ্বিতীয়টির একটি শিং ভেঙে যায়।
তবে এটা একদমই সম্ভব নয় যে আদতে একটি দু শিংওয়ালা গণ্ডারই এসেছিল, প্রথমবার আসার সময় তার একটি শিং ভাঙা ছিল, দ্বিতীয়বার আসতে আসতে তার ভাঙা শিংটি আবার গজিয়ে যায়, কেননা গণ্ডারের শিং কখনওই অত তাড়াতাড়ি গজাতে পারে না!

বৃদ্ধ জানান যে অসামান্য যুক্তিসমৃদ্ধ বিশ্লেষণ এটি! তর্কবাগীশ প্রস্থান করেন। ইতিমধ্যে, একটি বাক্সে করে মৃত বেড়ালটিকে শবযাত্রার মতো করে বয়ে আনেন গৃহবধূ, সঙ্গে পরিচারিকা এবং ডেইসি। কোথায় কে আফ্রিকার না এশিয়ার এক শিঙে না দু শিঙে গণ্ডার চাপা পড়েছে বলে এদের সঙ্গে কাজ ফেলে যেতে হবে? বলে মুদি এবং ক্যাফের মালিক এদের সঙ্গ দ্যান না। বেরেঙ্গার ভাবতে থাকে জঁ-এর সঙ্গে এই বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে সে বোধহয় ভালো কাজ করেনি।

প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের যবনিকা পতন হয়।

 

৩। মেরি পিয়া গয়ে রঙ্গুন উঁহাসে লগায়া টেলিফুন

পর্দা পড়িবামাত্র আমার ফোন বাজিয়া উঠে। ইওনেস্কো স্বয়ং। অধুনা কেরি সাহেবের মুন্সী নাটকে কেরির ভূমিকায় রিহার্সাল দিতেছেন, অতএব কেরিসুলভ বাংলা কিছুটা রপ্ত হইয়াছে।

ইও: টোর খোপড়ি ফুটোস্কোপ ডিয়া পরীকষা কড়াইটে হইবে!
আমি: সে কি! কেন?
ইও: আমার নাটক হৈটে টুকিয়া টো এট কিসু লিখিলি। কী বুঝিলি বল।
আমি: কী আবার, গণ্ডার এসেছে!
ইও: টুই সেই মূর্খই রহিয়া গেলি। মানুষ্যের ডেশে গণ্ডার আসে টখনি যখন টারা নীল রঙের এশীয় মনুষ্য দেখিটে পায়, যখন টার্কবাগীশ সিলজিসম বিটরণ করে, ক্যাফের ওই মেয়েটিকে কঠায় কঠায় ফাইন ডিটে হয়; টখন টোর ওই মুডির মটো বেকটিরা ভাবে বিল্লিটার ডেথ হওয়াটা একটা ছোট্ট ঘটনা।
আমি: ছোট্ট ঘটনা নয়?
ইও: টুই ডেখিটেছি মুডির ঠেকেও বেওকুফ!
আমি: রাখছি এখন। পরের সিনের বেল বাজছে। পর্দা উঠল বলে!

 

দ্বিতীয় অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য: বিশ্বাসে মিলয়ে গণ্ডার, তর্কে বহুদূর

এই দৃশ্যের ঘটনাস্থল একটি অফিস। নাট্যকার তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন এটা কোনও সরকারি দপ্তর হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। এই অফিসে ডেইসি ও বেরেঙ্গার সহকর্মী। এছাড়া আছে অন্যান্য কর্মীরা, বোটার্ড ও ডুডার্ড, ব্যিয়ুফবাবু এবং বড়বাবু প্যাপিলন। যবনিকা উন্মোচনের সময় বেরেঙ্গার ও ব্যিয়ুফবাবু বাদে অন্যেরা উপস্থিত। বোটার্ড কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অতি তীব্র আত্মবিশ্বাস, সম্ভবত পৃথিবীর পাঠশালায় শিক্ষিত, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সম্পর্কে অতি নিম্ন অভিমত পোষণ করে, অন্যের মতামত, ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চায় এবং এক দীর্ঘশ্মশ্রু জার্মান দার্শনিককে উদ্ধৃত করে। ডুডার্ড প্রথাগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ, দক্ষ কর্মী, বড়বাবুর প্রিয়, তুলনায় মৃদুভাষী। তার রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে সরাসরি কিছু জানা যায় না। দৃশ্যের শুরুতে বোটার্ড এবং ডুডার্ড গণ্ডার সংক্রান্ত তুমুল বাকযুদ্ধে নিমগ্ন। ডুডার্ড বলতে চায়, গণ্ডার সত্যিই এসেছিল, সে স্বচক্ষে দ্যাখেনি ঠিকই, কিন্তু তার পরিচিত অনেকেই দেখেছে, যাদের বয়ান তার মতে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। বোটার্ড তার বক্তব্যকে নস্যাৎ করে বলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিতদের এটাই সমস্যা যে তারা কোনও ঘটনার বাস্তব রূপটিকে ধরে উঠতে পারে না। সে বলে এই গণ্ডারের বিষয়টা একধরনের সমবেত বিভ্রম, ধৰ্ম যেরকম জনগণের আফিম, এটাও সেরকমই এক অফিমের আচ্ছন্নতা! ডুডার্ড বলে যে ঘটনাটা সংবাদপত্রেও আছে, বেড়ালের মারা যাওয়ার ঘটনাতেও। বোটার্ড জানায় যে এইসব সাংবাদিকরা কোনও কর্মের নয়, বেড়ালটার রংটা পর্যন্ত লেখেনি, যা লিখেছে সব ভুল! ডুডার্ড বলতে চেষ্টা করে যে এ ঘটনার সঙ্গে বেড়ালটার রঙের আবার সম্পর্ক কি! বোটার্ড বলে যে এই এই রঙের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! ইতিমধ্যে ডেইসি বলার চেষ্টা করে যে সে গতকাল স্বচক্ষে গণ্ডার দেখেছে। বোটার্ড তার মতামত গ্রাহ্য করার যোগ্য বলে মনে করে না। বড়বাবু স্মরণ করিয়ে দ্যান যে এটা অফিস, গণ্ডার হোক বা যাই হোক এখানে কাজ বন্ধ হতে পারে না। ইতিমধ্যে স্বাভাবিক লেট লতিফ বেরেঙ্গারের আগমন ঘটে। ডেইসি চুপিসারে তাকে হাজিরা খাতায় সই করতে দ্যায়। বেরেঙ্গার যেহেতু গতকালের গণ্ডারকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী, বোটার্ডের সঙ্গে তারও এ প্রসঙ্গে কথোপকথন হয়। একটি অথবা দুটি গণ্ডার, আফ্রিকার অথবা এশিয়ার, শিং একটি না দুটি, এইসব সমস্যার কথা শুনে বোটার্ড প্রবল পরিহাস করতে থাকে। সবকিছুই তার কপোলকল্পনা বলে স্রেফ উড়িয়ে দ্যায়। বড়বাবু জানতে চান ব্যিয়ুফবাবু আজও অনুপস্থিত কিনা এবং তিনি নেই জেনে তাঁর জমে থাকা কাজের পাহাড় সম্পর্কে অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

দপ্তরের কাজকর্ম মোটামুটি শুরু হয়। হঠাত সিঁড়িতে দুদ্দাড় আওয়াজ। হাঁফাতে হাঁফাতে শ্ৰীযুক্তা ব্যিয়ুফ, ব্যিয়ুফবাবুর স্ত্রী, অফিসে প্রবেশ করেন। বড়বাবু জানতে চান যে ব্যিয়ুফবাবু কোথায়, আর তিনিই বা এরকম ছুটে ছুটে আসছেন কেন? শ্ৰীযুক্তা ব্যিয়ুফ জানান যে ব্যিয়ুফবাবু গত কয়েকদিন ধরে জ্বরে, আর তিনি এভাবে হাঁফাতে হাঁফাতে আসছেন কেননা রাস্তায় তাঁকে একটা গণ্ডার তাড়া করেছিল! সবার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতে অফিস বাড়িটির একতলায় প্রবল আলোড়ন হতে থাকে, একটি গণ্ডার সশব্দে আগমন করে এবং বিশেষ কিছু বুঝে উঠবার আগেই বাড়িটির একমাত্ৰ সিঁড়িটিকে ধূলিসাৎ করে দ্যায়। বিনা সিঁড়িতে গণ্ডারটি যে দ্বিতলে আগমন করতে পারবে না সেটা মোটামুটি বোঝা গেলেও, এই অফিসের কর্মীদের নিষ্ক্রমণের সমস্যাটা থেকেই যায়। ডেইসি ছোটে দমকলে ফোন করতে। এবার সমানে একটি জলজ্যান্ত গণ্ডার দেখে বোটার্ড বলতে থাকে যে সে গণ্ডারের অস্তিত্বে অবিশ্বাস করেনি, শুধু সমস্যাটার আসল রূপটা বুঝতে চাইছিল! এবং সে আরও জানায় যে এই গোলযোগের জন্য সে ডুডার্ডকেই দোষী সাব্যস্ত করছে, কেননা ডুডার্ড তার তুলনায় ছোট মাপের মানুষ এবং তার বিচার ধারায় ছোটমাপের মানুষেরাই সবসময় দোষী!

ইতিমধ্যে, শ্রীযুক্তা ব্যিয়ুফ আর্তনাদ করে উঠে বলেন যে এই গণ্ডার তাঁর প্রাণবল্লভ, ইনি শ্রীযুক্ত ব্যিয়ুফ স্বয়ং, তিনি চিনতে পেরেছেন, গণ্ডাররূপী ব্যিয়ুফবাবু তাঁকে ব্যাকুলভাবে ডাকছেন! একটা বেশ শোরগোল উপস্থিত হয়। তাঁর বীমা করানো আছে কিনা, তিনি উকিলের কাছে যাবেন কিনা, ইত্যাদি বহু প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে। বড়বাবু প্যাপিলন জানান যে আর সহ্য করা সম্ভব নয়, ব্যিয়ুফবাবুকে তিনি বরখাস্ত করলেন। বোটার্ড জানায় যে এই অন্যায় বরখাস্তের প্রতিবাদে শ্রমিক সংগ্রাম সমিতি লড়ে যাবে। এই গণ্ডার সমস্যাটা একটা বিপুল চক্রান্ত, সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। শ্রীযুক্তা ব্যিয়ুফ বলেন আমি আসছি প্রাণাধিক, এবং বলেই দোতলা থেকে সটান গণ্ডারটির পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গণ্ডারটি তাঁকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে অদৃশ্য হয়ে যায়।

ডেইসি জানায় দমকল অসম্ভব ব্যস্ত: চতুর্দিকে গণ্ডার, সকালে ছিল সাতটা, এবেলা সতেরটা! তবু তারা আসছে। দমকলের ঘণ্টা শোনা যায়, জানলায় একজন দমকলকর্মীর মাথা, এদেরকে তিনি নামাতে এসেছেন। বড়বাবু সর্বাগ্রে প্রস্থান করেন। বলে যান ডুডার্ড যেন অফিসের সব কাগজপত্র সামলে রাখেন। এরপর সবাই মিলে পরস্পরকে বলতে থাকে আপ পহেলে! আপ পহেলে! বোটার্ড ডুডার্ডকে দোষারোপ করতে থাকে। বেরেঙ্গার ভাবে জঁ-এর সঙ্গে তার বিবাদটা মিটিয়ে নিতে হবে।

এই দৃশ্যের যবনিকা পতনের সময় হইয়াছে, হে পাঠক! এইমাত্র ইওনেস্কো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠাইলেন: আরে বেওকুফ, পিচ্চার অভি বাকি হ্যায়!

 

দ্বিতীয় অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্য: প্রবল গণ্ডার জ্বর

এই দৃশ্যটি ঘটতে থাকে জঁ-এর বাসস্থানে, মূলত তার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলে। ইওনেস্কো যথারীতি দৃশ্যের প্রারম্ভে তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন নিখুঁত মঞ্চসজ্জার কথা মাথায় রেখে। আমরা দেখি জঁ তার শোবার ঘরে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। তার অ্যাপার্টমেন্টের সদর দরজাটি বন্ধ। বেরেঙ্গার সিঁড়ি দিয়ে উঠে তার নাম ধরে ডাকতে থাকে, জঁ সাড়া দ্যায় না। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পরে পাশের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে একজন খর্বকায় বৃদ্ধ বেরিয়ে আসেন, থুতনিতে সাদা দাড়ি। বলেন: কী ব্যাপার? বেরেঙ্গার জানায় যে সে তার বন্ধু জঁ-এর সঙ্গে দ্যাখা করতে এসেছে। বৃদ্ধ জানান যে তাঁরও নাম জঁ! এক বৃদ্ধার মুখ দ্যাখা যায়। খর্বকায় বৃদ্ধর স্ত্রী। বৃদ্ধ জানান যে তাঁকে নয়, অন্য জঁকে খুঁজছে একজন।

দরজা খোলে অবশেষে। বেরেঙ্গার ভেতরে ঢোকে। জঁ জানায় তার প্রবল জ্বর। বেরেঙ্গার দ্যাখে তার চামড়ার রং সবজেটে, হাত দিয়ে খসখসে মনে হয়, গলার স্বর ভারি, কপালে একটা আঁচিল। বেরেঙ্গার ডাক্তার ডাকতে চায়, জঁ তাতে প্রবল আপত্তি জানায়। বেরেঙ্গার বলে যে সে গতকালের ঘটনার জন্য দুঃখিত। জঁ বলে সে ব্যাপারে তার কোনও স্মৃতি নেই। সে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠতে থাকে। বলে ওঠে যে গতকাল ব্যিয়ুফবাবু গণ্ডার হয়ে গেছেন, না জানি তাঁর কতদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তাতে। বেরেঙ্গার বলে যে মানুষের গণ্ডার হওয়া সমীচীন নয়, তা তার সভ্যতার ইতিহাস ও নীতিবোধের পরিপন্থী। জঁ প্রবল উত্তেজিত হয়ে ওঠে, বলে যে মানুষের নীতিবোধ চুলোয় যেতে পারে। সবার ওপরে সত্য প্রকৃতির নিয়ম। এইসব তথাকথিত মনুষ্যত্ব আর তার নীতিবোধ থেকে বেরনোর সময় এসেছে। এটা পরিবর্তনের যুগ। গণ্ডার হওয়াতে সে কোনও আপত্তির কারণ দেখতে পায় না, সে বেরেঙ্গারের মতো সংকীর্ণমনা নয়!

জঁ ক্রমান্বয়ে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠতে থাকে, ক্রমশ তার রূপান্তর প্রকট হয়ে ওঠে। তার কপালের আঁচিল গণ্ডারের খড়্গে পরিবর্তিত হয়, কণ্ঠস্বরে জান্তব ধ্বনি প্রকট হয়, প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ গণ্ডার হয়ে সে বাথরুমে দাপিয়ে বেড়াতে থাকে। বেরেঙ্গার কোনওক্রমে বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে খর্বকায় বৃদ্ধের দরজায় ধাক্কা দ্যায়। তিনি গণ্ডার বৃত্তান্ত শুনে তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দ্যান। বেরেঙ্গার ছুটে যায় কেয়ারটেকারের ঘরের দিকে: সেখান থেকে একটা গণ্ডারের মুখ উঁকি মারে। সে আবার ফিরে এসে বৃদ্ধের দরজায় করাঘাত করে: দরজা খুললে দুটি গণ্ডারের মুখ চোখে পড়ে! ত্রস্ত বেরেঙ্গার ছিটকে সরে আসে, করিডরের জানালা দিয়ে দ্যাখে রাস্তায় গণ্ডারের মিছিল চলছে। তারা যূথবদ্ধ, মোটেও একাকী বিচরণ করা প্রাণী নয়। সে আতঙ্কে পালাতে থাকে, এদিকে ধাক্কায় ধাক্কায় বাথরুমের দরজা ভেঙে পড়ার সময় হয়।

হে পাঠক! এই দৃশ্যের যবনিকা পড়বে এইবার। শুনলাম এই দৃশ্যের শেষে ইওনেস্কোর তূষ্ণীম্ভাব জাগ্রত হয়েছে, আর পলায়নরত বেরেঙ্গারকে দেখে তাঁর প্রতিবেশী বাঙালি কবি এইমাত্র আমাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে লিখেছেন: নীড় ভেঙে অন্ধকারে এই যৌন যৌথ মন্ত্রণার মালিন্য এড়ায়ে উৎক্রান্ত হতে ভয় পাই।
এভাবে আর কতদূর বা কতদিন পালানো যাবে কে জানে!

 

তৃতীয় অঙ্ক: কে তুমি রাখোনি হাত আমাদের যৌথ বিশ্বাসে?

পর্দা উঠিবার পূর্বেই ইওনেস্কো সায়েবের ই-মেল আসে। দেখিলাম শুধু লেখা:

কে তুমি ছিটকে যাও ত্রাসে?
কে তুমি রাখোনি হাত আমাদের যৌথ বিশ্বাসে?

ইওনেস্কো উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহার করিয়াছেন; অর্থাৎ তিনি অবহিত আছেন যে এই পঙক্তিদ্বয় মহান কবিবাবু শ্রীনিরুপম চক্রবর্তী বিরচিত!

পর্দা ওঠে এবার বেরেঙ্গারের ঘরে। ঘরটির সাজসজ্জা আগে দ্যাখা জঁ-এর ঘরটির মতো, শুধু যৎসামান্য এদিক ওদিক এখানে ওখানে। বেরেঙ্গারের মাথায় ফেট্টি বাঁধা, সে হয় নিদ্রিত। সম্ভবত দুঃস্বপ্ন দ্যাখে। সে জেগে ওঠে। তার বাসস্থানের চতুর্দিকে গণ্ডারের বিচরণ। তাকে ভয়ার্ত মনে হয়। ডুডার্ড তাকে দেখতে আসে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় তাদের মধ্যে। ডুডার্ড বলে এই গণ্ডারজ্বর একটা ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার, যেমন এসেছে তেমনভাবেই চলে যাবে। বেরেঙ্গার আশ্বস্ত হয় না, বারবার জানতে চায় যে তার কপালে খড়্গের মতো কিছু গজিয়ে উঠছে কিনা, বারবার বলে যে সে গণ্ডার হতে চায় না। ডুডার্ডকে সে প্রশ্ন করে অফিসের সিঁড়িটা সারানো হয়েছে কিনা। ডুডার্ড বলে হয়েছে, তবে সিঁড়িটা এখনও কাঠেরই আছে। বেরেঙ্গার বলে যে কাঠের সিঁড়ি দেখে বড়বাবু প্যাপিলন একটুও খুশি হবেন না। ডুডার্ড জানায় যে সে ব্যাপারে চিন্তা করার কিছু নেই, বড়বাবু নির্জনতা খুঁজতে অনেক দূরে চলে গেছেন, অধুনা তিনিও গণ্ডার! বেরেঙ্গার অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ওঠে, বলে সে প্রতিবাদ করবে, ইস্তেহার লিখবে, নগরপ্রধান বা তাঁর সহকারী যাকে সে খুঁজে পাবে তার সঙ্গে কথা বলবে। ডুডার্ড বলে প্রশাসনের কাজে বাধা দেওয়া অন্যায়, তাঁদের অবশ্যই এই সমস্যার সমাধান সম্পর্কে কোনও না কোনও পরিকল্পনা আছে। বেরেঙ্গার বলে এ মুহূর্তে দরকার বোটার্ডের মতো লড়াকু লোক। দিশাহারা বেরেঙ্গার বলে যে এখন ডুডার্ডের মতো উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরাই ভরসা, তার নিজস্ব শিক্ষা অত বেশি নয়, সে আবেগের বশে চলে। ডুডার্ড বলে কেউ যদি স্বেচ্ছায় গণ্ডার হতে চায় সেটা তার ব্যক্তিস্বাধীনতার আওতায় পড়ে, তাছাড়া এটা একটা স্থানীয় সমস্যা এবং গণ্ডার একটি স্বাভাবিক প্রাণী। বেরেঙ্গার বলে যে সে আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাস করে এবং গণ্ডার হওয়াটাকে অস্বাভাবিক মনে করে, তার মতে এই পুরো ব্যাপারটাই অশুভ। ডুডার্ডকে বলতে শোনা যায় যে শুভ ও অশুভ ব্যাপারটা আপেক্ষিক, সবটাই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। বেরেঙ্গার মন্তব্য করে যে গ্যালিলিওকে তবুও বলতে হবে ‘পৃথিবী কিন্তু ঘুরছেই!’ ডুডার্ড বলে, সেটা অন্য ব্যাপার। সেটা ছিল বিজ্ঞানের সঙ্গে অন্ধ ডগমার দ্বন্দ্ব, এটা তা নয়! তার মতে গণ্ডারগুলো যেন শিশুর মতো ঘুরছে, রাস্তায় গণ্ডার দেখলে আজকাল আর কেউ বিচলিত হয় না, বড়জোর একটু সরে রাস্তা ছেড়ে দ্যায়। বেরেঙ্গারের অভিমত হচ্ছে প্রশাসনের উচিত এই গণ্ডারগুলোকে এক জায়গায় আটকে রেখে, চোখে চোখে রাখা। ডুডার্ড বোঝায় সেটা আর সম্ভব নয়, জনগণ প্রবল আপত্তি করবে, কেননা এখন প্রত্যেকেরই পরিচিত, আত্মীয় অথবা ভালোবাসার কেউ গণ্ডার হয়ে গেছে। প্রবল হতাশ বেরেঙ্গার বলে এই মুহূর্তে দরকার তর্কবাগীশের মতো একজন লোক, যিনি আমাদের রাস্তা দ্যাখাতে পারবেন। ডুডার্ড জানতে চায় যে তিনি কে? বেরেঙ্গার প্রত্যুত্তরে বলে যে তিনি একজন দার্শনিক, যুক্তিবিদ, একজন প্রবল জ্ঞানী ও চিন্তাশীল, যিনি বুঝিয়ে গেছেন যে এশীয় গণ্ডারেরা আদতে আফ্রিকার আর আফ্রিকার গণ্ডারেরা এশিয়ার!

রাস্তা জুড়ে অবিশ্রাম গণ্ডারের গতায়াত। হঠাত চোখে পড়ে একটি গণ্ডারের শিঙে লাগানো একটি টুপি। বেরেঙ্গার হাহাকার করে ওঠে: একি! এটা যে তর্কবাগীশের টুপি! তর্কবাগীশও গণ্ডার হয়ে গেলেন! সে ভেঙে পড়ে একেবারে। ডুডার্ড বলে এতবড় একজন পণ্ডিত মানুষ কী আর না বুঝে কোনও কাজ করতে পারেন? দ্যাখ গণ্ডার হয়েও কেমন নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন!

ডেইসি প্রবেশ করে হাতে একঝুড়ি খাবার। বলে প্রায় সব দোকানেই লেখা আছে: রূপান্তর প্রক্রিয়ার জন্য দোকান বন্ধ! অতি কষ্টে সে কিছু খাবার সংগ্রহ করেছে। ডেইসি বলে বোটার্ডও এখন গণ্ডার! প্রবল বিস্মিত বেরেঙ্গার জানতে চায় তাকে গণ্ডার হতে হল কী কারণে। জানা যায় মনুষ্যরূপী বোটার্ডের শেষ কথা ছিল: যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে! ডেইসির কাছে খবর পাওয়া যায় যে অজস্র গণ্যমান্য কেষ্টবিষ্টুরা এখন গণ্ডার, এই গণ্ডারীকরণ প্রক্রিয়া এখন প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

বেরেঙ্গারের বাড়িতে ডেইসির আগমন এবং সেখানে তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ ডুডার্ডকে প্রবল ঈর্ষান্বিত করে তোলে। সেটা তার আচরণে প্রকাশ পায়। বারবার সে নানান ছুতোয় চলে যেতে চায়, বেরেঙ্গার তাকে আন্তরিকভাবে থাকতে এবং খেয়ে যেতে বলে। ইতিমধ্যে সারা রাস্তা জুড়ে গণ্ডারদের কুচকাওয়াজ চলতে থাকে। ধুলো ওড়ে। রাশি রাশি গণ্ডার দমকল দপ্তরের দিকে ছুটে যেতে থাকে। ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে দমকলকর্মীরা বেরিয়ে আসে: তারা প্রত্যেকেই এখন গণ্ডার। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে দরজা ঠেলে ঠেলে গণ্ডারেরা বেরোতে থাকে, জানালা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে একের পর এক। ডুডার্ড বলে ওঠে: আর কেউ বাকি রইল না!

ডুডার্ড মনস্থির করে ফেলেছে। সে বলে যে তার সবাই ওখানে, তার নিজের লোকেদের প্রতি তার কর্তব্য আছে, তাকে যেতেই হবে। বেরেঙ্গার অপ্রাণ চেষ্টা করে তাকে বোঝাতে। ভবি ভোলবার নয়! ডেইসি বলে এ ব্যাপারে তাদের সত্যই কিছু করণীয় নেই। ডুডার্ড ছুটে বেরিয়ে যায়। অগণিত গণ্ডারের ভিড়ে এই নতুন গণ্ডারটিকে আর আলাদা করে চেনা যায় না।

বেরেঙ্গার ডেইসিকে বলে: ও তোমাকে ভালোবাসত, দুঃখ পেয়ে চলে গেল! ওকে তুমি আটকালে না কেন? ডেইসি বলে: সে কথা তো সে আমাকে কখনও বলেনি!

হে পাঠক! বলিতে ভুলিয়াছি একেবারে প্রথম দৃশ্যে জঁ ডেইসির প্রতি অনুরাগের কথা বলিয়া বেরেঙ্গারকে উপহাস করিয়াছিল। এই দৃশ্য দেখিতে দেখিতে তাহা অকস্মাৎ স্মরণে আসিল। আহা রে! তাইতো কবি বলিয়াছেন: কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে!

বেরেঙ্গার জানায় যে ডেইসিকে সে ভালোবাসে। ডেইসি জানায় সেও। তাদের মধ্যে দীর্ঘ বাক্যালাপ চলতে থাকে। ইতিমধ্যে দুবার টেলিফোন বেজে ওঠে। ফোন ধরলে অন্য প্রান্তে গণ্ডারের আওয়াজ শোনা যায়। তারা রেডিও খোলে, সেখান থেকেও কেবল গণ্ডারের আওয়াজ ভেসে আসে। প্রশাসনের লোকেরা এখন গণ্ডার। এটা পরিষ্কার যে এ মুহূর্তে তারা দুজন ছাড়া আর প্রত্যেকেই গণ্ডার পরিণত হয়েছে।

আপ্ত বিশ্বাসে বেরেঙ্গার বলে যেতে থাকে যে তারা যেটা করছে সেটাই সঠিক। ডেইসির আত্মবিশ্বাস চিড় খেতে থাকে, বলে, ওদের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করা উচিত। বেরেঙ্গার বলে ওদের আবার ভাষা কোথায়? ডেইসি বলে: কী করে জানলে? তুমি কি ভাষাবিদ নাকি? ওদের সঙ্গে মানিয়ে চলা দরকার।

চতুর্দিকে রাশিরাশি গণ্ডার, ধীরে ধীরে তাদের আওয়াজ সঙ্গীতের মতো শোনাতে থাকে। ডেইসি বলে: ওরা গান গাইছে! ওদের দেখতে সুন্দর লাগছে! বেরেঙ্গার আদৌ মানতে চায় না। তাদের কথাবার্তা তিক্ততার দিকে গড়াতে থাকে। মতৈক্য হয় না। শেষে ডেইসি বলে এভাবে তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। সে ধীরে ধীরে প্রস্থান করে। গণ্ডারদের দলে মিলিয়ে যায়।

সারা বিশ্বে সম্ভবত এখন বেরেঙ্গার একা। তবু কিছুতেই সে গণ্ডার হতে চায় না। সে ডেইসিকে বারবার ডাকে, ডেইসি ফেরে না। সে নিজেকেই দোষী মনে করে। চারপাশে গণ্ডারের ধ্বনি তখন প্রায় নিখুঁত সঙ্গীতের মতো বাজছে। সে বোঝে যে সারা দুনিয়ায় সে সম্ভবত একমাত্র ফরাসিভাষী। সে চেষ্টা করে গণ্ডারের মতো আওয়াজ করতে। পারে না। একটা পুরনো ছবিতে সে নিজেকে চিনতে পারে: এই সুন্দর গণ্ডারদের তুলনায় নিজেকে তার অসম্ভব কুশ্রী মনে হয়! অথচ নিজের চামড়ার দিকে তাকিয়ে সে বোঝে এজন্মে সে আর যাই হোক গণ্ডার হতে পারবে না। সে ব্যথিত হয় পলকের জন্য, ভাবে নিজের বৈশিষ্ট্য আঁকড়ে থাকার এ কী নিদারুণ পরিণতি!

তার সম্বিৎ ফেরে পরক্ষণেই। সে বলে সে পৃথিবীর শেষ মানুষ, সে তাই থাকবে। আপ্রাণ লড়বে এই গণ্ডারদের সঙ্গে। কিছুতেই সে আত্মসমর্পণ করবে না!

যবনিকা পতন হয় শেষবারের মতো।

 

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

এই নিবন্ধ বিরচিত হইবার পর আমার সহিত ইওনেস্কো সাহেবের সুদীর্ঘ সাক্ষাৎ আলোচনা হয়, ইউরোপ ইতি নামক মহাদেশের একটি ছোট শহরে। সে শহরে অধুনা শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা। ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ব্যাকুল ইওনেস্কো মর্তে নামিয়াছেন, কর্মহীন আমি তাঁহার সকাশে উপস্থিত। ইওনেস্কোর বাংলা অধুনা অতি সংস্কৃত, তিনি তাহার প্রতিবেশী বঙ্গসন্তানটির বাল্মীকি প্রতিভা, তাসের দেশ ইত্যাদি নাটক ইতিমধ্যে মূল ভাষায় পাঠ করিয়া ফেলিয়াছেন, যাহা তাঁহার চেখভ এবং ইবসেন নামক ওপর দুই প্রতিবেশীর অসূয়ার কারণ হইয়াছে।

আলোচনায় বুঝিলাম থিয়েটার অফ দ্য অ্যাবসার্ড নামক বাক্সটিতে গণ্ডার নামক কালজয়ী নাটকটির পরিণত কলেবরটি আর ধরিয়া রাখা সম্ভব হইতেছে না। এই নাটক নাট্যকারের জীবন অভিজ্ঞতা সম্পৃক্ত, তিনি স্বচক্ষে নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের উত্থান দেখিয়াছেন, তিনি জানেন পরিচিত ও প্রিয় মুখশ্রীগুলির অকস্মাৎ হিংস্র রূপান্তর কীরূপে সংঘটিত হয়। এই নাটক সেই অভিজ্ঞতার রূপক মাত্র। এই গণ্ডারেরা নানা প্রকার, এই আখ্যানের চরিত্রগুলির মতো তাহারা কেহ যুক্তিবিদ, কেহ উচ্চ শিক্ষিত, কেহ হরিপদ কেরানি, কেহ হেড অফিসের শান্ত বড়বাবু, কেহ প্রগতিশীল রাজনীতিক কেহ বা অতি সামান্য মনুষ্য বিশেষ। গণ্ডারদশা তাহাদের একসূত্রে বাঁধিয়াছে, তাহারা একজাতি, একপ্রাণ একতায় বিশ্বাসী, তাহার ব্যতিক্রম সর্বশক্তিক্রমে রুধিতে তাহারা যূথবদ্ধ। তাহাদের জনসমর্থন বিপুল। প্রচার মাধ্যম তাহারা কব্জা করিয়াছে, তাহারাই প্রশাসন, তাহাদের কণ্ঠস্বরে সংগীতের সুষমা নিহিত!

ইওনেস্কো জানাইলেন ইদানীং ইউরোপে গণ্ডারজ্বরের প্রকোপ অনেক কম। যদিও ইতিউতি তাহারা জোট বাঁধিতেছে, জনাদেশ লইতেছে। তিনি এইবার স্বর্গের ট্রেন হইতে অবতরণ করিতেই দুইটি গণ্ডার নাকি তাঁহাকে বলিয়াছে, যথা হইতে আসিয়াছ, তথায় ফিরৎ যাও! তিনি নিয়মিত নিরানন্দবাজার ট্যাবলয়েডের পাঠক ইদানীং। বলিলেন, এই মুহূর্তে বঙ্গদেশে গণ্ডারেরা অতীব শক্তিশালী। অধুনা তথায় জিলায় জিলায় নগরে গ্রামে, নীলুবাবু লালুবাবুরা দলে দলে কাতারে কাতারে গণ্ডারে রূপান্তরিত হইতেছেন। প্রতিটি অসৎ ব্যক্তি গণ্ডার দশায় সততার এপিটোম হইয়া পুষ্পসম ফুটিয়া উঠে! এই নব্য গণ্ডারেরা শুধু বিড়াল নহে, মনুষ্য নিধনেও অতীব দক্ষ।

ইওনেস্কোকে আমি প্রশ্ন করিলাম, এই শ্বাসরোধী প্রতিবেশে কীসের আশায় বাঁচিবে বেরেঙ্গার নামক একক চাষা? তাহার প্রতিবাদ আদপেই মূল্যহীন! ইওনেস্কো তাঁহার স্থির দৃষ্টি আমাতে নিবদ্ধ করিলেন। তাঁহার অভিব্যক্তিতে প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধি। বলিলেন একদা বামাচারীরা এই ভুলের বশবর্তী হইয়া এই নাটক অপাঠ্য ভাবিয়াছিল। তাহারা বুঝে নাই যে একটি স্ফুলিঙ্গও এক অনপনেয় বহ্নি নির্মাণে সমর্থ হইতে পারে।

ওই সুরম্য নগরে তখন বৃষ্টিপাত হইতেছিল। দুইবিন্দু বারিধারা ইওনেস্কোর চোখে অশ্রুসম টলমল করিয়া উঠে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1755 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

6 Comments

  1. ইয়োনেস্কোর অ্যাবসার্ড নাটক নিয়ে অনেক তত্ত্বকথা করা যায় এবং বলাই বাহুল্য, করা হয়েছেও। নিরুপমবাবুর আলোচনার অভিমুখ একেবারেই তাঁর নিজস্ব। একজন নাট্যকর্মীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। অসম্ভব নাটকীয় ও জবরদস্ত অ্যাকশন-প্যাক্ট একটি রচনা। নতুন স্বাদ দেবে পাঠককে, দেবে ইয়োনেস্কোকে নিয়ে ভাবনার নতুন খোরাক।

    • অনেক ধন্যবাদ! একজন তুখোড় ফরাসীবিদের এই রচনা পাঠ এবং মন্তব্য এই মুহূর্তে আমাকে স্বদেশী মতে সপ্তম স্বর্গে এবং বিদেশি মতে নবম মেঘে অবস্থান করাচ্ছে!

  2. যতদূর মনে পড়ে গণ্ডার ভাষান্তরিত করেছিলেন সোমেনচন্দ্র নন্দী।

    • ঠিক বলেছেন। অনেক ধন্যবাদ মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। অন্তত আরও একটি অনুবাদ আছে বলে জানি, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়। ধন্যবাদ জানবেন।

  3. বাংলায় ভাষান্তরিত করেছিলেন সোমেন্দ্রচন্দ্র নন্দী। কাশিমবাজার রাজপরিবারের মানুষ। লেখাটি জরুরি। এই বঙ্গে গণ্ডারের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। ফ্যাসিবাদ দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। হ্যাঁ। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে যারা, সংখ্যায় কম হলেও আছে তো। এই আশা নিয়েই আছি।

    • অনেক ধন্যবাদ পড়বার জন্য। কাশিমবাজারের তথ্যটিও একদম ঠিক, আর বাদবাকিটুকু তো লেখাতে বলেছি!

আপনার মতামত...