লাল কাঁথা

লাজ্বাতুল কাওনাইন

 

–মতিচুর ও মতিচুর!

বাঁজখাই গলায় ডাকছে চায়না খাতুন, মতিচুরকে। কিন্তু ঘরে সম্ভবত সে নেই। তাই কোনও উত্তর এল না।

–…… পু….রে পাইলে না। সাতসকালে বাইর হইয়্যা যাইব। কতা নাই বাত্তি নাই। চায়না খাতুন এবার ডাক দিলেন দিলখাজকে।

–ওই চো…. দিলখাজ তুই আবার কই গেসোস!

দিলখাজ আশেপাশেই ছিল। তার সাহস কম। সে চায়না খাতুনের বিনা অনুমতিতে এক অণু নড়ে না। কিন্তু দিনরাত অকথ্য গালি খায়। তাতে অবশ্য সে কিছুই মনে করে না। এই পাড়ায় দুধের বাচ্চাদের শিক্ষাগত ভাষাই হল, অকথ্য গালি। তবে মতিচুরের অনেক সাহস। মতিচুরের আড়ালে চায়না খাতুন যতই গালিগালাজ করুক কিন্তু সামনে আসলে একদম পিঁপড়াটা হয়ে যায়। আর মতিচুরের ভিতর কিছু আছে। অনেক চুপচাপ। কথা বাড়তি বলে না। এই পাড়ার শিক্ষাগত যে গড় যোগ্যতা, সেই যোগ্যতায় তাকে পিএইচডি বলা চলে। খুব সুন্দর করে সাজতে পারে। ভদ্রলোকের মতো করে কথা বলতে পারে। সবচেয়ে বেশি রোজগার করে এনে দেয় চায়না খাতুনের হাতে। এই পাড়ার সব থেকে সুন্দর মানুষটা হল মতিচুর। ফর্সা, কালো, রেশমী চুল, ছিপছিপে লম্বা, চোখগুলাও কটাকটা। ইসসস, সবাই প্রেম করতে চায় মতিচুরের সঙ্গে। ও তো পাত্তাই দেয় না।

বেশ মেজাজ খারাপ করে দাঁত মাজতে মাজতে মুখের পেস্ট ছড়িয়ে দিল চায়না খাতুন, টিউবওয়েলটার পাশে।

–মতিচুর কই গেসে?
–পার্কে।
–ক্যা!
–আমি কী জানি!
–মাঙ্গী….. পু… কী জানোস ক!!! কিছুই জানো না। যাও তাইলে …..গা!

ভয়ে দিলখাজ রান্না করতে চলে গেল। চায়না খাতুনের ভালো হাত চলে। বেহুদা মারপিট শুরু করে। তবে আদরযত্ন তার থেকে বহুগুণ বেশি করে। আর যাই করুক, চায়না খাতুন ছাড়া তাদের বেঁচে থাকাটা একটা প্রশ্নবোধকে দাঁড়িয়ে যেত দিলখাজ বোঝে।

মতিচুর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক গাছের আড়ালে। দুইজন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। গাড়ি থেকে নেমে প্রতিদিন পার্কে হেঁটে, গেটে এসে ডাব কিনে খায়। দৃশ্যটা দেখতে বড় ভাল লাগে ওর।

বহুদিন ভেবেছে, একটু কথা বলবে তাদের সঙ্গে। আর বলা হয় না। ভদ্রমহিলাটা অনেক বেশি সুন্দর। হাঁটতে গিয়ে ফর্সা নরম গাল গোলাপী হয়ে যায়। মাথার চুল চুইয়ে ঘাম জুলফি বেয়ে পড়ে। এত ভালো লাগে দেখতে মতিচুরের। কী কথা বলবে ও, তাদের সঙ্গে। ওর মতো মানুষদের সঙ্গে, ওরা কি কখনও ভালো করে কথা বলে! নাকি এটা আসলে নিয়মবিরুদ্ধ। তবু আজ সাহস করে কাছে গেল। ওড়নাটা মাথায় টেনে নিয়ে, কিছু অংশ দাঁত দিয়ে কামড়ে মুখ খানিকটা আড়াল করল মতিচুর।

–আসসালামু আলাইকুম!

হকচকিয়ে তাকালে প্রায়বৃদ্ধ পুরুষ ও নারী জোড়া। ভদ্রলোকটি চরম বিরক্ত হল,

–এইগুলোর জ্বালায় পুরা ঢাকা শহর নোংরা হয়ে গিয়েছে। এই চলো চলো…

হঠাৎ মতিচুরের মেজাজ খুব চড়তে শুরু করল। তবু নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে বলল,

–সালামের উত্তর দিয়ে যান!

নারী সঙ্গীটা হতবাক হয়ে তাকাল। এত সুন্দর স্বরে এত সুন্দর করে একটা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কীভাবে কথা বলে। চিরচেনা এইসব মানুষদের সে শুধু গালিগালাজ আর খারাপ আচরণ করতেই দেখেছে। সে সালামের উত্তর দিল,

–ওলাইকুম আসসালাম।

মতিচুরের বুকের ভিতরটা কেমন ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাবে। কতদিনের সাধ এদের সঙ্গে কথা বলার। আজ সেটা হয়েছে। বিড়বিড় করে বলছে, হে খোদা তুমি আছ, আছ, আছ…..

পুরুষ সঙ্গীটা অনেক বিরক্ত হল,

–এগুলার সঙ্গে কথা কি আজব! রেহানা আসো তো… এখনই চাঁদাবাজি শুরু করবে। ঈদের সময়….

মতিচুর জোরে একটা গালি দিতে গিয়েও থেমে গেল,

–না টাকা চাইব না!
–তো কী?
–কিছু না। আপনারা যান!

অতিদ্রুত তারা হেঁটে চলে গেল। রোজায় ওরা ডাব খায় না। খেলে ভাল হত। আরও কিছুক্ষণ তাদের দেখা যেত। নীল একটা গাড়িতে উঠে তারা চলে গেল।

এই ভদ্রলোকের নাম আরশাদ জিহাদ। তার স্ত্রী রেহানা জিহাদ। ঢাকা শহরের বিশাল টাকাওয়ালা দশ জনের নাম বললে এদের নাম তালিকাভুক্ত হবার কথা। একমাত্র ছেলে শাওন জিহাদ। বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে, বাবার ব্যবসায় সাহায্য করছে। এই মোটামুটি এই দম্পতির পরিচয়। গল্পের প্রয়োজনে এর থেকে আর বেশিকিছু বলার নাই।

প্রতিদিন মতিচুর পার্কে আসে ভোরে। কিন্তু ওই দম্পতি আর আসে না। বোধহয় ভয় পেয়েছে। মতিচুর বাসা খুঁজে একদিন বের করল। লুকিয়ে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে সেটা বাসা নাকি ছোটবেলায় চায়না খাতুনের রাতের গল্পের কাল্পনিক রাজপ্রাসাদ! বাসা গেট সাজানো। খবর নিল এই বাসার ছেলের বিয়ে। খুব খুশি হল মতিচুর। বাসার ভিতর প্রবেশ করার একটা সুযোগ এল তাহলে।

বিয়ের আয়োজনের মাঝেই একদিন নিজের দলবল নিয়ে হাজির হল জিহাদ দম্পতির প্রাসাদের সামনে। নিরাপত্তা কর্মীরা আটকে দিল মতিচুর আর তার দলবলকে। সাংঘাতিক হইচই না করলে বাসার কর্তারা নামবে না। আবার ভিতরে প্রবেশও সম্ভব না। তাই মতিচুর প্রবেশের জন্য তর্ক বাঁধিয়ে দিল। নেমে এল এক রাজপুত্র। হাঁ করে তাকিয়ে আছে মতিচুর! রাজপুত্র দারোয়ানকে বলল,

–কী ব্যাপার কামরান চাচা?
–আব্বা, এই জারজের বাচ্চারা কি লাগাইছে দেখেন। বিয়াবাড়িতে চাঁদাবাজি করতে আইছে।
–আপনি সরেন!
–না আব্বা এরা সাংঘাতিক। এরা অভিশাপ দেয়। নয়া বিয়া, নয়া বাচ্চা হওয়া বাড়িতে গিয়া চাঁদাবাজি করে আর অভিশাপ দেয়।
–উফফফ! সরবেন!

শাওন বেশ চিৎকার করে বলে!

–হুম! কী ব্যাপার?
–বিয়ের বর কনের জন্য দোয়া করব। বকশিস চাইতে এসেছি আমরা হিজড়ার দল!

“আমরা হিজড়ার দল” কথাটা হুট করে কানে বাজল শাওনের। এত সুন্দর করে এইদেশে এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কথা বলতে পারে, ওর জানা ছিল না!

–আচ্ছা কত?

অপলক তাকিয়ে আছে মতিচুর, শাওনের দিকে। কি সুন্দর, কি সুন্দর!

–দিন যা হয়!

দশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল এগিয়ে দিল শাওন। ঠিক আছে, যাও!

মতিচুর সবাইকে সরে যেতে বলল! ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে গাড়ি করে ফিরলেন রেহানা আর আরশাদ!

–কী ব্যাপার গেটে?

হুট করে চিৎকার করে বোকার মতো মতিচুর বলল,

–আম্মা আসসালামু আলাইকুম!

ভুলটা সেখানেই ছিল বা ঘটনার শেষটা। সব ভুল কিন্তু শেষ হলেও মাঝেমধ্যে আপেক্ষিকতা ভেদে কারও জন্য অনেক কাঙ্ক্ষিত হয়ে যায়। যেমন, সেদিন পার্কের হিজড়া বুঝতে পেরে আরশাদ জিহাদ সাহেব ভেবে নিলেন, এরা ডাকাতের দল। এরা আরও বড় ক্ষতি করবে। তাই লোক দিয়ে ইচ্ছামতো মতিচুরকে মারলেন। শাওন আর রেহানার প্রতিবাদেও এক চুল সিদ্ধান্ত থেকে নড়েননি আরশাদ জিহাদ।

প্রচণ্ড ব্যথা জ্বর নিয়ে বিছানাতে বেঘোর দিন রাত কাটল মতিচুরের। পাশে আঠার মতো বাবা বা মা বা আত্মীয় হিসেবে বা একমাত্র আপনজনের ভূমিকায় শৈশব থেকে থাকা চায়না খাতুন বসে রইল। বার বার বলল,

–তোরে কতবার না করছিলাম রে। জোর কইর‍্যা সব জানলি। গেলি, মাইর খাইলি! হায় খোদা রে। আমার বাচ্চাগুলার একটার যদি কিছু হয়। ওই খা….

বেঘোরেও বকা শেষ করতে দেয়নি মতিচুর। ওদের কোনও অভিশাপ সে দিবে না, দিতে দিবে না। এটা কেমন একটা অন্যরকম আবেগ, ভালোবাসা। মতিচুর সত্যি অন্যরকম।

প্রায় মাস তিনেক পর রেহানা এল সেই পাড়াতে। মতিচুরের খোঁজে। চায়না খাতুন মুখ বিকৃত করে বলল,

–কী হইসে?
–একটা….

কী বলবে রেহানা ঠিক বুঝতে পারছে না। একটা ছেলে নাকি একটা মেয়ে নাকি একটা হিজড়া— কী বলে ডাকবে মতিচুরকে। অনেক কষ্টে সে মতিচুরের ঠিকানা জোগাড় করেছে। যতবার মতিচুরের সঙ্গে দেখা হয়েছে, ওর চোখটা বড্ড আপন লেগেছে রেহানার। অদ্ভুত চাহনি। খুব মারছিল যখন লোকে ওকে, ও তাকিয়েই ছিল উপরের বারান্দার দিকে। কাউকে খুঁজছিল। রেহানা জানালার আড়াল থেকে দেখছিল। বুকে অস্থির একটা অনুভূতি চেপে আসছিল। দম নিতে ছাড়তে শরীর ভারী হচ্ছিল। কিছু না… শুধু মতিচুরের চাহনিটা!

–কারে চান, মতিচুর?
–জ্বী!
–গেসে গা! মারছেন না আলা। আবার কী? চাক্কু ঢুকাইবেন ওর প্যাডে নাকি?
–না…..

এদের কী বলে ভাই বোন নাকি অন্য কিছু! রেহানা কতটা ভদ্রভাবে সম্বোধন করবে বুঝতে পারছে না।

–যান গা তো যান! ভদ্রলোকের গুও আমরা ঘিন্নাই।
–না শুনেন! এই কাঁথাটা ওকে দিবেন!
–কী????? ওই কি হুইয়্যা হাগব এইডিতে!!

চায়না খাতুন চরম ক্ষ্যাপছে।

–না! আসলে…

কান্নার উথলে আসা দমকে কথাটা শেষ হল না রেহানার। গাড়িতে উঠে গেল সেই দমকটা সঙ্গে নিয়েই। ঘরেই ছিল মতিচুর। উঠার ক্ষমতা নেই। মার খেয়ে তার মাথা ও বুকের ভিতরে অনেক ক্ষতি হয়েছে। প্রায়ই রক্তবমি হয়। বাঁচার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।  চায়না চায়নি আর এই অবস্থায় ওইসব অমানুষ বাপ-মাদের সঙ্গে তার অনেক আদরের পালিত কিন্তু আপনের চেয়েও বেশি মতিচুরের দেখা হোক।

সেই নকশি করা লাল কাঁথাটা বেঁচে থাকতে আর দেওয়া হয়নি মতিচুরকে। কিন্তু মারা যাবার পর, ওর লাশের মাথাটায় বেঁধে দেওয়া হল সেটা। থাক। চায়নাকে রেহানা শেষে বলতে পেরেছিল,

ওর জন্মের পর এই কাঁথাটা দিয়েই আমি ওকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম…

না বললেও জানত চায়না। মতিচুরও। তাইতো সেই মরণ টান!

জন্ম, মৃত্যু এক কাঁথাতেই গাঁথা হয়ে রইল মতিচুরের।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...