গিরীশের মতো একজন মানুষের চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটা বড় ক্ষতি

সন্দীপ রায়

 

গিরীশ কারনাড চলে যাওয়ার খবরটা শোনামাত্র বেশ কিছু পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ওঁর সঙ্গে আমাদের পরিবারের সখ্য বহুদিনের৷ বাবা ওঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। গিরীশ নাটক ও অন্যান্য লেখাপত্র বেরোলে বাবা তা সংগ্রহ করে পড়তেন৷ বাবার সঙ্গে ওঁর চিঠিপত্রেও যোগাযোগ ছিল। বাবাকেও অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন গিরীশও। মনে আছে, উনি যখন পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর অধ্যক্ষ ছিলেন, বাবাকে ওখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাবা গিয়েছিলেন। এছাড়াও বাবা ওঁর সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন ১৯৮১ সালে। সেবার নিউইয়র্কে বাবার ছবির একটা সম্পূর্ণ রেট্রোস্পেকটিভ-এর আয়োজন করা হয়েছিল। গিরীশ গোটা রেট্রোস্পেকটিভ-টায় উপস্থিত ছিলেন, একসঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, বাবার সঙ্গে ছবির বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছিলেন। তবে ওই নিউইয়র্ক-বাসের স্মৃতি ব্যক্তিগত কারণে আমাদের কাছে সুখের নয়। কারণ রেট্রোস্পেকটিভ চলাকালীন বাবার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বিশিষ্ট শিল্পনির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত নিউইয়র্কেই হৃদরোগে মারা যান৷ বাবা স্বাভাবিকভাবেই বংশীকাকুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন৷

সত্যজিৎ রায় এবং রাজ কাপুরের সঙ্গে গিরীশ কারনাড
ছবি: https://timesofindia.indiatimes.com/city/bengaluru/a-manthan-of-masala-art/articleshow/69734520.cms

গিরীশকে নিয়ে আমার পরের স্মৃতি কলকাতায়। ১৯৮৫ সালে আমি তখন দূরদর্শনের জাতীয় নেটওয়ার্কের জন্য ‘সত্যজিৎ রায় প্রেজেন্টস’-এর শুটিং করছি। তারই একটা স্লটে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভুল প্রতিশ্রুতি’ নামে একটা ছোটগল্প নিয়ে একটা শর্টফিল্ম করেছিলাম। হিন্দিতে নাম ছিল ‘প্রেমী’। তাতে গিরীশের একটি চরিত্র ছিল। গিরীশ ছাড়াও ছবিটায় অভিনয় করেছিলেন নীনা গুপ্তা এবং ফারুখ শেখ৷ গিরীশের কাজটা ছোট ছিল, মাত্র দেড়দিনের। আমরা তো প্রথমে বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম, ওঁর মতো অমন জাঁদরেল অভিনেতাকে সামলাতে অসুবিধা হবে কিনা, আমাদের কথা শুনে চলবেন তো! কিন্তু ওঁকে বলামাত্র এককথায় রাজি হলেন, নির্দিষ্ট দিনে কলকাতায় চলে এলেন এবং ইউনিটের সকলের সঙ্গে মিলেমিশে গেলেন শুধু তাই নয়, বাধ্য ছাত্রের মতো সমস্ত নির্দেশ মেনে কাজ করলেন এবং দুটো দিন সকলের সঙ্গে খোশমেজাজে কাটিয়ে গেলেন। শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও যে গিরীশ কত বড়মাপের, সেদিন বুঝেছিলাম।

গিরীশের মতো একজন মানুষের চলে যাওয়া তাই নিঃসন্দেহে একটা বড় ক্ষতি। ওই মাপের একজন পণ্ডিত, নাট্যকার, অভিনেতা ও নানা সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদে মুখর শিল্পী আজকের দিনে বিরল।

 

সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...