এই আমাদের শহরের হালচাল

শুভাশিস মুখোপাধ্যায়

 

এ বছরের বর্ষাকাল শুরু হল পানীয় আর চাষের জলের হাহাকার দিয়ে। উন্নয়নপন্থী রাজনীতিবিদদের একদল এই সময় অসম্ভব বিজ্ঞানবেত্তা বনে গিয়ে ঘটনাপরম্পরা ব্যাখ্যায় প্রাকৃতিক নিয়মের কথা বলে তাঁদের লাগামহীন দুর্নীতি, লোভ আর বেহিসেবি কাজকে আড়াল করার মরিয়া চেষ্টা চালান। আর এক দল এই ঘটনার পেছনে ঈশ্বরের হাত দেখতে পেয়ে যাগ-যজ্ঞের পরামর্শ দিয়ে নিজেদের কুকীর্তি আড়াল করেন। আম-জনতা পানীয় জল, চাষের জল, দৈনন্দিন ব্যবহারের জল না পেয়ে বিপন্ন হয়।

এখন আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি, সারা দেশের মানুষ চাতক পাখির মত আকাশপানে চেয়ে রয়েছে, ছিটে-ফোঁটা বৃষ্টির আশায়। ভারত সরকারের আবহাওয়া দপ্তর, ইন্ডিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল বিভাগ আমাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আশা-নিরাশার বাণী শুনিয়েছে, যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ তাদের গত জুন ২৫, ২০১৯-এর বুলেটিনে প্রদত্ত আশার বাণী। আরব সাগরের ধারে, ভারতের “গুজরাত মডেল”-খ্যাত রাজ্য, গুজরাতের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। ২৬-২৭ জুনের পর থেকে নাকি আর্থিক দিক থেকে “সুগঠিত” আমেদাবাদ ও তার সংলগ্ন অঞ্চল, অর্থাৎ উত্তর, মধ্য এবং দক্ষিণ গুজরাতের ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে মৃদু থেকে ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গোটা বারো ছোট-বড়-মাঝারি জল সংবহন তন্ত্র দিয়ে গুজরাতের যে প্রাচীন জল-ব্যবস্থা, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতা সম্পন্ন নদী-বাঁধ, সর্দার সরোবর প্রকল্প, যা আদতে কচ্ছ ও সৌরাষ্ট্রর মত শুখা তালুকগুলোকে নর্মদার জল থেকে বঞ্চিত করে আমেদাবাদের হোটেলগুলোতে জলের যোগান নিশ্চিত করার “উন্নয়ন”-এর কল! এত ভাল জলসম্পদ থাকা সত্তেও কেবল বেখেয়ালি জল-ব্যবস্থাপনার জন্য শুখা তালুকগুলো আজীবন শুখাই রয়ে গেল। মোহনার কাছে বাঁধ দেওয়ার এই অদ্ভুত উন্নয়নের চাপে পড়ে, দিল্লির সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ভারতের পরিবেশ ও বন দপ্তর এই নর্মদা প্রকল্পের কাজে গতি আনার ছুতোয় বিপুল অরণ্য ধ্বংসের ছাড়পত্র দিয়ে গেছে অতীতে, আজও দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দেওয়ার জন্য গোটা পঞ্চাশেক এমন অনুমতির আগাম আবেদন বন দপ্তরে বিবেচনার জমা পড়ে আছে। ভারতের পশ্চিম উপকূলে যত “উন্নয়ন-মূলক” কাজ বাড়ছে, আরব সাগরের গভীরে (জলতল থেকে নিচের দিকে এবং ভারতের স্থলভাগ ছাড়িয়ে তেল-সম্বৃদ্ধ দেশগুলোর দিকে) আবহাওয়ার অনিশ্চিত অবস্থা তত আমাদের জানান দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় “বায়ু” ভারতের পশ্চিম উপকূলের বর্ষার স্বাভাবিক আগমনকালকে বেশ কিছু দিন পেছিয়ে দিয়েছে। সারা গুজরাতের শুখা তালুকগুলোর গরিব মানুষগুলোর কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে ভারতের আবহাওয়া দপ্তর ঘোষণা করছে যে এই বছর বর্ষা যদিও আসতে দেরি করছে এবং করবে, তবুও “monsoon rains have covered most parts of cane, cotton, and soybean fields in western India and some parts of rice-sowing areas in central and northern India”। সারা দেশের বৃহৎ থেকে বড়-মাঝারি চাষিদের জন্য লক্ষ্মী যে সব “ক্যাস ক্রপ”, সেই আখ, তুলো এবং সয়াবিন চাষের কোনও অসুবিধা হবে না।

ছেলেবেলায় পড়া চেরাপুঞ্জি এলাকার কিম্বদন্তি-স্বরূপ বৃষ্টিপাতের কথা মনে হওয়ায় অব-হিমালয় অঞ্চলের পশ্চিমবঙ্গ, এবং উত্তর-পুবের সাতটি বোনের কথা মনে পড়ল। তাদের জন্য আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে খানিকটা এই রকমের ভবিষ্যদ্বাণী: আসাম, মেঘালয়, সিকিম সহ অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুরে এখনও তেমন বর্ষা আসেনি, তবে কয়েকদিনের মধ্যে এই সব অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষার সম্ভাবনা। এসব তো গেল সরকারি ভাষ্য, কিন্তু আসলে অঞ্চলটির বাস্তব অবস্থা ঠিক কেমন? বর্ষা পেছিয়ে যাওয়ায় মিজোরামের প্রত্যন্ত থেকে শহরগুলোর ধার-পাশ অঞ্চলে গত দু-তিন মাস জুড়ে শুরু হয়েছে পানীয় জলের তীব্র ও লাগাতার সঙ্কট। বর্ষা দেরিতে আসা, তীব্র দাবদাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বনাঞ্চল ও জলের উৎসগুলিকে ধারাবাহিকভাবে নষ্ট করে “উন্নয়ন”-এর “জোয়ার” আর তার “হোমাগ্নি”-তে আহূতি হিসেবে যোগান দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণে গাছ। ফল ফলতে দেরি হয়নি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে যে এবছর জুন ১ পর্যন্ত পুরো উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে (সিকিম বাদ দিয়ে) স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হয়েছে। গত পাঁচ-সাত বছরে এই সময়ে এই অঞ্চলে যেখানে গড়ে ২৮১ মিমি বৃষ্টি নথিভূক্ত হয়েছে, সেখানে এই বছরে সেই সময়সীমায় বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত মাত্র ১৬৭ মিমি।

বৃষ্টিপাতের সঙ্গে খাদ্য-সুরক্ষার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের কৃষিক্ষেত্রের প্রায় ৫০ শতাংশ চাষের জন্য বৃষ্টির জলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ভারতে গত অর্ধ-শতাব্দী ধরে বর্ষাকালের সময় ধরা হয়ে আসছে জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের প্রায় তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত, সঙ্গে ধরা হয় নভেম্বর মাস পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র বর্ষাকাল বা “মাইনর মনসুন”। মূল বর্ষাকালে আমাদের দেশের বর্ষার জলের কম-বেশি ৭০ শতাংশ পাওয়া যায়। এই জলের ওপরই আমাদের দেশের মূল এবং প্রধান কৃষিকাজ নির্ভরশীল। অর্থনীতির দিক থেকেও এই বর্ষার বিষয়টি তাচ্ছিল্য করার বস্তু নয়— ভারতের যে বুকের ছাতি ফোলানো বহু-বিজ্ঞাপিত আড়াই বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির আয়তনের কথা শুনি, তার প্রায় ১৫ শতাংশ আসে এই বর্ষা-নির্ভর চাষ থেকেই, যে ক্ষেত্রটিতে ভারতের প্রায় দেড় মিলিয়ন কৃষিকর্মীর কর্ম-সংস্থান হয়। ভারতের কৃষি অর্থনীতিবিদরা এবং কৃষিবিশেষজ্ঞ্ররা জোর গলায় বলে আসছেন যে বর্ষা একটু দেরিতে এলেও পরের দিকের ভারি বর্ষা শেষ পর্যন্ত কৃষিতে জলের ঘাটতি পুষিয়ে দেবে, কিন্তু ভারতের জল-সম্পদমন্ত্রী মশাই স্বয়ং সে হাঁড়িটি প্রকাশ্য হাটে ভেঙে দিয়ে বলে বসেছেন কৃষিতে জলের ঘাটতির কারণে ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য রপ্তানি কমবে, অর্থাৎ এই খাতে দেশে বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি দেখা দেবে!

এই বৃষ্টির ঘাটতি বা প্রাবল্য ভারতের শহর ও নগর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে গত বেশ কয়েক দশক ধরে।

জুলাই ২৬, ২০০৫। স্মৃতিশক্তির ওপর মৃদু চাপ দিলেই অনেকের মনে পড়বে ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী, মুম্বই শহরের সেই ভয়ঙ্কর দুপুরটির কথা। দুপুর দুটো। সারা শহরের মাথায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির তোড়ে মুম্বই মিউনিসিপাল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জলপ্লাবিত হয়ে গেল মিনিট কুড়ির মধ্যেই। মুম্বই শহরের জীবনদাত্রী তিনটি শহরতলির রেলপথে জল দাঁড়িয়ে গেছে, রেল চলাচল বিপর্যস্ত। কুরলা স্টেশন উপচে জল নেমে এসেছে রাস্তায়। ঘড়িতে তখন দুপুর দুটো বেজে তিরিশ মিনিট।

মুম্বই শহরের সেইভাবে শহরতলি নেই বললেই চলে, দুপাশে সমুদ্র দিয়ে বাঁধা শহর বেড়েছে লম্বায়, বেখাপ্পাভাবে। মাহিম, থানে, লোয়ার প্যারেল, ভিলে পার্লে প্রভৃতি স্থান থেকে বাড়ি ভেঙে পড়ার খবর আসছে। মুম্বইয়ের “পশ” এলাকার বহুতল বাড়ির গ্যারাজে ভাসমান গাড়ির সারি, ভূগর্ভস্থ খাবার জলের রিসার্ভারে রাস্তার জল ঢুকে শুরু হয়েছে পানীয় জলের সঙ্কট। হাঁটু বা কোমর জল ঠেলে দপ্তর থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন দলে দলে মানুষ অঝোর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। আবহাওয়া দপ্তরের বৃষ্টিপাত মাপার যে যন্ত্রটি সান্ত্রাক্রুজে রাখা আছে তাতে ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নথিভুক্ত হয়েছে ৯৪৪ মিমি, যা গত ১৫০ বছরের মধ্যে দেখা যায়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃষ্টি, অর্থাৎ ৭০৯ মিমি বৃষ্টিপাত ঘটে কেবল দুপুর আড়াইটে থেকে রাত সাড়ে সাতটার মধ্যে। শেষ হিসেব অনুসারে ৩০০০ বাড়ি ভেঙে পড়েছে, ৫০০০ জন মৃত, নিখোঁজের সংখ্যা অনিশ্চিত। বাচ্চাদের স্কুলে কয়েক হাজার বাচ্চা আটকে ছিল দিন দুই। মহারাষ্ট্র সরকার পরের দুদিন মুম্বই ও শহরতলির সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বলে ঘোষণা করে। মুম্বই পুরসভার হিসেব অনুসারে শহরের স্থলভাগের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জলের তলায় চলে যায়। মুম্বই পুরসভা তাদের পরিকল্পনার ঘাটতি ঢাকতে এবং মুম্বই শহরের উন্নয়নের নামে অপ-উন্নয়নের দিক থেকে দুর্গত মানুষের চোখ ফেরাতে “দুর্ভাগ্য”, “অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা” ইত্যাদি বলে অবস্থার সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু এই সব অপযুক্তি শেষ পর্যন্ত ধোপে টেঁকেনি। ইতিহাস বলছে যে অতীতে এই প্রদেশে সমতুল্য বৃষ্টিপাতে জনজীবন এমনভানে বিপন্ন হয়নি। তখন এই প্রদেশে বা মুম্বই শহরে চোখধাঁধানো চমকপ্রদ “উন্নয়ন” প্রকল্পগুলি চালু হয়নি, সমুদ্রের খাড়িগুলি ছিল সজীব। আর এখন? যত্রতত্র আকাশছোঁয়া বাড়ি, বাড়ির ছাদে সুইমিং পুল, সমুদ্রের ওপর দিয়ে লম্বা ফ্লাইওভার, জলাশয় বোজানো, গাছ কাটা, হোটেল, অপ্রতুল নিকাশি ব্যবস্থা জেনেও বেখাপ্পা অফিস-শোরুম নির্মাণ শহরটিকে গত শতকের শেষ থেকেই বিপন্ন থেকে সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে।

মহারাষ্ট্র সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের সচিবের বয়ান থেকে যা জানা গেছে তা খানিকটা এইরকম: সরকারের কাছে এমন ভয়ানক বর্ষা যে আসন্ন, তার কোনও আগাম সতর্কবার্তা ছিল না, ফলে সকারের হাতে যে বিপর্যয়-মোকাবেলা পরিকল্পনা ছিল তা মোটে শুরুই করা যায়নি। বিভিন্ন সূত্রে সব নজরদারিই ব্যর্থ হয়েছে। এই বিপদের কথা প্রশাসন প্রথম জানতে পারে যখন থানে জেলার উলহাস নদীর ওপর যে ব্যারাজটি আছে সেখান থেকে বিপদ সঙ্কেত আসে। এই বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে এই ব্যারাজের জলস্তর সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে ৭০ ফুট তলায় ছিল, সেটি ২৬ তারিখ বিকেলে সর্বোচ্চসীমা ছাপিয়ে যায়। ২৭ তারিখ সকালে জলের তোড়ে ব্যারাজটি ভেঙে পড়ে। পরে এই ভাঙনই আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠে। কালিনা অঞ্চলে মিথি নদীর পাড় বুজিয়ে একটি বেসরকারি মালিকানার সংস্থা বেশ কয়েকটি বড় বড় উড়োজাহাজের “রানওয়ে” বানিয়েছে যা ঐ অঞ্চলের প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। সমুদ্র বুজিয়ে যেমন একদিকে স্থলভাগ বাড়িয়ে তা নির্মাণকাজের জন্য বেসরকারি প্রোমোটারদের হাতে তুলে দিচ্ছে সরকার, আবার অন্য দিকে শহরের যাবতীয় খোলা জায়গা বেচে দিয়ে মুম্বই পুরসভা তার আয় বাড়াতে চাইছে। এই বিষয়ে মহারাষ্ট্র সরকারের তৎকালীন পরিবেশ দপ্তরের মন্ত্রীমশাই এই শতাব্দীর সম্ভবত সেরা উক্তিটি করে বসেন, তাও আবার মুম্বই-এর এই বিধ্বংসী বন্যার ঠিক তিন সপ্তাহের মাথায়। মুম্বই পুরসভার বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা কমানোর জন্য তাঁর দাওয়াই মুম্বই শহরের ফাঁকা জায়গা, যেমন মহালক্ষ্মী রেসকোর্স, অ্যারে মিল্ক কলোনি, যত পার্ক, বাগান, নুনের ভাটি, ম্যানগ্রোভ— সব বেসরকারি প্রোমোটারদের হাতে দিয়ে দেওয়া হোক। তাহলে পুরসভার কোষাগারে ১,১০,০০০ কোটি (হ্যাঁ, কোনও ছাপার ভুল নেই, কোথাও কোনও শূন্যের গোলমাল নেই!) টাকা আসবে আর সেই টাকা খাটিয়ে আরও উন্নয়ন হবে এবং বন্যা পরিস্থিতির উন্নত মোকাবেলা করা যাবে।

নয়া উদারনীতি এবং তার বিপর্যয়কারী দিকগুলি মুম্বই-এর জন্য যতটা খোলাখুলিভাবে সামনে আসছে, তা সম্ভবত আর কোনও ক্ষেত্রে এতটা সামনে আসেনি। নয়া-উদারনীতি চালিত উন্নয়নের জন্য দরকার নির্মাণ-সামগ্রী, দরকার সিমেন্ট-বালি-পাথর, অন্যথায়, বালি-খাদান, পাথর-খাদান, সিমেন্ট কারখানা। বালি খাদানের চাপে মুম্বই-এর ম্যানগ্রোভ অঞ্চল প্রায় নিশ্চিহ্ন, ফল হয়েছে সমুদ্রের নোনা জল দিয়ে মিঠা জলের উৎসগুলি দূষিত হচ্ছে। পাথর-খাদান ধ্বসের জন্ম দিয়েছে, দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে এই বিপদ বাড়বে। ২০০৫ সালে সাকি নাকা ধ্বস সেই বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছে, তারপর আরও ১২৫টি এমন ছোট-বড় ঘটনা ঘটেছে, পরিহার্য মৃত্যুর মিছিল ক্রমবর্ধমান। ২০০০ সালের জুলাই মাসে এমন এক বিধ্বংসী বন্যার পর তৈরি হওয়া কমিটি যে সব সুপারিশ করে, তাতে ১৭টি বিষয় ছিল। কিন্তু সেই সুপারিশের মাত্রও ২টি রূপায়িত হয়। রানি যাদব কমিটির সেই সুপারিশে সুস্পষ্ট ভাষ্য বলা ছিল যে, সব সুপারিশ কার্যকর করা না গেলে পরবর্তী বন্যায় শহরের মানুষ কেমন বিপদে পড়তে পারে। মুম্বই শহরের সাধারণ নাগরিকদের দুর্ভাগ্য যে সেই শহরের পুরসভার কর্তাব্যক্তিরা উৎকোচের বিনিময়ে বেসরকারি মাফিয়াদের হাতে শহরের সম্পদ তুলে দিতে যতটা তৎপর, তার কণামাত্রও তৎপর নন সরকারি সুপারিশকে কাজে রূপান্তরিত করে জনজীবনকে বিপন্নতার হাত থেকে রক্ষা করতে! রানি কমিটির সুপারিশে যে যে বিপদের কথা বলা হয়েছিল, প্রায় তার হুবহু প্রতিফলন দেখা গেছে ২০০৫-এর বন্যায়। ২০১৭-র ২৯শে অগাস্ট মুম্বই শহর আবার ভেসে যায়, কারণ সেই একই। এই বছর জুন ২৮ (২০১৯)-এ মুম্বই শহরের অবস্থা একইরকম। মুম্বই পুরসভা তার ওয়েবসাইটে মুম্বইবাসীদের টুইট করে জানিয়েছে যে তারা অসহায়, জল সরাতে তাদের বেশ খানিকটা সময় লাগবে। এই মধ্যেই ট্রেন বাতিল, রাস্তায় গাড়ির সারি, উপচে পড়া নর্দমা, সব মিলিয়ে মুম্বই-এর চেহারার বদল হয়নি কিছুই। সত্যি কি? শহরের আরও অনেক পরিষেবা বেসরকারি হাতে গেছে, শহরের খোলা জায়গা কমেছে আরও, আরও বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক খাড়ি বুজিয়ে উন্নয়ন হয়ে চলেছে। মিথি নদীর মুখ সরু করে বড় বড় ফ্লাই-ওভার বানানো, খাড়ি বুজিয়ে হাইওয়ে, মাতা বসুমতী এমনতর অনাচার আর মুখ বুজে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন ক্রমশই। রাজনীতির দুর্বৃত্ত মানুষদের লোভ আর মুনাফার জন্য বলি হচ্ছেন সাধারণ মুম্বইকাররা।

এবার নেমে আসি মন্দিরের শহর, পল্লভ বংশের চিহ্নবাহী চেন্নাই শহরের কিসসায়। ব্রিটিশ আমলের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির চেহারা নিয়ে অনেক ব্রিটিশ গবেষক মাথা ঘামিয়ে সিদ্ধান্তে আসেন যে তৎকালীন মাদ্রাজ শহর, যা আজকের চেন্নাই, তা আদতে প্লাবনভূমি। এই কারণেই হয়তো বা শহরটির চারপাশ ঘিরে ছিল অগুনতি জলাভূমি, খাড়ি, ছোট-বড় জলপ্রবাহের নানা রাস্তা। এই সব অঞ্চলগুলি অতীত এবং অনতি-অতীতে শহরের বাড়তি জল সহজেই ধরে রাখতে পারত। তারপর এল উন্নয়নের মায়াহরিণ, আর তার হাতছানিতে সাড়া দিল প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি তামিলনাড়ু এবং তার প্রধান শহর চেন্নাই। সমুদ্রের পাড়ে অবস্থান করা আর পাঁচটা শহরের মতো চেন্নাই-এর বৃদ্ধি ঘটেছে লম্বালম্বি, শহর কেবল বাড়তে পেরেছে পশ্চিম আর দক্ষিণ বরাবর। সারা পৃথিবীর তথাকথিত “আইটি বুম”-এর ধাক্কা লাগল এই শহরেও, ২০০০ সালের আশপাশে। আই টি পার্ক, বড় বড় টাওয়ারওয়ালা বাড়ি, ডিস-অ্যান্টেনা বসানোর জন্য উপযুক্ত “এলিভেশন”, সুসজ্জিত অফিস, কর্মীদের জন্য হাউসিং, বিদেশী পরামর্শদাতাদের থাকার জন্য ইউরোপীয় অ্যাপার্টমেন্ট, সঙ্গে জুটল ফাউ হিসেবে কেলগ, ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি আর শপিং মল। বড় বড় রাস্তা, প্রচুর ফ্লাইওভার, প্রচুর গ্যারাজ …। উন্নয়নের বন্যা। আর তার হাত ধরে এল জলাভূমি ধ্বংস, শহরের বেখাপ্পা বৃদ্ধি। কেমন? একটা-দুটো হিসেব দেওয়া যাক।

২০০০ সালে চেন্নাইয়ের পুরসভা এলাকা যতটা ছিল, উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে সেই এলাকার বৃদ্ধি ঘটে প্রায় চার গুণ। এই বাড়ার অন্যতম মূল কারণ ছিল এই আইটি বুম। ফুলের কাছে মধুমক্ষিকার মত লগ্নিকারী এবং চাকুরিপ্রার্থীদের চেন্নাই শহর আকর্ষণ করে। চেন্নাই শহরের জনসংখ্যা ৫ কোটি ৮০ লক্ষ (২০০১ সালে) থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ কোটি ৯০ লক্ষ (২০১১)। কথায় বলে, বাঘ থাকলেই ফেউয়ের দেখা মিলবে, ঠিক তেমনি আইটি-র হাত ধরে আসে সিমেন্ট কারখানা, দূষণ সৃষ্টিকারী অ্যাসিডের শিল্প, এন্নোরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা “সেজ”। শহরের খোলা জায়গা কমতে থাকে আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে আধুনিক শহরের চিহ্নবাহী কংক্রিটের অরণ্য। ১৯৯১ সালে, নয়া উদার অর্থনীতির সেই শুরুর দিকে এই শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ এই সিমেন্টের জঙ্গলে ঢাকা ছিল, আর ২০১৩ সালে সেই সিমেন্টের জঙ্গল শহরের প্রায় ৬৫ শতাংশ গিলে খেয়ে নেয়। চেন্নাই শহরের নাগরিক বর্জ্য ফেলার জন্য বাছা হয় শহরের বাইরের জলাভূমিগুলোকে। এই জলাভূমিতে জমতে থাকা বর্জ্য পদার্থ ক্রমে ক্রমে চুঁইয়ে ভূমিজলকে দূষিত করে তোলে। চেন্নাইয়ের পানীয় জলের সঙ্কট এবং শহুরে প্লাবনের সঙ্কট তাই বলা যায় পয়সার এপিঠ আর ওপিঠ।

অতীতে এই শহরের বাইরে যে সব বাদা আর জলাভূমি ছিল, তাদের মধ্যে যে কটা এখনও টিকে আছে, তাদের অবস্থান হল শহরের দক্ষিণ দিকে কম-বেশি ২০ কিমি দূরে। এই পালিকার্নি নামের বাদা অঞ্চলটি অতীতে এবং খানিকটা আজকেও বৃষ্টির ফলে শহরে যে অতিরিক্ত জলের যোগান ঘটে সেটিকে আত্মস্থ করত বা করে। ১৯৮০-র মাঝামাঝি সময়েও এই অঞ্চলটি প্রায় ২৫০ বর্গ-কিমি পরিমাণ জল ধরে রাখতে পারত।  ১৯৪৭-এ এই বাদা অঞ্চলের মোট ক্ষেত্রফল ছিল প্রায় ৫ হাজার হেক্টর, যা উন্নয়নের গুঁতোয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০০ হেক্টর। স্বভাবতই, এই অঞ্চলের জল-ধারণ ক্ষমতাও কমেছে সমান তালে।

এই অঞ্চলটিকে তামিলনাড়ু সরকার তার যাবতীয় “উন্নয়নমূলক” কাজের জন্য লভ্য জমির ব্যাঙ্ক হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তারা রেল দপ্তরকে মাস র‍্যাপিড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম-এর জন্য জমি দেয়, জমি দেয় ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ওসান টেকনোলজিকে। সমুদ্র থেকে বেশ খানিকটা দূরে অবস্থান করলেও সেন্টার ফর উইন্ড টেকনোলজিও এখানে দিব্য স্থান পেয়ে যায়! ২০০২ সালে তামিলনাড়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ একটি সমীক্ষা করে দেখে যে এই অঞ্চলের আদি জলাভূমির ৯০ শতাংশই গায়েব হয়ে গেছে নানানরকম সন্দেহজনক উন্নয়ন কর্মের কারণে।

এই ২০০২ সাল থেকেই চেন্নাই শহরে ছোট-বড় বন্যা ঘটতে থাকে। কেন, সে খবর লুকিয়ে আছে শহরের এই বেখাপ্পা বেড়ে ওঠা এবং “রিয়েল এস্টেট বুম”-এর মধ্যে। আজকের চেন্নাই শহরকে দেখলে সেকালের, সপ্তদশ শতকের ঘুমন্ত চেন্নাই শহরকে চেনাই যাবে না। করমণ্ডল উপকূল অঞ্চলে বেশ কটা জেলেদের গ্রামের সমাহার ছিল মদ্রসপ্তনম নামের সেদিনের বালিকা চেন্নাইতে। কোলকাতায় যেমন জোব চার্নক এসে গ্রামকে শহরে বদল করে দিলেন কুঠি আর দুর্গ বানিয়ে, চেন্নাই শহরও তেমনি গড়ে উঠল সমুদ্রের ধারে সেন্ট জর্জ দুর্গকে কেন্দ্র করে, সেই ১৬৪৪ সালে। চেন্নাই শহরে ক্রিশ্চান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ঐতিহাসিক কারণেই ভারতের অন্যান্য মেট্রোপলিটান শহরের তুলনায় বেশি বলা যায়। হয়তো এই বা অন্যান্য নানা কারণে এই শহরে গত কয়েক দশকে বিদেশ থেকে প্রায় এক লক্ষ মানুষ এই শহরে পাকাপাকিভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে থেকে গেছেন ও ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত এই শহরটি ভারতের অন্যান্য মেট্রোপলিটান শহরের থেকে বাসিন্দাদের কাছে অনেক সুরক্ষিত বলে প্রতিভাত হয়। এই সব জটিল কারণে এবং মূলত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানিতে ভারত সরকার এই শহরটিকে “স্মার্ট সিটি” বলে ঘোষণা করে সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে আর শহরটিতে, যাকে বলে “রিয়েল এস্টেট বুম” এসেছে, আর যেখানেই এই রিয়েল এস্টেট “ব্যবসা” জাঁকিয়ে বসেছে, সেখানেই তা ঘটেছে শহরের পরিবেশ-প্রতিবেশের একেবারে অপ্রত্যাহারযোগ্য ক্ষতি করেই।

ভারতের অন্যান্য শহরের চেয়ে চেন্নাইএর কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। চেন্নাইয়ের বাড়ি বা জমি-জমা সংক্রান্ত সম্পত্তি বেচা-কেনার বাজারটি যে কেবল বিপুল তাই নয়, সেটি অনেকাংশেই বর্তমান প্রয়োজন-ভিত্তিক। যারা জমি-বাড়ির ব্যবসা করে শুধু তারাই নয়, আরও অনেক খোঁজ-খবর রাখা মানুষও চেন্নাইয়ের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার এই সব খবর রাখে। আইটি সহ আরও নানান কিসিমের শিল্প বা ব্যবসা এই শহরে থাকায় সর্বদাই চাকুরিজীবীরা এবং তাঁদের পরিবার শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, আবার চাকুরিসূত্রে বহু মানুষ শহরটায় ভিড় জমাচ্ছেন। জমি-বাড়ি হস্তান্তর তাই এখানে হয় অপেক্ষাকৃত দ্রুত, যা কিনা রিয়েল এস্টেট বুমের অন্যতম প্রধান কারণ।

১৯০৩, ১৯১৮ বা ১৯৪৩-এর চেন্নাইয়ের বন্যা তীব্রতার দিক থেকে এখনকার মত ভয়াবহ না হলেও এই ঝড়-বৃষ্টি-বন্যার ফলে নগর জীবন বিপর্যস্ত হয়, ট্রেন চলাচল থেমে যায়। চেন্নাইবাসীরা প্রথম সিরিয়াস বন্যার স্বাদ পান ১৯৭৬-এ, দেশে তখন অভ্যন্তরীণ জরুরি চালু থাকায় এবং সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় সারা দেশের মানুষ বন্যার ভয়াবহতা জানতে পারেনি। এই বন্যার দাপটে মানালি অয়েল রিফাইনারির এমন ভয়ানক অবস্থা হয় যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে তলব করতে হয় এবং সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই কারখানার কাজ চালু রাখতে হয়। চেন্নাই শহরের পরবর্তী যে বন্যাটি সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে সেটি ১৯৮৫-র বন্যা। শহরের বন্যার ভয়াবহতা বোঝাতে একটি ঘটনার কথা বলাই যথেষ্ট। তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী এম জি রামচন্দন তখন থাকতেন রানভরম অঞ্চলে। বন্যার জল মুখ্যমন্ত্রীর বাসস্থানে প্রবেশ করলে সরকারি প্রশাসন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পত্নী শ্রী জানকিকে চেন্নাইয়ের সে সময়ের বিখ্যাত হোটেল, কন্নেমারা হোটেলে তোলেন। বলাই বাহুল্য, শহরের মানুষের যন্ত্রণার শেষ ছিল না, আম্মাতুর ও মাধাভারাম ডেয়ারি জলের তলায় চলে যায়।

২০০৫-এর বন্যার স্মৃতি এখনও অনেকের মনেই জাগরুক। সেই বছর অক্টোবর মাসে বঙ্গোপসাগরে এক প্রবল নিম্নচাপের ফলে তামিলনাড়ু ও চেন্নাই শহর ভেসে যায়। ৫০ হাজার মানুষকে বন্যাত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়।

দশ বছর পর, নভেম্বর ২০১৫-তে আবার চেন্নাই শহর বন্যার কবলে পড়ে। বন্যা হওয়া চেন্নাইতে প্রায় অবধারিত। ভারতীয় জাতীয় সড়ক এনএইচ৪৫ ও এনএইচ৪ কে জোড়ার জন্য যে বাইপাস নির্মিত হয়েছে, তা পূর্বগামী নিকাশি ব্যবস্থাকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। এর ফলে শহরের “পশ” এলাকা আন্না নগর, পরুর, ভানাগারাম, মাদুরাভয়াল, মুগাপ্পায়ের এবং আম্বাট্টুর অঞ্চলকে স্থায়ী বন্যা-প্রবণ করে তুলেছে। কোয়াম্বেডুতে যে প্লাবনভূমি ছিল, সেখানটিতে সরাসরি একটি বিরাট বাস টার্মিনাস গড়ে তোলা হয়েছে।

চেন্নাই যেমন বন্যার জন্য খবরের শিরোনামে এসেছিল, তেমনি আজকে আবার খবরের শীর্ষে এসেছে শহরটা আক্ষরিক অর্থে নির্জলা হয়ে যাওয়ায়। গত কয়েকদিন থেকেই সারা শহরে প্রবল জলকষ্ট, আর মানুষের এই দুর্দশার সময়ও দুই তামিল প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, এআইএডিএমকে এবং ডিএমকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলতে পারল না। সারা শহরে খাবার জল অমিল, প্রতিবেশী রাজ্য কেরল যখন ২০ হাজার লিটার জল পাঠনোর প্রস্তাব দিল, তখন তামিলনাড়ুর বর্তমান সরকার সে প্রস্তাব কার্যত খারিজ করে দিয়ে বিধাসভায় বিরোধীদের বিক্ষোভ সামলানোর চেষ্টা চালাল। চেন্নাই শহরের পানীয় জলের উৎস যে সব জলাধারগুলি, সেগুলি ক্রমাগত অনাবৃষ্টির কারণে শুকনো। শহরের জলাশয়, জলাভূমিগুলি উন্নয়নের বলি। কোলরিজের মত “নট এ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক” বলে বিলাপ করা ছাড়া চেন্নাইবাসীদের গতি নেই।

এই জলের আকালের ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে শহরের ২০১৫-র বন্যা, মানে লাগামছাড়া জলের লভ্যতার মধ্যেই। চকচকে-ঝকঝকে রাস্তা বানানোর উদগ্র তাগিদে চেন্নাইতে রাস্তা নিশ্ছিদ্র ইমারত সামগ্রী দিয়ে বানানো হয়েছে, ফলে চুঁইয়ে যে পরিমাণ জল ভূমিজলের পরিমাণকে সমৃদ্ধ করত সে রাস্তা এখন উন্নয়নের স্বার্থে রুদ্ধ। বন্যার হাত থেকে বাঁচতে কর্তাদের চটজলদি “সমাধান” ছিল (২০১৫তে) শহরের বাইরের যাবতীয় জলাভূমিকে একেবারে জলশূন্য করে ফেলতে হবে যাতে বন্যার জল ওখানে পাঠানো যায়। জলাভূমি জলশূন্য তো হল, কিন্তু তা পরিভাষায় যাকে বলে “রিচার্জ” করা তা আর হয়ে উঠল না। জলের ঘাটতির সেই শুরু। চেন্নাই শহর পানীয় জল এবং অন্যান্য ব্যবহার্য জলের জন্য সেই ঐতিহাসিক আমল থেকেই বাইরে থেকে জল “আমদানি”-র ওপর নির্ভরশীল। এক সময়ে সেই কুড্ডালোর জেলার ভীরানাম হ্রদ থেকে চেন্নাই, মানে তখনকার বড় গ্রাম মাদ্রাজের পূর্বসূরি, মদ্রসপ্তনমে পানীয় জল আসত। বর্তমানে, সমুদ্রের জলকে লবণমুক্ত করার প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার পানীয় জল তৈরির এক উচ্চাশাযুক্ত পরিকল্পনা করা হয়েছে। চেন্নাই অঞ্চলে এই আকালের বাজারেও সব মিলিয়ে গত বছর প্রায় ১২০০ মিমি বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সেই জল ধরে রাখার কোনও আয়োজন করার কথা কর্তাদের মাথায় আসেনি। তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন “আধুনিক” পদ্ধতি, যেমন সমুদ্রের জলকে লবণ-মুক্ত করা, নদী সংযোগের মাধ্যমে বাড়তি জল জোগাড়ের মত আষাঢ়ে পরিকল্পনা নিয়ে, কেননা সেখানে অনেক বৈধ ও অবৈধ টাকার লেনদেনের সুযোগ রয়েছে। ফল কী হয়েছে আর সাধারণ মানুষের দুর্গতি কেমন তা একবার দেখা যেতে পারে। বর্তমানে চেন্নাই শহর জলের জন্য নির্ভরশীল চারটি জলাধারের ওপর— চেম্বারম্বাক্কাম, পুন্ডি, পুঝাল, এবং চোলাভারাম।  এই চারটি জলাধারের জল চেন্নাই পুর এলাকার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জলের চাহিদা মেটায়। এই উৎসটি রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় চেন্নাই শহর আক্ষরিক অর্থেই নির্জলা হয়ে পড়েছে। চেন্নাই শহরের বস্তিবাসীর সংখ্যা শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ। এই অংশটি এখন পুরোপুরি পুরসভার প্রেরিত পানীয় জলের ট্যাঙ্কের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন। যাঁদের উপার্জনের জন্য সকালেই বেরিয়ে যেতে হয় এবং কাজ সেরে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, তাঁরা এই ট্যাঙ্কের জলের সুবিধা নিতে পারেন না, কেননা এই সরবরাহ সাধারণত আসে দুপুর নাগাদ। এঁদের অবস্থা শোচনীয়। গত সপ্তাহের গোড়া থেকে চেন্নাইয়ের ভোলবদলের প্রাণভোমরা, সেই আইটি ইন্ডাস্ট্রি পুনরায় না বলা পর্যন্ত তাদের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার ফতোয়া জারি করেছে। সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব কিছুরই কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরে “জল-জরুরি-অবস্থা” জারি হয়েছে বলা যায়।

লোকসভা ও রাজ্যসভায় চেন্নাইয়ের এই দুর্গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তত দুজন সদস্য অবস্থা সরেজমিনে বিচার করে বলেছেন, ভারতের একমাত্র শহর হল চেন্নাই, যেখানে ২০ লিটার পানীয় জলের মূল্য এক গ্রাম সোনার চেয়েও বেশি! অবস্থাটা এতটাই ভয়াবহ।

ভারতের কর্তাব্যক্তিরা গত কয়েক দশক ধরে জলের লভ্যতা ও তার ব্যবহার নিয়ে যে অবৈজ্ঞানিক নীতি নিয়ে চলেছেন, আজকে সেই বিষবৃক্ষের চারা প্রায় মহীরুহে পর্যবসিত হয়েছে। আমরা গ্রাম-শহর মিলিয়ে আমাদের জলের চাহিদার ৫০ শতাংশের ওপর মিটিয়ে থাকি ভৌম জল মারফত। মাটির তলা থেকে জল উত্তোলনে আমরা পৃথিবীতে একেবারে প্রথম, আমাদের উত্তোলনের পরিমাণ চিন ও মার্কিন দেশের মোট উত্তোলন যোগ করলে যা হয় তার চেয়েও বেশি। সংরক্ষণের কথা বললে কর্তারা শিউরে ওঠেন, নর্মদাপাড়ের গ্রামবাসীদের গ্রাম কে গ্রাম উচ্ছেদ করে জলাধার বানিয়ে সেই জল আমরা শহরের ফোয়ারায় ব্যবহার করে বলি “বিউটিফিকেশন”, যা দেখে দুর্বৃত্ত লগ্নিকারীরা দূষণ-প্রবণ শিল্পে এদেশে লগ্নি করবে! নীতি আয়োগ তার রিপোর্টে স্পষ্ট বলেছে চেন্নাইয়ের মত নির্জলা হতে চলেছে ভারতের আরও ২১টি শহর, এর মধ্যে পড়ছে আরও একটি আইটি হাব, ভারতের সিলিকন ভ্যালি, উদ্যান-নগরী, বেঙ্গালুরু এবং রাজধানী দিল্লি।

ভারতের ভৌমজল ক্ষয়ের হার বছরে ১০ থেকে ২৫ মিমি। ভারতে এখন সারা পৃথিবীর মিষ্টি জলের ভাণ্ডারের প্রায় ৪ শতাংশ রয়েছে, যা দিয়ে তাকে সারা পৃথিবীর লোকসংখ্যার যে ১৬ শতাংশ এই দেশে বসবাস করে তাদের জলের চাহিদা মেটাতে হবে।

আমাদের কর্তারা যে অষ্টাদশ শতকের জমিদারী কায়দায় চলেন, এবং তাঁদের পারিষদবর্গ ততোধিক বিলাস-ব্যসনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, তাতে ভারতের আমজনতা যদি শনির সঙ্কেত দেখেন তবে তাঁদের খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। সরকারি সব মিটিঙে বিসলেরির জলের বোতল দেওয়ার ইতর সংস্কৃতি চালু আছে, দিল্লিতেই, নীতি আয়োগের মিটিঙেই, যখন সেখানে জলসঙ্কট নিয়ে আলোচনা চলছে, বারান্দায় শোভা পাচ্ছে চার চারটি ওয়াটার কুলার, জল খাওয়ার জন্য কাচের গেলাসও মজুদ আছে। দু-তিন জন বিদেশি প্রতিনিধির সম্মানে ভোজে নিমন্ত্রিত হন শ-পাঁচেক মানুষ, ১৩৩টা পদ হয়। তারপর এঁটো থালা-বাসন ধুতে জলের হিসেবটা আর তাঁরা কষেননা। সেই ট্র্যাডিশন চলছে চলবে।

আমাদের কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতা নিয়ে কিছু না বললে গল্পটা ঠিক জমবে না। নিউ দিল্লি, নভি মুম্বই এসবের পাশে ফ্যাকাসে দেখানো কলকাতাকে রুজ-পমেটম মাখিয়ে বিশ্বের দরবারে হাজির করার জন্য এল রাজারহাট, নিউটাউন, সেক্টর ফাইভ। গ্রামের মানুষদের সেই ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কায়দায় উচ্ছেদ করে, মানে অ্যাকশন করে অ্যাকশন এরিয়া-১/২ ইত্যাদির পত্তন হল। মোট ফল? শহরে ভেড়ির মাছে যোগান কমেছে, কমেছে শাক-সব্জির জোগানও। ভেড়ি আর চাষের ক্ষেত ভোজবাজিতে পরিবর্তিত হয়েছে আধা-সিকি-ভিৎ-পর্যন্ত ওঠা বহুতল বাড়িতে, আর এলাকায় এলাকায় চলেছে দখলের লড়াই, কোন সিন্ডিকেটের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকা চিহ্নিতকরণের জন্য সংগ্রাম। মৃত্যু হচ্ছে স্কুলের, সদ্য কলেজে যাওয়া ছাত্রের।

রাজারহাট নিয়ে হিডকো-র নিজস্ব স্বীকারোক্তি:

The bulk of housing in the township is in the form of gated high rise apartment complexes. Given the lack of facilities, especially access to local produce markets and public transport, most apartments are not occupied. A number of these apartments are also purely for speculative investment purposes and given the real estate crash in 2008, there are few new buyers.

রাজারহাট-নিউটাউনের বহু ফ্ল্যাটের মালিক বহুজাতিক লগ্নি সংস্থা, যারা ক্রেতা হিসেবে বিক্রেতার সঙ্গে এই শর্ত করেছে যে তারা যেকোনও সময়ে তাদের নমিনি-কে স্বত্ব দিয়ে দিতে পারবে। ফলে একেকটা ফ্ল্যাট দশবার পর্যন্ত হস্তান্তর হয়েছে, কিন্তু কেউ বসবাস করছে না। বাড়িগুলির খুঁতগুলি ধরা পড়ছে না, পরে পরিভাষায় যাকে বলে “ওভারহেড” বেড়ে যাছে। অল্প পরিবার নিয়ে যাত্রা শুরু করার ফলে স্থায়ী বসবাসকারীদের ওপর খরচের বোঝা বাড়ছে, অনেকে তাই আবার তাদের পুরনো বাসস্থানে ফিরে আসছেন। সব মিলিয়ে যা দাঁড়াচ্ছে, এই নতুন কলকাতার অবস্থা দুর্গাপুরের টাউনশিপ বা কল্যানী টাউনশিপেরই চেহারা নিতে চলেছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...