ফাইনাল কাউন্টডাউন

সর্বজিৎ সরকার

 

রাত দশটায় কলকাতার রাস্তা এত ফাঁকা হয়ে যাবে এটা সে দশ বছর আগেও কখনও ভাবেতে পারেনি। কিন্তু এখন তো তাই হয়। অবশ্য কয়েকটা মোড় এখনও আছে, যেমন গড়িয়াহাট বা রাসবিহারী মোড়, হাজরা কিংবা উত্তরের শ্যামবাজার, যে জায়গাগুলো এই সময়েও জমজমাট থাকে। তবু, সে জায়গাগুলোর কথা আলাদা। সেগুলো তো ঠিক পাড়া নয়। মোড়। বেশ কয়েকটা রাস্তার মোড়, যেখান থেকে অন্য রাস্তাগুলো বেরিয়ে, ক্রমশই কিছুটা কাছের নয়ত কিছুটা দূরের মফস্বলের দিকে চলে গেছে। শহরটা ডুবছে, ধীরে ধীরে, ঠিক একটা ভাঙাচোরা বন্দরের মত যেন। কথাটা মনে হতেই কেমন হাসি পেল অর্কর। তাই তো ছিল শহরটা, একদম গোড়ার দিকে। বন্দর আর তার সঙ্গে লাগোয়া বাজার। বন্দরের চরিত্র আর বাজারের চরিত্র, যা হয়, তাই তো ছিল এই শহরেরও। অন্তত তলায় তলায়। ওপরে যতই বনেদিয়ানা দেখাক না কেন, সেটা যে আসলে বানানো, চোখ ঠার দেওয়া, মেকি, এটা কী নিজেও অনুভব করেনি সময়ে সময়ে! করেছে তো। তাহলে এখন? আস্তে আস্তে ডুবছে বলে হঠাৎ দরদ উথলে উঠল তার?

বন্দর আর বাজার। বাঃ! এটা সে ঠিকই ভেবেছে। ভিড় করে আসো, বেচো, কেনো, লাগাও, বেরিয়ে যাও। বেরিয়ে যাও; নাকি, ফুটে যাও? হ্যাঁ। ফুটে যাও-টাই ঠিক বোঝায়। এটা ভেবে আরও হাসি পেল তার। ফুটে যাওয়া একটা বেশ, একটা বেশ … নাঃ, এটাকে কী বলা উচিত, বুঝে উঠতে পারল না সে। সে যাই হোক, ফুটে যাওয়াটাই কিন্তু সত্যি। কেমন সব কিছুই হল। মানে বেসাতি আর কি! মুনাফাও হল, কমবেশি। কোনও কোনওদিন যা হোক, কিন্তু দায় থাকল না কোনও। পেছনে কি পড়ে রইল, সেটা বাঁচল না মরল, না কি আধমরা হয়ে পড়েই রইল, কী আসে যায় তাতে? বন্দরে নৌকো ভিড়িয়েছ, বাজারে এসেছ বেচতে, বেচার পরে একটু ফূর্তিফার্তাও হল, আবার কী চাই!

নৌকো ভেড়ানোর কথায় অন্য একটা ছবি মনে পড়ে গেল তার। অনেকদিন আগের যদিও। যখন তারা বড় হয়ে উঠছে সেই আশির শুরুর দিকের একটা দৃশ্য। প্রায় প্রতিদিন দেখতে পেত। যদিও ঠিক দশটায় নয়। আরও পরে, এগারোটা সাড়ে এগারোটার দিকে। যেহেতু রাতের সেই সময়টাতেই সে সাধারণত আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরত। রাসবিহারী এভিন্যুর যে জায়গায় তাদের পুরনো বাড়ি ছিল সেই রাস্তার মোড়ে। ততক্ষণে রাস্তা শুনশান হয়ে যেত। রাস্তার মাঝখানে ছিল ঘাসে ঢাকা ব্যুলেভার যার ওপরে ইস্পাতের ট্রাম লাইন স্ট্রিটল্যাম্পের আলোয় চকচক করত। দু একটা গাড়ি যেত আসত। ঠিক একটার সময় শেষ ট্রাম চলে যেত তার ট্রামজীবনের যত রুদ্ধ স্পিড, যা সে সারাদিন ধরে অন্য গাড়ি আর লোক চলাচলের কারণে চেপে রাখত, তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিয়ে। এই অবাধ স্বাধীনতা যে কত কামনার এই পৃথিবীতে, যে জানে সে জানে। অর্ক তখন সবে এই স্বাদ পেতে শুরু করেছে জীবনে।

এইরকম সব রাতেই সে দেখতে পেত তাদের। তাদের পাড়ায় ঢোকার মোড়টায় দাঁড়িয়ে আছে। দুজন। একজন মাঝবয়সী। অন্যজন খুব বেশি পনেরো কি ষোল। বয়স্কা মহিলার পরনে শাড়ি। হঠাৎ দেখলে মধ্যবিত্ত বাড়ির জেঠিমা কাকিমা মনে হবে। কিশোরী মেয়েটি বেশিরভাগ দিন ফ্রক অথবা স্কার্ট। ঝুলে খাটো। অর্ক লক্ষ করেছিল মেয়েটির দুধ সাদা উরু রাস্তার ঝাপসা আলোঅন্ধকারেও কেমন ঝিকিয়ে উঠছে। তার উরুর সুডৌল, সেই দুই নগ্ন থাইয়ের ইশারা, জানুর ঠিক পেছনের সামান্য টোল, ওই রাত এগারোটা, সাড়ে এগারোটার, ভদ্দরলোকের পাড়ার ঠাটবাটকে, সাজানো সভ্যতাকে, যেন নীরবে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে। রাস্তায় তেমন গাড়ি থাকত না অত রাতে। যাও বা যেত তাদের বেশিরভাগ ওদের দুজনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় স্পিড বাড়িয়ে দিত। দু একটা গাড়ি শুধু দাঁড়িয়ে পড়ত তাদের সামনে। জানলার কালো কাচ কিছুটা নামত। ভেতরের লোক কে আছে বোঝা যেত না। মহিলা এগিয়ে গিয়ে কথা বলতেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। কোনও কোনও গাড়ি দরজা না খুলেই চলে যেত। কোনওটা হয়ত দাঁড়িয়ে থাকত। স্টার্ট বন্ধ হত না। দরজা খুলে গেলে কিশোরী মেয়েটি উঠে পড়ত গাড়িতে। দরদাম না পোষালে খদ্দের নেবেই বা কেন; দোকানি বেচবেই বা কেন? গাড়ি অদৃশ্য হলে, অর্ক দেখত, মহিলা আস্তে আস্তে ক্লান্ত পায়ে আলোঅন্ধকার ফুটপাথ ধরে বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। একটা অদ্ভুত কথা মনে হত তার সে সময়। মেয়েটি গেল যে, ফিরবে তো ঠিক মত? পারবে তো ফিরতে?

অনেকদিন পরে অর্ক জানতে পেরেছিল মহিলা কিশোরীটির মা।

তো সে যাই হোক, আজ রাত দশটায় সে বেরিয়েছিল গড়িয়াহাট বাজার থেকে কয়েকটা রুমাল কিনবে বলে। হল না। বাজার যে আজকাল এত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়, তার ধারণাই ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এসেছিল ত্রিকোণ পার্কের কাছাকাছি। যদি একটাও দোকান খোলা থাকে, এই ভেবে। কিন্তু না। সবই বন্ধ। আর পুরো রাস্তাটাই কেমন গা ছমছমে আলো অন্ধকার মাখা। ফুটপাথ ধরেই সে হাঁটছিল। আর এখন ফুটপাথটা যেহেতু আগাগোড়াই সারিসারি হকারের স্টলে ঠাসা, আর তাদের ওপর দিকটাও ফুটপাথ জুড়ে ত্রিপল বা প্লাস্টিক দিয়ে পুরোটা ঢাকা, তাই সেই অন্ধকারে চলতে তার বেশ অসুবিধেই হচ্ছিল। মাঝে মাঝেই মোবাইল অন করে দেখতে হচ্ছিল রাস্তায় কোনও গাড্ডা আছে কি না।

ঠিক আছে। এবার বরং একটু দাঁড়ানো যাক। এতক্ষণ আমি, মানে অর্ক না, আমার হয়ে অন্য কে একটা যেন কথা বলছিল। কী যেন নাম লোকটার, সর্বজিৎ, না কি? যাই হোক। লোকটা থাকলেই আবোলতাবোল বানাতে থাকবে। এবার থেকে আমিই আমার কথা বলব। আমি কী দেখেছি আজ রাতে সেটা আমিই কেবল জানি। লোকটা বড়জোর নিজের মত একটা কিছু ব্যাখ্যা করত হয়ত। কিন্তু ব্যাখ্যা দিয়ে কী হবে! আসল কথা হল, ওই সময়েই রাস্তায় যখন একটাও দোকান খোলা নেই আমার ইচ্ছে করছিল কোথাও বসে একটা চা খেতে। চায়ের দোকান সব বন্ধ। বাধ্য হয়েই যখন আরও কিছুটা এগিয়েছি, দেখি একটা দোকান খোলা। যদিও বন্ধ হওয়ার মুখে। সারাদিনের বিক্রির হিসেব করছে। জিগেস করতে বলল, হয়ে যাবে। ঘড়ি দেখলাম, দশটা কুড়ি। চা নিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরিয়ে মোবাইলে ফেসবুক খুলেছি, হঠাৎ ডানদিকে রাস্তার ওপারে চোখ পড়ল।

চারপাশ বেশ অন্ধকার। ঝিম ধরা একটা হলুদ আলো, আবছায়া বাড়িগুলোর গায়ে লেপটে আছে। দেখে মনে হবে যেন এখনি তাদের গলা টিপে শ্বাসরোধ করবে। আগে অনেক গাছ ছিল এ রাস্তায়। এখন যা আছে, বেশিরভাগ মরা অথবা প্রায় শুকিয়ে আসা। মৃত্যুকে চেনা যায় তার পা টিপে টিপে এগিয়ে আসা নৈঃশব্দের অনুরণন দিয়ে। সে বাতাসে বিষ ঢালে। গাছ ও পাখিরা সেই বিষবাতাসের গন্ধ পায়, শিরায় আর স্নায়ুতে, আমাদের টের পাওয়ার ঢের আগে। শহরটা যে মরছে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। সেই আলোতেই চোখ পড়ল, ওপারের বাড়িটার দিকে। ঠিক বাড়িটা নয়। সেটা তো প্রায় অন্ধকারেই ঢাকা। শুধু বোঝা যায় বাড়িটা খুব পুরনো। ঝুলবারান্দায় কারুকাজ করা রেলিং। দোতলার সব দরজা জানলা বন্ধ। পাঁচিলের আড়াল থাকায় নিচের তলাটা দেখা গেল না। সব জানলাই বন্ধ। কাঠের জানলা খড়খড়ি দেওয়া। ভেতরে আলো জ্বললে নিশ্চই কিছুটা চুঁইয়ে পড়ত বাইরে। নেই যখন, তার মানে, ঘরে আলো জ্বলছে না। এরকম বাড়ি কি আগে দেখেছি এখানে? মনে পড়ল না। অথচ ছোট থেকে এ পাড়াতেই তো বড় হয়েছি। চোখে পড়েনি তো আগে। তার পরেই মনে হল, জ্বরা আর বার্ধক্য কখন কাউকে স্পর্শ করে আগে থেকে বোঝা যায় না। মানুষের ঘরবাড়ি মানুষেরই মত। নিঃশব্দে ক্ষয়ে যায়। যার যেমন আঘাত, যার যেমন বেদনার সাহচর্য, যে যেমন ক্ষতের জাদুঘর বানাতে থাকে নিজের জন্যে, তার বাড়িঘর, অলিন্দ, নিলয়ও তেমনিভাবে ক্ষয়। হঠাৎ দেখলাম বাড়িটার একটা জানলায় আলো জ্বলছে। প্রায় ঝাপসা একটা হলদেটে আলো। জানলাটা কাচের আর প্রায় মেঝে থেকে অনেকটা ওপর অবধি উঠে গেছে। এক পলকের জন্যে মনে হল জানলায় কে যেন দাঁড়িয়ে। সাদা শাড়িতে কোনও নারীমূর্তি। অবয়বটুকু শুধু বোঝা যাচ্ছে। তাও কেমন অস্পষ্ট। চারপাশ যেহেতু বেশ অন্ধকার তাই জানলার ওই আলোর দিকে নিজে থেকেই চোখ চলে যাচ্ছিল। কৌতূহল হল। নারীমূর্তি যেন এই দিকেই তাকিয়ে আছে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একবার। আমার চারপাশেও তেমন কোনও আলো নেই শুধু রাস্তার আলো ছাড়া। চায়ের দোকানের আলোও নিভিয়ে দিয়েছে। দোকানদার অপেক্ষা করছিল আমার চা শেষ হলে দাম নেবে বলে।

জিজ্ঞেস করলাম, “বন্ধ করবেন?”

“না, না, আছি এগারোটা অবধি। আরামসে খান।”

আবার আমার চোখ পড়ল জানলাটার দিকে। মহিলা সেই একইভাবে ওখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। আলো এসে পড়েছে পেছন দিক থেকে। ফলে তার মুখ চোখ কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনে হল যেন কোনও রহস্যময় পেইন্টিং দেখছি। নিকষ অন্ধকারের মধ্যে একটা ভাঙাচোরা বাড়ি; আর তার একটিমাত্র আলোকিত জানলায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অলৌকিক নারীমূর্তি, যার কোনওকিছুই এখান থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় না। হয়ত সে কারণেই চোখ ফেরাতে পারছিলাম না সেদিক থেকে।

সেই মুহূর্তেই হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হল। দেখলাম নারীর অবয়ব সরে গেছে। তার জায়গায় জানলার সেই আ্ধো আলো আর আধো অন্ধকার বর্গক্ষেত্রে অন্য কিছুর ছায়া ভেসে উঠেছে। ভালো করে নজর করতে চেষ্টা করলাম। অনেকগুলো মানুষের আকার। গায়ে গায়ে লেগে আছে। হালকা ছায়াছায়া। শুধু সকলেই যে পুরুষ সেটা বোঝা যাচ্ছে। লোকগুলো মনে হল একটা কাঠের সাঁকোর ওপরে দাঁড়িয়ে। মাথায় হেলমেট, হাতে রাইফেল। যেহেতু সবটাই ছাই ছাই পাঁশুটে রঙে ফুটে উঠেছে তাই মানুষগুলোকে ঠিক মানুষ মনে হচ্ছে না। একবার মনে হল ওটা কি তাহলে জানলা নয়? টিভির স্ক্রিন? তারপরই দেখলাম ছায়াগুলো ক্রমশ আয়তনে বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে একসময় জানলার ফ্রেম ছাড়িয়ে গেল। একজনকে মনে হল হাতে একটা চোঙা নিয়ে কিছু একটা বলছে। জোরে, চিৎকার করে। হঠাৎ হেলমেট পরা লোকগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। তার জায়গায় একটা কুয়াশা ঢাকা খালপাড় ভেসে উঠছে। সেখানে অসংখ্য মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে। সব ছবিটাই যদিও এখনও সেই একইরকম ছায়াছায়া। অনেক মানুষ। ভিড়ের মধ্যে প্রথম সারিতে মনে হল বাচ্চারা দাঁড়িয়ে। ঠিক তাদের পেছনেই মেয়েরা। আর সকলের পেছনে দাঁড়িয়ে পুরুষেরা। কারা এরা? জায়গাটাই বা কোথায়? আর কেনই বা রাসবিহারী এভিন্যুর একটা ভাঙাচোরা বাড়ির জানলায় তারা দৃশ্য হয়ে ভেসে উঠছে এত রাতে, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

একবার মনে হল, আমার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? না, তা তো নয়। এই তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে আছি। সামনে রাস্তা। তার ওপারে বাড়িটা। আর বাড়ির গায়ে সেই জানলাটা। সেখানে ততক্ষণে আবার সেই হেলমেট পরা ছায়ারা, হাতে বন্দুক, ফিরে এসেছে। মাইক হাতে লোকটা এবার শূন্যে হাত তুলে কি যেন চেঁচিয়ে বলল। আর তারপরেই স্পষ্ট শুনলাম, গুলির আওয়াজ। একটা নয়। একসঙ্গে অনেকগুলো। অনেকবার। ছবিটা তখনই ফের পালটে গেল। দেখলাম ভিড়ের মানুষগুলো যে যেদিকে পারে এলোপাথাড়ি ছুটছে। ছুটতে গিয়ে এ ওর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। ছুটছে। উর্ধশ্বাসে ছুটছে। তার মধ্যেই হঠাৎ দু একজন করে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। যেভাবে লাশ পড়ে ঠিক সেইভাবে। এতক্ষণ শুধু গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল; এবার তার সঙ্গে জড়ানো গলায় মানুষের তীব্র আর্তনাদ আর কান্নার আওয়াজও কানে এল। অনেক লোক একসঙ্গে চীৎকার করছে। সে আর্তস্বরে ভয়, আতঙ্ক আর বিলাপের একটা প্রবল ঢেউ যেন আমার কানে এসে আছড়ে পড়ছে।

আমি কি কোনও লাইট অ্যান্ড সাউন্ড-এর শো দেখছি? নাঃ! নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না। যা দেখছি তার সবকিছুই ঘটছে, এখন, এইখানে, আমার সামনেই। লোকগুলো পালাচ্ছে। পালাতে পালাতে মুখ থুবড়ে পড়ছে। হেলমেট পরা লোকগুলো এখন নেমে এসেছে তাদের মধ্যে। খালের পাড় উঁচু থেকে নেমে গেছে ঢালের দিকে। ঢালে ছুটে নামতে গিয়ে কয়েকটা মেয়ে পড়ে গেল। কয়েকটা হেলমেট পরা মাথা আর তাদের শক্ত কবজি মেয়েগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে খালের পাশের ধানজমির আড়ালে। এখন আর কোনও চীৎকার, কোনও আর্তনাদ, কোনও গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। জানলার ফ্রেম ছাড়িয়ে ভাঙাচোরা ইঁট বার হয়ে যাওয়া, পলেস্তারা খসা বাড়ির দেয়ালে, শান্ত ধান জমি দেখা যাচ্ছে। শুধু তার মধ্যেই কয়েকটা জায়গায় ধানের শীষ প্রবলভাবে নড়ছে, ঝাঁকিয়ে উঠছে, দুলছে, তারপর নেতিয়ে পড়ছে। আর কিছু দেখাও যাচ্ছে না, শোনাও যাচ্ছে না।

হেলমেট পরা লোকগুলো আবার সামনে চলে এল। এখন তারা মাটিতে পড়ে থাকা লাশগুলোকে টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মরা খালের দিকে। দু একটা বাচ্চা, মড়া বলেই মনে হল, মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল আলের পাশে। তাদের টেনে তুলে ছুঁড়ে দিল খালের কালো জলে।

ছায়াছায়া সব কিছুই। যেভাবে হঠাৎ এসেছিল সে ভাবেই আবার কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। যাওয়ার সময় সামনের রাস্তায় একটা গাড়ি প্রচণ্ড স্পিডে বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে চলে গেল। তার হেডলাইটের আলো পুরনো বাড়িটার গায়ে ঠিকরে উঠতেই দেখলাম সেখানে বড় বড় করে একটা সংখ্যা লেখা, ১৪ই মার্চ।

আবার সব কিছু আগের মত হয়ে গেছে। জানলাটা ঠিক সেখানেই, ফ্যাকাশে হলুদ আলো একইভাবে জ্বলে আছে ঘরের ভেতর। চমকে উঠেছি। সেই মহিলা, সেই নারীমূর্তি ফিরে এসেছে আবার। জানলায় তার আবছা শিল্যুট দেখা যাচ্ছে। একই রকম নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। কেমন একটা সন্দেহ হল আমার। এই মহিলার কথাই কি সর্বজিৎ বলছিল তখন? কিন্তু সে তো আশির গোড়ার কথা? তার সঙ্গে এ দৃশ্যের তো কোনও সম্পর্ক নেই।

যেভাবে হঠাৎ এসেছিল সেভাবেই আবার মুছে গেল নারীমূর্তি। তার জায়গায় আবার ঠিক সেই একইরকম ছায়া মানুষদের ভিড়। কী অদ্ভুত। শুধু তাদের মাথায় এখন আর হেলমেট নেই। হাতে রাইফেলও নয়। তার বদলে দেখি মাথায় পাগড়ি। আর হাতে লাঠি আর ত্রিশূল। কারও কারও হাতে খোলা তরোয়ালও দেখতে পাচ্ছি। ছবিটা এত তাড়াতাড়ি সরে সরে যাচ্ছে মনে হল এটা বোধহয় কোনও ট্রেনের কামরা। ভিড়ের মধ্যে লোকগুলোর বর্শার ফলা মাথা উঁচিয়ে আছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে এরা যেন রামায়ণের সময়ের লোকজন। আমোদ অভিলাষে শিকার অভিযানে বেরিয়েছে। আর বধ্যভূমিতে খুন করার জন্যে জনতার থেকে ভালো কী আর হতে পারে? শিকার করার সুখ আর ভয়কে ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মজা, দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যায়।

লোকগুলো যেভাবে নজরে রাখছে সবদিকে তাতে বোঝা যায় তারা সত্যিই শিকার খুঁজছে। ভিড়ের মধ্যে পুরো দলটার ছবি বড় হয়ে উঠল এবার। দৃশ্যটা ফের জানলার ফ্রেম ছাপিয়ে পাশের অন্ধকার দেওয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে। স্পষ্ট দেখলাম সেই ভিড়ের মধ্যে কয়েকটা হাত, রোমশ আর চওড়া, সেখানে নান রঙের ধাগা বাঁধা, একটা রোগা পাতলা মানুষের গলাটা চেপে ধরল। মানুষটার মাথায় একটা ছোট সাদা ফেজ। দৃশ্যের কোথাও কোনও রং নেই, ছিলও না এখনও অবধি, কিন্তু অন্ধকারেও সাদা তো বোঝাই যায়। সাদাই বোঝা যায় কেবল!

এখনও অবধি ট্রেনের চাকার একটা অস্পষ্ট আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা যায়নি। মনে হল লোকগুলো এবারে চেঁচিয়ে কি যেন নির্দেশ দিচ্ছে রোগা মানুষটাকে। সে শুনছে না। হাতগুলো আচমকা ধাক্কা মারতে মারতে মানুষটাকে ঠেলছে ট্রেনের দরজার দিকে। ট্রেনটা ছুটছে। দ্রুত সরে যাচ্ছে দৃশ্যপট। দরজার একদম কিনারে নিয়ে গিয়ে হাতগুলো এবারে জোর ধাক্কা মারে তার পিঠে। হঠাৎ সব কিছু কেমন ঝলসে উঠে সাদা হয়ে যায়। কিচ্ছু দেখতে পাই না আর। সেই মহিলা, সেই হেলমেট পরা মাথাগুলো, সেই হুমড়ি খাওয়া লাশেরা, সেই ত্রিশূল ধরা হাতগুলো, সেই সবকিছুই যেভাবে এসেছিল সেভাবেই আকস্মিক মিলিয়ে গেছে কোথায়।

চারপাশ আরও অন্ধকার হয়ে গেছে। আরও বেশি নিশ্চুপ। ভদ্দরলোকদের পাড়াগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে আরও অনেক আগেই।

অর্ক বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল সকালে উঠে ওর হয়ত মনেও পড়বে না আজ রাতে ও কী দেখেছিল। তবে একটা কথা ও ঠিকই বলেছিল। ভালোই করেছিল আমাকে থামিয়ে দিয়ে। আমি বললে হয়ত কিছু বেশি ব্যাখ্যা করতাম, তার বেশি আর কী? আমরা যারা এই অনেক দূরের পৃথিবীতে বাঁচি। সেলোফেনে মোড়া পৃথিবীতে। ছবি দেখে আতঙ্কিত হই। ঘুমিয়েও পড়ি। ভাবি ওই আগুনের আঁচ আমাদের গায়ে লাগবে না।

কলকাতা নামক একটা বন্দর আর বাজারের শহরে, এভাবেই দিন কাটে। কাটতে থাকে। যতদিন না শেষে, মরা মানুষদের লাশগুলো ফের, আবার, তাদের নিজেদের গুমরোতে থাকা দমবন্ধ করা গল্পগুলো আর একবার বলবার জন্যে ছটফট করে ওঠে। আর যতক্ষণ অবধি কেউ না কেউ, মাঝরাতে, ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে; চমকে উঠে, বলে, মেয়েটা গেল যে, ফিরবে তো ঠিক মত? পারবে তো ফিরতে?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1748 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...