প্রকৃতির প্রতিশোধ — তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 

...বিশ্বব্যাপী দূষণ ও জলবায়ুর এই অতি দ্রুত পটপরিবর্তনের নিরিখে আমরা যখন সামগ্রিকভাবে পরিবেশকেই চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের জুলাই সংখ্যার মূল বিষয়ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করিতেছি, ঠিক তখনই নজর পড়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি সদ্য-প্রকাশিত রিপোর্টের উপর। সেই রিপোর্টে, বিশেষ করিয়া নজর কাড়ে একটি ক্ষুদ্র অথচ অতি তাৎপর্যপূর্ণ শব্দবন্ধ – ‘ক্লাইমেট অ্যাপারথিড’। নবনির্মিত এই শব্দযুগ্মকটিকে ব্যাখ্যা করিতে গিয়া রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ দূত ফিলিপ অ্যালস্টন বলিতেছেন, এমন দিন সমাগতপ্রায় যখন জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী নয়া এক শ্রেণিবৈষম্য ঘনাইয়া তুলিবে। আমাদিগের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার নিরিখেই আমরা তাঁহার তত্ত্বটি মিলাইয়া লইতে পারি। বন্যাপীড়িত এলাকায় ত্রাণকার্য পরিদর্শন করিতে যাওয়া ফিনফিনে ধুতি-পাঞ্জাবিপরিহিত জনপ্রতিনিধিকে ঘিরিয়া ধরিয়া যে বিক্ষোভ, তাহার মর্মেও প্রকারান্তরে সেই শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্রোধেরই বীজ প্রোথিত থাকে কি না তাহা ভাবিয়া দেখিবার বিষয়।

এইসকল ভাবনারই ফলশ্রুতিস্বরূপ চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের জুলাই সংখ্যার মূল বিষয়: প্রকৃতির প্রতিশোধ। বিশ্বজোড়া জলবায়ুর পরিবর্তন মানবজাতিকে কীভাবে প্রভাবিত করিতেছে, একগুচ্ছ নিবন্ধের মধ্য দিয়া আমরা তাহারই সন্ধান করিতে চাহিয়াছি।...

 

গত ২৬ জুন সংসদের উচ্চকক্ষের অধিবেশনে এক বিচিত্র দৃশ্যের অবতারণা ঘটিতে দেখা গেল। রাজ্যসভা টিভি-র লাইভ কভারেজ সচরাচর সংবাদমাধ্যমের লোকজন ও একেবারে কর্মহীন কতিপয় বৃদ্ধ ব্যতীত বিশেষ কেহ দেখেন না বলিয়া রক্ষা, নহিলে এতদিনে তাহা ভাইরাল হইয়া যাইত। সেইদিন দ্বিপ্রহরে রাজ্যসভায় আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট ছিল দেশের অভূতপূর্ব জলসঙ্কট-সংক্রান্ত বিষয়। আলোচনা শুরু হইলে দেখা গেল সভা বস্তুত জনশূন্য। গুটিকয় যে কয়জন হাজির, তাঁহাদিগের অধিকাংশই গভীর চিন্তায় মুদিতনেত্র, কেহ বা আপনাপন মোবাইলে মগ্ন। আলোচনার বিষয়বস্তু ‘জলের মতো সহজ’ বলিয়াই যে দেশের নীতিপ্রণেতাগণের ঈদৃশ চিত্তবিক্ষেপ, তাহা বুঝিতে বিলম্ব হয় না – পরন্তু যে দেশেফি-বৎসর অতিবর্ষণজনিত বন্যা অতি স্বাভাবিক একটি বিষয়, সে দেশের আইনসভায় জলসঙ্কটের ন্যায় অপ্রাসঙ্গিক কারণে কালক্ষেপণ যে কতদূর অর্থহীন– সভাসদবর্গের গণ-অনুপস্থিতি ও মনোনিবেশের পরাকাষ্ঠা দেখিয়া তাহাও যৎপরোনাস্তি হৃদয়ঙ্গম হয়।

সাংসদগণের এই হঠকারী পরমৌদাসীন্যের অগ্রে-পশ্চাতে আরও নানাবিধ খবর ভিড় করিয়া আসিতে থাকে। বর্ষাগমে বিলম্বহেতু গোটা উপমহাদেশে তীব্র দাবদাহ সংবাদের শিরোনাম দখল করিয়া বসে, দেশের অর্ধাংশ জুড়িয়া খরাপরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটিতে থাকে, রাজস্থানের চুরুতে তাপমান পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডী পার হইয়া যায়, প্রতিবেশী পাকিস্তানে থার্মোমিটারের পারা গত অর্ধশতাব্দের মধ্যে সর্বোচ্চ পঞ্চান্ন ডিগ্রির সীমা স্পর্শ করে। ইহারই মধ্যে নীতি আয়োগের হাড়হিম-করা চেতাবনি – দেশের বৃহত্তম চিন্তাভাণ্ডটি তাহাদিগের সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানায়, আগামী দুই-এক বৎসরের মধ্যে দেশের অন্তত কুড়িটি শহরে ভূগর্ভস্থ জলের সঞ্চয় ফুরাইয়া আসিবে। সে রিপোর্টের মর্ম পুরাদস্তুর উদ্‌ঘাটন করিয়া উঠিবার পূর্বেই চেন্নাই শহরে অভূতপূর্ব জলসঙ্কট ঘনাইয়া আসে, পুরপ্রশাসনের জলের গাড়ি ঘিরিয়া বিক্ষোভ ও ভাঙচুর শুরু হয়, এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গ ঘোলা জলে (হায়, তাহাই বা কোথায়!) মাছ ধরিতে নামিয়া পড়েন।

এত বিচিত্র ঘটনাসন্নিপাতে– জলবায়ু ও পরিবেশের ক্রমপরিবর্তন যে কেবল এক কাগুজে সঙ্কট নহে, বরং ঘোরতর বাস্তব, পরন্তু বিপজ্জনক রকমের নিকটবর্তী এক আশু সঙ্কট– এ বিষয়ে সাধারণ্যে একপ্রকার বোধোদয় ঘটিতে থাকে। তাপদগ্ধ এই উপমহাদেশেরই অনুরূপ অভিজ্ঞতার অংশীদার হয় ইউরোপও –ফ্রান্স ও জার্মানিতে এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি অতিক্রম করে, যাহা গত এক শতাব্দকালের নিরিখে সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ণের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ দুই মেরুপ্রদেশে সঞ্চিত বরফ-আস্তরণ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি হারে গলিতে থাকে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডহার্টি আর্থ অবজার্ভেটরির ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী মার্কো টেডেস্কো-কে উদ্ধৃত করিয়া ১৮ জুনের নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, তাহার অব্যবহিত পূর্ববর্তী সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ড-এ তাপমাত্রা বাড়িয়াছে স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, এবং তৎপ্রভাবে ওই এলাকার আড়াই লক্ষ বর্গমাইল-ব্যাপী বরফের আস্তরণ হইতে দৈনিক গড়ে প্রায় দুই বিলিয়ন টন পরিমাণ বরফ গলিয়া গিয়াছে।

এক চিত্র হাজার শব্দের তুলনায় অধিক বাঙ্ময় – আমাদের এই নীল গ্রহ যে বাস্তবিক এক ভয়াবহ বিপদের মুখে দাঁড়াইয়া, তাহার মর্মান্তিকপ্রমাণ মিলিয়াছে সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্প্রতি বহুলপ্রচারিত, তাপক্লিষ্ট এক মুমূর্ষু মেরুভল্লুকের আলোকচিত্রে। মেরুপ্রদেশে বিপুল তাপমাত্রা বৃদ্ধিহেতু বিভ্রান্ত প্রাণীটি লোকালয়ে আসিয়া পড়িয়া কার্যত বেঘোরে মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। সে ছবির ভয়ঙ্কর অভিঘাত না-কাটিতেই কানে আসিয়াছে, বদ্রীনাথের আউলিতে জনৈক বিত্তবানের বিবাহ-অনুষ্ঠান বাবদ উৎপন্ন টন-টন প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা ডাঁই হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে, স্থানীয় গ্রামবাসী ও মেষপালকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন – পাছে পোষ্যগুলি অখাদ্য-কুখাদ্যে মুখ দিয়া অসুস্থ হইয়া পড়ে। এই সোশ্যাল মিডিয়াই আরও জানাইয়াছে, সমুদ্রতীরে এক পক্ষীমাতা খাদ্য ভাবিয়া তাহার শাবকটির মুখে যাহা তুলিয়া দিতেছে, তাহা বস্তুত একটি সিগারেটের দগ্ধাবশেষ।

সব মিলাইয়া পরিস্থিতি যে বিশেষ সুবিধাজনক নহে, তাহা টের পাইতে বিলম্ব হয় না। এরই মধ্যে সদর্থক কিছু পদক্ষেপও নজরে আসিয়াছে– আগুন আপন গৃহের চালে লাগিবার উপক্রম দেখিয়া নাগরিকসমাজের কিয়দংশ পলিব্যাগের ব্যবহার প্রতিরোধে প্রচার শুরু করিয়াছেন, ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার যথাসাধ্য সংরক্ষণের নিমিত্ত জলের অপব্যবহার রোধে সক্রিয় হইয়া উঠিয়াছেন অনেকেই। ব্যক্তিগত এই সকল উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত সামান্য হইলেও কোথাও যে অন্তত সামান্যতম সচেতনতার বোধ জাগ্রত হইতেছে, এই বার্তাটুকুই সামগ্রিক বিপন্নতার মধ্যে আশার ক্ষীণ আলোকসঞ্চার করে।

বিশ্বব্যাপী দূষণ ও জলবায়ুর এই অতি দ্রুত পটপরিবর্তনের নিরিখে আমরা যখন সামগ্রিকভাবে পরিবেশকেই চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের জুলাই সংখ্যার মূল বিষয়ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করিতেছি, ঠিক তখনই নজর পড়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি সদ্য-প্রকাশিত রিপোর্টের উপর। সেই রিপোর্টে, বিশেষ করিয়া নজর কাড়ে একটি ক্ষুদ্র অথচ অতি তাৎপর্যপূর্ণ শব্দবন্ধ – ‘ক্লাইমেট অ্যাপারথিড’। নবনির্মিত এই শব্দযুগ্মকটিকে ব্যাখ্যা করিতে গিয়া রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ দূত ফিলিপ অ্যালস্টন বলিতেছেন, এমন দিন সমাগতপ্রায় যখন জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী নয়া এক শ্রেণিবৈষম্য ঘনাইয়া তুলিবে। আমাদিগের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার নিরিখেই আমরা তাঁহার তত্ত্বটি মিলাইয়া লইতে পারি। বন্যাপীড়িত এলাকায় ত্রাণকার্য পরিদর্শন করিতে যাওয়া ফিনফিনে ধুতি-পাঞ্জাবিপরিহিত জনপ্রতিনিধিকে ঘিরিয়া ধরিয়া যে বিক্ষোভ, তাহার মর্মেও প্রকারান্তরে সেই শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্রোধেরই বীজ প্রোথিত থাকে কি না তাহা ভাবিয়া দেখিবার বিষয়।

এইসকল ভাবনারই ফলশ্রুতিস্বরূপ চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের জুলাই সংখ্যার মূল বিষয়: প্রকৃতির প্রতিশোধ। বিশ্বজোড়া জলবায়ুর পরিবর্তন মানবজাতিকে কীভাবে প্রভাবিত করিতেছে, একগুচ্ছ নিবন্ধের মধ্য দিয়া আমরা তাহারই সন্ধান করিতে চাহিয়াছি। মূল্যবান এই নিবন্ধগুলি লিখিয়াছেন শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, জয়ন্ত বসু, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, দেবব্রত শ্যামরায়, শতাব্দী দাশ, ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জিঅপরাজিতা সেনগুপ্ত। বলা বাহুল্য, সমস্যাটির বহুস্তর চরিত্র সামান্য এই কয়েকটি নিবন্ধের পরিসরে সম্যক অনুধাবন করা সম্ভব হয় নাই, তবে একটা চেষ্টা অন্তত করা গিয়াছে। আমাদিগের এই প্রয়াস যদি সামান্য ক’জন মানুষকেও বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে সাহায্য করে, তাহা হইলেই আপাতত যথেষ্ট হইবে।

মূল বিষয়ভাবনার বাহিরে – গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ-সহ আমাদের অন্যান্য সকল বিভাগ যথারীতি রহিয়াছে। স্মরণ বিভাগে সদ্যোপ্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব গিরিশ কারনাডকে লইয়া স্মৃতিচারণ করিয়াছেন সন্দীপ রায় এবং আরও একটি লেখা লিখিয়াছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। বিশিষ্ট নকশালপন্থী নেতা সন্তোষ রানাকে লইয়া আমরা সাক্ষাৎকার লইয়াছি আরেক নকশালপন্থী নেতা আজিজুল হকের; সঙ্গে রহিয়াছে প্রশান্ত ভট্টাচার্যের একটি তর্পণ। নানান কারণে পত্রিকার প্রকাশ একদিন বিলম্ব হইবার মধ্যেই শুনিলাম আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন শিল্পী রবীন মণ্ডল। অত্যন্ত দ্রুততার সহিত বিষাণ বসু তাঁহার স্মরণে একটি রচনা লিখিয়া দিয়াছেন।

এই, আর বাদবাকি, যেমন থাকে তেমনই। পড়ুন, মতামত দিন, ভালো থাকুন। পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানুষকে ভালোবাসুন…

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...