মহিলা ফুটবল বিশ্বকাপ: কয়েকটি অনামী দেশ, মার্কিন আধিপত্য ও কিছু কথা

সোহম দাস

 

ফ্রান্সের লিয়ঁ শহর। প্রতীকে জ্বলজ্বল করেন কেশরী পশুরাজ। এই শহরেরই নামী ক্লাব অলিম্পিক লিয়ঁ। তাদেরই ঘরের মাঠ পার্ক অলিম্পিক লিয়ঁতে আটান্ন হাজার দর্শকের সামনে দুই ডাচ ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে বাঁ পায়ে শটটা মারছেন মিডফিল্ডার রোজমেরি ল্যাভেল, অনেকটা লাফিয়েও সামান্যতম নাগালও পেলেন না গোলকিপার ও দলের অধিনায়ক সারি ভ্যান ভিনেদাল। মার্কিন মুলুকে চতুর্থবার কাপ আসা তখন একরকম নিশ্চিত। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে কমলা দল যেন ঢাকা পড়ে গেল সাদা-নীলের আনন্দ-স্রোতে। তবে মার্কিন কন্যাদের এই নিয়ে পরপর দু’বার ও রেকর্ড চারবার কাপ জেতার মাঝে পড়ে রইল এক অদ্ভুত সমাপতন। যে ক্লাবের ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষকে দুরমুশ করে জিতলেন মার্কিনিরা, সিংহের শহরের সেই ক্লাবেরই মহিলা দলটি ঘরোয়া লিগে তো বটেই, ইউরোপিয়ান ফুটবলেও সিংহী। তেরো বার লিগ ওয়ান ও ছ’বার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার রেকর্ড আছে তাদের। প্রসঙ্গত এটাও জানিয়ে রাখা ভাল, ফাইনালে গোল-সহ বিশ্বকাপে সোনার বলটি যিনি জিতে নিলেন, সেই মেগান র‍্যাপিনোও খেলে গেছেন এই ক্লাবে ২০১৩-১৪ মরশুমে।

মেয়েদের ফুটবল বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য চিরকালীন। ১৯৯১ সালে চিনে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া দিয়ে শুরু, তারপর থেকেএই নিয়ে যতগুলো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হল, তার প্রত্যেকটিতেই শেষ চারে পৌঁছেছে তারা। এর মধ্যে চারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাদ দিলে বাকি চারবারের মধ্যে একবার তারা হয়েছে রানার্স (২০১১) এবং তিনবার তৃতীয় স্থানাধিকারী (১৯৯৫, ২০০৩ ও ২০০৭)। বিশ্বকাপ ছাড়া ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিক্স থেকে ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক্স অবধি প্রতিবার তারা ফাইনাল খেলেছে। এর মধ্যে ২০০০ সিডনি অলিম্পিক্স ছাড়া বাকি চারটি ফাইনালেই তারা জিতেছে স্বর্ণপদক। একটি ছোট্ট তুলনামূলক পরিসংখ্যান দিলেই বোঝা যাবে, মেয়েদের ফুটবলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন এত সমীহ করার মতো একটি নাম। সদ্যসমাপ্ত টুর্নামেন্টটিতে গ্রুপ পর্বে তারা থাইল্যান্ডকে হারিয়েছে ১৩-০ গোলে। একটি বিশেষ ম্যাচেই যে সংখ্যক গোল তারা করেছে, ২০০৬ সাল থেকে ছেলেদের ফুটবলের বিভিন্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দলগুলির করা মোট গোলও এত নয়।

লিঙ্গ-বৈষম্যের নিরিখে ১৪৯টি দেশের মধ্যে যে দেশের নাম থাকে ৫১ নম্বরে, যে দেশে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে পুরুষ-পক্ষপাতের শিকার হন অসংখ্য নারী, যে দেশে প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত নারীদের হেনস্থার শিকার হতে হয় আইনরক্ষকদের হাতেও, সেই দেশের মেয়েরা এমন একটি খেলায় ছেলেদের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে গেছে, যে খেলাটি বিশ্বে সর্বাধিক অনুষ্ঠিত খেলা তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, এই খেলাটিকে এই সেদিন অবধিও ‘পুরুষ মানুষের খেলা’ বলে লেবেল সাঁটার সঙ্কীর্ণ মানসিকতা দেখিয়েছে সভ্যতাগর্বী বহু পাশ্চাত্য দেশই। এই দেশেই সোনার বল জেতা সত্ত্বেও মেগান র‍্যাপিনোকে ট্রাম্প সরকারের সমকামী-বিরোধী মনোভাবের প্রত্যক্ষ বিরোধিতার জন্য স্বয়ং প্রেসিডেন্টের রোষানলে পড়তে হয়। সমকামী হয়ে গর্বিত মেগান অবশ্য সে নিয়ে বিচলিত হন না, নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন— জিতলে যদি ট্রাম্প নিমন্ত্রণও করেন, তাহলেও ওই হোয়াইট হাউজে তিনি যাচ্ছেন না।

সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে কীভাবে সম্ভব হল এই উত্থান? এর জন্য অবশ্য দায়ী লিঙ্গ-বৈষম্য বিরোধী একটি আইনই। উইস্কন্সিন-লা ক্রস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল-গবেষক আইলিনা নারকোট্টা-ওয়েল্পের মতে, ফুটবলে মার্কিন মেয়েদের উত্থানের অন্যতম কারণ হল ১৯৭২ সালে আমেরিকার সংসদে গৃহীত এডুকেশন অ্যামেন্ডমেন্টস অ্যাক্টের ন’নম্বর আইনটি। এই আইনের জোরেই সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলিতে পড়াশোনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে অংশগ্রহণের ব্যাপারে লিঙ্গবৈষম্য বন্ধ হয়। মেয়েদের সুযোগ দেওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিকাঠামো একপ্রকার বাধ্যতামূলক হয়। একথা সত্যিই, ফুটবলের প্রতি আগ্রহটা তুলনামূলকভাবে বেশিই ছিল। সেজন্য স্কুল ও কলেজগুলি লিঙ্গ-বৈষম্য দূর করতে প্রথমেই নজর দেয় মেয়েদের ফুটবল দল গড়ার দিকে। ফলে, ১৯৭১ সালে সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ-বিদ্যালয়গুলিতে যেখানে মেয়ে ফুটবলারদের সংখ্যা ছিল মাত্র সাতশো, চার দশক পেরিয়ে ২০১৪ সালে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল পৌনে চার লাখেরও বেশি।

তবে শুধুই আইনের শক্তিই এমন অভূতপূর্ব উন্নতির মূলে নয়। আইন প্রণয়নের কুড়ি বছরের মধ্যেই ১৯৯১ সালে উদ্বোধনী বিশ্বকাপ জিতে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করতে থাকা ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির অন্যতম নাইকি ও আম্ব্রোর নজরে আসেন খেলোয়াড়রা। বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে স্পন্সর করে এই দুটি সংস্থা। তাঁরা হয়ে ওঠেন আমেরিকার সংস্কৃতির আইকন। এরপর ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্ব শিরোপা আসে। দেশের মাটিতে প্রজাতান্ত্রিক চিনের দলকে ফাইনালে পেনাল্টি শ্যুট আউটে ৫-৪ পরাজিত করেন ব্র্যান্ডি চ্যাস্টেইন অ্যান্ড কোং। শেষ শটটি মেরেছিলেন ব্র্যান্ডি নিজেই। ডিফেন্স, মিডফিল্ড, ফরোয়ার্ড লাইন, তিন পজিশনেই খেলার বিরল দক্ষতা ছিল ব্র্যান্ডির। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ জয় মার্কিন তরুণীদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। তারপর থেকে উঠে আসতে থাকেন একের পর এক খেলোয়াড়-অ্যাবি ওয়াম্বাচ, কার্লি লয়েড, হিদার ও’রিলি, হোপ সোলো, মেগান র‍্যাপিনো, এবং আরও অনেকেই।

অন্যদিকে ঠিক একই সময়ে ফুটবলের জন্য তুমুল জনপ্রিয় দেশগুলিতে কয়েক দশক ধরে নিষিদ্ধ হয়েছে ফুটবলে মেয়েদের অংশগ্রহণ। ফুটবলের সৃষ্টিকর্তার দেশ ইংল্যান্ডেই পঞ্চাশ বছর (১৯২১-১৯৭১) নিষিদ্ধ ছিল মহিলা ফুটবল। কারণটি ছিল হাস্যকর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে মেয়েদের ফুটবল এত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যে তা পুরুষ ফুটবলের ব্যবসায়িক স্বার্থের কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। অতএব, তড়িঘড়ি মহিলা ফুটবলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এফএ। অনেকটা একই সময়ে পশ্চিম জার্মানিতেও পনেরো বছর (১৯৫৫-১৯৭০) বন্ধ হয়েছিল দামাল কন্যাদের ফুটবল নিয়ে স্বপ্নের দৌড়। আর ফুটবলে সুচারু শিল্পের আমদানি যে দেশের হাত ধরে, সেই ব্রাজিলেও দীর্ঘ চল্লিশ বছর (১৯৪১-১৯৮১) মেয়েরা ফুটবল খেলতে পারেননি। অর্থাৎ, যে সময়ে গ্যারিঞ্চা, পেলে, ভাভা, টোস্টাওরা বিশ্ব কাঁপাচ্ছেন, সে সময়ে তাঁদেরই দেশে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন অসংখ্য ফুটবল-প্রতিভা। ফলে এইসব দেশে পূর্ণাঙ্গ মহিলা ফুটবল দল গড়ে ওঠেনি বহুদিন অবধি। সেই সুযোগে আমেরিকায় মহিলা ফুটবলে হয়েছে উপযুক্ত বিনিয়োগ, উন্নত হয়েছে পরিকাঠামো। ২০০৬ সালে ত্রিশ লক্ষ নথিভুক্ত মহিলা ফুটবলারের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই ছিলেন মার্কিন।

তবে সুখের কথা হল, এইসব কালো অতীতকে পিছনে ফেলে আসতে পেরেছে জার্মানি, ব্রাজিলের মতো দেশ। ১৯৯৫ টুর্নামেন্টে রানার্স হওয়ার পর ২০০৩ ও ২০০৭ সালে পরপর দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন জার্মান কন্যারা। ব্রাজিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান পেয়েছিল, ২০০৭-এ হয়েছিল রানার্স। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় চোখ পড়লেই সবার উপরে জ্বলজ্বল করেন এক ব্রাজিলীয়ই। মার্তা ভিয়েরা ডা সিল্ভা। ১৭টি গোল করে পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে এখন তিনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা বিশ্বকাপে। ছ’বার জিতেছেন ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের শিরোপা। গত দুটি বিশ্বকাপে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান পেয়েছেন ইংরেজ কন্যারা। মিডিয়ার দ্বারা ওভারহাইপড পুরুষ দলটির তুলনায় নিঃসন্দেহে অনেক ভালো পারফরম্যান্স।

সব মিলিয়ে মেয়েদের ফুটবলে চিত্রটা খানিক ভিন্নই। জার্মানি, ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডকে বাদ দিলে সাফল্য সেইসব দলগুলির, যাদের পুরুষ দলের তেমন বলার মতো কিছু নেই। যে দেশের জলাটান ইব্রাহিমোভিচ বেশিরভাগ সময়ে শিরোনামে আসেন ফুটবল-বহির্ভূত কারণের জন্য, সেই সুইডেন তিনবার তৃতীয় স্থান পেয়েছে (১৯৯১, ২০১১ ও ২০১৯), একবার হয়েছে রানার্স (২০০৩)। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে যে ইংল্যান্ডের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ছেলেদের দলকে, সেই ইংল্যান্ডের মহিলা দলকেই তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচে হারিয়ে এবছর তৃতীয় হয়েছেন সুইডিশরা। সুইডেনের প্রতিবেশী নরওয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ১৯৯৫ বিশ্বকাপে। এশীয় দল হিসাবে জাপানেরও পারফরম্যান্স চোখ-ধাঁধানো। ছেলেদের বিশ্বকাপে এখনও অবধি এশীয় দলের সর্বোচ্চ স্থান বলতে ২০০২ জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার চতুর্থ হওয়া। সেখানে মেয়েদের বিশ্বকাপে জাপান ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন, এবং তাও মার্কিনদের হারিয়েই। ২০১৫ সালের রিপ্লে ফাইনালে অবশ্য মধুর প্রতিশোধ নেয় আমেরিকা। বলতে হয় চিনের কথাও। প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিল তারা, ১৯৯৫ টুর্নামেন্টে চতুর্থ ও ১৯৯৯ টুর্নামেন্টে রানার্স হওয়ার সম্মান রয়েছে তাদের ইতিহাসে।

সময় বদলাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে ফুটবল দর্শনও। বড় দল-ছোট দলের বিভাজন ঘুচে যাচ্ছে। এবার ছেলে-মেয়ের বিভাজনটাও ঘুচে যাক। সংবাদপত্রে আরও বেশি জায়গা পান মার্তা ভিয়েরা ডা সিলভা, মেগান র‍্যাপিনো, আদা হেদেরবার্গরা। মেসি-রোনাল্ডো-নেইমারদের বিশ্বে সমান্তরাল বিশ্ব শাসন করেন যে তাঁরাই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...