কাশ্মির ও মানবাধিকার: রাষ্ট্রসঙ্ঘ, ভারত ও পাকিস্তান

ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য

 

তরুণ বুরহানওয়ানি— কারও কাছে বীর শহিদ, কারও কাছে আতঙ্কী। তাঁর মৃত্যুর তৃতীয় বার্ষিকীর দিনে, জুলাই মাসের আট তারিখে, প্রকাশিত হল রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার বিভাগের হাই কমিশনারের কার্যালয়ের কাশ্মির-সংক্রান্ত রিপোর্ট। রিপোর্ট, তবু রিপোর্ট নয়। বিগত বছরের চোদ্দই জুন তারিখের রিপোর্টের একটি বার্ষিক হালনাগাদ— এই আটই জুলাইয়ের রিপোর্ট।

চোদ্দই জুনের রিপোর্টে কী ছিল? ছিল কাশ্মিরের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা, ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময়ে ভারতীয় কাশ্মিরের পরিস্থিতি, এবং আজাদ জম্মু-কাশ্মির আর গিলগিট-বালটিস্তানে মানবাধিকার-সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণসমূহের উন্মোচন ও মূল্যায়ন। তবে এই মুল্যায়নে মোটেও খুশি হননি আমাদের ভারত সরকার। সরকারের মতে এই রিপোর্ট ছিল “বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যসম্পন্ন ও পক্ষপাতযুক্ত (fallacious, tendentious and motivated)।” প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই সংস্থাটি এই গবেষণা পরিচালনা করে অন্য কয়েকটি সংস্থার মাধ্যমে, কারণ কাশ্মিরে কাজ করার অনুমতি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এঁরা পান না।

হালনাগাদের রিপোর্টে আসার আগে গেল বছরের রিপোর্টে উল্লেখিত ভারতীয় কাশ্মির-সংক্রান্ত কিছু তথ্য ভাগ করে নেওয়া যাক:

  1. জুলাইয়ে বুরহানওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মির উপত্যকায় মানুষের প্রতিবাদের উত্তরে ভারতীয় সেনা— নাগরিক সমাজের হিসাব অনুযায়ী— জুলাইয়ের মাঝ থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৩০ থেকে ১৪৫ জন সাধারণ কাশ্মিরিকে হত্যা করে। আতঙ্কীদের হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা, এই সময়ের মধ্যে, ১৬ থেকে ২০। এর সঙ্গে উঠে এসেছে সাধারণ কাশ্মিরিদের ওপর পেলেটবর্ষণের কথাও।
  2. ২০১৬-র মার্চ থেকে ২০১৭-র অগাস্টের মধ্যে পিএসএ আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে ১০০০-এর বেশি মানুষকে, যার মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
  3. দীর্ঘ সময় ধরে কারফিউ এবং চলতে-থাকা অশান্তির জেরে বিঘ্নিত হয়েছে চিকিৎসা ও শিক্ষা-পরিষেবা। সঙ্কটের সময়গুলিতে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হবার কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষ।

উপরোক্ত তথ্যাদির মত পাক-অধিকৃত কাশ্মিরের মানবাধিকার সমস্যার কথাও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রিপোর্ট অনুযায়ী এই সমস্যার বিস্তৃতি ও গভীরতা ভারতীয় অংশের তুলনায় বেশ কম। এর সঙ্গে এ-ও উল্লেখ করে রাখা দরকার, যে ভারতীয় অংশে শত প্রতিকূলতা-সত্ত্বেও যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, আজাদ জম্মু-কাশ্মির বা গিলগিট-বালটিস্তান অংশে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা ততটুকু স্বাধীনতাও পাননি, যা এই অংশে তথ্য সংগ্রহকে প্রভাবিত করেছে।

সমস্যার প্রকৃত চেহারা জানতে পাঠক এই লিঙ্ক থেকে রিপোর্টটিতে চোখ বুলোতে পারেন। https://www.ohchr.org/Documents/Countries/IN/DevelopmentsInKashmirJune2016ToApril2018.pdf

হালনাগাদের রিপোর্টের সময়কাল ২০১৮ সালের মে মাস থেকে ২০১৯-এর এপ্রিল মাস। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৮ সালে ভারতীয় কাশ্মিরে নিহত হয়েছেন ১৬০ জন সাধারণ মানুষ। এক বছরে মৃত্যুর হিসাবে এই সংখ্যা বিগত দশকে সবচেয়ে বেশি। রিপোর্টে উল্লেখিত জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির কোয়ালিশন অফ সিভিল সোসাইটি বা জেকেসিসিএস-এর তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে ৭১ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় সেনার হাতে। পুরো রিপোর্টটি এখানে পড়া যেতে পারে— https://www.ohchr.org/Documents/Countries/IN/KashmirUpdateReport_8July2019.pdf

লেখার শুরুর দিকে যেমন বলা আছে— এই দুটি রিপোর্টের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের প্রতিবাদের ভাষা প্রায় একইরকম কর্কশ। যুক্তি তো নয়ই, তথ্যেরও লেশমাত্র এই প্রতিবাদে নেই। নেই প্রতিবাদে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার ন্যূনতম চেষ্টাও। ওএইচসিএইচআর-এর বক্তব্য, এই রিপোর্টগুলো প্রকাশ করার আগে মন্তব্যের জন্য দুই সরকারের কাছেই পাঠানো হয়েছে, কিন্তু তখন কোনও প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য তাঁরা পাননি। রিপোর্ট প্রকাশ হবার পর এই ধরনের মন্তব্য, সুতরাং, অনভিপ্রেত।

জুন ২০১৮-র রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর আরও একটি তথ্য সুচতুরভাবে আলোচনার বৃত্তে এনে ফেলা হয়। তা হল— ওএইচসিএইচআর-এর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনার জাইদরাদ আল-হুসেইনের অত্যধিক মুসলমানপ্রীতি। সেই প্রীতিই জন্ম দিয়েছে কাশ্মিরপন্থী ও ভারতবিরোধী এমন একটা রিপোর্টের— এমন মন্তব্য সেই সময়ের চলিত সংবাদে পরিলক্ষিত হতে থাকে। এমন আশঙ্কা যে অমূলক তা সহজেই প্রমাণ হয়। কারণ এই সংস্থার বর্তমান হাই কমিশনার মিশেল বাশেলেতহেরিয়ার সঙ্গে মুসলমান ধর্মের বিন্দুমাত্র সংস্রব নেই, এবং কাশ্মির-প্রসঙ্গে এই সংস্থার মূল্যায়নেও মূলগত কোনও পরিবর্তন হয়নি।

কাশ্মির-প্রসঙ্গে, বা বলা ভাল কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাদের কার্যকলাপ প্রসঙ্গে ভারত সরকারের অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়ার পিছনে কি সত্যিই কোনও কারণ আছে? সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে সাধারণ মানুষের পীড়ন— এই বক্তব্যের কি আদপেই কোনও সত্যতা আছে? নিজের মতটা না জানিয়ে বরং তুলে দেওয়া যাক এ-বিষয়ে মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি মন্তব্য—

Whatever be the case, normalcy not being restored cannot be a fig leaf for prolonged, permanent or indefinite deployment of the armed forces (particularly for public order or law and order purposes) as it would mock at our democratic process and would be a travesty of the jurisdiction conferred by Entry 2A of the Union List forthe deployment of the armed forces to normalize a situation particularly of an internal disturbance. (WRIT PETITION (CRIMINAL) NO.129 OF 2012, dated 8th July 2016).[1]

এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত আফস্পাপীড়িত মণিপুর ও কাশ্মিরে সেনাদের হাতে সাধারণ মানুষের এক্সট্রাজুডিশিয়াল বা এনকাউন্টার হত্যা। প্রায় সাতশো সেনার বিরুদ্ধে চলতে থাকা মামলা রদ করার সমস্ত সরকারি চেষ্টা সত্ত্বেও মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট সত্যের উন্মোচনের তাগিদে যে চেষ্টা করছেন তা প্রকৃত অর্থে ধন্যবাদার্হ। শোপিয়ান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মেজর আদিত্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকারী এই বিচারব্যবস্থার মধ্যে সত্য প্রকাশের লক্ষ্যে এইটুকু চেষ্টা দেখলে আশা মরিতে-মরিতেও মরে না!

_________________

[1] https://www.sci.gov.in/jonew/ropor/rop/all/741422.pdf

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...