বিগ ব্রাদার সব দেখছেন, একটি কথোপকথন

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

‘ফগফগফজজ্ঞ,হজকগজখঝকঝহখ,হ্‌হ,খখখজ্ঝজখঝজ্ঝজখজখজখঝঝজখজখ …’

‘কী হে, কী বিড়বিড় করছ, পরিষ্কার করে কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না…’

‘ফগফগফজজ্ঞ,হজকগজখঝকঝহখ,হ্‌হ,খখখজ্ঝজখঝজ্ঝজখজখজখঝঝজখজখ …’

‘এই যে ভাই, কী বলছ, মাথাটাথা গেল নাকি…?’

‘ডাকস্পিক।’

‘কী স্পিক?’

‘‘ডাকস্পিক’। ‘উনিশশ চুরাশি’। অরওয়েল আপনি যত তাড়াতাড়ি যত ফ্লুয়েন্টলি অবান্তরভাবে দেশের পক্ষে, বলা ভাল সরকারের পক্ষে কথা বলতে পারবেন, ততই আপনি তরতরিয়ে উঠবেন।’

‘অ। তা এই প্রসঙ্গ, হঠাৎ?’

‘কেন? পড়েননি? শিক্ষাব্যবস্থা? নজরদারি? সোশ্যাল মিডিয়া?’

‘আবছা আবছা মনে আছে, একটু খোলসা করো তো।’

‘খোলসা? বেশ। সব জেনেও খেলাচ্ছেন? শুনুন। দেশের সমস্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রছাত্রীদের সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তাদের রেস্পেক্টিভ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত করতে বলেছে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রক। এবং, কালক্রমে, সেই লিঙ্কিংকে একটু বাড়িয়ে তা শেষমেশ মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যোগ করার কথা ভাবা হচ্ছে।’

‘ওহ। এই ব্যাপার। তোমাদের সব ব্যাপারে স্যাটায়ার স্যাটায়ার খেলা না খেললেই নয়?’

‘কেন? আপনার মনে হচ্ছে না এটা অসাংবিধানিক? রাইট টু প্রাইভেসির এগেইন্সটে? গোপনীয়তায় হাত বসানো?’

‘আহা। এমন ভাবছ কেন? উচ্চশিক্ষা সচিব তো বলেইছেন, আসল লক্ষ্য পজিটিভিটি বাড়ানো। এই অ্যাকাউন্ট লিঙ্কিং করে প্রতিটা প্রতিষ্ঠান থেকে একজন সোশ্যাল মিডিয়া চ্যাম্পিয়ন (এস.এম.সি.) নির্বাচিত করে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে ভালো খবর বা সাক্সেস স্টোরি পোস্ট করা। বা, অন্যান্য সংস্থার সাক্সেস স্টোরির খবর রিটুইট করা। ভাবো একবার। কী সদর্থক।’

‘হু, সদর্থকই বটে। আচ্ছা, সাক্সেস স্টোরি প্রচারের জন্য এই লিঙ্কিং-এর খুব দরকার ছিল কি? মানে, একটা কমন প্ল্যাটফর্ম বা ফেসবুক গ্রুপ খুলে সেখানে ইচ্ছুকদের যুক্ত করে সেখানেই তো একটা থ্রেড করে ক্রমাগত পোস্ট করা যেত …’

‘আঃ। এঁড়ে তর্ক করো না। তর্ক আমাদের পোষায় না। করলেই বা কী সমস্যা আছে কী? কী সমস্যা?’

‘নেই বলছেন। ফ্যাকাল্টি বা নন-ফ্যাকাল্টি, যিনিই সেই গালভরা সোশ্যাল মিডিয়া চ্যাম্প হোন না কেন, তার প্রায় সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের অ্যাকাউন্টে নজর চলে আসছে। বিগ ব্রাদার দেখছেন। টেলিস্ক্রিন। অরওয়েল …’

‘আবার অরওয়েল অরওয়েল করে। দেখো, ফিকশন ইজ ফিকশন। অত মিলিও না। হলই বা লিঙ্কিং। সারাক্ষণ তো মোবাইলে চোখ। ফেসবুক খুলে বসে আছে। এইটুকু জ্ঞান নেই? লিঙ্ক করা মানেই কি সাইবার সিকিউরিটি গায়েব হওয়া? আরে বাবা, কেউ তোমার প্রফাইলের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রোফাইল লিঙ্ক করছে, তার মানে এই নয় যে তোমার প্রোফাইল বা অ্যাকাউন্টের দখল চলে আসছে তার হাতে। এত সহজ নাকি? অ্যাঁ?’

‘বেশ, ধরে নিলাম সহজ না। ধরে নিলাম সিকিওর থাকবে। কিন্তু পোস্ট। স্ট্যাটাস। ছাত্রছাত্রী কী পোস্ট দিচ্ছেন, আদৌ কতটা সরকার বিরোধী তা দেখার খোলাবাজারি দখল চলে আসছে সরকারের কাছে। আর টার্গেট ছাত্রছাত্রী। দেশের স্পাইন। ওটাকেই জাপটে ধরা। পাশ করে বেরিয়েই সরকারি চাকরির জন্য দরবার হয়ত। ব্যাস। পুরনো পোস্টের জের। বাজেয়াপ্ত বাঁধা চাকরি। অথবা, অন্য মতের ছেলেমেয়েদের আদর করে শাসানো। পজিটিভি খবর বাড়াতে বলে প্রতিবাদের আগুনটাকে নেভানো। যেন আরেকটা জেএনইউ না তৈরি হয়। যেন সামান্যতম ফুলকি দেখলেই সমূলে উৎপাটনের যাবতীয় চাতুরি নেওয়া যায়, এক্কেবারে শুরুতেই। কারণ, সমবেত বিদ্রোহ, প্রতিবাদ পরের কথা। একটা ফেসবুক, টুইটার পোস্ট ছাত্রের আত্মাকে চানায়। গঠনকে চেনায়। বোঝা যায় কে আমাদের পক্ষে, আর কে তার নিজের বিবেকের। এভাবেই ডিসক্রিমিনেশন। এভাবেই, টার্গেট সেই ছাত্রছাত্রী। আর, টার্গেট সোশ্যাল মিডিয়া। আর, ছুটকো ছাটকা গুন্ডাগিরি? একটা আপত্তিকর পোস্টের দোহাই দিয়ে তার বিরুদ্ধে ভাড়াটে গুন্ডা লেলিয়ে দেওয়া, এসব তো চাট্টিখানি ব্যাপার, হতেই পারে। মোটকথা আমি কেন দেব আমার ব্যক্তিগত মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের খোঁজ। দৈনন্দিন জীবনের খোঁজ। মতামতের খোঁজ। কেন?’

‘আহা, দিও না। সুব্রহ্মণ্যমজি তো বলেইছেন, যাঁদের ইচ্ছে নেই, দেবেন না। জোর করার কিছু নেই।’

‘বলছেন? তাহলে ঘটা করে সার্কুলার বেরোল কেন? কাদের ইচ্ছে এই লিঙ্কেজ করার? সরকার বিরোধিতা ছেড়েই দিলাম, নিজস্ব হালহকিকত এভাবে খোলা মার্কেটে খোলসা করার প্রসেস কার ভালো লাগবে? কে দেবে শিক্ষা সংস্থাকে এই অনুমতি? কোন ছাত্র? কোন ছাত্রী? আর তখনই আসবে জোর। ঘুরিয়ে পজিটিভিটি দেখানোর কথা। আদর। আসলে অর্ডার। বকলমে এটাই ডিক্টেটরশিপ। ফ্যাসিজম। বাম, দক্ষিণ যেকোনও পন্থার অনেক বাইরে এই অসুখ। চিনের যেমন ‘উইচ্যাট’। সবচেয়ে কমন সোশ্যাল মিডিয়া। স্কুল-কলেজের কথা, দৈনন্দিন কাজ, পরিষেবা— স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে গেলে উইচ্যাটের সদস্য হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না চৈনিক নাগরিকের। আর সেখানেই খবরদারি চিনা সরকারের। কোথায় সামান্যতম সরকার বিরোধিতা থাকছে? চালাও নজরদারি। দ্য পার্টি ইজ অলওয়েজ রাইট। অলওয়েজ। অন্য মত মানেই সন্দেহজনক।’

‘ধুস, তোমাদের সঙ্গে কথায় পারা যায় না, বই মুখে নিয়ে বসে থাকো, আর এটা ওটা খোঁজো … চলি হে’

‘যাবেন? কোথায় যাবেন? আপনার শহরেই এরকম হাজারটা টেলিস্ক্রিন তৈরি হচ্ছে। আপনি কী ভাবছেন আপনার, আপনার বিষাদ, আপনার বিরক্তি আপনার মতামত সব রেকর্ড হচ্ছে। থট পুলিশ। আপনার চারদিকে। কী করছেন, পরের কথা। ভাবছেন সরকার-বিরোধী কিছু? ওটুকুই যথেষ্ট। আপনি থট ক্রিমিনাল। আপনাকে একশ এক নম্বর রুমে ঢোকানো হবে। আপনাকে মুছে ফেলা হবে। আপনার অস্তিত্ব। আপনি কোনওদিন ছিলেনই না হয়ত। একটা বেবাক ভারতবর্ষ। নাগরিক। গরিষ্ঠ অংশের ভোট। একাধারে মূল্যবৃদ্ধি, মব লিঞ্চিং, বন্ধ হওয়া স্টুডেন্ট ফেলোশিপ, ব্যাঙ্কের সুদ, গ্যাসের দাম নিয়ে উত্তেজিত, পরের মুহূর্তেই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। চিন, পাকিস্তান, আমেরিকা। কে শত্রু, কে বন্ধু। দেশের ভেতরটা ছাড়ুন। আসল তো বাইরেটা। মহাকাশ। বিজ্ঞান। মিশাইল। স্যাটেলাইট। ডাবলথিঙ্ক। খারাপ কিছু ভাবছি ঠিকই। কিন্তু আসলে খারাপ কিছু হতেই পারে না। অতএব সব ভালো। তাই, সোশ্যাল মিডিয়ার লিঙ্কিং ভালো। পজিটিভিটি বাড়ানো বড়ই সদর্থক, নিষ্পাপ। সোশ্যাল মিডিয়া প্রাইভেট রাইটের মধ্যে একেবারেই পড়ে না, ওটা তো মেয়ার এক্সেপশন। ছাত্রছাত্রীদের টার্গেট করা নেহাতই সমাপতন। আর কিছু না। মন্ত্রী ভালো। মন্ত্রক ভালো। রাজা ভালো। সরকার ভালো। সব ভালো। শুধু, বেচাল কিছু করবেন না। বেচাল কিছু ভাববেন না।

মনে রাখবেন, বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ।’

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...