সন্তোষ পাল

মৃণাল চক্রবর্তী

 

শিলিগুড়ির সেই বাড়িটায় সন্তোষ পাল নামের কেউ ছিল না। কিন্তু দেড়তলা কেমন-যেন বাড়ির নেমপ্লেটে কালোর ওপর গোলাপি রঙে লেখা ছিল সন্তোষ পালের নাম। ছোট একটা বাগানে নিমপাতা পড়ে ছিল ডাঁই হয়ে। নিমগাছটা তিরিক্ষে মেজাজে আকাশের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছিল। গাঁদা ফুলের ঝোপ নিজের মস্তিতে বড় ফ্যামিলি নিয়ে দিঘা বেড়াতে এসেছে। গেটের বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছিল একটা অল্প উঁচু বারান্দার মধ্যে বাড়িতে ঢোকার দরজা একেবারেই নিরপেক্ষ পোজ মেরে অন্য দিকে তাকিয়ে। বারান্দায় ধুলো।

শীতের শেষ দুপুরে রিকশা থেকে নেমেছিলাম বাঘা যতীন পার্কের কাছে ওই পাড়ায়। এখানে বোধ হয় লোকজন কম আসে। কারণ আমি ফিরে আসার পথে একটা-দুটো দরজা জানলা খুলে মানুষজন, প্রধানত বুড়ো-বুড়ি, শান্তিনিকেতনী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা টাইপ না, তুমি তুমি করে উল্লেখ করা যায়, ঘুমভাঙা চোখে দেখছিল কার পায়ের শব্দ পড়েছে এ-পাড়ায় এতদিন পরে? আমি কথা বলায় তারা ভারি খুশি হল। বারান্দা-জানলা-নিচু ছাতে ভেসে উঠল সাহায্য-বাড়ানো বুড়োবুড়ি মুখ। তারা কথা বলতে লাগল সন্তোষ পালকে নিয়ে। কিন্তু কিছুই জানা গেল না। এরা বিভিন্ন সময়ে তাকে দেখেছে, টুকরো কথাও হয়ে গেছে। কিন্তু সেসব কথা থেকে বাস্তব কোনও সন্তোষ পালকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন তথ্যই বিভ্রান্তিকর এবং পরস্পরবিরোধী। এই নিয়ে ছাত-বারান্দা-জানালায় একটা ঝগড়াও বেধে গেল। অন্যান্য ব্যক্তিগত মামলা উঠে এল। আমি ভাঙা মন নিয়ে এগিয়ে গেলাম। এরা সবাই মিলে যে মানুষটার কথা বলছে তার সঙ্গে আমার ডিউক বার-এ দেখা হওয়া সন্তোষ পালের কোনও মিল নেই।

মদ খেতে গিয়ে এরকম বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু আমার পাশের সিটে বসা সন্তোষ পাল খুব উদ্যোগ নিয়ে নিজেকে পরিচয় করালেন। এখন যদিও আমি ধীরে ধীরে তার চেহারাটা ভুলে যাচ্ছি ওই সব বুড়োবুড়ির কথার পর থেকে। আমার ঝাপসা মনে পড়ছে একটা গাঢ় নীল জামা আর খয়েরি রঙের টেরিকটনের প্যান্ট-পরা মাঝারি চেহারার পুরনো ধুলো জমা আয়নায় দেখা একজন কালো রঙের মাঝবয়েসি মানুষকে। খুব আমুদে মানুষ। গাছপালার খবর রাখেন, ব্লু মুন দেখার কথা বললেন, বড়লি মাছ খেতে কত ভাল তা বললেন, ট্রাম্প যে জিতবে তা নিয়ে বাজি রাখতে পারেন এবং রেখেছেন ট্রেনের সহযাত্রীর সঙ্গে। ট্রেনে ট্রেনেই জীবন কেটে গেল বলে হা হা করে হাসলেন। আমাকে দু-হাত জড়িয়ে বললেন একবার শিলিগুড়ি যেতে। সন্তোষ পালের সেই নিমন্ত্রণ আমি সারা জীবন মনে রাখব।

–আমি আপনাকে অন্য এক শিলিগুড়ি দেখাব দাদা। রিকশা করে বেরব। আশপাশ ঘুরে সুকনার কাছে যাব। অখানে একটা লুকনো গ্রাম আছে।

গলা নামিয়ে নিলেন সন্তোষ পাল। এদিক ওদিক দেখে মুখটা এগিয়ে এনে বললেন—

–মালিসাপাড়া। জঙ্গলের মধ্যেই আর একটা লুকনো জঙ্গল। সেখানে যাওয়ার দিন-ক্ষণ আছে। লুকনো জঙ্গলের মধ্যে গ্রাম। সেখানে রাতে একটা চুপচাপ মেলা হয়। আগের মানুষেরা এসে খুব শস্তায় মাল বেচে যায়।
–আগের মানুষরা?— এই প্রশ্ন করা দরকার ছিল মনে হল।

এখন আমি একটা রাস্তা খুঁজছি। অজস্র গলি এখানে। আমি হারিয়ে গেছি। বার বার হারিয়েছি। রাস্তা গুলিয়ে ফেলি কবে থেকে। হোটেলে যাব। দার্জিলিং লজ হোটেলটার নাম। কত দূরে দার্জিলিং। অথচ হোটেল নাম বাগিয়ে বসে আছে। তবে দার্জিলিং মোড়ও তো আছে। আরও দূরে। এসব নিয়ে ভাবার কোনও মানে হয় না। একটা টোটো পেয়ে তাই আমি এন-জে-পি স্টেশনে যাব বললাম।

–এই অবেলায় স্টেশনে কেন যাবে ইন্দ্রজিৎ?

পুল্টুশ জিগ্যেস করল। দুপুরের ঘুম শেষ করে উঠেছে আর কি। এত বিরক্ত লাগে একেক সময়! হঠাৎ খবর্দারি করা ভাল লাগে না। এখন থেকে বকেই যাবে। সবচেয়ে মুশকিল হয় যখন স্বাস্থ্য নিয়ে লম্বা লেকচার দেয়।

–অবেলা বলে কিছু নেই।
–আছে। এখন তোমার হোটেলে গিয়ে স্নান শেষ করে খেতে বসার কথা।
–আমি স্টেশনে যাব।
–এই অবসেশনটা বন্ধ করা দরকার। তুমি দুপুরে কিছু খাওনি। স্টেশনে কিছু নেই। নস্টালজিয়া নিয়ে বিলাসিতা করার কোনও অর্থ নেই। স্টেশনে কী আছে?
–ভাল করে সব দেখে নেওয়া দরকার। কোচবিহার যাব আমি। তাছাড়া সন্তোষ পালের ব্যাপারটাও ভাবতে হবে।
–কোচবিহার তুমি ফাইনালি যাবে না। ভ্যাগাবন্ডের মত স্টেশন চত্বরে ঘুরো না। তাছাড়া এই সন্তোষ পাল কে? নিশ্চই আমার বিশ্রাম নেবার সময় ঢুকে পড়েছিল। এই সব আলতু ফালতু লোককে ঢুকতে দেবে না।
–তুমি চুপ করো। এবার নাহলে মিউট করে দেব।

এ-কথায় ঘাবড়ে গেল পুল্টুশ। এমনিতেই চারপাশে লোকজন থাকলে ওকে চুপ করে থাকতে হয়। আগে কয়েকবার মিউট করে দিয়ে ওকে জব্দ করেছি। সেটা ভেবেই বোধ হয় একটা চাপা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল

–কোচবিহার যেও না। ওখানে তোমার কিছু নেই।

আমি ওকে মিউট করে দিলাম।

আমি কোচবিহারে ছিলাম ছ-বছর। ওখান থেকেই মাধ্যমিক পাশ করি। বোন দু-ক্লাস নিচে পড়ত। বাবা এক দিক থেকে বিষয়ী ছিল। আর কোনও বাচ্চার চেষ্টা করেনি। তাহলেই বাড়ির ছবি পালটে কিলবিলে হয়ে যেত। মা ন্যাতা পরে মার খেত আর শাপ-শাপান্ত করত। তার বদলে বেশ একটা বাড়ি বাড়ি পরিবেশে তখন বড় হয়েছিলাম। বাবা নিজের রহস্যময় কাজ সেরে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে দাওয়ায় বসে শ্যামাসঙ্গীত গাইত আর গুড়ের চা খেত। আমি তাই প্রথমে কোচবিহার যাব।

সন্তোষ পালের কথা আমি ভুলতে পারছি না। স্টেশন চত্বরে এলাম। হয়ত সন্তোষকে দেখা যাবে এখানে। আমাকে খুঁজতে এসেছে যেমন আমি খুঁজছি ওকে। অনেক ট্যুরিস্ট আসছে। লোকগুলো নেপাল ভুটান দার্জিলিং বলে গলা ফাটাচ্ছে। ট্যুরিস্টরা ফটাফট উঠে পড়ছে গাড়িতে। যাদের গাড়ির ব্যবস্থা করা আছে, তারা সুন্দর হাসি হেসে গাড়ির দালালদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মহাপুরুষের মত তাকাচ্ছে দিগন্তে। কিন্তু দিগন্ত দেখা যায় না বছর কুড়ি ধরে। একবার আমি শিলিগুড়ি থেকে হালকা সাদা পাহাড় দেখেছিলাম। অণুকে দেখতে এসেছিলাম সেবার। রিকশা চড়ে পাহাড় দেখতে দেখতে মনে পড়েছিল, অণুর বিয়ে হয়ে গেছে কবে। আমি এক অবৈধ ভ্রমণে যাচ্ছি। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। সাত বছর পরে দেখা করার কথা ছিল। অণু বিয়ের কদিন আগে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদছিল রাতে। ঝিলের ধারে ঠান্ডা হাওয়া বয়েছিল। ওর কয়েকটা সামনের দিকের চুল আমার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। আমার বুক ভেজা ভেজা। দু-একবার নাকও টেনেছিল অণু। আমি হেঁচে ফেলেছিলাম।

ওই সময় অণু আমাকে ওর মাথার দিব্যি দিয়ে বলেছিল সাত বছর পরে দেখা হবে। দেখা করতেই হবে আমাকে। তাই তিরিশ বছর বয়েসে আমি রিকশা চড়ে যাচ্ছিলাম যখন পাহাড় চোখে পড়ল। কিন্তু এখন চোখে পড়ছে আর একটা মানুষ। চেলু না?

হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবে চেলু। একটা পট্টি জড়ানো মোবাইলে কথা বলছে। দূর থেকে কথাগুলো কানে এল না। তাই আমি এগিয়ে গেলাম।

চেলু। রঙচঙে ছিল এমন একটা বারমুডাস আর সবুজ টি-শার্ট পরে। আমি মুখোমুখি হতেও কথা বলে যেতে লাগল। চিনতে পারেনি। ৫০ থেকে ৬৫ যে কোনও বয়স হতে পারে চেলুর। নিচে সামনের দিকের তিনটে দাঁত পড়ে গেছে। গায়ের রঙ শুকনো গাছের ডালের মত। খড়ি ওঠা হাত-পা। কথা বলার সময় ওপরের দাঁতটা নড়ছিল। ওটাও যাবে।

–কেমন আছ চেলু?

চমকে ফোন থামিয়ে দিল। আমাকে ভাল করে দেখে ভুরু কুঁচকে বলল—

–আমি চেলু-উলু কেউ না। আমি রামদাস। রামদাস ভগত।
–বাজে কথা। তুমিই চেলু। ভুজাওলা শামের মার্ডার কেসে তোমার নাম জড়িয়েছিল। তুমি জেলও খেটেছিলে কিছুদিন। তুমিই চেলু।

লোকটা আমাকে ছাড়িয়ে এগোনোর চেষ্টা করল। আমার রোখ চেপে গেল। চেলু কেন বলবে আমি চেলু না? আমি কি বলতে পারি আমি মেঘেন্দ্র কুমার সমাজপতি, ইন্দ্রজিৎ রায় নই? আমি ওর পেছনে যেতে যেতে বললাম—

–আমি কাউকে বলব না। প্রমিস। খালি তুমি স্বীকার করো তুমিই চেলু। তুমি ভুজাওলা শামের বৌ লায়লিকে বিয়ে করেছিলে জেল থেকে বেরিয়ে। আমার সব মনে পড়ে গেছে।
–আমি রামদাস আছি হজোর। আপনি সবাইকে পুছে দেখুন।
–ওসব পোছাপুছি করতে যাব না আমি। খুব কঠোর হয়ে বললাম। – তুমি চেলু।

এই সময় একটা ট্রেন এল। সবাই আবার চেঁচাতে লাগল নেপাম সিকিম গেজিং পেলিং করে। এক মোটা গোঁফের চা-ওলা বড় একটা কেটলি তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি যেই একটু ভয় পেলাম অমনি চেলু পালাল।

চায়ের দোকানির মুখে কোমলতা আনতে আমি একটা চা খেতে চাইলাম। চিনি ছাড়া বলায় লোকটা গম্ভীর হয়ে গেল দেখে চিনি-চাই দিতে বললাম।

–আপনি সন্তোষ পালকে চেনেন?

চা-ওলার মুখ নরম হয়ে এল। একটু অন্যমনস্ক হয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে বলল।

–উনি এখানে নাই। চলে গেছেন। কাল রাইতের টিরেনে।
–ইস, আমি ওনার কাছেই এসেছিলাম।
–কত লোক আসে যায়।

দোকানের সামনে কয়েক জন ট্যুরিস্ট চলে এল এই সময়। চা-ওলা প্রবল কেটলি তুলে ধরল আবার। অবহেলায় ঢালতে লাগল চায়ের ভাঁড়ে। আমি প্রায় পুরো চা বিন-এ ঢেলে স্টেশনের মুখে চলে গেলাম। কিন্তু কোনও স্মৃতি আটকে নেই এখানে। তারা আছে কোথায়? জেলা ভাগ হলে স্মৃতিরা কোথায় যায়? সন্তোষ পাল বলতে পারতেন। কিন্তু উনি রাতের ট্রেনে চলে গেছেন কোথাও। ওই চা-ওলা আর আমার মত আরও কত মানুষকে বিমর্ষ করে দিয়ে রাতের গাড়িতে কোথায় চলে গেলেন তিনি!

চেলুর ব্যাপারটা বোঝা গেল না। বছর কুড়ি আগে আমি আলিপুরদুয়ার এসেছিলাম মাসতুতো বোনের বিয়েতে। তার নামটা এখন মনে পড়ছে না। ফেরার সময় নিউ জলপাইগুড়ি এসে চেলুকে দেখতে পাই। প্রায় একই রকম দেখতে চেলু, তখন দাঁত ছিল, স্টেশনে চায়ের দোকানে কাজ করত। অত্যন্ত ভদ্র এবং বিনয়ী স্বভাবের চেলুকে সবাই পছন্দ করত। তার প্রাণের বন্ধু ছিল ভুজাওলা শাম। সে লায়লিকে বিয়ে করে এনেছিল ধুলিয়ান থেকে। কে যেন বলেছিল ঠেলাওলা বনোয়ারির বৌ ছিল লায়লি। বনোয়ারির পিঠে চাকু মেরেছিল হোটেলের দালাল শম্ভু। সেই চোট সামলাতে দেশে চলে গিয়েছিল বনোয়ারি। কিন্তু লায়লিকে পায়নি শম্ভু। ওকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে শাম লায়লিকে আবার বিয়ে করে নিয়ে আসে শিলিগুড়ি।

আমি লায়লিকে দেখেছিলাম। স্টেশন চত্বরেই দোকান ছিল শামের। লায়লিও বসত দোকানে। বছর কুড়ি বয়েস হবে। কালো আগুনের টুকরো। হাসতে শুরু করলে টাইট করে জড়ানো শাড়ি এলোমেলো হয়ে যেত, পাগল-পাগল চুল উড়ত হাওয়ায়। ওর চোখে যে বিজলি আছে সে-কথা শাম আমাদের কয়েকজনকে বলেছিল। সেই বিজলি রাতে জ্বললে ঘরে বাতি লাগে না। আলোও থাকে, আগুনও থাকে তাদের ঘরে। শাম বলেছিল।

লায়লির সঙ্গে কথা বলে আমি নিশ্চিত হই যে ওর চোখের দিকে তাকালে ধুমকি লেগে যায়। এমন করে লজ্জা-লজ্জা চোখ তুলত আর নামাত আর এদিক-ওদিক তাকাত লায়লি যে শামের দোকানের সব ভুজা বিক্রি হয়ে যেত তাড়াতাড়ি। সবাই বেশি ভুজা কিনে ফেলত। আমিও কিনে ফেলে শেষে চা-ওলা পবনকে হাফ দিয়েছিলাম। ও আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছিল। গম্ভীর কিন্তু চাপা গলায় বলেছিল, ও হুরি আছে।

চাপা গলায় বলেছিল কারণ ওর বৌ কড়া নজরে রাখত ওকে। লায়লি আসার পর থেকে মেয়েরা এককাট্টা হয়ে একটা গোপন কিন্তু কঠিন লায়লি-বিরোধী মঞ্চ গড়ে তুলেছিল। কারণ তাদের বরেরা খুব যৌনসক্রিয় হয়ে ওঠে রাতারাতি। প্রথমে মেয়েরা এতে আনন্দ পেলেও পরে বোঝে যে এতে ঘাপলা আছে। বিশেষ করে যখন জানা যায় যে টিকিটবাবু মদন কর্মকার তার বৌ শীলাকে রমণান্তে লায়লি বলে ডুকরে ডেকেছিল। শীলা এই কথা ফাঁস করে দেয় লছমি, সাধনা (হিন্দিতে) আর পবনের বৌ মালতীকে। তাছাড়া অন্যান্য মেয়েরাও খুব গর্ভবতী হয়ে পড়ছিল রাতারাতি। লায়লি সম্ভবত জানত যে রাত জুড়ে বিভিন্ন বাড়িতে এসব কাণ্ড ঘটছে। কিন্তু হাসত লায়লি। আর সে যখন হাসত, রাত-জাগা, ক্লান্ত বৌরা তাকে অভিশাপ দিত। লায়লি, আজ আমার মনে হয়, মেয়েদের অভিশাপ ভালবাসত।

–আরে, নগেনবাবু না?

পিঠে হাত দিয়ে কে একজন বলায় আমি ফিরে তাকালাম।

–নমস্কার। আমি নগেন রায় বলছি। আপনি নগেনবাবু তো?

আমারই বয়েসি একটা লোক। চুলে কালো রঙ করা কিন্তু সাদা গোঁফগুলো বেরিয়ে পড়েছে। ও ফোনে কথা বলার মত করে কেন যে আমায় ‘বলছি’ বলল, আমি বুঝলাম না। লায়লিকে নিয়ে আমার স্মৃতিচারণে বাধা দিয়ে ফোন-নগেন অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলল। ও শিলিগুড়িতে কাঠ কেনার ইজারা পেয়েছে। নগেন বন দপ্তরের লোক। তাকে নিতে আসবে। আমাকে নাকি সেই নগেনের মতই দেখতে। এসব কথায় আমি খুব বিরক্ত হচ্ছিলাম। হঠাৎ ওর মোবাইল বাজল।

–হ্যাঁ নগেনবাবু, বলছি, আমি এসে গেছি। আপনি কোথায়? না না, এখানে একজনকে নগেনবাবু ভেবে… না, না, আমি তার সঙ্গে চলে যাইনি। এখানে ওয়েট করছি। আচ্ছা, আচ্ছা…

বলতে বলতে সরে গেল লোকটা। একজন টিটিই বাইরে এসে চা খাচ্ছিলেন। হেরে যাওয়া উকিলের মত এক ধরনের কিটকিটে বিষণ্নতা ছিল ভদ্রলোকের মধ্যে।

–কোচবিহারের পরের ট্রেন কটায়?

তিনি দূরের দিকে তাকিয়ে বললেন—

–অনেক ট্রেন আছে।
–আমি আজ যাব না। কাল যাব।
–কালও ট্রেন থাকবে। কোনও ভয় পাবেন না। ওদিকটা এখনও ভাল আছে।

এই সময় ওঁর ফোন এল।

–হ্যাঁ, জগাদা। না, দানাপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার। মলয় আছে, ইব্রাহিম আছে। আমি এনজেপিতে চা খাচ্ছি।

এর পর উনি আরও কথা বলতে লাগলেন। ট্রেন বিষয়ে নানা কথা। সেই ট্রেনের মধ্যে ওঁদের বন্ধুরা আছেন। এটা একটা অন্য জীবন। সারা ভারতে ছুটে যাওয়া দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের মধ্যে বাইরে কিছু মানুষ ফোনে ট্রেন-জড়িত বিষয়ে কত কথা বলে চলেছেন। বুকের পাটা আছে এঁদের। একই সঙ্গে মেট্টুপালায়ম আর অমৃতসর বলতে পারেন। একজন শেওড়াফুলিতে আটকে আছেন, অন্যজন কামাখ্যা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। ট্রেন যাচ্ছে আসছে, সিগনাল বদলাচ্ছে, কুয়াশার বারো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে গাড়ি। অন্য জীবন। এটা আমি চেয়েছিলাম। তেমন করে চাইনি নিশ্চই।

এমন এক অদ্ভুত সময়ে যখন শীত বলে সন্ধে নেমেছে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে, আমি অণুকে দেখলাম। সপরিবারে অণু, সঙ্গে দুটো টিনএজার ছেলেমেয়ে। সঙ্গে একটি মেয়ে। অনেক কম বয়েস। তিরিশমত হবে। আর একজন পুরুষ, নিঃসন্দেহে অণুর স্বামী। আমারই বয়েসি হবেন।

পুল্টুশ বাজে কথা বলেছিল। কোচবিহার না, এই স্টেশনে আমার কিছু নেই!

 

(ক্রমশ)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...