ঘেয়ো কুকুর ও বিচারপ্রার্থীগণ

রোমেল রহমান

 

কে যেন চিৎকার দিয়ে বলল, কুকুরটা এখনো বিচার পায়নি? অন্য কে যেন বলল, নাহ! শালা পাথরের মতো হত্যে দিয়ে আছে বিচারকক্ষের দরজায়! ক্ষয় হবে তবু পচবে না। আবার কেউ বলল, একেবারে ঘেয়ো, গা দিয়ে মাছি উড়ছে, গন্ধও বেরোয়। আচ্ছা এই মাছিগুলো তো সেই সময়ও দেখেছিলাম তাই না? মাছিগুলো মরেনি? মাছিদের আয়ু কত? একজন কেউ বলল, আগের মতো চিন্তার পদ্ধতি এখানে চালালে চলবে না। ভুলে যাচ্ছ কেন এখানে বয়স বলে কিচ্ছু নেই। মানে সময় ঝুলে আছে। নড়ছে না। কে যেন বলল, তা বলে কি চারপাশও ঘুরছে না? প্যাঁচ নেই কোনও? আবার কেউ বলল, পুরো ব্যাপারটাই একটা প্যাঁচ। আমাদের মগজ শুধু ধরতে পারছে না আগামাথা।  তখন আবার সেই লোকটা বলল, তাহলে কি মাছিগুলোও কুকুরটার সঙ্গে চলে এসেছিল বিচারের এই ভূমিতে? কেউ কোনও উত্তর দিল না। মাঠের হইচই শোনা যেতে লাগল নিয়মমাফিক। একজন কেউ বলল, ওই মহিলা অমন ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেন? অন্য কেউ উত্তর দিল, মহিলার স্বামীকে ধরে নিয়ে গুলি করে মেরেছিল! আগের লোকটা বলল, ইসস্‌! তা উনি কি বিচার পেয়েছেন? কী বলল কোর্ট ওনাকে? একজন কেউ খেঁকিয়ে উঠে বলল, এহ্‌ বিচার! এত সস্তা নাকি? প্রথমে ছোটকোর্ট তারপর মাঝারিকোর্ট তারপর বড়কোর্ট! মাঝখানে দুটো নদী, তার একটাতে আবার ফেরি পারাপার। সে ফেরিও নাকি অনেক দেরিতে দেরিতে আসে। আসলে টাইম মতো আসে না বুঝলে? এত সিঁড়ি বেয়ে বিচার পাওয়া কি একদিনের কাজ? ছোটকোর্টেই জায়গা হয়নি ওর! দরজা থেকে ওই ঘেয়ো কুকুরটাই তাড়িয়ে দিয়েছে। কে যেন বলল, বলো কী? ঘেয়ো কুকুরটা? অন্য কেউ বিষণ্ণ সুরে বলল, হ্যাঁ! ঘেয়ো কুকুরটাই! সে আজকাল পরামর্শ দিচ্ছে বিচার বিষয়ক! আর কে যেন বলল, লোকে শুনছে ওর কথা? আগেরজন বলল, শুনবে না কেন? অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে, এরপর কি হতে পারে সে বিষয়ক একটা খোঁজ যদি কেউ দিতে পারে ক্ষতি কি শুনতে? অযথা ভিড়ের ভেতর লাইনে ঠাসাঠাসি করার মানে আছে? তাছাড়া এই যে বিরাট বিস্ময়ের বিচারালয় যার শুরু শেষ কী যে আছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এত বড় এলাকা ঘুরে দেখবার একটা লোভও তো থাকেই! চিরকাল শুনে এসেছি এই বিচারভূমির কথা, কত রকমের বর্ণনা! তা যদি না খুঁড়ে দেখি শান্তি হয়? তাই লোকেরা বেরিয়ে পরে ঘুরে দেখতে! খাবারদাবারের তো চিন্তা নেই, সবই ফাউ! তো সেই ঘুরতে গেলে আবার আগের যায়গায় ফিরে আসতে আসতে যে সময় পেরিয়ে যায়, তাতে আগের নিয়মে কবার জন্মমৃত্যু হয়ে যেতে পারে ঠিক নেই। কিন্তু ফিরে এসেও দেখবে সেই একই দৃশ্য! যেন কিছুরই বদল হয়নি।  সেই ঘেয়ো কুকুর ফাঁকে ফাঁকে লেজ নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছে চিৎ হয়ে। বিস্ময়ে আগেরজন বলল, তাহলে বিচার পাবার চান্স নেই? একজন কেউ বলল, কুকুরটার কাছে শুনে দেখতে পারেন, আপনার ফাইলের অবস্থা কী! লোকটা বলল, পেমেন্ট দিতে হবে নাকি? আগেরজন বলল, ধুর! পয়সা নিয়ে করবে কী? কিনবে কী এখানে? কেনার মতন জমি আছে এখানে? ফলে বোঝা গেল লোকটা জমির কারবারি। আগের লোকটা বলল, কিন্তু ভাষা বিষয়ক সমস্যা হবার কথা তো? মানে আমার ভাষা আর…। আগের লোকটা বলল, সবাই কথা বলতে পারে এখানে। আপনি মনে হয় এখানে ঢোকামাত্র বাতাসে দুলতে থাকা নিয়মাবলিটা পড়েননি! ওখানে লেখা ছিল, এখানে একটাই ভাষা, সবাই সেই ভাষাতেই কথা বলে। লোকটা বিস্ময় নিয়ে বলে, কুকুরও কথা বলে? পৃথিবীতে থাকতে তো বলেনি? তখন কেউ একজন রাশভারি স্বরে বলে উঠল, বলত! কিন্তু বুঝতে পারিনি আমরা। ফলে, লোকটার কাছে কেমন জানি ইয়ার্কি ইয়ার্কি লাগে সব কিছু। এবং সে বলে, মহিলার সঙ্গে কথা বলা যাবে? কেউ একজন বলল, কেন টাংকি মারবেন নাকি? লোকটা বলল, এহ্‌ তা না আসলে জানতে চাচ্ছিলাম কুকুরটা তাকে কী বলেছে? আগের লোকটা বলল, জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন, তবে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে যাবেন না, তাহলে আপনার বিচার পিছিয়ে যেতে পারে। লোকটা বলল, তাহলে থাক। তখন কেউ একজন বলে, মধ্যবিত্ত তাই না? লোকটা কিছু বলে না দূরে বিচারালয়ের বারান্দায় ধুঁকতে থাকা ঘেয়ো কুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ যেন বলে, কুকুরটা বিচার পেলে অন্তত আমরা নিশ্চিত হতাম আমাদেরও সম্ভাবনা আছে। তখন একজন বলল, হুম তা ঠিক।  এরপর আমাদের পাঠাবে কোথায় এখান থেকে? নাকি এটাই বিচার? সেই লোকটা বলল, আচ্ছা ছোটকোর্টের বিচারকক্ষগুলোর দেওয়ালে বিচারকের নামের ওখানে লেখা আছে, ভারপ্রাপ্ত বিচারক। ব্যাপারটা কী? তখন সেই ভারি কণ্ঠটা বলে, আসলে কে যে কার উপর ভার দিচ্ছে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। আবার অন্য কেউ বলে ওঠে, মাঝারি কোর্টের দরজা আমি এখনও খুঁজে পাইনি। মানে ভেবেছিলাম এক ঝলক দেখব, ঐ দুয়ারে যারা দাঁড়িয়ে তারা দেখতে কেমন। রাশভারি কণ্ঠটি বলল, সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের সেটা দেখার কথা মনে থাকবে বলে মনে হয় না। তখন ভিড়ের ভেতর থেকে একটা নারীকণ্ঠ বলে উঠল, পরিচিত কাউকেই তো খুঁজে পাচ্ছি না।  আগেরজন সেটা শুনে বলল, ঐ দেখো উনি আবার পরিচিত মুখ খুঁজছেন। উনিও বোধহয় আপনার মতো নিয়মকানুন না পড়ে ঢুকে পড়েছেন। রাশভারি লোকটা বলল, মেয়েটাকে বলে দাও, এখানে অন্তত মহল্লার কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই লোকটা বলে, বলেন কী? তখন একজন কেউ বলে, এখানে ভাষা এক এবং সবাই কথা বলতে পারে, তবে দেখা যাচ্ছে কেউ কারও পরিচিত বা পাড়ার কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না, আবার লোকেরও অভাব হচ্ছে না। যেমন ধরুন আমরা কজন কথা বলছি কিন্তু আমারা কাউকেই চিনি না। তখন লোকটা বলল, যাহ্‌ শালা তাহলে বিচার কিসের! বিচারকও কি আমাদের চিনবেন? যদি বলে বসেন এই নামে কোনও কেস নেই! রাশভারি কণ্ঠটি এগিয়ে এসে বলে, ভালো বলেছ! তাহলে বিচার বলে কিছু নেই! কিংবা এই পুরো ব্যাপারটাই একটা তামাশা! চিনচিনে একটা কণ্ঠ বলে উঠল, তাহলে সময়? কে যেন বলল, সেটার ফাঁদেই আছি আমরা! নাকি আরও অন্য কিছু! একজন কেউ বলল, তাহলে কি এখানে আসার আগে যা ঘটেছিল সেটাই বিচার ছিল? কে যেন, হো হো হো… করে হেসে ফেলল! রাশভারী কণ্ঠটি বলল, ভালো বলেছ। তখন কুকুরটা হাই তুলল। কে যেন বলল, কুকুরটার মনে হচ্ছে ঘুম পাচ্ছে। অন্য কেউ বলল, বলো কী! এখানে আবার ঘুম আছে নাকি? আগের লোকটা বলল, ওহ তাও তো একটা কথা! একজন বলল, কুকুরটার ইতিহাস জানেন? অন্য কেউ বলল, না তো! আগের লোকটা বলল, কুকুরটা নাকি আদিম মানুষদের কারও হাতে পাথরের ঘায়ে শিকার হয়েছিল। তখনও বোধহয় এদেরকে গৃহপালিত হিসেবে নেওয়া হয়নি। তারপর ওটাকে খেয়ে ফেলে তারা।  একজন বলল তারপর? কথক লোকটা বলল, ঐ তো তারপর কুকুরটা নাকি বিচার চেয়েছিল তার এমন নির্মম মৃত্যুর জন্য। তখন বিচারপতি বিরক্ত হয়ে ওকে আবার জন্ম দিয়ে পাঠায়। একজন কেউ বলল, বাহ! তারপর? লোকটা বলে, এবার সভ্য সমাজে জন্মাল। ভালোই ছিল কুকুরটা ডাস্টবিনের খাবার খেয়ে বেঁচে ছিল। কাউকে ঘাঁটাত না। একবার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, কে যেন অযথাই ভাতের গরম মাড় ছুড়ে দিয়েছিল ওর শরীরে, তারপর পাছার একটা অংশ ঝলসে গেল। সেই ঘা নিয়ে দগদগে দিন কাটাতে লাগল বেচারা। তারমধ্যে বর্ষাকাল এল, খাবারের অভাব দেখা দিল। ফলে একটা হোটেলের ধারেকাছে শুয়ে থাকত কুকুরটা, হোটেলের এক মেসিয়ার হাড়গোড় দিত খেতে। একদিন কুকুরটা যখন ঘুমোচ্ছে তখন এক বালক একটা ইট ছুঁড়ে ওর একটা পা থেঁতলে দিল। ভীষণ রাগ হয়েছিল ওর। সেদিন কিছু বলতে পারেনি শুধু চিৎকার দিয়ে কেঁদেছে। তার কদিনপর একদিন সে ছেলেটাকে দেখতে পেল। ওর মাথায় ঝিলিক মেরে উঠল ক্রোধ! লেংচে লেংচে ছুটে গিয়ে কামড়ে দিল বালককে। শ্রোতাদের একজন বলল, তারপর? কথক লোকটা বলল, কদিন পর একদিন কর্পোরেশনের লোকেরা এল। তাদের লোকেরা কোনও কথা ছাড়াই সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরল ওর ঘেয়ো শরীর, অন্য একটা সাঁড়াশি দিয়ে আটকে ধরা হল ওর গলা! শ্রোতাদের একজন বলল, থাক থাক আর বলার দরকার নেই। কথক বলল, উঁহু! ভাব্বেন না যে ইনজেকশন ফুটিয়ে মেরে ফেলা হল। বরং একটা মুগুর দিয়ে পিটিয়ে থেঁতলে ওর মগজ বের করে দিয়ে খুন করা হল ওকে। এবং রাষ্ট্রের ইনজেকশনের খরচ বাঁচানো হল। শ্রোতাদের একজন বলল, এহ! কী বিশ্রী মৃত্যু! সহ্য করা যায় না। কথক বলল, ওর শরীরের ঐ পাশটায় গিয়ে দেখবেন, মাথা থ্যাঁতলানো, মগজ নেই, চোখ বেরিয়ে এসেছে। শ্রোতারা বলল, থাক। আর না। কিন্তু একজন বলল, তা এখানে সে কীসের বিচার চাইতে এসেছে? কথক বলল, তা জানি না, তবে শুনেছি, ঐ মহিলা নাকি ওর কাছে জানতে গিয়েছিল তার স্বামী হত্যার বিচার পাওয়ার পথ কী? তখন নাকি কুকুরটা জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যার বিচার এখানে হয় না। কে যেন বলল, তাহলে ও নিজে কেন বসে আছে? রাশভারি কণ্ঠটা বলে উঠল, এটা তো আমার প্রশ্ন!

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...