চন্দ্রযান, চন্দ্রজান

সোমদেব ঘোষ

 

গত শতকের ষাটের দশকে মানুষ চাঁদে পাড়ি দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে স্পেস রেসে প্রথমে এগিয়ে ছিল সোভিয়েতরাই, মহাকাশে তারাই প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ (স্পুটনিক ১), প্রথম প্রাণী (কুকুর লাইকা— স্পুটনিক ২), প্রথম মানুষ (ইউরি গ্যাগারিন— ভস্তক ১), প্রথম মহিলা (ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা— ভস্তক ৬) পাঠিয়েছিল। লুনা ২ প্রথম চাঁদে ল্যান্ড করে (হার্ড ইম্প্যাক্ট), লুনা ৩ প্রথম চাঁদের ও-পিঠের ছবি তোলে, আর লুনা ৯ প্রথম চাঁদের মাটিতে সফ্ট ল্যান্ডিং করে। কিস্তিমাত অবশ্য মার্কিনরাই করেছিল, ২০-শে (ভারতে ২১-শে) জুলাই ১৯৬৯ সালে মেসার্স আর্মস্ট্রং ও অল্ড্রিন চাঁদের মাটিতে পা রাখেন। রাশিয়া কোনওদিনও চাঁদে মানুষ পাঠাতে সক্ষম হয়নি, আর ১৯৭২ সালের পর মার্কিনরাও আর চাঁদমুখো হয়নি।

সোভিয়েত মহাকাশযান ও মহাকাশচারী। বাঁদিকে ওপরে, স্পুটনিক ১। ডানদিকে ওপরে, লাইকা। বাঁদিকে নীচে, ইউরি গ্যাগারিন। ডানদিকে নীচে, ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা

মার্কিন মহাকাশচারী, চাঁদের বুকে প্রথম মানুষ — ছবিতে বাজ অল্ড্রিন, হেলমেটের প্রতিফলনে ক্যামেরা হাতে নীল আর্মস্ট্রং

“ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম্যান, ওয়ান জায়ান্ট লিপ ফর ম্যানকাইন্ড”— এই রেডিও বাক্যের ঠিক পঞ্চাশ বছর আড়াই দিনের মাথায় ভারতবর্ষের ইসরোর (ISRO) জিএসএলভি মার্ক ৩ (GSLV Mark-III) “বাহুবলী” রকেট চেপে চন্দ্রযান-২ চাঁদের দিকে পাড়ি দিয়েছে। টিনটিনের রকেটের মত সোজা লাইনে যাচ্ছে না অবশ্য, প্রথমে পৃথিবীর চারদিকে পাক খাবে চন্দ্রযান,পাক খেতে খেতে ক্রমে তার কক্ষপথের ব্যাস বাড়ানো হবে, অবশেষে ঠিক সময়ে তাকে ঠেলা মেরে পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের কক্ষপথে পাঠানো হবে। তারপর সময় বুঝে চন্দ্রযান থেকে বিক্রম নামক ল্যান্ডার বিচ্ছিন্ন হয়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি নামবে, তারপর প্রজ্ঞান নামক রোভার আশেপাশের ৫০০ মিটার অবধি চলে ফিরে বেড়িয়ে গবেষণা করবে। প্রজ্ঞান আর বিক্রম (বিক্রম সারাভাইয়ের নামে এর নাম) মোটামুটি ১৪ দিন কাজকর্ম করবে, তারপর ওখানে সূর্য ডুবে রাতের অন্ধকার হয়ে গেলে তারাও চিরকালের মত ঘুমিয়ে পড়বে। চন্দ্রযান-২, মানে যেটা অর্বিটার, সেটা অবশ্য বছরখানেক চাঁদের চারদিকে ঘুরবে, গবেষণা চালাবে। চন্দ্রযান-১ যেমন চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে মাটিতে জলের আভাস পেয়েছিল, চন্দ্রযান-২ তেমনই কি জলের খোঁজ পাবে? আর জল থাকলে জীবিত কিছুর থাকারও সম্ভাবনা কি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়?

জিএসএলভি মার্ক ৩ রকেট, ডাকনাম “বাহুবলী”

চন্দ্রযান-২ কীভাবে চাঁদে যাবে: গোলাপিটা চন্দ্রযান, নীলটা পৃথিবী, আর সবুজটা চাঁদ। জুলাই মাসের মাঝামাঝি পৃথিবীর মাটি ছাড়ার পর চন্দ্রযান মাসখানেক পৃথিবীকেই পাক খাবে, তারপর আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের কক্ষপথের দিকে পাড়ি দেবে। মোটামুটি ১৮ আগস্ট চন্দ্রযান পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছবে। এর দু’দিন বাদে, ২০ আগস্ট, চাঁদও সেই জায়গায় এসে পড়বে, আর চন্দ্রযান এবার চাঁদের চারদিকে পাক খেতে শুরু করবে

মহাকাশ জায়গাটা বড়ই ফাঁকা। চারিদিকে শুধুই ভ্যাকুয়াম, শুধু মরুদ্যানের মত কোথাও কোথাও গ্যালাক্সি, তারা, বা গ্রহ-উপগ্রহ পাওয়া যায়। সূর্যের সংসারও এমনই— তারা একখানা, তার চারপাশে আটখানা গ্রহ (প্লুটো এখন বামনগ্রহ), আর সেই গ্রহের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু উপগ্রহ। বুধ শুক্র এরা একা থাকতেই পছন্দ করে, তাদের কোনও উপগ্রহ নেই। মঙ্গলের আছে দুইখান (ফোবোস আর ডীমস), কিন্তু তারা আয়তনে বড়ই ছোট। বৃহস্পতির ছোটবড় মিলিয়ে ঊনআশিখানা (৭৯) আছে, যদিও এদের মধ্যে চারজন (ইও, ক্যালিস্টো, ইউরোপা, গ্যানিমীড) মোটামুটি বড়সড় সাইজের। শনির গোটা বাষট্টি (৬২) উপগ্রহের মধ্যে টাইটান সবার বড়, রিয়া মেজবোন। ইউরেনাসের সাতাশটা (২৭) আর নেপচুনের চোদ্দটা (১৪) উপগ্রহ আছে, আর প্লুটোর আছে একখানা, ক্যারন। অবশ্য প্লুটোর তুলনায় ক্যারনের যা সাইজ, তাতে তাকে প্লুটোর উপগ্রহ না বলে ছোটভাই বা বাইনারি প্ল্যানেট বললেও খুব একটা ক্ষতি নেই।

সৌরমণ্ডলের প্রধান উপগ্রহরা

ইয়ে, না, থুড়ি, নীল ডেগ্রাস টাইসন রাগ করবেন। বাইনারি ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট। মানিকজোড় বামনগ্রহ। খুশি?

সেদিক থেকে দেখতে গেলে পৃথিবীর উপগ্রহ মাত্র একটি, চাঁদ বা মুন বা লুনা। সাইজে খুব একটা বড়ও না আবার খুব ছোটও না, পৃথিবীর চারভাগের এক ভাগ। চাঁদের পৃষ্ঠতলের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের ছ’ভাগের এক ভাগ। অতএব খুব একটা পার্থক্য নেই দু’য়ের মধ্য, আবার ঠিক যমজগ্রহও নয়। ‘ঠিকঠাক’ উপগ্রহ হতে গেলে যা যা গুণাগুণ লাগে, চাঁদের প্রায় সবই আছে, ঠিক যেন গোল্ডিলক্স। অবশ্য একটা বিশেষ জায়গায় তফাত আছে বটে। পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে এক বায়ুমণ্ডল, যা না থাকলে পৃথিবীর বুকে প্রাণ বা কম্প্যুটারের স্ক্রিনে এই লেখা, দু’য়ের কারুরই অস্তিত্ব থাকত না। চাঁদের এই একটা জিনিসের অভাব, চাঁদের কোনও বায়ুমণ্ডল নেই। তাই চাঁদের বুকে কখনও প্রাণ আসেনি, বা যদি এসে থাকেও বিবর্তনের সিঁড়িতে মাইক্রোঅর্গানিজমের ওপরে উঠতে পারেনি।

চাঁদের বুকে প্রাণ নেই বটে, কিন্তু চাঁদের প্রভাব কিন্তু পৃথিবীর প্রাণীদের জীবনে বেশ প্রবল। ক্যালিফোর্নিয়া গ্রুনিয়ন [California Grunion (Leuresthestenuis)] বলে এক প্রকার মাছ হয়, তারা মার্চ মাস থেকে আগস্ট অবধি মাসে দু’বার করে মার্কিন মুলুকের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রসৈকতে এসে ডিম পাড়ে। দিনদশেক বাদে ডিম ফুটে মিনিমাছ বের হয়, জোয়ারের জল এসে তাদের সমুদ্রবাড়িতে নিয়ে যায়। অবশ্য যেকোনও জোয়ার হলে চলবে না, ভরা কোটাল চাই, নয়তো প্রচুর সদ্যোজাত মাছ সৈকতেই শেষ হয়ে যাবে। অতএব, গ্রুনিয়নদের হিসেবটিসেব করে ভরা কোটালের ঠিক দশ দিন আগে সৈকতে এসে ডিম পাড়তে হয়। গ্রুনিয়নরা জোয়ারভাটার পাঁজি ছাপায় বলে জানা যায় না, কিন্তু এর পেছনে বিবর্তনের ভূমিকা যে বড়ই মুখ্য, সেটা অতিবড় মুখ্যুকেও বলে দিতে হয় না।

ক্যালিফোর্নিয়া গ্রুনিয়ন

অবশ্য চাঁদমামা, তাঁর ভর এবং ফলত তাঁর মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে নো জোয়ারভাটা, নো বাচ্চা গ্রুনিয়ন। সুয্যিদেব আছেন বটে, কিন্তু জোয়ারভাটার ওপর চাঁদের তুলনায় তাঁর প্রভাব নিতান্তই কম।

দৈনিক জীবনে আমরা চাঁদ বলতে অবশ্য ভর, মাধ্যাকর্ষণ, বা জোয়ারভাটাও বুঝি না (মাছধরা পেশা হলে অন্য কথা)। চাঁদ বলতে আমরা বুঝি জ্যোৎস্না, চাঁদের আলো। ছোটবেলাটা যাদের গ্রামের দিকে কেটেছে, অমাবস্যার রাতে পাঁচ ব্যাটারির (ট্যাঁকে না পোষালে তিন ব্যাটারির) টর্চ ছাড়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া মানেই হয় খানাখন্দে পা পড়ে মচকানো, বা সাপের কামড় খেয়ে পটলচাষ। পূর্ণিমা থাকলে ব্যাপারটা পুরো আলাদা, টর্চ দিয়ে কী হবে, আকাশেই তো জলজ্যান্ত একটা সার্চলাইট বসে আছে। অবশ্য এই সার্চলাইটের আলো কোমল, মিষ্টি, ঠান্ডা। এতে কাঠ-কাঠ ছায়া পড়ে না, এতে চোখ ঝলসে যায় না, আদপে যেখান থেকে আলোটা আসছে সেই সূর্যের মত এ আলো সোনালি নয়। পূর্ণিমার রাতে পুরো পৃথিবীটা যেন একটা রূপোলি চাদরে মুড়ে যায়। পান্না কোথায় গল্পে টিনটিন ঠিক এরকমই এক জ্যোৎস্নালোকিত রাতে জিপসিদের গান শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে পড়েছিল। জ্যোৎস্নায় কেমন একটা অদ্ভুত মায়াবী কবিতা আছে, তাই না?

টিনটিনের “পান্না কোথায়” বইতে চাঁদনি রাতে জিপসিসঙ্গীত

অবশ্য সুকান্তও খুব ভুল বলে যাননি। জ্যোৎস্নালোকিত রাতে পদ্য পেলেও চাঁদ অনেকের কাছে গদ্যময় রুটিই। সিংহের কাছে তো বটেই। তাঞ্জানিয়ার সেরেঙ্গেটি ন্যাশানাল পার্কে রাতে সিংহ— থুড়ি, সিংহীরা শিকার করতে বেরোয়। শিকার বলতে বড়সড় তৃণভোজী প্রাণী, নয়ত সিংহদের পেট ভরবে না যে। কথায় বলে, সিংহদের পেট নাকি অন্ধকার কুঁয়ো।

বড়সড় তৃণভোজীদের ক্ষেত্রেও অবশ্য একই কথা প্রযোজ্য। শরীর বিশাল, এদিকে ঘাসফুসে ফুড ভ্যালু থাকলেও এনার্জি অতটাও নেই। তাই খেতে হয় প্রচুর। দিনরাত জেগে থাকা অবস্থায় ঘাস শিকারেই মনোযোগ দেয় বিপুলদেহী তৃণভোজীরা।

উইল্ডেবিস্ট (Wildebeest) হল সিংহীদের পেয়ারের শিকার। প্রিন্সটনের মেরেডিথ পামার ও সহগবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, যে দিন পনের চাঁদের দেখা খুব একটা পাওয়া যায় না, সে সময়টা উইল্ডেবিস্ট মোটামুটি একটা সুরক্ষিত জায়গা দেখে সেখানেই সবাই একসঙ্গে গুটিসুটি মেরে ঘাসটাস চিবোয়। শুক্লএকাদশী পেরোলে তারা তাদের সাহসের বেলুনে হাওয়া ভরে এদিকওদিক বেরোয় ভাল ঘাসের উদ্দেশ্যে।

উইল্ডেবিস্ট ও চাঁদ

ওদিকে আফ্রিকান বাফেলো (African Buffalo) আবার শুক্লপক্ষ-কৃষ্ণপক্ষের ধার ধারে না। আকাশে চাঁদের আলো থাকলে তাদের পায় কে, খাবার যেখানে, তারাও সেখানে। অবশ্য মনে রাখতে হবে সাইজে এই মোষেরা উইল্ডেবিস্টের চেয়েও বড়, সিংহরা সহজে এদের ঘাঁটায় না। তাও, আকাশ অন্ধকার থাকলে এরা একসঙ্গে এসে যূথ বানিয়ে খাওয়াদাওয়া সারে। সংখ্যা যার, জোর তার। মুলুকের কথা বলতে পারব না।

টমসন’স গ্যাজেলরা বুদ্ধিমান প্রাণী। চাঁদ ওঠার পরেই তারা তাদের ডিনারে মন দেয়। জেব্রাদের ততক্ষণে আঁচানো হয়ে গেছে অবশ্য। তার মানে এটা নয় যে জেব্রাদের মাথায় বুদ্ধি নেই। গবেষকদের মতে, চাঁদ ওঠার আগেই খাওয়াদাওয়া সেরে নেওয়াটা সিংহদেরই বোকা বানানোর প্ল্যান।

তৃণভোজী-মাংসাশী-লায়নকিংদের দেশ ছেড়ে আমরা আরেকটু দক্ষিণে যাই, আফ্রিকার একদম দক্ষিণে, দক্ষিণ আফ্রিকায়। তৃণভূমি প্রচুর এখানে, বৃষ্টি ততটা প্রচুর নয়, তাই হাতিদের গোবরই হল গুবরেপোকাদের (Dung Beetle) জলখাবারের স্টল। খাদ্য ও বাষ্প, এই দুই-ই যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায় হস্তীমলে, কিন্তু বেশি দেরি করলে শুকিয়ে যাবে, বা অন্য গুবরেপোকারা এসে সব চেটেপুটে সাফ করে দেবে। গুবরেরা তাই যা পারে খেয়েটেয়ে বাকিটা দিয়ে একটা বল বানিয়ে সেটা গড়িয়ে গড়িয়ে একটা গর্তটর্তর মধ্যে গিয়ে ঢোকে।

বাঁদিকে রাতের আকাশ ও ডাঙ বিটল, বাঁদিকে গোবরডেলা নিয়ে দুই গুবরের লড়াই

মুশকিল হল, গড়িয়ে যে গর্তের দিকে যাবে, জিপিএস তো নেই, গর্তের দিকে যেতে গিয়ে জনসন-রনসনের মত নিজের চারদিকেই যদি ঘুরতে থাকে, গুবরেপোকাদের তো তাহলে সাড়ে সর্বনাশ! দরকার একটা ম্যাপকম্পাসের, যাতে করে কিনা গুবরেরা সোজা সরলরেখা বরাবর গোবর-টু-গর্ত ডিরেক্ট লাইনে যেতে পারে।

দিনের বেলা কোনও অসুবিধা নেই। আকাশে সূর্য আছে। রাতের বেলা কী হবে? কেন, চাঁদ আছে যে। চাঁদের আলো বায়ুমণ্ডলে ঢুকে গ্যাস ও ধুলোর কণার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে স্ক্যাটার করে, করেটরে পোলারাইজড (polarized) হয়ে যায়। গুবরেপোকাদের মধ্যে এক বিশেষ স্ক্যারাব প্রজাতি (Scarabaeussatyrus) এই পোলারাইজড আলোর প্যাটার্ন দেখে দিকনির্ণয় করে নেয়। পূর্ণিমা হলে সবচেয়ে সুবিধা; বঙ্কিমচন্দ্র হলে বা আকাশে মেঘ থাকলে মুশকিল, চান্দ্রেয় জিপিএস কাজ করবে না।

আরও মুশকিল হল কাছেপিঠে শহরটহর থাকলে। মানুষের স্বভাবই হল রাতে কৃত্রিম আলোয় পুরো শহর আলোকিত করে ফেলা। কলকাতার কথাই ধরা যাক, শহরে শেষ কবে পুরোপুরি অন্ধকার আকাশ দেখা গেছে মনে পড়ে? এত আলোকদূষণ থাকলে চাঁদের আলোর পোলারাইজেশন দেখে রাস্তা চিনে নেওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। স্ক্যারাবদের (এখনও অবধি) চিন্তা নেই, তারা শহুরে সভ্যতার অনেক দূরে বাস করে। কিন্তু স্ক্যারাবরা তো আর একমাত্র প্রাণী নয় যারা পোলারাইজড চাঁদের আলো ব্যবহার করে জীবনযাপন করে, শহরের কাছাকাছি মানুষের কাছাকাছি যারা বসবাস করে, তাদের কী হবে?

দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে এবার আরও একটি ক্রিকেট খেলিয়ে দেশে যাওয়া যাক। নিউজিল্যান্ডের কাছে গ্রেট ব্যারিয়র রিফ, সেখানে থাকে ট্রিপলফিন মাছ [Common Triplefins (Forsterygionlapillum)]। প্রতিবেশী প্রচুর, তাদের বেশিরভাগই খুব একটা বন্ধুভাবাপন্ন নয়। বাঁচতে হলে বাচ্চা মাছেদের প্রবালজঙ্গলে থাকলে চলবে না, চলে যেতে হবে গভীর সমুদ্রে, সেখানে লাঞ্চডিনার হবার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। বাচ্চা ট্রিপলফিন মাছ জন্মাবার পর ৫২ দিন গভীর সমুদ্রে কাটিয়ে তারপর প্রবালজঙ্গলে ফিরে আসে। অবশ্য ছোটবেলায় এইরকম নির্বাসনে শুধু ট্রিপলফিনরাই যায় না, প্রচুর মাছের প্রজাতিই এই একই কাণ্ড করে। তাহলে ট্রিপলফিন নিয়ে কথা বলছি কেন?

তার কারণ ট্রিপলফিনের কানের মধ্যে অটোলিথ (Otolith) নামক এক বস্তু পাওয়া যায়। ক্যালসিয়াম কার্বোনেট (CaCO3) দিয়ে তৈরি এই অটোলিথের ওপর রোজ নতুন একটা স্তর জমা হয়, ক্রস সেকশন নিলে মনে হবে ঠিক যেন গাছের বর্ষবলয় (tree rings)। বাচ্চা ট্রিপলফিন যত তাড়াতাড়ি বড় হবে, সেইদিনের স্তর ততটাই পুরু হবে। কোন স্তর কত পুরু মাপলে দেখা যায় অমাবস্যার রাতে মাছগুলো সবচেয়ে ধীরে বাড়ে। আকাশে চাঁদ আছে কিন্তু মেঘও আছে, এমন রাতে দেখা যায় মাছগুলোর বড় হওয়ার হার বেড়েছে। এই হার সবচেয়ে বেশি হয় পূর্ণিমার রাতে। অর্থাৎ আকাশে চাঁদ থাকলে, এবং চারদিকে ফটফটে জ্যোৎস্না থাকলে ট্রিপলফিন মাছও তাড়াতাড়ি বড় হয়।

এর কারণ দু’টো। এক, জ্যোৎস্না থাকলে বাচ্চা মাছগুলো সহজেই প্ল্যাঙ্কটন খুঁজে খেতে পারে, বাড়েও তাড়াতাড়ি, কমপ্ল্যান লাগে না। দুই, ট্রিপলফিন যাদের পেটে যায়, সেই লণ্ঠনমাছ (Lantern fish) আবার জ্যোৎস্না থাকলে খাবারের খোঁজে বেরোয় না— আলো থাকলে আরও বড় মাছের পেটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, লণ্ঠনমাছ তাই লুকিয়ে থাকে, ট্রিপলফিন তাই আরামসে রিল্যাক্স করতে করতে খাওয়াদাওয়া সারতে পারে। স্ট্রেস কম হলে বাড়ও বেশি হয়। অতএব চাঁদ থাকলে ট্রিপলফিনের পোয়া বারো।

বাঁদিকে ট্রিপলফিন, ডানদিকে সিক্সবার র‍্যাস

প্রবালজঙ্গলে ফেরার সময় ব্যাপারটা পাল্টে যায়। বাচ্চা মাছ এখন বড় হয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় মাছ রিফে আছে। তাই রিফে ফেরাটা করা দরকার রাতের অন্ধকারে, চাঁদমশাই থাকলে মুশকিল, পাড়ার দাদাদের পেটে যেতে হবে। সিক্সবার র‍্যাস [Sixbar Wrasse (Thalassomahardwicke)] নামক মাছ তাই পূর্ণিমার আশেপাশে রিফে ফেরে না, দিনকতক গা ঢাকা দিয়ে অন্ধকার বাড়লে লুকিয়েচুরিয়ে পাড়ায় ফেরে।

ভরতপুর বার্ড স্যাঙ্কচুয়ারি, যার নাম এখন কেওলাদেও ঘানা জাতীয় উদ্যান, এক অতি অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। ফি বছর এখানে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এসে শীত কাটিয়ে যায়। পরিযায়ী পাখি বললেই আর্কটিক টার্নের কথা আসতে বাধ্য— এরা বছরে সত্তর থেকে নব্বুই হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়।

জুপ্ল্যাঙ্কটনদের (Zooplankton) মাইগ্রেশানের কাছে অবশ্য আর্কটিক টার্ন নেহাতই শিশু।

প্ল্যাঙ্কটন মূলত দু’প্রকারের হয়— ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (Phytoplankton) সালোকসংশ্লেষ করে নিজেরাই রান্নাবান্না করে নেয়, জুপ্ল্যাঙ্কটন এই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন খেয়েই বেঁচে থাকে। উল্টে তারা আবার ট্রিপলফিনের মত প্রচুর ছোট ছোট মাছের খাদ্য হয়। এদের হাত থেকে বাঁচতে জুপ্ল্যাঙ্কটন সমুদ্রের গভীরে দৈনিক ডাইভ দেয়। গভীর জলে সূর্যের আলো সহজে পৌঁছয় না, ট্রিপলফিন জাতীয় চোখে দেখে শিকার করা মাছও তাদের নাগাল পায় না। সূর্য ডুবে গেলে জুপ্ল্যাঙ্কটন ফের সমুদ্রের ওপরের স্তরে ফিরে আসে।

বাঁদিকে বিভিন্ন জুপ্ল্যাঙ্কটন, ডানদিকে জুপ্ল্যাঙ্কটনদের দৈনিক মাইগ্রেশন

এই দৈনিক মাইগ্রেশান সমস্ত পৃথিবী জুড়ে চলতে থাকে। প্রত্যেক দিন সূর্যের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাঙ্কটনবাহিনীও সমুদ্রের গভীর থেকে অগভীর, এবং ফের গভীরে ফিরে যায়। হিসেব করে দেখা গেছে এই ওঠানামার টাইম পিরিয়ড ঠিক ২৪ ঘণ্টা, অর্থাৎ পৃথিবীতে এক সৌরদিবস (1 solar day on Earth), সুয্যিদেবের সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে।

শীতকালে সুমেরুবৃত্তের উত্তরে, অর্থাৎ উত্তরমেরুর কাছে তাহলে কী হয়? সূর্যের দেখা তো পাওয়া যাবে না, জুপ্ল্যাঙ্কটনদের মাইগ্রেট করার প্রয়োজনও তো নেই, তাই না?

আজ্ঞে না, প্রয়োজন আছে। সূর্য নেই তো কী হয়েছে, চন্দ্রভাই তো আছেন। জুপ্ল্যাঙ্কটনদের সেই দৈনিক ওঠানামা করতেই হয়, শুধু এবার টাইম পিরিয়ড ২৪ ঘণ্টা নয়, ২৪.৮ ঘণ্টা, অর্থাৎ পৃথিবীতে এক চান্দ্রেয় দিবস (1 lunar day on Earth)। শুধু তাই নয়, পূর্ণিমা যত এগিয়ে আসে, চাঁদের ঔজ্জ্বল্য যত বাড়ে, জুপ্ল্যাঙ্কটনরা তত গভীরে নেমে যায়। পূর্ণিমার দিন তারা ৫০ মিটার গভীরে পৌঁছে যায়। কোন রাতে কত গভীর অবধি নামছে সেটা সোনার (sonar) দিয়ে মাপলে দেখা যায়, এই ডিপেস্ট ডাইভের গভীরতারও একটা টাইম পিরিয়ড আছে— ২৯.৫ দিন, অর্থাৎ পৃথিবীতে এক চান্দ্রেয় মাস (1 lunar month)।

অর্থাৎ চাঁদের সঙ্গে ঠিক কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে।

অতএব পৃথিবীতে জানের ওপর চন্দ্রের প্রভাব নিঃসন্দেহে বহুত দুর্ধর্ষ!

 

তথ্যসূত্র

এই লেখাটার অনেক তথ্যই সায়েন্স নিউজ ম্যাগাজিনের একটি আর্টিকেল থেকে সংগৃহীত, আর্টিকেলটির লিঙ্ক তলায় (1) দিলাম।

  1. Moonlight shapes how some animals move, grow and even sing: https://www.sciencenews.org/article/moon-animals-light-behavior-lunar-phases
  2. A ‘dynamic’ landscape of fear: prey responses to spatiotemporal variations in predation risk across the lunar cycle : https://doi.org/10.1111/ele.12832
  3. Insect orientation to polarized moonlight: https://www.nature.com/articles/424033a
  4. Dung Beetles Use the Milky Way for Orientation: https://doi.org/10.1016/j.cub.2012.12.034
  5. Beetles navigate by lunar polarity (Moonlighting):https://www.thefreelibrary.com/Beetles+navigate+by+lunar+polarity.+(Moonlighting).-a0105853348
  6. Moonlight enhances growth in larval fish: https://doi.org/10.1002/ecy.2563
  7. Moonlight Drives Ocean-Scale Mass Vertical Migration of Zooplankton during the Arctic Winter: https://doi.org/10.1016/j.cub.2015.11.038
  8. The moon drives the migration of Arctic zooplankton:https://www.sciencenews.org/blog/wild-things/moon-drives-migration-arctic-zooplankton

ছবিসূত্র

  1. Sputnik I replica: https://en.wikipedia.org/wiki/Sputnik_1#/media/File:Sputnik_asm.jpg
  2. Laika: https://en.wikipedia.org/wiki/Laika#/media/File:Laika_(Soviet_dog).jpg
  3. Yuri Gagarin: https://www.berfrois.com/2012/04/the-cosmonaut-andrew-jenks/
  4. Valentina Tereshkova: https://www.thefamouspeople.com/profiles/images/valentina-tereshkova-3.jpg
  5. Aldrin and Armstrong: https://en.wikipedia.org/wiki/Apollo_11#/media/File:Aldrin_Apollo_11_original.jpg
  6. Chandrayaan II animation: https://en.wikipedia.org/wiki/Chandrayaan-2#/media/File:Animation_of_Chandrayaan-2_around_Earth.gif
  7. Chandrayaan II on Baahubali: https://www.financialexpress.com/lifestyle/science/chandrayaan-2-launch-isro-has-just-a-few-minutes-to-launch-lunar-mission-heres-why/1652260/
  8. Major Moons of the Solar System: http://www.planetary.org/multimedia/space-images/charts/the-solar-systems-major-moons.html
  9. California Grunion: https://www.californiabeaches.com/california-grunion-run/
  10. Tintin Castafiore Emerald Gypsies Moonlit Night: http://en.tintin.com/news/index/rub/0/id/5189/0/the-castafiore-emerald-available-in-the-tintin-app#
  11. Wildebeest Moon: https://c1.staticflickr.com/7/6222/6356011097_77360ca29f_b.jpg
  12. Dung Beetle and Night Sky: https://www.smithsonianmag.com/science-nature/african-dung-beetles-navigate-at-night-using-the-milky-way-5582232/
  13. Common Triplefin: https://en.wikipedia.org/wiki/Common_triplefin#/media/File:Forsterygion_lapillum_(Common_triplefin).jpg
  14. Sixbar Wrasse: https://en.wikipedia.org/wiki/Sixbar_wrasse#/media/File:Thalassoma_hardwicke_R%C3%A9union.jpg
  15. Zooplankton Variety: https://en.wikipedia.org/wiki/Zooplankton#/media/File:Zooplankton.jpg
  16. Zooplankton diel migration: https://www.livingoceansfoundation.org/education/portal/course/feeding/

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...