এক কাপ চায়ে…

শতাব্দী দাশ

 

চায়ের কাপে তুফান তোলার সময় এক কাপ চায়ের অন্তরালের রক্তঘামের হিসেব কে-ই বা মনে রাখে?  এই যেমন, আমরা জানিও না যে এই মুহূর্তে বন্যাবিধ্বস্ত শুধুমাত্র অসমের একাধিক অঞ্চল নয়, পশ্চিমবঙ্গেরও কালেজভ্যালি সহ আরও নানা চা-বাগান।

ভারতবর্ষের চা উৎপাদনের অসমের পরেই পশ্চিমবঙ্গের স্থান৷ ভারতে উৎপাদিত চায়ের ৭০%-ই আসে অসম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে৷ দুই রাজ্যের ১৫০০ চা বাগানে কাজ করেন প্রায় ১২ লক্ষ শ্রমিক। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং জেলাগুলো জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২৭৬টি টি এস্টেটে কাজ করেন প্রায় সাড়ে চার লাখ শ্রমিক। কোচবিহার ও উত্তর দিনাজপুরে ছড়িয়েছে আরও অসংখ্য ‘নয়া’ বাগান, নয়া উদারনীতির পরের যুগে। ‘চা বাগান সংগ্রাম সমিতি’-র মতে, চা-উৎপাদন প্রক্রিয়াটি হল ব্রিটিশদের হাতে তৈরি প্রথম বৃহদাকার পুঁজিবাদী উদ্যোগ৷ শিল্পের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর দ্বারা পরিচালিত হলেও, এর মধ্যে প্রাক-পুঁজিবাদী শোষণের উপাদানও ছিল যথেষ্ট।

বিভিন্ন ধরনের বাগিচা শিল্পে শ্রমিকদের সামাজিক অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘প্লান্টেশন লেবার অ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে, যে আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য হল দুই প্রকার: এক, মজুরি। দুই, অন্যান্য সুযোগসুবিধা। অথচ ২০১৩ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ শ্রমদপ্তর থেকে প্রকাশিত সমীক্ষাপত্রেই চা বাগানে সেই অ্যাক্ট ভাঙার এবং সার্বিক অব্যবস্থার চিত্রটি প্রকট৷ এখানে রেশন অপ্রতুল। এখানে চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্কট। এখানে আছে পানীয় জলের অভাব। অনেক বাগানে বিদ্যুতেরও অভাব লক্ষ করা যায়।

যদিও টি-বোর্ডের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব বলছে, চা-শিল্পের উন্নতি হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ও রপ্তানি, (এবং মুনাফাও), তবু চা-শ্রমিকরা বঞ্চিত থাকছেন ন্যায্য মজুরি, ন্যায্য বোনাস, ন্যায্য বকেয়া, বাসস্থান ও আরও নানা অধিকার থেকে। বাগানে মজুরি ও অন্যান্য পাওনাগণ্ডা বাকি পড়ে থাকা কোনও নতুন ঘটনা নয়। ১৯৪৮ সালে যে ন্যূনতম মজুরি আইন এসেছিল স্বাধীন দেশে, তার সুফল এখনও পান না পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের চা-শ্রমিকরা, যদিও তা নিয়ে আন্দোলন চলছে বহুদিন। শ্রমিক সংগঠনগুলির লাগাতার বিক্ষোভের চাপে ২০১৫ সালেই গঠিত হয়েছিল এই সংক্রান্ত অ্যাডভাইসারি বোর্ড। অথচ এখনও পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি লাগু হল না। পুরনো চুক্তির মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও মালিকদের নানা টালবাহানা এবং সরকারের গয়ংগচ্ছ মনোভাবের জাঁতাকলে পড়ে ন্যূনতম মজুরি আইন থেকে বঞ্চিত শ্রমিকরা। ভিত্তিহীন অন্তর্বর্তীকালীন ছিটেফোঁটা মজুরিবৃদ্ধি দিয়ে সরকার জোড়াতালি দিয়ে চলেছে। আর একটা বড় গোলমাল হয়েছে রেশন ব্যবস্থায়। ফলস্বরূপ, এই মজুরি ও রেশন মিলে শ্রমিকদের প্রাপ্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা চলে গেছে মালিকদের পকেটে।

বহু অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা গ্র‍্যাচুইটি পান না। অনেক ক্ষেত্রেই পিএফ-এর টাকা কাটা হয়, কিন্তু জমা পড়ে না ব্যাঙ্কে। ন্যূনতম নীতিবোধের পরোয়া না করে চা-বাগানের নামে ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে মালিকরা তাদের অন্য ব্যবসায় তা খাটায়। বাগান রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করে না মালিকরা, তারপর বাগানে উৎপাদন কমে গেলে রাতারাতি বাগান বন্ধ করে পালিয়ে যায় ম্যানেজমেন্ট। অতঃপর খারাপ শর্তে খোলে কোনও বাগান, কোনওটা আবার খোলেই না। বছর পেরোতে থাকে, কোথাও তো দশকও। বান্দাপানি, ঢেকলাপাড়া, রেড ব্যাঙ্ক, সুরেন্দ্রনগরের মত বাগানগুলো এভাবে বন্ধ অবস্থাতেই দশক পেরিয়েছে। অপুষ্টি আর অনাহারে মৃত্যু এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডানকান্স আর অ্যালকেমিস্টের বাগানগুলোও এরকম অবস্থার মধ্যে কাটাচ্ছে। আদালতের রায়কেও তোয়াক্কা না করে মালিকরা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের তুঘলকিপনা। এসব খবর ক্ষণিকের জন্য সংবাদপত্রে ঠাঁই পেলেও তারপর শীতঘুমে চলে যায়। বিগত এক দশকে শ্রমিকদের জীবনকে অনিশ্চয়তায় রেখে ৬০টির অধিক চা বাগান বন্ধ হয়েছে৷ চা-বাগানের ৭০% শ্রমিক ক্রনিক এনার্জি ডেফিসিয়েন্সিতে ভুগছেন।

চালু বাগানের তুলনায় বন্ধ বাগান কিন্তু সংখ্যায় বেশ কম৷ তা প্রমাণ করে, চা-শিল্পে মালিকের যে ক্ষতি হচ্ছে, এমনটা নয়। উল্টে, দেশীয় বাজারে চায়ের চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় যোগান এখনও কম। অর্থনীতির মৌলিক সূত্র অনুসারে যা নস্যাৎ করে দিচ্ছে মালিকদের ছড়ানো লোকসানের গুজবকে। টি বোর্ডের তথ্যও তাই বলে।

সম্পূর্ণ চা-বাগান অঞ্চল জুড়েই, অতএব, চলছে মালিক শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্য। জমি-বাড়ির পাট্টাবিহীন চা শ্রমিকরা দিন কাটাতে থাকেন গভীর অনিশ্চয়তা নিয়ে। গত এক-দেড় দশকে ব্যাপক হারে বেড়েছে বাগান ছেড়ে কাজের সন্ধানে দেশেবিদেশে পাড়ি দেওয়া। মালিকের শোষণ আর সরকারের ঔদাসীন্য— এই দুই-এর সাঁড়াশি চাপে শ্রমিকদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। অবশ্য ধীরে ধীরে হলেও চলছে প্রতিরোধও। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর যৌথ মঞ্চ লড়াই চালাচ্ছে। শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন মানবাধিকার কর্মী, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, আইনি পরামর্শদাতারা। তাঁদের প্রকাশিত তথ্যই তুলে ধরা হল ছবির সঙ্গে। কিন্তু এই উদ্যোগ সম্ভবত অপ্রতুল। চা শ্রমিকদের দুরবস্থা অনিয়মিত ফিলানথ্রপির হুজুগে, শহুরে গড়িমসিতে হারিয়ে থাকছে সমস্যার মূল অনুসন্ধান আর তার সমাধানের জন্য যথাযথ ভূমিকা পালন।

কালেজভ্যালি চা বাগানের বন্যাবিধ্বস্ত বাড়ি

দুটি পাতা একটি কুঁড়ি

শীতের চা বাগান, এরপর আসবে ফার্স্ট ফ্লাশ

ফার্স্ট ফ্লাশ

শ্রমের সংগ্রহ

প্রাপ্যের আশায় শ্রমিকরা

অপেক্ষা ফুরোয় না

জোট বাঁধার চেষ্টা

সভা সমিতি

পোস্টারিং

দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি

 

ছবি ঋণ-চা বাগান সংগ্রাম সমিতি
তথ্য ঋণ-শমীক চক্রবর্তী

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1808 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...