ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে নাইপল

মোজাফফর হোসেন

 

এই মুহূর্তে বিশ্বে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তর ডায়াসপোরিক সাহিত্যের দেশ ভারত। ভারতীয় কয়েক প্রজন্মের নারী-পুরুষ এখন সংকর (হাইব্রিড) ও অন্বয় সাধিত (হাইফেনেটেড) পরিচয় নিয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁরা তাঁদের সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে নতুন মূল্যবোধের অনুসন্ধান করছেন। ভারতীয় ডায়াসপোরার সংকট ও সম্ভাবনাকে নিজেদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু করে তুলেছেন সালমান রুশদি, রোহিনটন মিস্ত্রি, অমিতাভ ঘোষ, ঝুম্পা লাহিড়ী, অনিতা দেশাই, রাজা রাও, বিক্রম শেঠ, অমিত চৌধুরী, কিরণ দেশাই, অরুন্ধতী রায়, ভারতী মুখার্জী থেকে শুরু করে এম জি ভাসানজি, শ্যাম সেলভাদুরাই, বিক্রম চন্দ্র, ফারুক ঢোন্ডি, রমেশ গণেশকেরা, কেতকী কুশারী ডাইসন, ভেন বেগামুদ্রে, চিত্রা ব্যানার্জী, গীতা মেহতার মতো খ্যাতিমান লেখকরা। এমনকি রুপি কাউর, সাউনা সিং বাল্ডুইন, অখিল শর্মা, সন্ধ্যা মেনন, তনজ ভাটিয়া, নিশা শর্মা, শায়ন্তুনী দাশগুপ্তের মতো নতুন লেখকরাও ভারতীয় ডায়াসপোরিক জীবনের সংকটকে উপজীব্য করে তুলেছেন তাঁদের গল্প-উপন্যাসে-কবিতায়।

তবে ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যে নানাদিক থেকে প্রতিনিধিত্বশীল এবং অনুকরণীয় লেখক হলেন স্যার ভিএস নাইপল। এই প্রেক্ষাপটে একমাত্র সাহিত্যে নোবেলজয়ী লেখক তিনি। বুকার পুরস্কারও পেয়েছেন ডায়াসপোরিক গল্পসংকলন ‘ইন এ ফ্রি স্টেট’(১৯৭১)-এর জন্য। ডায়াসপোরিক জীবনে তাঁর মতো বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আর কোনো লেখক হননি। জন্ম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদে। নিজের জাতিসত্তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তাঁর ‘Many-Sided Background’ থেকে। নাইপলের পরিবার কাজের জন্য ব্রিটিশ ভারত থেকে ব্রিটিশ ত্রিনিদাদে যায়। এরপর আর ভারতে ফিরে আসেনি। নাইপল সেখানে হিন্দু সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠলেও মিশেছেন-পড়াশোনা করেছেন খ্রিস্টান মহল্লাতে। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে লন্ডনে থেকে যান। এই অর্থে ত্রিজাতীয় সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট থেকে লেখক নাইপলের জন্ম। ডায়াসপোরা সাহিত্যতত্ত্বের বিবেচনায় তিনি দ্বৈত ডায়াসপোরিক লেখক–অর্থাৎ ভারতীয়-ত্রিনিদাদীয়-ব্রিটিশ লেখক তিনি। ফলে ডায়াসপোরিক চেতনা ও নির্বাসিত জীবনের সংবেদনশীলতা সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে কোনও পাঠকের পক্ষে নাইপলের সাহিত্য সম্পূর্ণরূপে বুঝে ওঠা সম্ভব না। বর্তমান গদ্যে ডায়াসপোরিক ফ্রেমওয়ার্ক থেকে নাইপলের কিছু লেখার মধ্যে দিয়ে তাঁকে ও তাঁর সাহিত্যে আত্মপরিচয় অন্বেষণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটবে।

নাইপল যখন প্রথম লেখালেখির কথা চিমত্মা করেন তখন লেখার উপকরণ কোনো একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়ে নির্ধারিত ছিল না। নাইপল দেখলেন, যে ইংরেজি ভাষায় তিনি লিখতে চাচ্ছেন সেই ইংরেজি সাহিত্য-ঐতিহ্য তাঁর নিজের নয়। আবার ত্রিনিদাদে তিনি যে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর বেড়ে উঠেছেন সেখানে ভারতীয় সাহিত্য-ঐতিহ্য বলে কিছু দাঁড়ায়নি। তার চেয়ে বড় কথা, ত্রিনিদাদী বা ভারতীয় সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় মূল্যবোধ নাইপলের কোনোদিনই পছন্দ হয়নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘আমি জানতাম, বিশাল পৃথিবী পড়ে আছে বাইরে। আমি যা-কিছুর মধ্যে বেড়ে উঠেছি, সেই কৃষিজীবী ও ঔপনিবেশিক সমাজকে গ্রহণ করতে পারিনি।’ এমন পরিস্থিতিতে একজন নতুন লেখক কি নিয়ে লিখবেন? এই প্রশ্ন থেকেই যেন লেখক নাইপলের জন্ম। আত্মপরিচয়ের এই সংকট থেকে নাইপল বুঝে নেন প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত কোনো পথ তাঁর গন্তব্যযাত্রা নয়। নিজের প্রয়োজনেই তাঁকে নতুন পথ সৃষ্টি করতে হবে। এটাই যেন লেখক নাইপলের জন্য ভবিতব্য ছিল। এক্ষেত্রে তিনি কিছু নির্দেশনা পেয়ে যান তাঁর বাবার কাছ থেকে। বাবার গল্প থেকে নাইপল তাঁর লেখকজীবনের বিষয়বস্তুটা খুঁজে পান। ত্রিনিদাদে তখন অধিকাংশ ভারতীয় পেশায় শ্রমজীবী হলেও, নাইপলের বাবা ছিলেন সাংবাদিক। বাবার লেখার ভেতর নাইপল তাঁর সাহিত্যে-ঐতিহ্য খুঁজে পান। তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে সঞ্চয় করে আরও মহাবয়ানের দিকে ঝুঁকে পড়েন, প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করেন ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদ ও ভারত। উপজীব্য হয়ে ওঠে ত্রিনিদাদ ও ইংল্যান্ডে বসবাসরত ভারতীয় ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক সংকট।

সাংস্কৃতিকভাবে নির্দিষ্টতাবোধের অভাব থেকে নাইপলের ভেতর জন্ম নেয় বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অস্তিত্বের সংকট। নাইপলের শুরুর দিককার উপন্যাসগুলোতে দেখি ঔপনিবেশিক ত্রিনিদাদবাসী তাঁদের নিজস্বতার অন্বেষণ করছে। এবং আগন্তুক ভারতীয়দের জন্য নিজস্বতার বিষয়টি ‘গৃহ’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন ‘এ হাউজ ফর মি. বিশ্বাস’ উপন্যাসে বিশ্বাস মনে করেন, পুরুষত্বের ধারণাটা একটা বাড়ির মালিকানার সাথে সম্পৃক্ত। তার যেহেতু নিজস্ব কোনো গৃহ নেই, ফলে তিনি নিজেকে পুরুষ মানুষ হিসেবে অযোগ্য ভাবেন। বাড়ির মালিকানার সঙ্গে তিনি ব্যক্তির পরিচয় যুক্ত বলে মনে করেন। ‘এ বেন্ড ইন দ্য রিভার’ উপন্যাসে সেলিম তার অ্যাপার্টমেন্টকে নিজের বাড়ি বলে ভাবতে পারে না। আগের ভাড়াটিয়ার দেয়ালে সাটা নোংরা ছবিগুলো সে তুলে ফেলে না, সেগুলো সবসময় তাকে মনে করিয়ে দেয় এটা তার গৃহ না। এভাবেই নতুন এক সাহিত্য-ঐতিহ্যের জন্ম হয় নাইপলের হাত দিয়েই। বন্ধুলেখক পল থেরু যথার্থতই বলেছেন, “With Naipaul, his tradition begins with him.”

নাইপলের সাহিত্যে ভারতীয় স্বদেশি, ভারতীয় অধিবাসী, ত্রিনিদাদবাসী ও ব্রিটিশ জনগণ চরিত্র হয়ে উঠলেও তিনি কখনোই কারও একার লেখক হিসেবে চিহ্নিত হননি। তিনি কি ভারতীয়, নাকি ত্রিনিদাদীয়, নাকি ব্রিটিশ? এই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর তাঁর ক্ষেত্রে আমরা খুঁজে পাই না। এর অংশত কারণ কোনও দেশের ইতিহাসই নাইপলের নিজের ইতিহাস হয়ে ওঠেনি। ইশিগুরো যেমনটি বলছেন, প্রকৃত ইতিহাস আবেগ থেকে আসে না, আসে ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা থেকে। ইশিগুরো বলছেন, ‘‘জাপান সম্পর্কে আমার যে জানাশুনার ঘাটতি, দায়িত্ববোধের অভাব, এটা আমি মনে করি আমাকে গৃহহীন লেখক হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছে। আমাকে নির্দিষ্ট করে কোনও সামাজিক ভূমিকা পালন করতে হয়নি কারণ আমি বিশুদ্ধ ইংরেজ না, আবার জাপানিও না। ফলে আমাকে আক্ষরিক অর্থে কোনও দায়িত্ব পালন করতে হয়নি, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সমাজ নিয়ে লিখতে হয়নি। কারও ইতিহাস আমার ইতিহাস হয়ে ওঠেনি।’’ [সাক্ষাৎকার; কেনজাবুরো ওয়ে গৃহীত] এই ‘স্বদেশি’ বোধ ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করেছেন নাইপলও। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘I was born in trinidad, i have lived most of my life in england and India is the land of my ancestors. That says it all. I am not English, not Indian, not Trinidadian. I am my own person.’ [টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২০০২]

কোনও জাতিগত দায়বদ্ধতা না থাকা বা জাতীয়তাবোধের আবেগ দ্বারা আক্রান্ত না হওয়ার একটা সুবিধাও আছে। নির্মম সত্যও অতি সহজে বলে ফেলা যায়। নাইপল এই সুবিধার চর্চাটা ভালোমতোই করেছেন। লেখক হিসেবে  নিজেকে কঠোর সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজের জন্মস্থান ত্রিনিদাদকে তিনি বলছেন তাঁর জন্য ‘unimportant, uncreative and cynical’ (The middle passage, 1962)। তিনবার নিজের পূর্বপুরুষের দেশ ভারত-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন তিনটি বই : ‘এ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ (১৯৬৪), ‘ইন্ডিয়া: অ্যান উনডেড সিভিলাইজেশান’ (১৯৭৭) এবং ‘ইন্ডিয়া: এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ’ (১৯৯০)। বইগুলোর শিরোনাম পড়েই বোঝা যায় ভারতীয়দের জন্য সুখকর কিছু লেখেননি তিনি। তিনি লিখেছেন: ‘ভারতে লোকে সর্বত্র মলত্যাগ করে। রেললাইনের ধারে, মাঠের ধারে, রাস্তার ধারে, নদীর ধারে, সমুদ্রতীরে কোথাও হাগতে বাকি রাখে না।’ ভারত বহুভাষাভাষী মানুষের দেশ। সব ভাষার সাহিত্য সম্পর্কে বিশদ না জেনেই মন্তব্য করেছেন: ‘ইংরেজি ছাড়া অন্য ভারতীয় ভাষায় এখন কোনও লেখালেখি হচ্ছে না।’ ভারতীয় বাঙালিদের সম্পর্কেও তাঁর মন্তব্য যথেষ্ট নেতিবাচক। এক জায়গায় লিখেছেন : ‘…লোকটা খারাপ। শুধু বাঙালি আর অপরাধীদের সঙ্গে মেশে।’ মুসলিম-বিশ্বে সমালোচিত হয়েছেন ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখিত ‘অ্যামাং দ্য বিলিভার’স্: অ্যান ইসলামিক জার্নি’ (১৯৮১) এবং ‘বিয়ন্ড বিলিফ: ইসলামিক এক্সকারশনস্ অ্যামাং দ্য কনভার্টেড পিপলস্’ (১৯৯৮) গ্রন্থদুটির কারণে। ইসলাম সম্পর্কে নাইপল বলেন, ‘It (Islam) has had a calamitous effect on converted peoples. To be converted you have to destroy your past, destroy your history. You have to stamp on it, you have to say ‘my ancestral culture does not exist, it doesn’t matter.’ (পাঠোন্মোচন, ‘হাফ এ লাইফ’, কুইন্স এলিজাবেথ হল, ইংল্যান্ড) আফ্রিকার উগান্ডা সফরকালে তিনি বলেন, ‘আফ্রিকানদের খালি লাথি মারা দরকার। লাথির ভাষাটাই কেবল তারা বোঝে।’ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নাইপলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আফ্রিকার কোনও ভবিষ্যৎ নেই।’

লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন, সেই অক্সফোর্ড সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য হলো, ‘What I learnt from Oxford in 6 years, it took me 12 years to unlearn।’ (ঢাকা লিটফেস্ট, ঢাকা ২০১৭) এভাবে কেবল ভারত, আফ্রিকা কিংবা মুসলিম বিশ্ব নয়, সামগ্রিকভাবে নাইপল গোটা বিশ্ব নিয়েই চরমভাবে হতাশ একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর প্রমাণ আমরা পাই মার্কিন ভ্রমণলেখক ও কথাসাহিত্যিক পল থেরোক্সকে যখন তিনি বলেন, ‘The melancholy thing about the world is that it is full of stupid people; and the world is run for the benefit of the stupid and common.’

নাইপল এসব কথা হয়ত মিথ্যা বলেননি। কিন্তু এগুলো আংশিক সত্য। পুরোপুরি সত্য নয়। নাইপল নিজেকে কোনও পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম করতে না পারার কারণে নিজের মতো করে সত্যকে গ্রহণ ও নির্মাণ করেছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন সীমানাহীন ভাসমান পৃথিবীর কথক। এর কারণ তাঁর ডায়াসপোরিক পরিচিতি। এই পরিচিতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা না করে নাইপল এর একটা ব্যাখ্যা দাড় করাতে চেয়েছেন। না-ভারতীয় না-ত্রিনিদাদীয়, মাঝামাঝি একটা স্বতন্ত্র পরিচিতি নির্মাণের চেষ্টা তাঁর সাহিত্যজুড়ে আছে।

প্রথম উপন্যাস ‘দি মিসটিক মসিউর’ (১৯৫৭)-এ আমরা দেখি গণেশ নামের একজন ভারতীয় গুরু ঔপনিবেশিক ত্রিটিনাদে রাজনৈতিকভাবে শক্তিমান হয়ে উঠছে। ত্রিনিদাদে বসবাসরত পূর্ব ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি লেখা। উপন্যাসের কথক বলছেন যে, গণেশের (উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র) ইতিহাস, আমাদের সময়ের ইতিহাস। কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি, গণেশের মধ্য দিয়ে ত্রিনিদাদে ভারতীয় জনগণের উত্থান-পর্বের ইতিহাস রচিত হয়। গণেশ হল পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া পূর্ব-ভারত থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধি। প্রথম প্রজন্মের ভারতীয়দের জন্য সাংস্কৃতিকভাবে আত্মপরিচয় নির্মাণের কাজটি আরও কঠিন ছিল। গল্পের কথক কিশোর গণেশের প্রতি সহানুভূতির সাথে তার সেই সময়ের সংগ্রামের কথা উঠিয়ে এনেছেন। স্কুলে প্রথম দিনই গণেশ সাংস্কৃতিকভাবে নিগৃহীত হয়। অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তার ভারতীয় আচরণ ও পোশাক নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। সেই প্রথম গণেশ ভারতীয় হিসেবে নিজেকে সমাজের প্রামিত্মক মানুষ বলে মনে করে। সে লজ্জিত হয়ে ভারতীয় পরিচিত আড়াল করার চেষ্টা করে। নাইপলের ভাষায়: ‘সে (গণেশ) তার ভারতীয় নাম নিয়ে এতটাই লজ্জায় পড়ে যায় যে একটা পর্যায়ে বলে বেড়ায় যে আসলে তাকে ডাকা হত গরেথ নামে।’ গণেশ তখন অন্যদের সংস্কৃতি নকল করার চেষ্টা করে। সে ভারতীয় গুরুবিদ্যা প্রচার করলেও ভারতীয় তান্ত্রিকদের পোশাক না পরে, পরে ইউরোপীয়দের পোশাক। তার খাবারের টেবিলে ভারতীয় ডাল-ভাত-রুটির পাশাপাশি চলে আসে পশ্চিমা খাবার। এভাবেই নতুন দেশে পূর্ব ভারতীয়রা দ্বৈতজীবন যাপন করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা ভালো করে ইংরেজি বলতে পারে না, আবার অন্যদিকে হিন্দি ভাষা একেবারে ভুলে যায়। প্রাচ্যের সঙ্গে পশ্চিমের এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের মাঝে আটকা পড়ে গণেশ। সে যখন তার প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার সাথে পশ্চিমের জ্ঞানকে মেলাতে পারে, তখনই সে সফল হয়। সে যখন বলতে শেখে, ‘সব ধর্মই এক’, তখনই সে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান সকলের মানুষ হয়ে ওঠে। গণেশ ভারতীয় ত্রিনিদাদী হিসেবে নয়, কলোনিয়াল প্রডাক্ট হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভ করে। এরপর যখন গণেশকে আমরা লেখক হয়ে উঠতে দেখি তখন আমাদের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না, গণেশ একইসঙ্গে নাইপলের জীবনী ও ইতিহাস।

‘মিগুয়েল স্ট্রিট’ (১৯৫৯) গল্প সংকলনের স্থান পাওয়া তিনটি গল্পে উপজীব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ত্রিনিদাদে বসবাসরত সংখ্যালঘু পূর্বভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংকট। ভাকু ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি লিখতে পারে বলে তার স্ত্রী গর্বের সঙ্গে সেটি প্রচার করে বেড়ায়। ভাকুরা সংখ্যাগুরু নিগ্রোদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে। এখানে প্রত্যেকে একে অন্যের থেকে আলাদা। নিগ্রোরা নারী ও শিশু নির্যাতনে অভ্যস্ত। বউ পেটানোটা ভাকুর জন্যও আচারে পরিণত হয়। সে ক্রিকেট খেলার ব্যাটকে এ কাজে খুব উপযোগী মনে করে। তার স্ত্রীও ব্যাটটি যত্ন করে হাতের কাছে-কিনারে রেখে দেয়। দাসজীবন থেকে বের হয়ে আসলেও সেই জীবনের কিছু বদঅভ্যাস নিগ্রোরা ছাড়তে পারেনি। উপন্যাসের অল্পবয়সী কথক পানশালা ও ব্রথেল গমনে অভ্যসত্ম হয়ে উঠলে তার সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিমত্মা করে মা তাকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়। ‘মিগুয়েল স্ট্রিট’ গল্প সংকলনে নাইপল একটি সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে আরেকটি সংস্কৃতিকে দেখার চেষ্টা করছেন। তখন তিনি ইংল্যান্ডে, ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় তিনি এক কিশোরের দৃষ্টি দিয়ে তাঁর জন্মশহর ত্রিনিদাদের বহু-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি পর্যবেক্ষণ করছেন। দূর থেকে অন্য আলোয় নিজের অতীত খনন করছেন নাইপল।

গণেশের মতো মিগুয়েল স্ট্রিটের আর সব বাসিন্দা দ্বৈতজীবন যাপন করে, এটা তাদের উপর আরোপিত বাস্তবতা, অন্যটা তাদের কল্পনা। পানশালা, বস্তি, ব্রথেল, অনাহার, নৃশংসতা তাদের যাপিত জীবনের অংশ। তারা হলিউডের সিনেমা দেখে ফ্যান্টাসি জগত তৈরি করে তাদের আশ্রয়ের জন্য। কবি বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ ইউরোপীয় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘আত্মার ভাই’ হিসেবে নিজেকে ভাবেন। তিনি ইংরেজিতে তার মহত কবিতাটি লিখবেন বলে প্রচার করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক লাইনের বেশি লিখতে পারেন না।

ব্যক্তির নাম আধুনিককালে একজন মানুষের অসিত্মত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের নামটি তার নিজের নয়। একধরনের অস্তিত্বের সংকট থেকে চরিত্র নিজেই তার জন্য অন্য একটি নাম নির্বাচন করেছেন। তিনি যে নামটি বেছে নিয়েছেন সে নামটি তার নিজের দেশীয় সংস্কৃতির বা গোত্রের নাম নয়। তিনি বিখ্যাত ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের নামটি নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন। তিনি কবি হতে চান, নিজের মতো করে নয়; ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো করে। কিন্তু তিনি যে সাদা চামড়ার ওয়ার্ডসওয়ার্থ হতে পারবেন না, এটিও তিনি তার মাথায় রেখেছেন। এজন্য তিনি নামের আগে ‘বি.’ অর্থাৎ ‘ব্ল্যাক’ শব্দটা যোগ করে রেখেছেন। লক্ষ্য করার বিষয়, গল্পটির কথক এক স্কুলপড়ুয়া কিশোর। ধরে নিতে পারি নাইপল নিজেই। ফলে পাঠক সরাসরি বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভাবনাটা জানতে পারছে না। এই বর্ণনাশৈলী থেকেও বোঝা যায়, বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের অস্তিত্ব অন্যের কাছে গচ্ছিত। এভাবেই দীর্ঘদিন ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকার কারণে ত্রিনিদাদে আগন্তুক ভারতীয় কিংবা আফ্রিকানদের ভেতর অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। তারা ভুল আলোয় নিজের চেহার দেখার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হল, যে দেশটি ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ছিল তারা কেন অর্থনীতি ও শিক্ষা-দীক্ষায় এত পিছিয়ে? ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো তো তাদের নিজেদের ভাষায় ‘এনলাইট’ করতেই গিয়েছিল! ‘মিগুয়েল স্ট্রিট’ এমন অনেক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাড় করিয়ে দেয়।

আত্মপরিচয়ের সংকট, নিজস্বতার অনুসন্ধান, আগন্তুক-অনুভূতি, সাংষ্কৃতিকভাবে পরাভূত যাবতীয় অনুষঙ্গের যথার্থ প্রকাশ ঘটেছে নাইপলের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘এ হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস’ (১৯৬১)-এ। উপন্যাসের বর্ণনাকারী কিশোর আনন্দ তার ভূমিহীন-গৃহহীন বাবা মিস্টার বিশ্বাসের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। আমরা জানি, নাইপল তাঁর নিজের এবং বাবার জীবনের ছায়াচরিত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এ-দুই চরিত্র।

উপন্যাসের প্রথম অংশে নাইপল ত্রিনিদাদে আখ-চাষের শ্রমিক হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে আসা লোকজনের হিন্দুধর্মীয় আচার, কুসংস্কার, দর্শন ও সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে কথা বলেছেন।

পিতৃমাতৃভূমি থেকে তারা হাজার হাজার মাইল দূরে নতুন দেশে এসে তাদের নিজস্ব কৃষ্টি যেন আরও প্রবলভাবে ধরে রাখতে চাইছে। ভিনদেশে এক টুকরো স্বদেশ তৈরি করার আকুতি থেকে তারা জোর দেয় তাদের ফেলে আসা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি আরও প্রবল সামর্থ নিয়ে আঘাত করে। হিন্দুদের অনেকেই এখন মৃতদের শরীর শ্মশানে না নিয়ে কবরস্থ করে। শুরুতে হিন্দুসমাজে একজাতের নারীপুরুষের সঙ্গে অন্যজাতের নারীপুরুষের বিয়ে মেনে নেয়া না হলেও পরে এই জাত-ভেদাভেদ উঠে যায়। তবে সাংস্কৃতিক ডিলেমা তাদের ভেতর থেকে যায়। যেমন মিস্টার বিশ্বাসকে কানাডীয় মিশন স্কুলে ভর্তি করা হলেও পরে তাকে পড়তে জয়রামের কাছে পাঠানো হয়। লোকের বাড়িতে থেকে কাজ শিখতে গিয়ে বিশ্বাস চোরের অপবাদ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। মাকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, “I am going to get a job of my own. And am going to get my own house too.’’ মি. বিশ্বাস মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মারা যায়। কিন্তু সে শেষপর্যন্ত নিজে একটা বাড়ির মালিক হয়। ফলে গৃহের প্রশ্নে ভারতীয় ত্রিনিদাদীরা আর এশিয়ার পরিচয়ে পরিচিত থাকে না, তারা তখন নতুন পৃথিবীর অংশ হয়ে ওঠে। নাইপল বলছেন,

Immigrants are people on their own. They cannot be judged by the standards of their older culture. Culture is like language, ever developing. There is no right and wrong; no purity from which there is decline. Usage sanctions everything.

‘দ্য মিমিক মেন’ (১৯৬৭) উপন্যাসে রঞ্জিত কৃপাল সিং নামের এক ক্যারিবিয়ান রাজনীতিক লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে থেকে তিনি তার আত্মজীবনী লিখছেন। তিনি এমন এক অতীত নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন যেখানে তার নিজস্ব অস্তিত্ব গ্রন্থিত হওয়ার আগেই বলা হয়েছে তুমি তোমার গৃহত্যাগ করো এবং আর কখনোই ফিরে এসো না। এই অবস্থায় রঞ্জিত সিং কিভাবে লিখবেন তার আত্মকথন? সিংয়ের বাবা-মা ভারত থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ক্যারিবীয় দ্বীপে আসে। এখানে তার জন্ম হয়। উপন্যাসে ইসাবেলা শহরে ভারতীয় যৌথ পরিবারে বেড়ে ওটার দিনগুলোর কথা তুলে ধরে রঞ্জিত সিং। নাইপল এখানে ইসাবেলা এবং লন্ডনের মাঝে আটকে যাওয়া কৃপাল সিংয়ের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের সংকট তুলে ধরেছেন। সিং তার আত্মজীবনী লিখছে লন্ডনে বসে, যেটি তার নিজের দেশ নয়, যে দেশটি তার জন্মভূমি সেটি আবার তার পিতামাতার দেশ নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রথম প্রজন্মের ভারতীয় হিসেবে তাকে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক সবধরনের সংকটের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।

‘ইন এ ফ্রি স্টেট’ (১৯৭১) গ্রন্থে নামগল্পের পাশাপাশি বিষয়সংশিস্নষ্ট আরও দুটি গল্প স্থান পেয়েছে। ‘ওয়ান আউট অব ম্যানি’ গল্পে সন্তোষ বম্বেতে কাজ করে। যখন তার মালিক ওয়াশিংটন ডিসিতে চলে যাবেন বলে ঠিক হয়, তখন সন্তোষ গ্রামে তার দরিদ্র পরিবারের কাছে ফিরে না গিয়ে মালিকের সঙ্গে আমেরিকায় চলে আসে। এখানে আসা মাত্রই সে নিজেকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে। দেশত্যাগের জন্য তার মনে অনুশোচনার জন্ম হয়।

এভাবেই নাইপল তাঁর প্রায় প্রতিটা গল্প-উপন্যাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বসবাসরত ভারতীয়দের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শারীরিক এবং মানসিক স্থানচ্যুতের বিষয়টি উঠিয়ে এনেছেন। তিনি নিজে মিশ্র সংস্কৃতির ভেতর আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করেছেন। মি. বিশ্বাসের নিজস্ব বাড়ির অন্বেষণ নাইপলের সেই প্রতীকী অন্বেষণ।


ঋণস্বীকার: যে ভারতীয়রা ইংরিজিতে লিখছেন, অভিজিৎ মুখার্জি, বুকস ওয়ে, ২০০৬

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...