ক্যাম্বোডিয়া— ঐতিহ্য আর বধ্যভূমি

ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য

 

সোফিয়াক, ডাকনাম কোয়, টুক টুক চালিয়ে সংসার চালায়। বয়েস ৩৪। মা-বাপ আছেন গ্রামে, পৈতৃকভিটে আগলে। আর কোয় তার বউকে নিয়ে আছে সিয়েম রিয়েপ শহরের থেকে আট কিলোমিটার দূরের আর একটা গ্রামে। বউ দুমাসের পোয়াতি। আগে হোটেলে হাউসকিপিং-এর কাজে ছিল। বিয়ের পর সংসার দেখাই তার একমাত্র কাজ।

এশিয়ার দেশগুলোতে চালু এক রকমের যান, যা কি না আমাদের দেশের অটো রিক্সার মতন কিছুটা। “মতন” বলতে— আমাদের দেশে যাঁরা অটো ব্যবহার করেন, এই সমস্ত দেশে তেমন মানুষেরাই ব্যবহারকরেন টুক টুক। ভাড়া গাড়ির থেকে কম, আর বেশ চারপাশ দেখতে দেখতে যাওয়া যায় বলে ‘ক্যামেরা-কলুষিত চোখ’-এর ট্যুরিস্টদের কাছে এর কদর আছে।

কোয়-এর সঙ্গে আমার পরিচয় হল সিয়েম রিয়েপ-এই। কাজের সূত্রে গেছি ক্যাম্বোডিয়ার রাজধানী নম্‌পেন্-এ। দিন দশের থাকার মধ্যেই প্রথম সপ্তাহান্তটাই শনি-রবি-সোমের লং উইক এন্ড। দেশ ছাড়ার আগেই অতএব আঁকর ওআট ভ্রমণের পরিকল্পনা হয়ে গেল। শুক্র রাতে জায়ান্ট আইবিস কোম্পানির স্লিপার বাসে চেপে শনি সকালে সিয়েম রিয়েপ। আর সোমের দুপুরে সিয়েম রিয়েপ থেকে ওই একই কোম্পানির বাসে চেপে সন্ধ্যাসন্ধ্যি নম্‌ পেন্‌ ফেরত। সে ভারী চমৎকার ব্যবস্থা। বাতানুকুল বাসে ওয়াইফাই, মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট কি নেই। অল্পস্বল্প খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। খুবই আরামদায়ক ব্যবস্থা সব মিলিয়ে।

শিবের গীত থামিয়ে বরং কোয়-এর কথায় আসা যাক।

কোয় সিয়েম রিয়েপ-এ ট্যুরিস্টদের ঘোরানোর জন্য টুক টুক চালায়। আমাকে এর ঠিকানা দিলেন নম্‌পেন্‌-এ যে হোটেলে ছিলাম, সেখানে কর্মরতা শ্রীমতি ইউ। আমি সিয়েম রিয়েপ যাচ্ছি জানতে পেরে তিনি শুধু কোয়-এর নম্বরই দিলেন না, নিজেও কোয়-এর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত করে রাখলেন যাতে আমার ওখানে পৌঁছে কোনও অসুবিধা না হয়।

সিয়েম রিয়েপ পৌঁছনোর কথা ছিল সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ। সেখানে বাস পৌঁছে দিল ভোর পাঁচটায়। আমি একরকম নিশ্চিত ছিলাম যে অত ভোরে কোয় আসবে না। আমি একটা টুক টুক প্রায় বুক করে ফেলেছি, এমন সময় কোয়-এর ফোন। সেই থেকে তিনদিন কোয় আমার প্রায় সর্বক্ষণের সঙ্গী। এরপর যতটুকু ঘুরেছি, তার সবটুকুই তার সঙ্গে।

আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে, যদিও প্রথম আলো খুব নজর করলে দেখা যায়। সকাল হতে চললেও অন্ধকারই মনে হচ্ছে তখনও। নীলচে অন্ধকার।

হোটেলের একটা বেশ ফরাসি গোছের নাম। সিল্ক দ্য লাঁ’কর গোছের কিছু একটা উচ্চারণ হবে মনে হয়। ছোট হোটেল। বুটিক গোছের। বেশ সস্তায় পেয়েছিলাম, মেরেকেটে ৪৫ ডলার প্রতিরাত। আর সবথেকে ভালো ব্যাপার হল, ওটা আঁকর যাবার রাস্তার একদম ওপরেই।

অত সকালে হোটেলে গিয়ে ঘর পেলাম না। মানে, খালি পেলাম না আর কি। বারোটায় আসতে বলে দিল। মালপত্তর ধুতি-ফতুয়া পরিহিত রিসেপশনিস্টের জিম্মায় রেখে বেরিয়ে পড়া অতঃপর। হ্যাঁ, ধুতি-ফতুয়াই! মানে ওই ধরনেরই পোষাক আর কি! পরে বেলার দিকে যখন চেক-ইন করলাম, দেখলাম ওয়ারড্রোবেও একজোড়া ফতুয়া-পায়জামা ধরনের পোশাক— তোয়ালে-জোব্বার বদলে।

তখন ভোর ছটা। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। উত্তাল ভেজা হাওয়া। ঠান্ডা লাগছে বেশ। তারই মধ্যে টুকটুক করে রওনা দিলাম আঁকরের উদ্দেশে। আঁকর ওআট, মানে নগরের (প্রধান) মন্দির। একদম সোজা রাস্তা। শহর থেকে বেরিয়ে আসার পর জঙ্গল বাড়ছে দু’পাশে। হয়তো অনেক ল্যান্ডমাইন রয়েছে এখনও ওই সমস্ত জঙ্গলের মধ্যে। ওখানকার সরকার নাকি সব মাইন এখনও সাফ করে উঠতে পারেননি। যাই হোক, ভোরের হালকা আলো, ঠান্ডা হাওয়া আর জঙ্গলের বুনো গন্ধ নিয়ে প্রথম স্টপে পৌঁছলাম। টিকিট কাউন্টার।

চল্লিশ ডলারের টিকিট নিয়ে প্রধান আকর্ষণের দিকে যাত্রা। চল্লিশ ডলারের টিকিটে ছ’দিনে সমস্ত মন্দির ঘুরে দেখবার অনুমতি। হাতে অতটা সময় না-থাকলেও এই টিকিটই আমার আড়াইদিনের হিসাবে শস্তাতম বন্দোবস্ত। দেখলাম বেলুনে চেপে মন্দিরের শোভা দেখার একটা ব্যবস্থাও আছে। খরচ মাত্র কুড়ি ডলার দেখে চেপে দেখবার ইচ্ছে হল খুবই। আমাকে হতাশ করে কাউন্টারবালিকা জানালেন, কদিন ধরে খুব হাওয়া চলছে বলে ওই ব্যবস্থা বন্ধ রাখা আছে। এর মধ্যেই একদিন নাকি বেলুন হাওয়ায় এমন দুলেছে, যে বেলুনাভ্যন্তরের দু-একজন ভেতরেই আছাড় খেয়েটেয়ে হাত-পা ভেঙে বসেছেন। হাত-পা ভাঙার ভয়ে সাইকেল পর্যন্ত চালাতে শিখিনি! ফলত বেলুনে চড়ে দুর্দশাপ্রাপ্তির কোনও প্রশ্নই ছিল না।

আঁকরের সামনে সোফিয়াক কোয় ও তার টুকটুক

আঁকরের সৃষ্টির মূলে আছে মহাপৃথিবীর অনুকরণ। মাঝখানের সবথেকে লম্বা চূড়াটি মেরু পর্বত, আর চারদিকের অপেক্ষাকৃত ছো্ট চূড়াগুলি অন্যান্য অপেক্ষাকৃত ছোট পর্বতশৃঙ্গ। আর মন্দিরের চারদিক ঘিরে থাকা নিখুঁত মাপে কাটা বিশাল চতুষ্কোণ জলাশয় এই মেরু পর্বত আর মহাদেশগুলিকে ঘিরে থাকা পৌরাণিক মহাসমুদ্র। এই মহাসমুদ্র-জলাশয়ের আদত কাজ ছিল প্রাচীন নগরের অধিবাসীদের জলের যোগান দেওয়া। পোড়ামাটির নলে করে সেই জল পৌঁছে যেত সাড়ে তিন লক্ষ অধিবাসীর ঘরে-ঘরে।

আঁকর ওআটের সামনে বাধাস্বরূপ

আঁকরের সিঁড়ির দুপাশে দুই বিশাল ফণা নিয়ে পাহারায় দুজন শেষনাগ। এঁদের এড়িয়ে এগিয়ে গেলে কালক্রমে চোখে পড়বে মূল মন্দিরকে কিছু দূরত্বে চারদিকে ঘিরে থাকা ছাওয়া বারান্দা, যার সম্পূর্ণ দেওয়াল জুড়ে রামায়ণ আর মহাভারতের কাহিনি খোদাই করা।

আঁকরের শেষনাগ

প্যানেলের রামায়ণ

এই বারান্দার মায়া ফুরোলে সমগ্র মন্দিরস্থাপত্যের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে দেখতে পাওয়া যাবে মূল মন্দিরের বিশাল চূড়া, যার চারপাশে অপেক্ষাকৃত ছোট চূড়াগুলি হাতজোড় করে আছে।

খৃস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকে তৈরি এই আঁকর ওআট মন্দিরটি মুলত বিষ্ণুর, যদিও এ মন্দিরে শিবলিঙ্গের সংখ্যা প্রচুর। ধারণা করা যাচ্ছে, এই মন্দিরের বৌদ্ধিকরণ হয় পরে। বহু শিবলিঙ্গ ভাঙা, এবং কোনও কোনও ভাঙা শিবলিঙ্গের ওপরেই বুদ্ধমূর্তির প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এ দেখলে ধর্মীয় আধিপত্যবাদের কথা মনে পড়ে বই কী।

আরাধনার পথে

আঁকর ওআট, আঁকর থম আর আশেপাশের অন্যান্য মন্দিরসংলগ্ন অঞ্চলকে বলা হয় সেন্ট্রাল আঁকর।

ছোকরা বুন হে হ্যাক গ্র্যাজুয়েশন করছে। আর দিনের বেলায় আঁকর ওআটের মোড়ে একটা ফুটের খাবারের দোকানে সেলসম্যান। জাতিধর্ম নির্বিশেষে আঁকররূপসুধাপিয়াসীদের ধরে ধরে দোকানে হাজির করে গরম ক্রোয়াসঁ আর কফি খাওয়ানো কাজ তার। সেই পুণ্যকর্মে যোগ দিয়েই তার সঙ্গে আমার আলাপ।

বুন হে হ্যাক-এর হাসি

কুড়ির কোঠায় বয়েস বুনের। বাতামবাং-এর ছেলে সে। লেখাপড়া শিখে তার ঐকান্তিক ইচ্ছে গাইড হবার। গাইডদের নাকি ভালো ইনকাম ওখানে। তার সঙ্গে আলাপ শুরু করে সেই আলাপকে এগিয়ে নিয়ে চলার কথা আমাকে আর ভাবতে হল না। ঝড়ের বেগে যে বলে গেল— ক্ষ্‌মের রুজের শাসনকাল ঠিক কত বছর কত মাস কত দিন চলেছিল। কত লোক কেমন কেমন করে মরেছিল। আর তার পরে কেমন করে ভিয়েতনামের সাহায্যে দেশে শান্তি পুনরায় সুপ্রতিষ্ঠিত হল। এমন সাবলীল তার ভঙ্গি, যেন মুখস্থ সংলাপ বলছে। ইংরেজিতে সে, বলাই বাহুল্য, কোয়-এর থেকে অনেক বেশি দড়। মাঝেমধ্যে মার্কিনি উচ্চারণে বাজি মাত করতে চায় বুন, যদিও একটু-আধটু ঠেকেও যায় কথা বলতে গিয়ে। তা হোক, তবু সে দেশের ভবিষ্যত এবং অবশ্যই নিজের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী।

বুনের থেকে ছুটি নিয়ে কিঞ্চিৎ বিশ্রামপূর্বক আঁকর থম আর বায়ন মন্দিরের দিকে রওনা হওয়া গেল। দেখতে পাচ্ছি চূড়ায় খোদাই করা রাজার প্রসন্ন মুখ। পণ্ডিতেরা বলেন, এই মুখ রাজা সপ্তম জয়বর্মণের। বায়নের আরও একটা বৈশিষ্ট্য হল, এই মন্দির বুদ্ধকে নিবেদিত। অর্থাৎ প্রায় একশো বছরের তফাতে বৌদ্ধধর্ম ক্যাম্বোডিয়ার মাটিতে শিকড় পেয়ে গেছে। রাজধর্মে পরিণত হয়েছে। বায়নের ছাদে চড়লে, এই মুখগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, রাজা দেখছেন। তবে মেলাতে পারছেন কি না তিনিই জানেন।

বায়নের রাজমূর্তি

বায়ন মুখের মন্দির। মন্দির দেখে বেরোনোর যে পথে কোয়-এর দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে দেখলাম রাস্তার দু’ধারে শেষনাগকে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক অসুর, যাঁদের প্রত্যেকের মুখভঙ্গি আলাদা।

অসুরেরা

সিয়েম রিয়েপ যাচ্ছি শুনে আঁকর ছাড়া আর যে দ্রষ্টব্যের কথা সকলে বারবার বলেছে, তা হল তা প্রম-এর মন্দির। এই সেই মন্দির যার অনেকটা গ্রাস করেছে গাছের শিকড়। কোনও আক্রোশে মহাদ্রুম এই দেবালয়কে গুঁড়িয়ে শেষ করে দিতে চায়! প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই মন্দিরের পুনর্গঠনের কাজ করছে ভারতের আর্কিওলজিকাল সার্ভে।

গাছের গ্রাসে তা প্রম

এরকমই একটা ঘোরাঘুরির সময়, মানে আমি গেছি ব্যানতিয়ে স্রেই দেখতে আর সেই সময় উচ্চণ্ড বৃষ্টি, এরকম একটা অবস্থায় আমাদের হাতে সময় অনেকটা আর পেটে যাকে বলে ‘ভোঁচকানি-লাগা’ খিদে, আমরা খেতে বসলাম একটা ঢাবা ধরনের জায়গায়। সুখদুঃখের গল্পগাছার সেখানেই সূত্রপাত।

ব্যানতিয়ে স্রেই-এর ইন্দ্র ও ঐরাবত। প্যানেলের একেবারে মাঝখানে দেখতে হবে। দেবরাজ মুছে গেছেন, কিন্তু ঐরাবতটি অক্ষত

এটা-ওটা-সেটা কথা হতে হতে কোয় বলতে শুরু করে— জীবনে মাত্র এক বছরের জন্যে ইস্কুলে গেছে সে। সে যখন মা-বাপের কোল আলো করে এল তখন সারা দেশ একটা ধ্বংসস্তূপের বেশি কিছু নয়। পেটের ভাত (হ্যাঁ, ভাতই) যোগাড় করাই তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমতাবস্থায় পড়াশোনা চালানো সম্ভব হয় না, এবং অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া ছেড়ে রাজমিস্ত্রির যোগাড়ের কাজে লেগে পড়তে হয় তাকে। তারপরে একাজ-সেকাজ করতে করতে নানান ঘাটের জল খেয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে টুক টুক চালাচ্ছে কোয়। প্রশ্ন করতে জানাল, সংসার চলে যায় বিদেশি ট্যুরিস্টদের কল্যাণে— ভাড়ায়, দানধ্যানে, বদান্যতায়।

কোয়ের দাদু-দিদিমা (কোনদিকের তা আমি জিগ্যেস করতে ভুলে গেছি। মনে হয় বাবার দিকেরই) প্রায় না খেতে পেয়ে প্রাণ হারান ক্ষ্‌মের রুজের শাসনকালে। মানে, চাষের কাজ করতেন। আর খাটনির তুলনায় খাবার যথেষ্ট পেতেন না। এমন অনেক মৃত্যুর খবর পেয়েছি।

কোয় জানে না তার দেশের স্বাধীনতা দিবস ৯ই নভেম্বর। আমার থেকে জেনে সে অবাক।

কোয়ের কথায় আরও একটু যাবার আগে আরও একজনের কথা বলে নিই। নাম তার ম্যানিলিন। ম্যানি-র সঙ্গে আমার পরিচয় নম্‌ পেন-এ। মেয়েটির বয়েস বছর তিরিশের কোঠায়। কর্মসূত্রে মিডিয়া প্ল্যানার ম্যানি চাকরি করে খুব নামী এক মিডিয়া মার্কেটিং এজেন্সিতে। কথায় কথায় সে জানায় যে অতীতের সর্বনাশা সময় কাটিয়ে উঠেছে দেশ, এবং ক্ষ্‌মের রুজ-পরবতী সময়ে বিদেশিদের মধ্যে প্রথমে চিনেরা এলেও (একদম শুরুতে মার্কিনি আর ফরাসি বাদ দিলে, আশির দশক থেকে) গত কয়েক বছর ধরে প্রথম বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও তাদের বিনিয়োগের ডালি নিয়ে হাজির হচ্ছে ক্যাম্বোডিয়ায়। তার আশা, অচিরেই এই দেশ গরীব দেশের তকমা সরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের শিরোপা পাবে। স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং-এর, তার মতে, অনেক উন্নতি হয়েছে গত কয়েক বছরে।

ম্যানিলিন চাইছিল আমি যেন “জেনোসাইড ম্যুসিয়াম” দেখতে কোনওমতেই না ভুলি। আমি মৃদু আপত্তি জানাতে সে অবাক হল। আমি তাকে বললাম, যে আমি ক্যাম্বোডিয়ার ভালোটুকু দেখতে চাই। তার সর্বনাশের ছবি দেখায় আমার রুচি নেই— বিশেষত ক্যাম্বোডিয়া যখন এত উন্নতি করছে।

ম্যানিলিনের উন্নয়ন কোয়-এর ওপর তেমন প্রভাব ফেলেনি। আমাদের একান্ত আলাপে সে বলছে— পোল পটের অনেক দুর্নাম ঠিকই, তবু মনে হয় ওই সময়টাই ছিল ভাল।

এই উত্তরের জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না একেবারেই। তাকে চেপে ধরতেই কোয় বলল, দেখো, আমরা শুনেছি অনেক কিছুই। আর তোমায় তো বললামই যে আমার দাদু আর দিদাকে আমি ওই সময়েই হারিয়েছি। কিন্তু একটা কথা তো অস্বীকার করতে পারো না, যে সেই সময় খুব বড়লোক ছিল না কেউ।

পোল পট চেয়েছিলেন দেশের সম্পদ কুক্ষিগত করা রাজপরিবার আর তার প্রসাদলোভী দুর্নীতিপরায়ণ আমলাদের তৈরি করা ব্যবস্থা ভেঙে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হোক— যে ব্যবস্থা দেশের সম্পদে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। অনেক দুর্নাম তাদের, তবু পোল পট আর তার লোকেরা মন্দির আর প্রকৃতির দেখাশোনা করত।

কোয় থেরবাদী (হীনযানীও বলা যায়) বৌদ্ধ। ধার্মিক মানুষ সে। পোল পট তখনকার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বিবস্ত্র করে তাদের ধর্মাচরণের পথ বন্ধ করে দিতেন, এ-কথা শুনলে তার ভালো লাগে না। সেটা অত্যাচার বলেই সে মনে করে। তবে সে ছিল একরকম, আর এখন রাজার আমলে ধর্মাচরণে বাধা না থাকলেও প্রকাশ্য দিবালোকে লাঠি দিয়ে সন্ন্যাসী ঠ্যাঙ্গাতে পিছ-পা হয় না পুলিস, কোয় বলে। মনে পড়ল, এই খবরটা চোখে পড়েছে আমার, দু’একদিন আগেই।

ক্যাম্বোডিয়ার জাতীয় আয়ের সবথেকে বড় অংশ আসে পরিষেবা ক্ষেত্র থেকে— ৪১.৮%। জাতীয় আয়ের ২৩.৫% যোগাড় হয় বাণিজ্যিক পরিষেবা রপ্তানির থেকে। এই বাণিজ্যিক পরিষেবা রপ্তানির তিন-চতুর্থাংশের যোগানই দেয় পর্যটন। এহেন পর্যটকেদের আবাসভূমি, অর্থাৎ হোটেলগুলো, শুনি সেক্সট্যুরিজমের লীলাক্ষেত্র। হোটেল বুক করার সময় অনেক জায়গাতেই লেখা দেখেছি— আমরা সেক্সট্যুরিজমকে প্রশ্রয় দিই না! এতটা বলতে হচ্ছে যখন, তখন ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে এর একটা ভালোরকমের চাহিদা এই দেশে আছে।

সেক্সট্যুরিজম যদি পরিষেবার এক আকর্ষণ হয়, তবে আরেক আকর্ষণ অবশ্যই ক্ষ্‌মের রুজের বলিদের দ্রষ্টব্য হিসাবে উপস্থিত করা। সেক্সট্যুরিজম স্বাভাবিক কারণেই বিজ্ঞাপিত হয় না, ক্ষ্‌মের রুজের ক্ষত হয়। এই দেশের আনাচে-কানাচে আপনার চোখে পড়বে মাইন-এ অঙ্গহানি হওয়া মানুষদের এক্সিবিশন। কখনো দেখবেন মাইন ভিকটিমদের তৈরি হস্তশিল্পের দোকান, বা কখনও তাদের নিয়ে তৈরি ব্যান্ড। এইসব জায়গায় থিকথিক করছে সাহেব-মেমসাহেবদের ভিড়। অকাতরে তাঁরা বিলোচ্ছেন খুচরো, যা কৃতকৃতার্থ হয়ে গ্রহণ করছে এইসব পঙ্গু যুদ্ধধ্বস্ত মানুষ।

একটা দেশ নিজের গোপনাঙ্গের ক্ষতকে উজাড় করে দেখিয়ে যে এভাবে অর্থ উপার্জন করতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। সেই দেশ, যে দেশ গৌরবে এককালে ছিল প্রায় রোমান সাম্রাজ্যের সমতুল্য, বিজ্ঞানের প্রয়োগে বিশ্বের অন্যতম সেরা, আর জ্ঞানের উৎকর্ষে অসাধারণ। অঙ্গবিহীন চলন্ত দেহ দেখিয়ে এই দেশ— যে কি না নিজের অতীতগর্বের অভিজ্ঞান হিসাবে জাতীয় পতাকায় ঠাঁই দিয়েছে আঁকোরের মন্দিরকে— কোটি কোটি ডলার আর ইউরো কামিয়ে আনছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর থেকে— দানের চেহারায়।

পরিষেবার পর যেই দুই ক্ষেত্র দেশীয় আয়ে বড় রকমের অংশ নেয় তারা হল যথাক্রমে বস্ত্রশিল্প ও কৃষি। টাকার হিসাবে বন্ত্রশিল্পের ভাগ বেশি হলেও দেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের জীবিকা আসে কৃষির থেকে। ক্যাম্বোডিয়ার মাটি সোনার ফসল ফলায়।

পাঠক যদি ধৈর্য নিয়ে এতদূর এসে থাকেন, তবে ধরে নিতে হবে বাকি পথটুকুও তিনি যাবেন। আর তাঁর মনে থাকবে প্রশ্ন। কী এমন হল ক্যাম্বোডিয়ার, যে অমন এক সমৃদ্ধির ইতিহাস নিয়েও এমন করে মুখ থুবড়ে পড়তে হল তাকে? বিশেষত, ক্যাম্বোডিয়া এমন একটা দেশ যে দেশ ইতিহাসের আধুনিক পর্যায়ে কোনও বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি। কোন শক্তিবলেই বা পোল পটের অত বাড়বাড়ন্ত ঘটে গেল, যার বলি হল অগুনতি মানুষ?

১৯৭১ পর্যন্ত, যা দেখা যাচ্ছে, ক্যাম্বোডিয়ার অবস্থা খুব খারাপ ছিল না। একটা আধা সোশ্যালিস্ট আধাগণতান্ত্রিক— কিছু বা রাজতান্ত্রিক জগাখিচুড়ি অবস্থায় নানান অসুবিধা সত্ত্বেও সে দেশের মানুষ মোটের ওপর খুশিই ছিল। দেশে চাষের জমি বাড়ন্ত, ফলে পেটের খাবার টান— এ সত্ত্বেও সব নিয়ে তারা নিজের মত ছিল একরকম।

শান্তি নোবেলিত হেনরি কিসিঞ্জার— যিনি না থাকলে সম্ভবত পূর্ব তিমোরে ইন্দোনেশিয়ার হত্যালীলা আর পূর্ব পাকিস্তানের রক্তস্নানের কোনওটাই দেখতে হত না, সেই যুদ্ধব্যবসায়ী মহাপ্রাণ কিসিঞ্জার সাহেবকে দিয়ে সমস্যার সূত্রপাত।

১৯৭০-এ— তৎকালীন রাজা নরোদম শিহানুক তখন বিদেশভ্রমণে গেছেন— তাঁর অবর্তমানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ক্ষমতা হস্তগত করলেন লোন নই। সমস্যা অনেকদিন ধরেই চলছিল, এবং বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে শিহানুকের ডান-বামের ব্যালান্সের খেলা শেষ হতে চলেছে। এই শেষের শুরু দ্বিতীয় ইন্দোচিন লড়াইয়ের বাড়াবাড়ির থেকে। ১৯৬৬-র নির্বাচনে বামশক্তিরা অনেকটা দুর্বল হল। ১৯৬৯-এ শক্তি দেখানোর খেলায় রীতিমত সামনে চলে এলেন ঘোষিত বামবিরোধী নেতা লোন নই।

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, এই সময় ভিয়েতনামে চলছে অ্যামেরিকার আক্রমণ আর হো চি মিন-এর নেতৃত্বে তার প্রতিরোধ আর অ্যামেরিকায় চলছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন। ওদিকে সদ্য অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন নিক্সন, যাঁর জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে আসন নিয়েছেন শান্তিময় কিসিঞ্জারসাহেব। আর কমিউনিজমের ‘করাল কবলে’ পড়ে গেছে— সোভিয়েত রাশিয়া আর চিন ছাড়া— পূর্ব ইওরোপ আর আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ। ভিয়েতনামের গেরিলা কমিউনিস্টরা ছাড়াও কমিউনিস্টরা মাথা তুলছেন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। সুতরাং, সময়টা ভাল না!

আমাদের লোন নই বামবিরোধী। ১৯৬৯ সালেই তিনি মার্কিন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিহানুককে গদিচ্যুত করে ক্যাম্বোডিয়ার সর্বেসর্বা হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। চারদিকের অবস্থাগুণে কিছুটা আস্থাও অর্জন করেন তিনি। এইরকম একটা অবস্থায়, ১৯৭০ সালে শিহানুকের প্যারিস ভ্রমণের সময় নোবেলজয়ীর আশীর্বাদ শিরোধার্য করে লোন নইয়ের ক্ষমতাদখল। শুধু নোবেলজয়ীর নয়, সঙ্গে ক্যাম্বোডিয়ার ব্যবসায়ী মহলেরও। তাঁর ডেপুটি ছিলেন সেই মহলের একজন সর্বেসর্বা।

১৯৬৯ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৭০ সালের মে মাস পর্যন্ত ‘অপারেশন মেনু’-র লক্ষ্য হয় ক্যাম্বোডিয়া। অ্যামেরিকানরা চিরকালই খুব স্মার্ট। তাই ওরা টাইট প্যান্ট পরে পা ফাঁক করে হাঁটে, আর বোমা আর বোমাবাজির চমৎকার সব নাম দেয়। ছোট্ট বুদ্ধের পর এই খানাপিনার ‘মেনু’-আয়োজন। এই সময়কালে নিক্সনসাহেব ঘোষণা করেছিলেন যে ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে। এই সেনার কিছু তাদের প্লেনে বোমা-টোমা বেঁধে দক্ষিণ কোরিয়ার ঘাঁটিতে অপেক্ষা করছিল। একদিকে এই বোমা লাগানো অবস্থায় অ্যামেরিকায় ফেরত আসা সম্ভব নয়, আরেকদিকে ক্যাম্বোডিয়ার পূর্বদিকে ভিয়েতনামের লাগোয়া অংশে হো চি মিন ট্রেইল বা সরণী দিয়ে উত্তর ভিয়েতনামের সৈন্যচলাচল বন্ধ না করলেই নয়। ফলে ক্যাম্বোডিয়ার ওপর বোমাবর্ষণ। যে দেশ যুদ্ধ-টুদ্ধ কিছুতে নেই, তারই ওপর বোমা ফেলা। ঈশ্বরের অপার মহিমা ছাড়া এ আর কী?

‘মেনু’-র পর ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত চলল অপারেশন ফ্রিডম ডিল! এর বলি হল ক্যাম্বোডিয়া দেশের প্রায় অর্ধেক অংশ। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা পাবার কথা নয় তাই পাওয়া যায়নি, তবে বিভিন্ন হিসাবকারীর মতে এতে মারা গিয়েছিল দেড় লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ সাধারণ ক্যাম্বোডিয়াবাসী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্নপাত্র, রাইস বোল ক্যাম্বোডিয়ার চাষবাস, ধানের ফলন এই ক’বছরে ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। গ্রামে গ্রামে চলছিল অঘোষিত দুর্ভিক্ষ। পেন্টাগনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত ক্যাম্বোডিয়াতে পাঁচলক্ষ টন বোমা ফেলা হয়।

অন্যদিকে, দুই পক্ষকে ব্যালান্স করে চলবার চেষ্টা করলেও বামপন্থীদের সঙ্গে শিহানুকের কোনওকালেই সদ্ভাব ছিল না। ১৯৬৭-৬৮ নাগাদ পশ্চিম কাম্পুচিয়ায় বামপন্থীদের প্ররোচনায় চাষিদের একটা বিদ্রোহও হয়। একদিকে চাষবাসের সমস্যা, সরকারের যথেচ্ছ দুর্নীতি— এসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাষিদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন ছিলই। এই চার বছরের বোমাবাজির পর সেই আগুন জ্বলে উঠল দাউদাউ করে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নিপীড়ন আর নির্বিচার হত্যার ফলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে, লোন নই সরকারের কুশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠে আর ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের জয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে লোন নই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল ক্ষ্‌মের রুজ— বা লাল ক্ষ্‌মেরের দল।

১৯৭৫ সালে ক্ষ্‌মের রুজ নম্‌ পেনের দখল নিতেই প্রবল আক্রোশ ঝরে পড়ল সরকার, সরকারি কর্মচারী আর সরকারের সমর্থক শহুরে সুবিধাভোগী মানুষদের প্রতি। প্রতিহিংসাই বলা যেতে পারে একরকম। গ্রামের মানুষদের কাছে এই শ্রেণির শহুরে মানুষেরা তখন জোচ্চুরি আর অত্যাচারের প্রতীক। তাদের সামনে তখন একটাই পথ খোলা। সমাজের খোলনলচে পালটে দাও। দরকার হলে এই সমাজটাকে নিশ্চিহ্ন করে নতুন সমাজ গঠন করো।

ভিয়েতনামের গেরিলা বা মুক্তিযোদ্ধারাও গ্রামের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষের থেকেই এসেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ক্ষ্‌মেরদের একটা পার্থক্য ছিল। ভিয়েতনামের লড়াই শুরু হয়েছে আরও কুড়ি বছর আগের থেকে। তারও আগে বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে যোদ্ধাদের ট্রেনিং হয়েছে আামেরিকার কাছে, যার একজন উল্লেখযোগ্য ফসল জেনারেল জিয়াপ। এছাড়াও, উত্তর ভিয়েতনামের শাসনের ভারও তারা বহন করেছিল কিছুদিন। এই দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি, সর্বোপরি হো বা জিয়াপের নেতৃত্ব, সে অর্থে কোনওরকমের প্রস্তুতিই ক্ষ্‌মেরদের ছিল না। ফলত সম্পূর্ণ আনকোরা কিছু অর্বাচীনের হাতে এসে পড়ল দেশশাসনের ভার। তাতে যা হওয়ার তাই হল। সমস্ত দেশটা প্রায় কৃষিশিক্ষার ইশকুল হয়ে উঠল।

তবে, আগে যেমন বলেছি— এদের সপক্ষেও কিছু কথা উঠে আসে বৈ কী!

ক্ষ্‌মের রুজদের চালানো জেনোসাইড নিয়ে হাড়হিম করা তথ্যে ঠাসা বইয়ের অভাব নেই। এ বিষয়ে যিনি সবার আগে স্মরণীয় তিনি মার্কিন দেশের প্রোফেসর আর জে রুমেল। প্রোফেসর রুমেলের বক্তব্য—

out of a 1970 population of probably near 7,100,000 …almost 3,300,000 men, women, and children were murdered …most of these… were murdered by the communist Khmer Rouge.
(Statistics of Cambodian Democide Estimates, Calculations, And Sources)

প্রোফেসর রূমেলের কথামতো, ওই সময়ের ক্যাম্বোডিয়ায় ক্ষ্‌মের রুজের হাতে প্রতি দুজনে একজন মারা গিয়েছিলেন।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল, ১৯৭০ থেকে ওই সময়কাল পর্যন্ত ক্যাম্বোডিয়ার জনসংখ্যা অর্ধেক হবার বদলে দ্বিগুণ হয়েছিল! ফলে, রুমেল সাহেবের কথা মেনে নিতে কিছুটা অস্বস্তি থেকেই যায়।

নোম চম্‌স্কির কথায়— ক্যাম্বোডিয়ায় প্রাণহানির যে হিসাব পাওয়া যায় (পোল পটের হাতে) তা অন্তত কয়েক হাজার গুণ রঞ্জিত। তাঁর কথায়, অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ মরেছে অ্যামেরিকার বোমায়।

১৯৭৫-এ ক্ষমতা হাতে নিয়ে পোল পট ও ক্ষ্‌মের রুজ পেল আামেরিকার বোমায় ধ্বস্ত হয়ে যাওয়া একটা দেশ। অবিশ্রান্ত বোমাবর্ষণের ফলে ধান চাষের ক্ষতি হয়েছিল মারাত্মক, যার ফলে ১৯৭৪-এ ধান উৎপাদনের পরিমাণ ছিল নগণ্য। দেশে খাদ্যসঙ্কট তীব্র। এই অবস্থায় পোল পট নির্দেশ জারি করলেন যে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে চাষের কাজে লাগতে হবে সকলকে যাতে এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সুতরাং, পোল পট সম্বন্ধে যা-ই বলা হোক না কেন (তাতে কতটা সত্য কতটাই বা মিথ্যা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়), হঠাত আকাশ থেকে তাঁর উদয় হয়নি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর বেন কিয়েরনান বলছেন—

Apart from the large human toll, perhaps the most powerful and direct impact of the bombing was the political backlash it caused … The CIA’s Directorate of Operations, after investigations south of Phnom Penh, reported in May 1973 that the communists there were successfully ‘using damage caused by B-52 strikes as the main theme of their propaganda’ … The U.S. carpet bombing of Cambodia was partly responsible for the rise of what had been a small-scale Khmer Rouge insurgency, which now grew capable of overthrowing the Lon Nol government.

ক্যাম্বোডিয়া এসব মেনে নিয়েই বেশ আছে constitutional monarchy হয়ে। সবার ওপরে রাজা, আর ক্ষমতায় একরকমের বামপন্থী সরকার। Transparency International-এর Corruption Index মোতাবেক ১৭৫টা দেশের মধ্যে ক্যাস্বোডিয়ার স্থান ১৫৬ (যে দেশে যত বেশি দুর্নীতি তাঁর স্থান তত নীচে)। ম্যানিলিনের ক্ষ্‌মের বস আমাদের জানাতে ভোলেন না, ভিয়েতনাম দুটো বড় দেশকে হারিয়েছে বলে ওরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে। এক কালের গর্ব তা প্রম মন্দিরের বিজ্ঞাপনে বলতে ভোলা হয় না যে সেটা লারা ক্রফটের টুম্ব রেইডার ফিল্মের শুটিং স্পট। আমেরিকান ডলার তাদের মুদ্রা রিয়েলকে প্রায় প্রতিস্থাপিত করে ফেলেছে। টুক টুকের ভাড়াও আপনি অনায়াসে ডলারে দিতে পারেন এবং খুচরোও ডলারেই ফেরত পাবেন।

ব্যানতিয়ে ক্‌দেই থেকে বেরোবার পথে দেখলাম একটা বাচ্চা ছেলে— কতই বা বয়েস হবে— বছর পাঁচেক— কাঠি দিয়ে দিয়ে ছবি আঁকছে, আর তার বোন পাশে বসে বসে দেখছে। একটা ছবিতে সে এঁকেছে দোতলা বাড়ি। আর একটা ছবি এঁকেছে বায়ন মন্দিরের। সেই সপ্তম জয়বর্মণের বিখ্যাত মুখ। ওদের বাপ-মা হয়ত ওদের ক্ষ্‌মের পরিচয় শেখান। শেখাতে চেষ্টা করেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. লেখাটা বেশ ভালো। তবে পোল পটের বর্বরতার দায় তারই। লোকটা টাকা পয়সা পর্যন্ত বাজার থেকে উঠিয়ে দিয়েছিল, ওর এই অর্থনৈতিক বিপ্লবে দলে দলে লোক স্রেফ না খেতে পেয়ে, বিনা চিকিৎসায় মাছির মতো মরেছে। সবাইকে হাতে ধরে মারতে হয়নি। একটা কথা এখানে বলা নেই দেখলাম। পোল পটকে ক্ষমতায় বসায় উত্তর ভিয়েতনাম, পরে ভিয়েতনামের সঙ্গে একহাত নিতে গিয়ে ও নিশ্চিহ্ন হয়। নতুবা হয়ত এখনও টিঁকে থাকতো। ওদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি অবশ্যই হয়েছে আগের তুলনায়, বিদেশি ট্যুরিস্ট শুধু নয়, বিদেশি বিনিয়োগের কল্যাণে। সেক্স ট্যুরিসিমের প্রাবল্য ভিয়েতনামের বদলে ওখানে কেন বেশি, সেটাও একটা রহস্য। আর পোল পটের জমানো হাড়গোড় দেখিয়ে যদি ওরা দু পয়সা করে তো বেশ করছে। লেখকের উচিত ছিলো ওই জাদুঘরটা দেখে আসা। ওইসব সদ্য ঘটে যাওয়া বর্বরতা ভুলে, সত্য যুগের গরিমায় বিভোর হয়ে থাকতে হবে সে আবার কী কথা! এটা প্রায় পারিপার্শ্বিক ভুলে রামরাজ্যের মহিমা কীর্তনের মতো শোনাচ্ছে।

আপনার মতামত...