চাইলে স্বচ্ছন্দে বসত করতে পারতেন দেশের ক্রিমি লেয়ারে

প্রশান্ত ভট্টাচার্য

 

কয়েক বছর আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় একটি খবর ছাপা হয়েছিল। খবরটি ছিল একটি চুরির ঘটনা, ও যাঁর জিনিস চুরি গেছে তাঁর আচরণ বিষয়ে। এক ভদ্রলোকের ঘরে চোর ঢুকেছিল। পুলিশ তাকে বমাল পাকড়াও করে। চোরের কাছ থেকে উদ্ধার হয় কয়েকশো টাকা ও একটি হাতঘড়ি। ভদ্রলোক খুব সাধারণ নয়, প্রাক্তন সাংসদ। পুলিশ উদ্ধার করা মাল তাঁকে দেখায় এবং নগদ শ’খানেক টাকা ও হাতঘড়িটা তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। জানা যায়, ঘড়িটি সংসদের স্মারক হিসেবে তাঁকে উপহার দেওয়া হয়। দেশের সব সাংসদকে সেই উপহার দিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এইচএমটি। ভদ্রলোকের অনুরোধে চোরটিকে মুক্তি দেওয়া হয়। আর এই মুক্তির কারণ, ভদ্রলোক মনে করেন, তাঁর চাইতেও চোরটির অর্থকষ্ট অনেক বেশি আর সেই যুক্তিতে ওকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন তিনি। এই ভদ্রলোকের নাম এ কে রায়। অরুণকুমার রায়। ধানবাদ থেকে তিনবার লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন স্পষ্ট এক পৃথক জগতের অধিবাসী। আমাদের চেনা, অতিচেনা, চিরচেনা সংসদীয় রাজনীতিকদের সঙ্গে মেলে না! এমনকী, বামবিশ্বেও তাঁর মতো মানুষ পাওয়া ভার।

এ কে রায়কে আমি প্রখম দেখি ১৯৭৯ সালে। ছাত্রজীবনের বিপ্লবের উন্মার্গগামিতায় এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। চলে গিয়েছি ধানবাদে। নামটা আগেই শোনা ছিল, তাঁর ঠেক খুঁজে এক সকালে গিয়ে হাজির হলাম। ঘর তো নয়, যেন একটা ঝুপড়ি। মাটিতে একটা তক্তার ওপর চাটাই জাতীয় একটা কিছুতে বসে আছেন। ঘরে আরও কয়েকজন রয়েছেন। মুখে বেশ বড় দাড়ি। মাথার চুলও একটু যেন বড়। কীরকম একটা সাধু-সন্ত গোছের লাগল। আমি যে ওঁকেই দেখতে এসেছি, সেটা শুনে মৃদু হাসলেন। আর আমার কম বয়সের কথা বিবেচনা করে বিশ্বাসও করলেন। তারপর মামুলি দু’-চারটে কথা। কী পড়ি? বাড়িতে কে কে আছেন? কোন ধরনের বই পড়তে ভাল লাগে? তবে রাজনীতি নিয়ে কম কথা বললেন। কেমন যেন মনে হল, আমার মতো অর্বাচীনের রাজনৈতিক কথাবার্তা ওঁর কাছে এতটাই শিশুসুলভ মনে হচ্ছে যে একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের মতো উনি নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় বলে মনে করেছেন। আমরা তখন সুকান্তর কবিতার লাইনে বিভোর, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’। আমাদের তখন চেতনায় মার্কস, হৃদয়ে চে। তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিই বিরুদ্ধবাদীদের। কিন্তু এ কে রায় তো প্রতিপক্ষ নয়, বরং কমরেড৷ অথচ লোকটা আমায় তেমন পাত্তা দিচ্ছেন না! ভারতীয় বিপ্লবের পথ নিয়ে আমার সঙ্গে চর্চা করতে আগ্রহ দেথাচ্ছেন না। উল্টে আমাকে বলছেন, ঘুরে ঘুরে সব দেখো। দু’দিন বেরিয়ে নাও। তারপর। তারপর কী? আমার কি তখন তর সইবার বয়স! তবু লোকটাকে ভাল লেগে গেল, কেননা ততদিনে আমি বেশ কয়েকজন এমপি দেখে ফেলেছি, তাঁদের জীবনযাপনের চেয়ে এ কে রায় আলাদা। একেবারে মাটির কাছাকাছি। পুঁজি বলতে বোধহয় একজোড়া পাজামা-পাঞ্জাবি। অথচ গোটা ধানবাদ ওঁকে চেনে। চেনে রায় বলে। কমিউনিস্ট আন্দোলনে রায় বলতে এককালে বোঝা হত মানবেন্দ্র রায়কে। আর পরে বোধহয় এই রায়কে।

সংঘর্ষ ও সংগ্রামের কষ্টিপাথরে নির্মাণ হয়েছে এই ব্যক্তিত্বের। ৩ বার বিহার বিধানসভার বিধায়ক হয়েছেন, ৩ বার লোকসভার সদস্য হয়েছেন অথচ দেখেছিলেন কোন ভূত! তাই ধানবাদের ওই গরমে লোকটার ঘরে পাখা চলে না, বিদ্যুতের কোনও কানেকশানই নেই, আলো জ্বলে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, যতদিন সব মজদুরের মাথার ওপর ছাদ না থাকছে, ঘরে বিদ্যুৎ না আসছে, ততদিন অন্য কিছু নয়। এমন একটি মাথা ঠেকে যাওয়া ঘরে দিনের পর দিন, প্রায় অর্ধশতাব্দী। তাঁর খাওয়া-দাওয়া, ওই পাজাম-পঞ্জাবি, পায়ে টায়ারের চপ্পল, সবই  সংগৃহীত হত কমরেডদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। যখন যা জুটত তাই খেতেন। কেয়ার করতেন না শরীরে বাসা বাঁধা হাই ব্লাড প্রেশার বা সুগারের আধিক্যের। যখন দেশের বড়, মেজ, সেজ, রাঙা স্তরের রাজনৈতিক নেতারা ঘড়ি ধরে প্রেশার মাপান, রক্ত পরীক্ষা করান, সুগার টেস্ট করান, মাসে মাসে চেক আপে যান, বছরে চারবার ভ্রমণে যান, দেশে কিম্বা বিদেশে, তখন কমরেড রায় কোনও কিছুকে পরোয়া না করে দিনরাত কাজ করে যান শ্রমিকদের মধ্যে, খেটেখাওয়া মানুষের মধ্যে। অথচ এই লোকটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলেন। জার্মানিতে গেলেন উচ্চ শিক্ষা নিতে। ফিরে কাজ করতেন তখনকার বিহারের সিন্দ্রিতে, সরকারি সংস্থা পিডিআইএল-এ। বড় পদে। কিন্তু সরকার বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে তাঁকে সেই চাকরি খোয়াতে হয়। সব ছেড়েছুড়ে একজন সেল্ফস্টাইল বিপ্লবী। এ কে রায় শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ধানবাদ অঞ্চলের কয়লাখনি শ্রমিকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। ওঁর কাজের সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যায় শঙ্কর গুহ নিয়োগীর। দু’জনেই আমৃত্যু বাংলার বাইরে মজদুরদের লড়াইয়ের প্রতিমুহূর্তের অভিভাবক থেকে গেলেন। তবে পেশাদার ট্রেড ইয়নিয়নিস্ট হলেন না। এ কে রায় ছিলেন মিতভাষী, বিনয়ী এবং সবসময়ই স্মিতহাস্য। নিজের কোনও অসুবিধাকে কখনওই প্রকাশ করতেন না। অথচ নীতির প্রশ্নে এক সুতোও রেয়াত করতেন না। বিধায়ক বা সাংসদ হিসাবে কখনও মাইনে নিতেন না। নিতেন না পেনশন। ওঁর পেনশন রাস্ট্রপতির ফান্ডে জমা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে  যখন সাংসদদের মাইনে, ভাতা ও পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব আসে, ডান, বাম সব সাংসদদের মধ্যে এ কে রায়ই একমাত্র যিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ অনুগামী আনন্দ মাহাতোর কথায়, ‘এমপি’রা নিজেরাই নিজেদের মাইনে, ভাতা বাড়িয়ে নেবেন, এই প্রস্তাব তিনি কিছুতেই মানতে পারেননি। ওই ভূমিকার জন্য সারা দেশ তাঁকে তখন চিনেছিল।’

১৯৬৭, ১৯৬৯ ও ১৯৭২ সালে বিহারের সিন্দ্রি  কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)’র সঙ্গে ছিলেন। পরে সিপিএম তাঁকে বহিষ্কার করেছিল। আর করবে নাই বা কেন!

প্রথমত, সিপিএম নেতারা বিহারের আদিবাসীদের সমস্যাকে আলাদা করে দেখতে নারাজ। সবই শ্রেণি সংগ্রামের বাঁধা বুলিতে ফেলে বিচার করতে চান। এ কে রায় মনে করতেন, আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূখণ্ড লাগবে। স্বায়ত্ত শাসন লাগবে। এই বিরোধ তীব্র হতে থাকে। পাশাপাশি সেই সময় অনেক সিপিএম নেতা গাড়ি চেপে ঘুরতেন, এ কে রায় এর বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁর কথা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের এই রকম ফুটানি করা চলে না। এই প্রতিবাদের কারণেই শেষ পর্যন্ত সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত। রায় নিজে তখন চড়তেন একটা লজঝড়ে স্কুটার। সেটিও আবার কিনেছিলেন ব্যাঙ্ক লোনে। ১৯৭৭, ১৯৮০ এবং ১৯৮৯— তিনবার ধানবাদ কেন্দ্র থেকে সাংসদ হয়েছিলেন এ কে রায়। ততদিনে তিনি মার্কসিস্ট কোঅর্ডিনেশন কমিটি (এমসিসি) বলে একটি ভিন্ন সংগঠন গড়ে তুলেছেন। করেন কামগর মজদুর ইউনিয়ন। তবে সিপিএমের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সিটুর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ হয়নি। আটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি সিটুর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলনের তিনি ছিলেন পাইওনিয়র। ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করেছিলেন এই আন্দোলন। এই আন্দোলনে রায় পাশে পেয়েছিলেন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার (জেএমএম) প্রধান শিবু সোরেন ও প্রাক্তন সাংসদ বিনোদবিহারী মাহাতোকে। এঁদের আন্দোলনের চাপে অবশেষে ২০০০ সালের ১৫ই নভেম্বর বিহার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাজ্য  ঝাড়খণ্ড গঠিত হয়। আদিবাসী সমাজে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশস্পর্শী। বিহার তথা ঝাড়খণ্ডের রাজনীতিতে তিনি তার আগে থেকেই হয়ে উঠেছিলেন একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। অথচ ঝাড়খণ্ড রাজ্য তৈরি হওয়ার পরেও রাজ্যশাসন থেকে যোজন দূরে রইলেন এ কে রায়।

আবার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে ধানবাদে এ কে রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের ঘনিষ্ঠ কোল মাফিয়া সুরজ দেও সিং। তিনি  নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে গেলেন, ১০০টি গাড়ির এক কনভয় নিয়ে মিছিল করে গুলি চালাতে চালাতে। আমার কাছে সেটা ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। তারও চেয়ে বেশি বিস্ময়ের। আমাদের বাংলায় তখন কোনও রাজনৈতিক দলেরই মিছিল করে, বিশেষ করে গাড়ির মিছিল করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়নি, বাইকবাহিনী তো বহুদূর। আজ ভাবি, বোধহয় একটু ভয়ও পেয়েছিলাম। তখন তো কাঁচা বয়স, সবুজ মন। পরে দেখলাম এ কে রায় নমিনেশন জমা দিতে চলেছেন। তাঁর সঙ্গে ১০০টি গোরুর গাড়ি আর তাতে তির, ধনুকধারী প্রায় হাজার খানেক আদিবাসী শ্রমিক ও তাঁর সমর্থক। ওই নির্বাচনেও এ কে রায়-ই জিতেছিলেন। তখন যেন মনে হয়েছিল বন্দুকের চেয়ে তিরের দাপট বেশি। বন্দুকের প্রতিপক্ষ তিরধনুক, যেন মানুষের বলে বলীয়ান এ কে রায় এক সেনাপতি।

সালটা সম্ভবত ১৯৮৫। এ কে রায় তখন সাংসদ নন। পৃথক ঝাড়খণ্ডের দাবিতে আন্দোলনের তখন ভরামাস। একটু তাপ নিতে ধানবাদ গিয়েছি। রায়ের সঙ্গে দেখা হল। কথায় কথায় পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের কথা উঠল। জ্যোতি বসুর সরকার তখনই হাঁপাতে শুরু করেছে। রায় নিজের থেকেই বললেন, ‘অপারেশন বর্গা তো হল, তারপরের পদক্ষেপটা কী?’ আমি নিরুত্তর। উনি নিজেই বললেন, ‘জ্যোতিবাবুরাই তা জানেন না। বুঝে উঠতে পারছেন না!’ আবারও বুঝলাম, এ কে রায়  মানে এক অন্যধারার বামপন্থা। তত্ত্ব ও অনুশীলনের সমুচ্চয় ঘটিয়ে এক অন্যধারার বামপন্থী। সত্যিই তো ১৯৮৬-৮৭ সাল থেকে জ্যোতি বসু বা এরাজ্যের সিপিএম নেতারা তো গ্রামে নতুন বামপন্থার চর্চা করতে পারলেন না! উল্টে বাসনা-কামনায় জর্জরিত একদল হিংস্র বামপন্থী গ্রাম বাংলায় দাপিয়ে বেড়াতে লাগল। এই শতাব্দীতে যাদের নাম ‘হার্মাদ’। সাবাশ অরুণকুমার রায়! আপনি আটের দশকেই এই বামপন্থাকে দেখতে পেয়েছিলেন।

যে ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে এ কে রায় এই দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেছেন, তার কোনও তুলনা হয় না। লোকটা কিন্তু নকশালদের মতো গ্রামে গিয়ে স্টে উইথ, ইট উইথ, অ্যাক্ট উইথ করেননি বা মাওবাদীদের মতো জঙ্গলে গিয়ে গেরিলা কায়দায় জনযুদ্ধ করেননি বরং সংসদীয় পথেই তাঁর অনুশীলন চালিয়েছেন। তবু বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত জীবনচর্চার পথে পা মাড়াননি। কিন্ত তা করার জন্য তাঁকে বাড়তি কোনও কসরত করতে হত না। স্রেফ বিধায়ক বা সাংসদ থাকার দৌলতেই দেশের ক্রিমি লেয়ারে বসত করতে পারতেন!  তবু এ কে রায় তাঁর স্বপ্নগুলো, অনুভূতিগুলো, জেদগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন শেষদিন পর্যন্ত। ব্যর্থ হয়নি তাঁর ব্যক্তিত্ব। মানুষের সামাজিক সাফল্যগুলির পরতে পরতে হয়তো লুকিয়ে থাকে কিছু কিছু ব্যর্থতা। তবু তা শেষ সত্য নয়। তাই আড়ম্বরহীন এই রাজনৈতিক সন্ন্যাসী হারিয়ে যাননি, প্রহ্লাদের মতো থেকে যাবেন শ্রমজীবী মানুষের স্মৃতি সরণিতে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...