জম্মু-কাশ্মিরের সাম্প্রতিক ট্রাজেডি

সন্দীপ পাণ্ড্যে

 

গত এগারোই আগস্ট, রবিবার সন্ধ্যা ছটা থেকে সাতটার মধ্যে লক্ষ্ণৌয়ের হজরতগঞ্জে গান্ধিমূর্তির সামনে কাশ্মিরের মানুষের সমর্থনে ও কাশ্মিরে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে মোমবাতি মিছিলের কর্মসূচি পুলিশের কথায় এবং বকরীদ ও স্বাধীনতা দিবসের বিষয় মাথায় রেখে ষোলো তারিখ পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্ত্বেও ওইদিন সকালে আইআইটি কানপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক সন্দীপ পাণ্ড্যেকে পুলিশ তাঁর বাড়িতে নজরবন্দি রাখা স্থির করে। পুলিশ বলে, বেলা চারটে পর্যন্ত ওঁকে বাড়িতেই থাকতে হবে। সন্দীপ পুলিশকে জানান, যে ওইদিনের কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। তখন সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীরা ওঁর বাড়ি ছেলে চলে যান।

গতকাল আমরা খবর পেলাম ১৬ই আগস্ট সন্ধে ৬টায় অধ্যাপক পাণ্ড্যেদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিটিও পুলিশ করতে দেয়নি। তার ঠিক ঘণ্টাদেড়েক আগে অধ্যাপক পাণ্ড্যের, অ্যাডভোকেট মহম্মদ শোয়েবের এবং অন্যান্য উদ্যোক্তাদের বাড়িতে পুলিশ পৌঁছয় এবং তাঁদের পুনরায় গৃহবন্দি করা হয়! তারপরে তাঁরা অবশ্য একটা ছোট মিছিল করতে পারেন।

নিচে রইল কাশ্মির-বিষয়ে সন্দীপের একটি লেখা। বক্তব্যের দায়িত্ব সম্পূর্ণত লেখকের। মূল লেখাটি হিন্দিতে। লেখাটি অনুবাদ করে সমকালের বিশিষ্ট অনুবাদক শ্রী দীপঙ্কর চৌধুরী আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন।

জম্মু-কাশ্মিরে একটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটানো হল।

সে-রাজ্যের একটি নাগরিকের সঙ্গেও পরামর্শ না করে, এবং ভারতীয় সংবিধান তথা সংসদকে হাতিয়ার করে, সেনা নামিয়ে, গণতন্ত্রকে হত্যা করা হল বিশ্বের বৃহত্তম এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে।

এর যন্ত্রণাটা কোথায়?

সেটা বুঝতে হলে নিজেকে একবার জম্মু-কাশ্মিরের অধিবাসীদের সঙ্গে একাসনে বসিয়ে নিতে হবে।

আচ্ছা, একটা অবস্থা কল্পনা করে নিন তো:

ধরুন, ভারতের নির্বাচিত সরকার দেশে আইন ও অর্থব্যবস্থা ঠিকমতো চালাতে পারছে না– এই অজুহাতে বৃটেন ও আমেরিকা রাষ্ট্রসঙ্ঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে এক প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিয়ে এক পরামর্শদাতাকে পাঠাল ভারতশাসনে সাহায্য করতে। সেই ব্যক্তি এসে সুপারিশ করল ভারতের নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করবার। রাশিয়া, চিন একটু একটু বিরোধিতা করল বটে কিন্তু তারা ভেটোর প্রয়োগ করল না, কারণ পাকিস্তান যে তাদের জিগরি দোস্ত! অতএব? অতএব, নির্বাচিত সরকারকে ভেঙে দিয়ে সেই পরামর্শদাতা নিজেই গভর্নর-জেনারেল হয়ে ভারতশাসন শুরু করে দিল। শান্তি বজায় রাখবার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক সেনাদল মোতায়েন করে দেওয়া হল এদেশে, যাতে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের সৈন্যরা রয়েছে। এরা যেহেতু ভারতীয়দের চেনে না, তাই তারা যখন তখন যেকোনও ভারতীয়ের কাছ থেকে তার পরিচয়পত্র দেখতে চাইতে লাগল। না দেখাতে পারলে তাদের নাজেহাল করা শুরু করল– ‘দু’হাত উপরে তুলে দাঁড়িয়ে থাক!’ মারধোরও করতে লাগল তাদের। অপমানিত দেশবাসীগণ প্রতিবাদ করে আরও লাঞ্ছিত হতে লাগলেন। দলবদ্ধ প্রতিবাদের জবাবে তারা পেল ছররা গুলি। বহু মহিলা ও শিশুর চোখ চলে গেল। ভগত সিং বা চন্দ্রশেখর আজাদের প্রেরণায় যে সকল দেশভক্ত বিদ্রোহ করে উঠল, তাদের গ্রেফতার করে ‘আতঙ্কবাদী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে লাগল।

এরপর হঠাৎ একদিন ভারতে বিদেশি সৈনিকের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হল। টিভি-রেডিও-সংবাদপত্রে দেওয়া হল লাগাম। বাইরের কোনও দেশের সঙ্গে ভারতের খবরের আদানপ্রদান বন্ধ করে দেওয়া হল। দেশের লোকে জানতেই পারল না যে সেই গভ-জেনারেল সাহেব ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের সহমতিতে ভারতের সংবিধানকে বিনষ্ট করে দেশটাকে তার উপনিবেশ বানিয়ে নিয়েছে ইতোমধ্যে।

ইংল্যান্ডের রানি ফের ভারতেশ্বরী বনে বসেছেন!

প্রেসের উপর লাগাম দেওয়া আছে কিনা, তাই তারা একপেশে প্রচার করে দিতে লাগল যে এহেন ব্যবস্থায় ভারতবাসী অতীব খুশি। কিছু পেটোয়া লোককে দিয়ে এমন প্রচার করে দেওয়া হল যে পূর্বতন ইংরেজশাসনে ভারতবাসী অতীব সুখী ছিল, স্বাধীনতা পেয়ে ভারতীয় নেতা আর অফিসারেরা দেশটাকে লুটেপুটে খেয়েছে।

কোনও ভারতীয় নাগরিকের যদি এ পর্যন্ত পড়ে কষ্ট হয়ে থাকে তবে সে অনুভব করতে পারবে যে আজকের কাশ্মিরিদের মনের ভিতরটা কেমন করছে।

 

***

তারা যেটা করল, সেটা কাশ্মিরিদের মঙ্গলের জন্যেই— এমনটাই যদি কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার ভেবে থাকে, তো সেখানে এত এত সৈন্য মোতায়েন করবার দরকার পড়ছে কেন? সৈন্যদলের কাজটাই তো হল জনগণের কণ্ঠরোধ করা। অনেকে বলছেন যে ভারতবাসী এই সিদ্ধান্তে সহমত। কিন্তু কাশ্মির নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবার বিন্দুমাত্র অধিকার কি অ-কাশ্মিরিদের আছে? যেকোনও জায়গার ভবিষ্যত-নির্ধারণ কি সেখানকার অধিবাসীরা করবেন, না কি বহিরাগতরা?

ভারত-সরকার তো কাশ্মিরিদের উপর কোনও প্রকার ভরোসাই রাখছে না। ভিন্নস্বরের নেতাদের কথা তো বাদই দিলাম, মূলধারার যে সকল কাশ্মিরি নেতাদের নিয়ে দিল্লির লোক-দেখানে গণতন্ত্র চালানো– তাঁদেরও অপরাধীদের মতো নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে।

মেহবুবা মুফতির সঙ্গে মিলে ভাজপা তো সরকারও চালিয়েছে সেখানে। তাঁর সঙ্গেও কোনওরকম পূর্বালোচনা করেনি দিল্লি। আসলে, মোদি-শাহ্‌রা জানতেনই যে মেহবুবা-ওমর আব্দুল্লাহ্‌ মানবেনই না তাঁদের প্রস্তাব। তাই বিতর্কের সময়ে ফারুক আব্দুল্লাহর মতো বরিষ্ঠ নেতাকে সংসদে উপস্থিতই হতে দেয়নি। তাঁকে ঘরে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে, আর চাউর করে দেওয়া হয়েছে যে তিনি ‘অসুস্থ’। অমিত শাহ্‌ সংসদে বলেছেন যে তিনি তো আর ফারুকের মাথায় পিস্তল ধরে এখানে এনে হাজির করাতে পারবেন না, কিন্তু বাস্তবটা হল এই যে ফারুক আবদুল্লাহ্‌কে পুলিশ ঘরে নজরবন্দি করে রেখেছিল।

 

***

কাশ্মিরিভাইদের সমর্থনে ও সেখানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবার দাবিতে ১১ই আগস্ট ২০১৯ রবিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মৌ-র হজরতগঞ্জে এক ‘মোমবাতি মিছিল’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। বকরীদ ও স্বাধীনতা দিবস সমারোহের দোহাই দিয়ে স্থানীয় পুলিশ তাকে ১৬ই আগস্ট পর্যন্ত মুলতুবি রেখেছে। এতদ্‌সত্ত্বেও আজ সকাল সাড়ে দশটা থেকে আমাকে ঘরে নজরবন্দি করে রেখেছে। সেটা বুঝতে পারলাম যখন আমার স্ত্রী অরুন্ধতীর কথায় দুপুর রুটি কিনতে বেরোতে যাচ্ছিলাম। পুলিশের সেপাই জানাল যে বিকেল চারটে অবধি আমার বাড়ি থেকে বেরোনো মানা। বোঝো! অর্থাৎ, কাশ্মিরের ভিতরে তো মানুষের বাকস্বাধীনতা নেইই, তার বাইরেও কেউ কাশ্মির নিয়ে সরকার-বিরোধী কিছু বলতে চাইলে তারও গলা টিপে ধরা হবে! হায় রে আমার বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র! উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লক্ষ্মৌ নগরীতেই যখন এই অবস্থা, তখন খোদ কাশ্মিরের অবস্থাখানা যে কত ভয়াবহ, সেটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়।

***

ইতোমধ্যেই কিছু কিছু লোকজন ‘কাশ্মিরে জমি কিনব’, বা ‘কাশ্মিরি মেয়ে বিয়ে করব’— ধরনের ফালতু কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। এসব লোকজনের পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা জমি ও নারীকে চিরকালই ভোগ্যবস্তু বলেই ভেবে এসেছে। এহেন মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় ভাজপার নেতৃবৃন্দ আর তাদের পেটোয়া সমর্থকদের কাশ্মিরের ভালোমন্দ নিয়ে বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই, না তারা কাশ্মিরের ভালো চায়। তাই, কাশ্মিরের সম্পূর্ণ ভারতভুক্তি প্রচেষ্টার পিছনে তাদের দুরভিসন্ধি বিদ্যমান। নিঃসন্দেহ। তারা কাশ্মিরকে নিজেদের উপনিবেশ বানিয়ে তাকে দুইতে চায়।

 

***

সময়ের দাবিটা তাহলে এখন কী?

যথাশীঘ্র সম্ভব জম্মু-কাশ্মির বিধানসভার নির্বাচন করাও। নির্বাচিত সভার সিলমোহর পেয়ে গেলে কেন্দ্রের বর্তমান সিদ্ধান্তটা না হয় থেকে যাবে, নইলে পূর্বতন অবস্থায় ফিরিয়ে আনো। কেন্দ্রের কোনওরূপ হস্তক্ষেপ-বিনা সেখানকার নির্বাচিত সরকারের উপর ভরোসা রেখে তাদেরই নিজরাজ্য চালাতে দেওয়া উচিত। আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব স্থানীয় পুলিশের উপরে সম্পূর্ণ ন্যস্ত করে সেনাবাহিনীকে সীমান্তে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আজকের দিনে কাশ্মিরে অনধিক তিনশত সন্ত্রাসবাদী আছে, যে সংখ্যাটা নরেন্দ্র মোদির প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী বনবার সময়ে আশি ছিল। উত্তরপ্রদেশে কুলদীপ সিং সেঙ্গরের মতো কুখ্যাত অপরাধীদের সংখ্যা তিনশতের কম হবে না। উত্তরপ্রদেশ সরকার যদি নিজের পুলিশ-বল দিয়ে এইসব অপরাধীদের সামলাতে পারে তো জম্মু-কাশ্মির পারবে না কেন? এইসব অপরাধীদের সঙ্গে আতঙ্কবাদীদের বিশেষ পার্থক্য নেই। কুলদীপ সিং সেঙ্গরের সাঙ্গোপাঙ্গরাও প্রকাশ্য দিবালোকে একাধিকবার পুলিশ অফিসারদের উপরে গুলি চালিয়েছে। তাই, মাত্র তিনশত সন্ত্রাসবাদীকে সামলাতে সমগ্র জম্মু-কাশ্মিরের জনগণকে প্রায়-বন্দি করে রেখে সাজা দেওয়াটা কোন্‌ দেশের ন্যায়াচার?

হে কেন্দ্রের ভাজপা সরকার, জেনে রাখো যে অন্য অন্য প্রদেশের ভারতীয়দের সমানই নাগরিক অধিকার প্রাপ্য জম্মু-কাশ্মিরের মানুষেরও।

একে সম্মান করো। একে সম্মান করো।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1748 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...