এই নিপীড়নের শেষ কোথায়

তানিয়া লস্কর

 

গত ৫ আগস্ট ভারত গণরাজ্যের গরিষ্ঠ সংখ্যক লোক যখন কাশ্মিরকে সকল প্রকার অনুন্নতি তথা অন্যায় অত্যাচার থেকে উদ্ধার করে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যস্ত, তখন আমরা ভারতেরই উত্তর-পূর্ব প্রান্তের অসম রাজ্যের বাসিন্দারা আরেকটি নজিরবিহীন অত্যাচারের সাক্ষী হচ্ছিলাম। যার ফলে ৩ জন লোককে প্রাণও হারাতে হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় স্তরের টিভি চ্যানেল এসব নিয়ে রা কাড়েনি। কারণটা বোধহয় সেই পুরনো। অসমের নামে টিআরপি তেমন উঠবে না। নাকি আসলেই আমরা ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছি? যেখানে আমাদেরকে দিয়ে যা বলানো হচ্ছে আমরা তাই বলছি, যা নিয়ে ভাবানো হচ্ছে তাই ভাবছি?

তা যাহোক ফিরে আসি অসমের কথায়। ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ আগস্ট থেকে। সেদিন থেকেই নিম্ন অসম বিশেষ করে ধুবড়ি, বরপেটা, চিরাং বাকসা ইত্যাদি জেলার কয়েক হাজার মানুষের নামে এনআরসি পুনঃপরীক্ষার জন্য হাজির হওয়ার নোটিস আসতে থাকে। প্রায় সকল মানুষকে তাদের বাসস্থান থেকে ন্যূনতম তিনশো-চারশো কিলোমিটার দূরের কোনও জেলায় এনআরসি পুনঃপরীক্ষণের জন্য ডাকা হয়। যেমন ধরুন কামরূপ জেলার সোনতলি গ্রামের বেশিরভাগ লোককে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে গোলাঘাট জেলায় হাজির হতে বলা হয়। প্রায় সবাই খেটে খাওয়া হাড়-হাভাতে লোক।  ৪৫০ কিলোমিটার দূরে সপরিবারে যেতে হলে যে পরিমাণ টাকা খরচ হতে পারে সেটুকু দু-তিনদিনের ভিতর জোগাড় করে নেওয়া এদের জন্য কত বড় সমস্যা, সেটা এসি কোর্টে বসে এনআরসির নিয়ম তৈরি করা লোকেদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। তাছাড়া দু-সপ্তাহ আগে পর্যন্ত উঠোনে বন্যার জল ছিল। একাংশ হাঁস মুরগি, গরু-ছাগল ইত্যাদিও বন্যার কবলে মারা পড়েছে। একেকটি পরিবারে ৬ থেকে ৮ জন লোক। যদিও সবার যাওয়া জরুরি নয়। কিন্তু আগে আরও দু তিনবার পরীক্ষণের পর পুনরায় ডাকায় কেউই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। তাই সবাই মিলে ধার-দেনা করে ভ্যান কিংবা ট্রেভেলার গাড়ি রিজার্ভ করে ছুটেছেন। আর যারা পারছেন না তারা রাত্রি ১০টা থেকে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে লাইন দিচ্ছেন। বাস-মালিকরাও কম যায় না। এ সুযোগে ভাড়া তর তর করে বেড়ে যাচ্ছিল।

সিটিজেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস-এর রিপোর্ট মতে শুধু কামরূপ জেলার চেনামারা রাজস্ব চক্রতেই প্রায় ২৫০০০ লোককে নোটিস পাঠানো হয়। এছাড়াও গরৈমারিতে ৪৫০০, নাগরবেরাতে ৩৫০০ সহ কেবল কামরূপ জেলাতেই প্রায় ১ লক্ষ মানুষকে পুনঃপরীক্ষার জন্য নোটিস প্রেরণ করা হয়েছে। অথচ কিছুদিন আগেই ২৩ জুলাই ২০১৯ তারিখে উচ্চতম ন্যায়ালায় কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের পুনঃপরীক্ষার দাবি নাকচ করে দিয়েছিলেন। শুনতে অবাক লাগলেও ঠিক এরকমটাই ঘটছে। উচ্চতম ন্যায়ালয়ের রায়কে তুড়ি মেরে এনআরসি কর্তৃপক্ষ লক্ষ লক্ষ লোককে নোটিস পাঠিয়ে দেন। এমন অবস্থায় লোকেরা আতঙ্কগ্রস্ত হবেন এটাই স্বাভাবিক। তাই রাত্রি সাড়ে দশটায় শয়ে শয়ে লোক হাজির হন বাস স্ট্যান্ডে। বাসগুলো ওভারলোডেড, মানুষেরা সন্ত্রস্ত। বাচ্চা, বুড়ো, গর্ভবতী মহিলা সবাই প্রায় নিশিধরার মত দৌড়াদৌড়ি করছেন। এমন সময় হাল ধরলেন এক দল তরুণী-তরুণ। রেহানা, সালমা, আশরাফুলরা। তারা জায়গায় জায়গায় নিজেদের পরিচিত সমাজকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়ালেন যোরহাট গোলাঘাট ইত্যাদি জেলাসমূহ থেকে বন্দিতা আচার্য, সোনেশ্বর নরহ, প্রণব দোলেরাও। বরপেটা থেকে একদল স্বেচ্ছাসেবক লোকেদের গাড়িতে তুলে দিলেন। যোরহাট, গোলাঘাটে বন্দিতারা যোরহাট সেন্ট্রাল ক্লাব, ইদগাহ কমিটি, আশিয়ানা প্রভৃতি সংগঠনের সাহায্যে খাওয়াদাওয়া, বিশ্রাম এমনকি স্বাস্থ্যপরীক্ষারও ব্যবস্থা করে রাখেন। তাদের সকল রকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে যায় আরও দুটি অঘটন। ৫ তারিখ রাত্রে গৌহাটির পাশে খানাপাড়াতে এরকমই এনআরসি হিয়ারিং-এর জন্য যাওয়া একটি বাস একটি দ্রুতগামী লরির সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়। এতে একটি ৮ বছরের শিশু সহ ২৪ জন লোক গুরুতর আহত হন। এবং একজন নিহত হন। সংঘর্ষের ফলে বাসটিতে আগুন লেগে যাওয়ায় আহতরা প্রায় সবাই পুড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে আহত লোকেরা সম্বিত ফেরার পর নিজেদের শরীরের বিভিন্ন অংশে পুড়ে যাওয়ার ঘা নিয়েও নিজেদের কাগজপত্র গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এমনই আতঙ্ক এনআরসির। এদিকে স্বেচ্ছাসেবকদের এবার ছুটতে হয় গৌহাটি মেডিকেল কলেজে। সেখানে একটি দলকে কিছুটা সামলে নিতেই পরেরদিন সোনাপুরে একটি দুর্ঘটনায় সাতজন আহত হন। তৃতীয় ঘটনায় গোলাঘাট থেকে ফেরতগামী একটি বাস কামরূপ জেলার বকোর কাছাকাছি বামনগাঁও অঞ্চলে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়। এতে মারা যান আরও দুজন এবং আহত হন প্রায় ১৪/১৫ জন। নিহতরা হলেন জয়মুন নেসা এবং তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়া বোন আরজুনা বেগম। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ক্রাউড ফান্ডিং-এর মাধ্যমে তাদের ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করেন স্বেচ্ছাসেবকরা। অথচ আশ্চর্যের কথা হল রাষ্ট্রের তরফ থেকে আজ পর্যন্ত কোনও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়নি। এমনই ব্রাত্য অসমের দরিদ্র মুসলমানেরা। প্রায় ৪ দিন ৪ রাত না ঘুমিয়ে অসুস্থদের সেবা করে গেছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। এমন করুণ কিন্তু মর্মস্পর্শী ঘটনা মানুষের মাঝে কখনও কখনও ঘটে যায়। রাষ্ট্র তথা স্বার্থান্বেষী জাতীয়তাবাদীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মানুষের হাত ধরেছেন মানুষেরা— এই প্রথম অসমে এনআরসির ইতিহাসে।

কিন্তু যন্ত্রণার হিসেবটা কে রাখবে? তাছাড়া অসমের জণগণের প্রকৃত ভাগ্য-বিধাতা কে? উচ্চতম ন্যায়ালয়? যার নির্দেশে এনআরসি নবায়নের কাজ শুরু হয়েছিল? অথচ আজ সেই মহামান্য উচ্চতম ন্যায়ালয়ের রায় উপেক্ষা করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এমন হুলুস্থুলের মধ্যে ফেলা হচ্ছে? ভারত গণরাজ্য? যার সামনে বার বার পরীক্ষা দিয়েও অসমের বাঙালি এবং বঙ্গমূলীয়রা কিছুতেই পাশ করতে পারছেন না? না কি তথাকথিত জাতীয়তাবাদী দল এবং অসম প্রদেশ যারা কমিটির পর কমিটি বানিয়ে অসমের বাঙালির জমির অধিকার সহ সব ধরনের মানব অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের বন্ধুয়া শ্রমিক বানিয়ে রাখতে চাইছে? রাষ্ট্রসঙ্ঘের দেওয়া নিপীড়ন বা টর্চারের সংজ্ঞা মতে, কারও কাছ থেকে তথ্য আদায়, কিংবা কারওকে তার নিজের কৃতকার্য অথবা অপর কারও কৃতকার্য অথবা কিছু করেছে এমন সন্দেহের ভিত্তিতে অথবা অন্য যে কোনও ধরনের বৈষম্যের ভিত্তিতে সরকারি আধিকারিক কিংবা অন্য যেকোনও কেউ সরাসরি কিংবা অন্য কারও মাধ্যমে মানসিক বা শারীরিক উৎপীড়ন করেন কিংবা অন্য কারওকে দিয়ে করান তাকে নিপীড়ন বা টর্চার বলে। তাহলে জাতিগত এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত বৈষম্যের ভিত্তিতে হঠাৎ করে শুধু নিম্ন অসমের কিছু লোকজনকে এভাবে বার বার তাদের সুরক্ষা কিংবা প্রয়োজনের কথা বিচার না করে ডেকে পাঠানোটাও নিপীড়নের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই নিপীড়নের শেষ কোথায়? উত্তর বোধহয় কারওই জানা নেই। হয়তো বা এখানেই শেষ কিংবা এই সবে শুরু।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1748 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...