‘বার্ন ফ্যাসিস্ট, নট দ্য ফরেস্ট’

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

একটা চিঠি। খুঁজে পেলাম। রাইমুন্ডো প্রায়া মুরা। মুরা উপজাতির নেতা। যদিও, জাতির কোনও ‘উপ’ প্রেফিক্স হয় কি? জানি না। ওর চিঠি। কোথায় ছিল, কবে লিখল, কীভাবে লিখল এই আগুনের মধ্যে জানি না। তবে চিঠিটা আছে। ওদের কোনও ভাষায় কি? আমি তো পরিষ্কার বাংলায় দেখছি। পড়ি?

“ব্রাদার। একটা গল্প বলি? বোকা বুড়োর। বুড়োদের। একটা জীবন। শেষ পর্যন্ত দেখে যাওয়া। আগুন। লড়াই। ঘরবাড়ি লোপাটের যুগ-পেরনো লেগ্যাসি। পর্তুগিজ আক্রমণ। ইম্পেরিয়ালিজম। অনেক দেখছি। আমার বাবা ছিল। ঠাকুর্দা। তার বাবা। আমাদের ক্ল্যান। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ পড়েছ? চিনুয়া আচেবে। আমিও পড়িনি। তবে, শুনেছি গল্পটা একই। আমরা আমেরিকা। কালো আমেরিকা। ওরা আফ্রিকা। কালো। ধ্বংসের ছবি। ক্রনোলজি। একটা ইনফিনিটি গেম। সিসিফাসের পাথর। সরকারের ইনফ্রাস্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে আমাদের পাথর তোলা। নামানো। মিথ। কিন্তু, আর কতদিন?

জেয়ার বোলসেনারো। আমাদের প্রেসিডেন্ট। দ্যাট প্রেসিডেন্ট। দ্যাট ফা..। কৃষি করবে। ডেভেলপমেন্ট করবে। দেশের ব্যুরো অফ ইনডিজেনাস ট্রাইব তুলে দিল। পলিসিতে আমরা কোনও প্রায়োরিটি নই। চাষবাসের নামে আগুন। আমাদের আমাজনিয়ার জিঙ্গু ন্যাশনাল পার্ক। আর্সন। একটা রিং-এর মতো আগুন। বলয়। আকাশের ওপর থেকে ছবি। লাল লাল মশালের ভেতর একটা হলদে প্যাসিফিক রিং-এর মতো কিছু। সেই আগুন। ওরা লাগাল। ইচ্ছে করে। পারো। দক্ষিণ পশ্চিমের গ্রাম। আরারা জাতির ছেলেমেয়েবুড়ো। ওদের জমিজমা ভিটেমাটির আমাজনিয়ায় প্রেসিডেন্টের খুনে চাষাদের একদিনের সরকারি ‘ফায়ার ডে’। মার্সেনারি ফার্মার্স। তোমাদের দেশের বিদর্ভ, অন্ধ্রের মতো না। এই আগুন, বিষ এসব ওরা খায় না। খাওয়ায়। রাষ্ট্রের মদতে ব্রাদার। একটার পর একটা আমাজনিয়ার লাল লাল বিন্দু। আকাশের ওপর থেকে। গাছ নেই। গাছ…। কাটলেই ফাইন লাগত। প্রেসিডেন্ট তুলে দিল। পোচারদের পোয়াবারো। গত বছরের তুলনায় অষ্টাশি শতাংশ বেশি পোচিং। ডিফরেস্টেশন। রাতে পাহারা দিলাম। সকালে কেটে দিল। সকালে একজোট হলাম। দুপুর, বিকেল, রাত, ওদের হারেরে। আমাদের মতো আঠারো হাজার মুরা ট্রাইব আর আমাজনিয়া জঙ্গল শেষ হচ্ছে ব্রাদার। জাস্ট শেষ। সবটুকুই। তোমাদের গুগল আছে না?

প্রেসিডেন্ট বলছে এই সময়টা হয়। হয় তো। আওয়ার প্রেসিডেন্ট নোস এভরিথিং। আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি ড্রাই ওয়েদার। চট করে আগুন লাগে। কিন্তু এবার? ২০১৮-র চেয়ে চুরাশি শতাংশ বেশি। এবছরে সংখ্যাটা বাহাত্তর ৭২,৮৪৩। হ্যাঁ, ঠিক দেখছেন। ওয়াইল্ড ফায়ার। এক বছর। বাহাত্তর হাজার। প্রেসিডেন্ট বলছেন ‘এভিরিথিং ইজ নর্মাল’। তবে, আইএনপিই-র ডিরেক্টরকে সরিয়ে দিলেন। দোষ? সমীক্ষায় ফরেস্ট ফায়ারের সরকারি হিসেবের বদলে আসল হিসেবটা দিয়েছিলেন ডিরেক্টর, রিকার্ডো গ্যালভায়ো। কী করবেন? ডিরেক্টর সত্যি মিথ্যের সরকারি হিসেবের তোয়াক্কা করতেন না যে…

কিছু কি করা যায়? কিছু কি করা হচ্ছে? আমার ছেলেমেয়ে? আমার আঠারো হাজার মুরা ভাইবোন, আপনি, তোমার ইওরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, সো কল্ড সেফ রেস্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। কী করছি? কী করছ? ব্রাসিলিয়া। মিছিল। আমাদের। কালো মানুষের। ছেলে বুকে করে চিৎকার করা আরারা, মুরা জাতি মায়েরা। কানফাটানো, বুকফাটানো। অথবা সেদিন। পাওলিস্টা অ্যাভেন্যুয়ে। হাজারে হাজারে মানুষ। হাতে প্ল্যাকার্ড। পোস্টার। ‘বার্ন ফ্যাসিস্ট, নট ফরেস্ট’। একটা সবুজ গ্রহ। বানানো। ওপরে আগুনের কাট আউট। জ্বলছে। ট্রাম্প অফ দ্য ট্রপিক, আসলি ট্রাম্প, নকলি ট্রাম্প, বার্ন দেম। কালো পোশাক পরা একটা বিষন্ন মেয়ের কপালে এসওএস। আগুন। আমাদের আমাজনিয়ার সঙ্গে ওদের বুকে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, লেগ্যাসির পর লেগ্যাসি ধরে চলে আসা ‘প্রো-ডেভেলপমেন্ট’ জুমলাবাজির বিরুদ্ধে ওদের আগুন। আমাদেরটা নিভুক, একদিন। ওদেরটা যেন না নেভে। প্লিজ…

আর বলিভিয়া। দেশ। আরও একটা দেশ। পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে গরিব দেশ। আর জানোয়ার, পাখি, গাছ? তোমাদের বায়োডাইভার্সিটি না কি যেন সেসবের বিচারে? এক নম্বরে। পশ্চিমের সান্টা ক্রুজ প্রায় শেষ। রোবোরো আর সান ইগনাসিও মিউনিসিপ্যালিটিতে লিটারেলি ‘ডিজাস্টার’ শব্দের প্রয়োগ। সাড়ে চার লক্ষ হেক্টর জমি পুড়ে খাক। ইভো মোরালেস। ওদের প্রেসিডেন্ট। দোষের ভাগীদার। তবে, সব মেটালেন ভাইজান। চিলি, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে একসঙ্গে। বারবার স্পটে গেলেন। ১৫০০০ লিটার সুপারট্যাঙ্কার। যতটা আগুন নেভে। ধোঁয়া কমে। রিলিফ। বারোশো কেজির ওপরে জল, চাল, আটা, নুডলস। শুধু রোবোরেতেই ছশোর ওপরে পুলিশ ফোর্স। লা পাজ আর কাচাকাম্বায় ফায়ার ব্রিগেড। ওয়ার-টাইম স্পিড। ক্ষিপ্রতা। মোরালেসরা জানেন, ক্ষতিটা, ভয়টা শুধু সান্টা ক্রুজের আকাশে না। প্রেসিডেন্টের বাড়ির আকাশেও। সম্পূর্ণ বিপরীত গোলার্ধের ফুটপাথের ছেলেমেয়েগুলোর আকাশেও। মোরালেসদের রাজনীতি, ব্রাদার, অত বুঝি না। আমরা লেফট রাইট বুঝি না। বুঝি, বাঁয়ে জঙ্গল, ডানে জঙ্গল। আমাদের দুটোই ঠিক। পবিত্র। হোলিয়ার দ্যান এনিথিং এলস। তবে শুনেছি, ওঁরা, মোরালেসরা ওইসব ফুটপাথের ছেলেমেয়েদের কথা বলেন। মানুষের কথা বলেন। সমানাধিকারের কথা বলেন। আমাদের প্রেসিডেন্ট বলেন না।

ইন আ নাটশেল, ব্রাদার, ভাল্লাগছে না কিছুই। আমরা গাছ চাই, জানোয়ার চাই, পাখি চাই, আকাশ চাই। সব হারাচ্ছে। পোড়া জন্তু, পাখি, বুকে হাঁটা জীবন, জানোয়ার। ওদের, আমাদের ঘর, আমাজনিয়া। গ্রহটার কুড়ি পারসেন্ট অক্সিজেন। ধ্বংস। আগুন। সেও আমাজনিয়ার কুড়ি পারসেন্টে। আর পাঁচ বাড়লেও সব ওষুধের বাইরে চলে যাবে। শুনছি। আর শ্বাস নিচ্ছি। ব্রাদার। কিছু করবে না?”

…..

চিঠিটা রাইমুন্ডো লেখেনি। বা হয়ত লিখেছে। মনে মনে। পোস্ট করেনি। রাইমুন্ডো মুরা। বয়স সত্তর পেরিয়েছে। আগুন নেভানোর লড়াইয়ে শেষ না দেখে সে থামবে না বলেছে। বলেছে,

ফর দ্য ফরেস্ট, আই উইল গো অন, আনটিল দ্য লাস্ট ড্রপ অফ মাই ব্লাড।

সেলাম রাইমুন্ডো, আমাজনিয়া, মাদার আর্থ …

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...