কার্ডবন্দি— ছেড়ে দে মা…

রৌহিন ব্যানার্জি

 

খবরে প্রকাশ, ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্ক খুব শিগগিরই তাদের এটিএম কার্ড বা ডেবিট কার্ড পরিষেবা বন্ধ করতে চলেছে। এই খবরে প্রতিক্রিয়া নানারকম– কারও মতে এসবই গুজব, কেউ বিস্মিত, কেউ সেই নোটবন্দির দিনগুলি স্মরণ করে আতঙ্কে জড়োসড়ো। নোটবন্দির পরে এবারে তাহলে কার্ডবন্দি? তাহলে আমাদের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলব কীভাবে? আবার সেই চেক হাতে লাইন দিয়ে টোকেন তুলে তারপরে আবার হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা কখন কাউন্টার থেকে ডাক আসবে? সই মিলল না বলে নিজের টাকা নিজে তুলতে আবার গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে? স্টেটব্যাঙ্ক অবশ্য বলেছেন অত চিন্তার কিছু নেই, তারা অনলাইন বিনা কার্ডে টাকা তোলার বন্দোবস্ত করে দেবেন। সত্যি বলতে কি আমরা অনেকে না জানলেও এই ব্যবস্থা এখনই বলবৎ আছে স্টেট ব্যাঙ্কের ইয়োনো (YONO – You Only Need One) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে– সেটিকেই আরও সর্বজনীন করে তোলা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা তত ভাল নয়। একে তো প্রত্যন্ত অঞ্চল তো বটেই, এমনকি শহরাঞ্চলেও বহু মানুষ এখনও ই-ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যথেষ্ট সড়গড় নন, ব্যাঙ্কের তরফ থেকে তাদের খুব সহায়তা করা হয় এমন বদনামও কেউ দেবে না, বিশেষ করে একটু নোংরা জামাকাপড় বা খালি পায়ের মানুষ হলে ব্যাঙ্ক কর্মীরা কেমন ব্যবহার করে থাকেন সে আমরা সকলেই জানি, উপরন্তু খুব বেশি দিন তো হয়নি সেই বিভীষিকাময় দিনগুলি, যখন এটিএম-এর লাইনে দাঁড়িয়ে মারা গেছিল একশোর ওপরে মানুষ।

২০১৬ সালের ৮ই নভেম্বর– তারিখটা ভোলা খুব সহজ নয়। এমনকি সাল তারিখ মনে রাখতে পারে না বলে ইতিহাসে কম নম্বর ওঠার দুঃখ যাদের আজও গেল না, তাদেরও এই তারিখটা বিলক্ষণ মনে আছে। কারণ আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগের এই তারিখেই ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি কার্যকর করা হয়েছিল– যাকে আমরা নোটবন্দি বা ডিমনিটাইজেশন বলে জানি। মজাটা হল, সূচনাপর্ব থেকেই ডিমনিটাইজেশন যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক ইস্যু। রাত আটটায় জাতীর উদ্দেশে সেই নাটকীয় ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জানালেন এই “মহান” পদক্ষেপের নাকি মূলত তিনটি উদ্দেশ্য– ১) কালো টাকা ফেরৎ আনা, ২) জাল নোট পাকড়াও করা এবং ৩) সন্ত্রাসবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া। এর সঙ্গে ইতি গজর মত একটি চার নম্বর কারণও অবশ্য উল্লেখ করেছিলেন– ই-ব্যাঙ্কিং এবং প্লাস্টিক মানির ব্যবহার বাড়ানো। কিন্তু তখন অত গরমাগরম বাজারে এসব জটিল তত্ত্ব নিয়ে কে-ই বা মাথা ঘামাবে? কিন্তু তারপর গঙ্গা-যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়াল, ক্রমশ লোকে বুঝতে শুরু করল ওই তিনটি কারণের একটাও পূরণ হয়নি বলাটাই ওভারস্টেটমেন্ট, পূরণ করার কোনও লক্ষণই দেখায়নি কারণ পূরণ করার উদ্দেশ্য আদৌ ছিলই না। চার নম্বর কারণটা কিন্তু সরকারের মনোগত অভিপ্রায়ই ছিল, এবং তার বহুবিধ কারণের মধ্যে দুটিকে আমরা প্রধান হিসাবে দেখতে পারি– প্রথমত ব্যাঙ্কগুলি এবং সরকারের ঘরের ক্যাশ ফ্লো-এর বিপুল ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত সারা দেশের বাজারের ওপর তথ্যগত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। এই দ্বিতীয় কারণটি জটিলতর এবং পৃথক আলোচনার বিষয়– আমরা আপাতত আমাদের আলোচনা প্রথম কারণটায় সীমাবদ্ধ রাখব।

ক্যাশ ফ্লো-এর ঘাটতি কোনও নতুন কথা নয়– বস্তুত ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি বহুদিন ধরেই এই ক্ষয়রোগের শিকার। এই ঘাটতি হবার মূল কারণ অনাদায়ী ঋণ। অর্থাৎ ব্যাঙ্ক তার গ্রাহককে বিভিন্ন খাতে যে ঋণ দেয়, গ্রাহক যদি তা সময়মতো বা আদৌ শোধ না করে, স্বভাবতই ব্যাঙ্কের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ব্যাহত হয়ে ক্যাশ টাকার প্রবাহে (জমা-তোলা ইত্যাদি) ঘাটতি দেখা দেয়। এখন এই অনাদায়ী ঋণের কথা শুনলেই আমরা মুখ নামিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত, অথবা সন্দিগ্ধ চোখে আশেপাশে তাকাতে– চারপাশে কে কে আছে ঋণখেলাপি, খুঁজে বার করতে– কারণ আমাদের দুর্দশার কারণ যে তারাই। তারাই? সত্যিই তারা? আপনারা যারা ব্যাঙ্ক থেকে লোন কখনও নিয়েছেন, আপনারা ভালো করেই জানেন কতটা জটিল এই প্রক্রিয়া– এমনকি আজকের দিনে, যখন ব্যাঙ্ক “৫ মিনিটে লোন” রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে করছে, তখনও আসল ব্যপারটা যে অত সোজা নয় তা আপনি জানেন। ব্যাঙ্ক থেকে লোন পাবার জন্য যে ধাপগুলির মধ্যে দিয়ে আপনাকে যেতে হয়, তার মধ্যে সর্বপ্রথম হল “এলিজিবিলিটি”। যার সোজা অর্থ আপনার লোন শোধ করার ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা ভালো করে বাজিয়ে নিয়ে, উপযুক্ত সিকিউরিটি রেখে তবে ব্যাঙ্ক আপনাকে লোন দেয়। এবং সেই লোন শোধ করার যে মাসিক কিস্তি, তার একটি কিস্তি কখনও বাদ চলে গেলে ব্যাঙ্কের মূর্তি আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চই জেনে থাকবেন। ফোনে ধমক চমক থেকে বাড়িতে লোক আসা, পুলিশের ভয় দেখানো– কিছুই বাকি রাখে না তারা। তার পরেও কি ঋণখেলাপি কেউ হয় না? নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার প্যান কার্ডের সঙ্গে জড়িত অ্যাকাউন্টগুলি, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি, সবকিছুই দখল করে নেবার অধিকার থাকে ব্যাঙ্কের। এবং যেহেতু ব্যাঙ্ক সেই হিসাবটা মিলিয়েই ঋণ দেয়, কাজেই তাদের টাকা শেষ অবধি উঠেও আসে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ আঁটুনিটা বজ্র। তাহলে ফসকা গেরোটা কোথায়? এত কিছুর পরেও ঋণখেলাপিরাই দায়ী– কেন? কারণ দাদা, আমি আপনি যারা দশ-পনেরো-কুড়ি-পঞ্চাশ লাখ এক কোটি দু কোটি ধার নিই আমাদের “এলিজিবিলিটি” অনুযায়ী, তারা স্রেফ খুচরো– আদতে আমরা ঋণগ্রহীতা বা খেলাপি কিছুই নই। ভেবে দেখুন, যদি মাত্র দুজন ব্যবসায়ীকে ব্যাঙ্ক এক লক্ষ কোটি টাকা ধার দেয়, না ভুল পড়েননি– সংখ্যাটা এক লক্ষ কোটিই, একের পরে বারোটা শূন্য, এবং তারপরে তারা সেই ধার আদৌ শোধ না দেয়, তবে তার কী প্রভাব পড়তে পারে। ভেবে দেখার সুবিধার জন্য বলা যায় এর মাত্র একশো ভাগের দুই ভাগ দিয়ে ব্যাঙ্কের সবস্তরের কর্মীদের এক মাসের মাইনে হয়ে যায়। এর পরে আমি আপনি কত ঋণ নিলাম, কত শোধ করলাম, এসবে সত্যিই কি আর কিছু আসে যায়?

কিন্তু হ্যাঁ, আসে যায়, এবং আসছে যাচ্ছে। প্রায় সবকটি রাষ্টায়ত্ত ব্যাঙ্ক এরকম বিপুল পরিমাণ বেহিসাবি ঋণ দিয়ে এবং তারপরে তা আদায় করতে না পেরে দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে এবং বর্তমানে অবস্থাটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে এইসব ছোটখাটো টাকাই এখন তাদের শেষ ভরসা। এমন কি আমার আপনার ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের যে সেভিংস অ্যাকাউন্ট, যা দিয়ে আমাদের অনেকেরই দৈনন্দিন সংসার নির্বাহ হয়, সেগুলির ওপরেও ব্যাঙ্ক দখলদারি করতে চায়– কারণ ঐ সব মহা ঋণখেলাপিদের মাথার চুলটাও ছোঁবার ক্ষমতা ব্যাঙ্কের নেই। বরং উলটে সরকার দরকার বুঝে তার ঋণ মকুব করে দিতে বাধ্য করছে ব্যাঙ্ককে যাতে তারা আবারও ওই পরিমাণ ঋণ নিতে পারে। তাই অগত্যা দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাঙ্ক বিভিন্নভাবে আমাদের জমা টাকায় ভাগ বসানোর চেষ্টা করে চলেছে। বস্তুত নোটবন্দির অন্য কারণ হিসাবে যে প্লাস্টিক মানির চলের কথা বলা হয়েছে, সেটিও এর সঙ্গে জড়িত। খেয়াল করলেই দেখবেন, আপনার টাকা আপনি তুলবেন, এটিএম-এ এজন্য আপনাকে শুধু লাইন নয়, টাকাও দিতে হয়। বহু এটিএম কাউন্টারে টাকা থাকে না, অথবা শুধুই ২০০০ বা ৫০০-র মত বড় নোট। কাউন্টারগুলি মেইন্টেইনড হয় না এবং খারাপ হলে সারানোর লোক অনেক দেরিতে আসে। শীতাতপযন্ত্র প্রায় সব এটিএম কাউন্টারেই বন্ধ অথবা খারাপ থাকে। এসবই কাকতালীয় যদি না ভাবেন, তাহলে স্পষ্টই অনুমান করা যায়, এটিএম ব্যবস্থাটিকে ব্যাঙ্ক নিরুৎসাহিত করতে চাইছে। কেন চাইছে? কারণ ব্যাঙ্ক চাইছে না আপনি যখন তখন খেয়ালখুশিমত আপনার সেভিংস-এর টাকা তুলে নিন, কারণ ওটা থাকলে ব্যাঙ্কের ক্যাশ ঘাটতি সামলাতে কিছুটা কাজে লাগবে। আপনার দরকার তো কি? ব্যাঙ্ক ছাড়া অন্য কোথায়ই বা রাখবেন টাকা? যাবার জায়গা যখন নেই, তখন তাঁরা যা করছেন, মেনে নেওয়া ছাড়া আপনার উপায়ও নেই।

অতএব “এটিএম কার্ড উঠে যাবে” এমত সম্ভাবনার কথা শুনলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আমাদের অধিকাংশ মানুষই, অর্থাৎ যারা নিম্ন মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির, আমাদের ক্যাশ টাকার প্রয়োজন হয়। আমরা স্পেনসার থেকে নয়, আমাদের পাড়ার বাজার থেকে সবজি, মাছ মাংস কিনি, আসা যাওয়ার পথে বাসস্ট্যান্ড থেকে ফল, মুদির জিনিস। রাস্তার ধারে পাঁচ টাকা দিয়ে ভাঁড়ের চা খাই, এই শহরে এখনও পঁচিশ টাকায় দোসা, তিরিশ টাকায় মাছভাত পাওয়া যায়, সেসব খাই। এরা কেউ কার্ড নেয় না– নোটবন্দির পর চাপে পড়ে কেউ কেউ পেটিএম-এর ব্যবস্থা করেছিল, সেসবও আবার আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেছে। কেন গেল? কেন কার্ড ব্যবহার হয় না? কারণ নিশ্চই বাস্তবে তার কিছু অসুবিধা আছে যা ই-ব্যাঙ্কিং কর্তাদের হিসাবের বাইরে। সেই অসুবিধা আমি আপনি চেষ্টা করলে বুঝব, সরকার বাহাদুরের বুঝতে বয়ে গেছে। এবং যেহেতু আমাদের ক্যাশ টাকার দরকার তাই এটিএম কার্ডের মত সামান্য পরিষেবাটুকুও আমাদের খুবই দরকার। আপনারা যতই বলুন কার্ডলেস ট্র্যানজাকশন ইত্যাদি, আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি সেসব কী ব্যপার। এমন কি খুব আশাবাদী দেশভক্তেরাও জানেন, “প্রথম কিছুদিন” চরম অব্যবস্থা চলবেই– হয়তো মরবে আরও শ-খানেক। সে আর এমনকি ব্যাপার– আমাদের সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন “ওই সংখ্যাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়!” সে তো বটেই। সেই বিখ্যাত উক্তি– “সিয়াচেনে সৈন্যরা এই ঠান্ডাতে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে আর তুমি–”

রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় বলেছিলেন “ভাল জিনিষ অল্প বলিয়াই তাহা ভাল, নইলে নিজেরই ভীড়ে সে হয়ে যেত মাঝারি।” তা বলছিলাম কি দাদা, ই-ব্যাঙ্কিং খুব ভালো, কিন্তু প্রায় সব ভালো ব্যাপারের মতই সে অল্প কয়েকজনের জন্য থাকলেই ভালো– আমাদের এত ভালোয় কাজ কী? আমাদের নিজেদের জমানো টাকাটুকু আমাদের দৈনন্দিন কাজের জন্য– ওটুকু ভালোয় ভালোয় তুলতে দিন সাহেবেরা– তাহলেই যথেষ্ট। বাকি নোটবন্দি, কার্ডবন্দি, জানবন্দি যা পারেন করেন– আমাদের ছাড়ান দেন দয়া করে– জয় শ্রী রাম, জয় শ্রী নরেন, জয় শ্রী মুকেশ– যা বলতে বলবেন সবই বলব– সত্যি বলছি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...