মনসারাম অথবা ধানিপটকার ফুটফাট

মধুময় পাল

 

মনসারামের সঙ্গে আলাপ কবে হয়েছিল, এ প্রশ্নে তারিখের বদলে একটা সময় পাই, যখন জঙ্গলমহলের মানুষ পুলিশের অত্যাচার তথা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছিল। একটা কমিটি তৈরি করেছিল। বরাবর মার-খাওয়া মানুষজন আরও-একবার বেশ সাহসী হয়ে উঠেছিল। অত্যাচার রুখে দিতে অস্ত্র হাতে ধরেছিল বেপরোয়া যৌবন। মনসারামের সঙ্গে যখন আলাপ হয়, আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি, আধাসেনা, পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের যৌথবাহিনীর নির্যাতনে জঙ্গলমহল তখন রক্তাক্ত। রক্তস্রোতে শুয়ে দম টানছে জঙ্গলের শরীর।

মনসারামে সঙ্গে কীভাবে আলাপ হয়, এ প্রশ্নে একটা ছোটসভার কথা মনে পড়ে। শাসকের সমস্যার পাশে ভিড়ভাট্টা বাড়াবার বড়সভা নয়, মানুষের যন্ত্রণার পাশে মানুষের দাঁড়ানোর ছোটসভা। মনসারাম বলছিল, অনেকে আমার কাছে জানতে চান, ছিতামণি মুর্মুর চোখ কেমন আছে? তো আমি তাদের বলি, ছিতামণিরা যেমন বাঁচে, তেমনই আছে। এই বেঁচে থাকা একটা চোখে মোটমাট চলে যায়। চিকিৎসা নাই, বিচার নাই। উয়াদের সুচিকিৎসা, সুবিচারের কথা বলেছিল ঘাঘুদাদারা। তো ছিতামণিরা বুঝে গেছে, ওসব কথা ডায়লগ ছিল। ডায়লগ হল গিয়া পুন্নিমার মতো। আসলে স্থায়ী অমাবস্যার ওপর একটা পাতলা আলোর থান। ডায়লগের দোকান হয়। যার দোকান যত বড়, যার ইস্টকে ভেরাইটি বেশি, তার মান তত বেশি। তো ছিতামণির চোখের কথা বলি। সিটা নিয়ে দু-দশদিন বলাবলি হবে। সবাই জানে। একদিন বলাবলিটা ঘাটের বুড়া হয়ে যাবে। সিটাও সবাই জানে। আমি বলি, কথাটা হল এই যে, পুলিশের লাঠিটা ঘা মারল কিন্তু বামকথার চোখে। বামকথা কানা হয়ে গেল। যে বামকথারে গরীব মানুষ চোখের মণির মতো রক্ষা করল, সেই মণিটারেই তো কানা করে দিল বামকথার লাঠি আর লাঠির রাজামালিক। ছিতামণি একটা নাম। তার চোটখাওয়া চোখটা আমাদের রক্তাক্ত বিশ্বাস।

বলা শেষ হতেই একটা কাগজের কাপ এগিয়ে আসে। বিটনুন-গোলা ট্যালটেলে লাল চা। মনসারাম হাত বাড়িয়ে নেয়। আমিও পাই। এবং আমাদের কথা হয়। বলি, বেশ বললে। কানা বামকথা। জবাব দেয় মনসারাম, ভুল বললাম কি? পুঁজিরে আদর করতে গেল বলেই না বামপন্থা নিজেরে কানা করে দিল, না কি? আর কি মানুষ এই কানারে সমর্থন দিতে যাবে? যাবে না। কী না কী অনেদ্দেষ্ট শিল্পের ছুতানাতা ছিটায়ে লাঠি মেরে নিজেরেই কানা করে দিলে! আর যে তোমারে বিশ্বাস যাবে না কেউ। তোমার সত্যকথারেও ভাববে নিঘ্‌ঘাত মানুষ মারার টাটকা ফন্দি।

 

এরপর দেখা হয় এক বাসস্ট্যান্ডে। ইটের ভিতের ওপর দরমা আর প্লাস্টিকের দোকানে বসে ছোলার ডাল দিয়ে লুচি খাচ্ছিল মনসারাম। গরম লুচি। কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে, আর পাতে পাতে পড়ে যাচ্ছে। লম্বা লম্বা বেঞ্চে বসে আছে হাটুরে বাটুরে খদ্দেরসকল। লুচির গন্ধে আমার মনে হয়, তখন ভোর ছিল। ঠান্ডা বাতাস। বাসে বাসে কোলাহল। কুয়াশা আর হাঁটাপথ ভেঙে যারা এসেছে সকালের রোদ ভেঙে দূরে কোথাও যাবার জন্য, তাদের ব্যস্ততা ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে উঠছিল।

যেন কোনও আগে থেমে-যাওয়া কথার খেই ধরে শুরু করে মনসারাম। সরস্বতী মুর্মুর কথা ধরো। মাঝরাতের গ্রাম ঘেরাওয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে দুটা মেলেটারি। একটা মারতে মারতে তুলে নিয়ে যায় সরস্বতীর স্বামী গরানকে। আরেকটা মেলেটারি, সিটা ছোকরা, রেপ করে সরস্বতীকে। রাগে কষ্টে চিৎকার করে সরস্বতী বলে, যে পুলিশটা ইজ্জত নিল সিটার আমার ছেলের বয়স। আরে ইগুলা কুত্তার ধর্ম পাইছে। মানুষরে কুত্তা বানাইলি, বুঝবি যখন তুদের ঘরের বউ-বিটিকে টান দিবে। সরস্বতীর চিৎকারে ভোর আসে পাখির ডাকের আগে। গ্রাম জাগে কিন্তু শব্দ নাই। ভারি বুটের দাপাদাপির চিহ্নগুলা ভয় দেখায়। ইবার বামদাদা মানে ঘাঘুদাদারা ছুটে আসে। কুনঅ ভয় নাই। আমরা আছি। চুপ যা, সরো। ইজ্জত লুটের কথা মেয়েলোকের বলতে নাই। মেয়েলোক উসব চাপি রাখে। কষ্ট হলিও চাপি রাখে। লোকে কী বলবে? সরস্বতীর লজ্জাশরম নাই গো? সবাই জানে, মেয়েলোকের চুপ থাকাই ধর্ম। সরো, ভালো বলি শোন, মেলেটারির নিন্দা করা পাপ। উয়ারা আমাদের বাপ-মা। মেলেটারি আছে, তাই আমরা বাঁচি। তোকে জেলে পুরে দিবে। একবার জেলে দিলে আর ছাড়ান নাই। সরস্বতী তবু চুপ যায় না। কুথাকে কারখানা হবে বলি মেলেটারিটা আমার ইজ্জত নিল?

তো সেই ঘাঘুবাবুরা লজ্জা, পাপ, দেশের নিন্দা ইত্যাদি বলে ভয় দেখিয়ে সত্য চাপা দিলেন। এর পরেতে মিথ্যার উকিলঠাকুর তেনারা সত্য বললে গরীবে বিশ্বাস যাবে কি? তেনারা কি বরবাদ হয়ে গেলেন না? আমাদের রোগা পাতলা লালমোহনদাকে ঘর থেকে তুলে ঝাঁঝরা করে বললেন, এনকাউন্টারে মারা গেছে। দাদাটা বড় সিধা মানুষ ছিলেন গো। দরদ ছিল। তেনারা বলেন, ছত্রধরের নাকি লক্ষ লক্ষ টাকা আছে। লজ্জা মোটে নাই তেনাদের। মিথ্যার মহাসড়ক বানায়ে গেলেন।

ন্যাশানাল হাইওয়ে। বাস এল, মনসাদা! চলো।

আমার কোনও কথা ছিল না সেবারের দেখায়।

 

এর পর, মনসারামের সঙ্গে যখন দেখা হয়, স্পষ্ট মনে করতে পারি, আমি হাঁপাচ্ছিলাম। হাঁপাচ্ছিলাম এইজন্য যে, মনসারামকে দেখে আমি পালাচ্ছিলাম।

ঘটনা এরকম, কোথাও যাব বলে দাঁড়িয়ে আছি বাসস্ট্যান্ডে, গোঙানির মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছিল, বুঝলাম কাছেই ল্যাম্পপোস্ট আছে, সেখানেই বাজছে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে। প্রচণ্ড গরম। আগুনের হলকায় ঝাপসা চারদিক। বোঝা যায়, গাছ ফুরিয়ে গেছে, জলাশয় ফুরিয়ে গেছে, মাটির নীচের জল ফুরিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের গর্ভের আগুন লকলক করছে। দেখি, উলটো দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মনসারাম। কেন জানি না ওকে দেখে ভয় পাই। না-দেখার ভানে নিজেকে ঢেকে জোরে পা চালাই। বয়স হয়েছে। পায়ে জোর কমেছে। ন্যাদোস ভুড়ি ঢকঢক করে। দম কমেছে। কয়েক পা চলতেই হাঁপ ধরে। মনসারামের চোখকে কিন্তু ফাঁকি দিতে পারিনি। দূর থেকে ডাকে, মাধবদাদা! যেন শুনিনি, এভাবে পালাই। গায়েগতরে খাটা মানুষ একটা বয়স পর্যন্ত আরামের মানুষের চেয়ে অনেক সজীব, অনেক তেজি। মনসারাম আমাকে ধরে ফেলে এক ছুটে। মাধবদাদা, পালাচ্ছ?

আমি বলি, না না। পালাব কেন? খেয়াল করিনি তোমাকে। কেমন আছ?

মনসা আবার সেই পুরনো কথার খেই ধরে, ধারাবাহিকের মতো, বলে, তুমি যে বলেছিলে, ভালো হবে। বেশি কিছু না হোক, কাজ পাবে। ডাল-ভাত খেতে পাবে। বেশি কিছু আশা না করাই উচিত। জুলুমবাজি কম হবে। দুষ্ট লোক, পাজি লোকেদের শাস্তি হবে। তোমাদের শান্তি হবে। কী শুনালে, আর কী হল। কথা বলার জো নাই, মাধবদাদা। বলতে গেলে সেই ঘাঘুপার্টির লোক বলে দাগায়ে দেয়। যেই পার্টির বিরুদ্ধে খাড়া হইছিলাম, সেই পার্টির লোক বলে গাল দিলে বড় কষ্ট হয়। আরও কষ্ট হয়, যখন দেখি, সেই ঘাঘুপার্টির লোকজন নতুন চেয়ারে বসি পা দুলায় আর মিচকি মিচকি হাসে। জোরজুলুম দশগুণ বাড়ি গেল, মাধবদাদা। চুরিচামারি, কী আর বলি। চোরেরাই চেয়ার চালায়। নিজেরা মারপিট করে। মারে। মরে। দুইটা পক্ষই বন্দে মাতরম আওয়াজ দেয়। মাধবদাদা, তুমি কি এমন হবে বলেছিলে? কে কত বড় চোর, সিটাই সম্মানের হল। একটু কান পাতো, শুনবে, খালি খাওয়ার শব্দ। আমাদের ধলি গাইটা সারারাত ভোঁস ভোঁস খেত আর জাবর কাটত। সারারাত শব্দ হত। নতুন চেয়ারগুলি থেকে সেইরকম শব্দ পাই সারাদিন সারারাত। পুকুরকাটার টাকা খায়, সিমেন্টের টাকা খায়, বালির টাকা খায়, রাস্তার টাকা খায়, চাকরির টাকা খায়, ঠাকুরের টাকা খায়, শ্মশানের টাকা খায়, হিজড়ার টাকা খায়, ভিখারির টাকা খায়। খালি খায় আর খায়। আরও বড় বিপদটা কী জানো, মাধবদাদা, উয়াদের সঙ্গে না ভিড়লে বাঁচা মুশকিলের করি দিবে। যে ছেলেগুলা মানুষের কথা ভাবত, পঞ্চায়েতের ঘাঘুদের বিরুদ্ধে লড়াই দিত, আজ তাদের অনেকে জেলে, কয়েকটা সারেন্ডারে গেছে, বাকিগুলা একা, একদম একা, মনখারাপের একা। যারা সারেন্ডারে গেছে, তারা অমুকবাবুর চেয়ারে খাটে, তোলায় খাটে, জুলুমে খাটে। তুমি তো বদলের কথা বলেছিলে। পুরানা ঘাঘুরা যদি নতুন চেয়ারে মিশে যায়, বলো বদল কি হয়? মাধবদাদা, অশিক্ষা যে শিক্ষারে চালায়, তার কুনঅ বদল নাই। তোমরা যারা বদলের ডাক দিলে, টিভিতে এস্টাইলের পাঞ্জাবি পরে বসে সুন্দর সুন্দর বাক্যি সাজালে, তারা কি ভুউউশ? গুছায়ে ভুউউশ হলে, নাকি আরও গুছানোর তালে ঘাপটিতে আছ? কুমির সামলাতে যদি না পারো, খাল কাটো কেন? পাড়ায় পাড়ায় এখন কুমিরের চাষ। বদলটা কী হল, আগে যে কটা মানুষ ছিল, তারা এখন কুমিরের কীর্তন করে।

মনসারামকে আমি কোনও জবাব দিতে পারিনি। আমারও তো একই প্রশ্ন। বদলবাবুদের জিজ্ঞেস করে জবাব পেয়েছি, আমাদের দেশে মনের মুক্তি সাধনায় রামমোহন রায় ব্যর্থ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্যর্থ। রবীন্দ্রনাথও ব্যর্থ। দেশের মুক্তি সাধনায় সূর্য সেন-রাসবিহারী বসু-নেতাজি সুভাষ ব্যর্থ। স্বাধীনতা সংগ্রামটাই কি ব্যর্থ নয়? দেশে দেশে আন্দোলনের বিপ্লবের ব্যর্থতার অসংখ্য উদাহরণ আছে। এ জবাব শুনে মনসারাম নিশ্চয় বলত, তোমাকেও আর বিশ্বস যাব না, মাধবদাদা!

 

মনসারামের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। তখনই একটা লোকের ছেলেবেলায় পালাই। ছেলেটা গরীব। বাঙাল। বস্তিতে থাকে। কালীপুজোয় তখন খুব শীত পড়ত। ওদের বাড়ির সামনে একটা পুজো হত। ভুটিয়া চাদরে গা ঢেকে ছেলেটা বাজি পোড়াত। এক আনায় কেনা এক প্যাকেট ধানিপটকা ফোটাত সে একটা একটা করে। বন্ধুদের অনেকেই যখন দুম দাম গুদুম গাদাম শব্দে পাড়া কাঁপাচ্ছে, তুবড়ি ছুড়ে দিচ্ছে ফুলকি, রঙিন আগুন থেকে গলগল ধোঁয়া উড়ছে, ছেলেটা একা একা ধানিপটকা ফাটায় একটা একটা করে। শব্দ হয় ফুট ফাট। আজও সে জীবনের বিকেলে একটা একটা ধানিপটকা ফাটানোয় মজা পায়। ফুট ফাট। তার সামনে একটা মোমবাতি জ্বলে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...