‘কে আমাকে ডাকল, আমি জেগে উঠলাম’

অনিমিখ পাত্র

 

দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ঘরে ফেরা মানে যেন জলের ওপর একটা ভোর হচ্ছে। যেন ঘুম আসার মুহূর্তের আর ঘুম ভাঙার সময়ের এক ছায়াচ্ছন্নতা। এক অদ্ভুত আধেকলীন লুপ, একটা অবুঝ টানেল। বিশেষ করে যদি পাহাড়ি পাকদণ্ডী বেয়ে নেমেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়তে হয় নাগরিক ভুলভুলাইয়ার ভেতরে। যেন, তন্দ্রা আর মায়া অঞ্জন লাগা এক মানুষকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন রাশভারী অঙ্কের মাস্টারমশাই। যেন, এইই তো ছিল, আর এইই তো নেই। এ প্রায় প্রত্যেকবারই হয়। আজ আমি বলব, সেই সেবার কুমাউঁ থেকে ফিরে যে ছন্নছাড়া দশা হয়েছিল, বিশেষ করে সেবারের কথা। সবুজ-নীল ফিতের মতো রামগঙ্গা নদীর বুকে পাথরের ওপর দাঁড়ানো আমার একটা ছবি দেখে বন্ধু আকাশ বলেছিল, এই অসামান্য সুন্দরকে ছেড়ে আসো কী করে! কষ্ট হয় না? এর উত্তরে আমার গরীব শব্দভাণ্ডার দিয়ে কীই বা বোঝাই! বিশেষ করে প্রায় এক পক্ষকাল জুড়ে যদি জীবনখাতা ভরে থাকে চিরপাইন আর দেওদারের ফাঁকে ফাঁকে রোদ আর জ্যোৎস্নার ফালি, বনঝিঁঝিঁর একটানা ঘণ্টাধ্বনি, কুমায়ুনি খাবারের থালা, পঞ্চচুল্লির হাতছানি, হাজার পাখির শিস, ঈগলের পাহারা, বন্ধ হওয়া ইন্দো-টিবেট বাণিজ্যপথের স্মৃতি, মেষপালকের আলাপচারিতা, বুনোফুলের হাঁটাপথ এবং এবং এবং একজন দুজন আলোকসামান্য মানুষের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা। লোভ আর ইঁদুর দৌড় সেখানে পৌঁছয় না।

পাহাড় যেন আমাদের ‘স্বাভাবিক’ পৃথিবীর বাইরে। আমাদের ‘মূল’ ও ‘ঠিক’ ভারতবর্ষের অংশ সে নয়। সেইসব ফিরবার পর। আকাশের এই প্রশ্নটা হাড়েমজ্জায় টের পাই, যখন আসে যথাসাধ্য ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠার পালা। ‘মূল’ ঘটনাপ্রবাহে মনোনিবেশ করার সময়। ঝাঁকুনিময় ল্যান্ডিং-এর মতো এই মেনে ও মানিয়ে নেবার সময়টায় একটু চাপ হয়। মৃদু মৃদু ভয় হয়। নাগরিক জীবনের হাঁ-মুখ ক্রমশ ঢুকিয়ে নেয় তার নকশার ভেতর। কেবল ব্যস্ততর জীবনের গায়ে জলের আলপনা হয়ে থাকে সরমোলি আর গৌনাপ নামের গ্রামদুটি।

আজও যেসব জায়গায় মানুষের গাড়ির ধোঁয়া পৌছয়নি, সেখানকার আকাশ প্রকৃতই অনেক বেশি নীল, বাতাসে প্রকৃতই আনন্দের গন্ধ। টায়ারের দাগ যে রাস্তায় পড়েনি, সে রাস্তাই যেন পৃথিবীর গর্ভগৃহের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কুমাউঁ হিমালয়ে, বিনসর স্যাংচুয়ারির পেটের ভেতর গৌনাপ নামের একটা ছোট্ট গ্রাম সেরকমই এক গর্ভগৃহ। তার তিন কিলোমিটার আগেই টায়ারের শেষতম দাগটি ফুরোয়। কুমাউঁ মন্ডল বিকাশ নিগমের রেস্টহাউজ থেকে তারপর এই তিন কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে যেতে হয়। ঘন পাইনের ভেতর দিয়ে, বিস্ময় সরিয়ে।

শ্যাম, সুন্দর আর মহেশ— এই তিনভাইয়ের ব্যবস্থাপনায় একটা হোমস্টে। মনোজ নামের এক দূর গাঁয়ের ছেলে সেখানে ক্লাব মাহিন্দ্রার চাকরি ছেড়ে কাজ নিয়েছে। আমি, সঙ্ঘমিত্রা আর অভিষেক হাঁটা শুরু করি বুক ঢিবঢিব সঙ্গে নিয়ে। ফোনে সুন্দর ভাই আমাদের পথনির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কে না জানে পাহাড়ি পথে রাস্তা ভুল করলে সে কেবলই গোলকধাঁধার মতো ঘুরিয়ে মারবে। কোথাও কোনও সাইনবোর্ড নেই। আমরা ক্রমশ ফুলে ছাওয়া একটা পথ ধরে নেমে যেতে থাকি। হাঁটায় আমাদের ভয় নেই। কারণ, ট্রেক করার পূর্ব অভিজ্ঞতা। চিন্তার যেটা, তখন বিকেল। আলো থাকতে থাকতেই ডেরায় ঢুকে যেতে হয়, জঙ্গলের নিয়ম। এক কিলোমিটার হাঁটার পর দেখি রাস্তার ওপর একটা গাছের গুঁড়ি শোয়ানো আছে, তার ওপর অনেকগুলো নুড়ি পাথরের কাটাকুটি সাজানো। মানুষই রেখেছে। এই তবে পথের ইঙ্গিত। আরও কিছুটা যাবার পর দেখি একজন আসছেন সামনের দিক থেকে, আলাপ হয়, তিনিই মনোজ।

গ্রামে পৌঁছই। যথারীতি কুকুরের অভ্যর্থনা। ঢুকতে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ফলভারানত মৌসম্বী লেবুর গাছ, পথের শ্রান্তি ভুলে সঙ্ঘমিত্রা একঝলক ট্যুইস্ট নেচে নেয়।

গৌনাপের পথে

হোমস্টে বাড়িটি ভিলা ধরনের। তার একধারে মহেশের পরিবার থাকেন। বারান্দা ছাওয়া লতাগাছ, ফুলের। যা আশা করিনি ওইরকম প্রত্যন্তে, তা হল এক ঝকঝকে হালফ্যাশানের বাথরুম। অথচ পাথুরে, রাস্টিক।

ছুটে আসে গ্রামবালক হিমাংশু। আমাদের হাত ধরে টেনে সে গ্রাম দেখাতে নিয়ে যায়। ৭-৮ ঘরের বসতি। কৃষিনির্ভর। পাইন, প্রজাপতি আর পাখি সেখানে অশেষ। রাতে লেপার্ড আসে। সারাদিনমান ওই বনঝিঁঝিঁ আর দুএকটা অস্ফুট মানুষের গলা। পৃথিবীর আসল পৃথিবী।

এই বাড়িটায় ছিলাম

পাহাড়ের একটা ঢালে এই হাতের তালুতে ধরা ছোট্ট গ্রামটি। মহিলারাই সংখ্যায় বেশি। জমিতে নিড়ানি দিচ্ছেন। বীজ বোনার কাজও চলছে। এর ওর গাছ থেকে টুক করে লেবু ছিঁড়ে নিয়ে খেতে খেতে চিলতে মাঠে নেমে যাচ্ছেন তারা। পাথর আর মাটিলেপা বাড়িগুলির নিচের তলায় ছাগলের ঘর। এক বুড়ি, স্বভাবে রঙিন, আমাদের সঙ্গে রসিকতায় মেতে ওঠেন। রীতিমতো পোজ দিয়ে তার ছবি তোলার আবদার মেটাই। আরেক বালক দিপু, আমার ক্যামেরা ফোনটিকে নিয়ে তার ভারী আগ্রহ। একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে, আরেকবার ক্যামেরার ওদিকে। হিমাংশুর ছোট বোন রেশমি। দিপুর সম্ভবত রেশমিকে খুব পছন্দ। সে রেশমির হাত ধরে টেনে আনে, একসঙ্গে ছবি তুলবে বলে। রেশমির দোনামনা ভাব আমার নজর এড়ায় না। সারাদিন এরা যা খেতে দেন আমাদের, সমস্তটাই নিজেদের পরিশ্রমের ফসল থেকে, সরাসরি, আজকালকার লব্জে যাকে বলে ‘অর্গানিক’। হিমাংশু ক্লাস এইটে পড়ে। ওর উপরের দিদিটি ক্লাস নাইন। এই অভয়ারণ্যে স্কুল কোথায়? কী করে স্কুলে যাস হিমাংশু? একগাল হেসে হিমাংশু জানায়, ৯ কিলোমিটার দূরে। মানে, যেতে ৯ আসতে ৯ অর্থাৎ ১৮ কিলোমিটার পথ পাহাড়ে জঙ্গলে হেঁটে ভাইবোন স্কুলে যায়। ভয় করে না? না। ভালুক আছে, লেপার্ড আছে। হিমাংশু তো হাতে পাথর রাখে, তাড়াতে তাড়াতে যায় জীবজন্তুদের। জঙ্গলে থেকে কি জানোয়ারদের ভয় পেলে চলে? আর অসুখ-বিসুখ? করেই না। খুব অসুস্থ হলে, ওই ৯ কিলোমিটার। ডুলিতে করে কাঁধে চাপিয়ে শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।

আমি আর হিমাংশু

হিমাংশু চুপি চুপি মৌসম্বি পেড়ে দিচ্ছে

ভাইকে পাহারা দিচ্ছে দিদি

গ্রাম থেকে একটা রাস্তা উঠে গেছে খানিকটা উঁচুতে। সেখানে উঠে চোখে পড়ে তুষারশৃঙ্গরাজি। নন্দাদেবী, চৌখাম্বা, ত্রিশূল। এই তুষারশৃঙ্গগুলিকেই এরা জানেন হিমালয় বলে। কুমাউঁর স্পেশাল দেবতা ‘গোলুদেব’। তার পুজো হয় এখানে। তবে, বড় একটা আসেন না কেউ এমনিতে। আমরা তিনজন পাইনের স্নেহচ্ছায়ায় চিত্রার্পিতের মতো এখানে বসে থাকি। একটা সবচেয়ে উঁচু পাইনের কারুকার্যময় কাণ্ডে হেলান দিই। নীচে খাড়া পাহাড় নেমে গেছে। নানারঙের ফুলে ফুলে নানারঙের প্রজাপতি। মনে মনে বলি, ‘কে আমাকে ডাকল সেই শূন্যে ঝাঁপ দিতে / রক্তমুখী চূড়ার থেকে সজল পৃথিবীতে’। সাদা এই ফুলগুলি স্মৃতি তৈরি করে। ঠিক সতেরো বছর বয়সে এসেছিলাম কুমাউঁ পাহাড়ে। আর, এইবার ঠিক চৌত্রিশ। সতেরোর যত স্মৃতি, ফটোগ্রাফে আছে। শুধু, এই ফুলের গন্ধটা থেকে গেছে চেতনার ভেতর, সজল। একটা অর্ধেক দিন এই জায়গাটায় বসে থেকে, ঘাসের ওপর হতবাক ঘুমিয়ে গিয়ে, এইবার সঙ্গে নিয়ে এলাম একধরনের রোদ্দুর, সত্যি সত্যিই যাকে দুহাত দিয়ে ধরা যায়, গায়ে মাখা যায়। রিস্টওয়াচ দেখে, খিদের তাড়নায় একসময় ফিরে এলাম বটে, কিন্তু আসলে আমরা এখনও বসে আছি সেই বনচ্ছায়ায়, পাইনের আশ্রয়ে, পাখির ডাক আর রৌদ্রগন্ধের ভেতরে।

ছাগলের ঘর

সেই রোমান্টিক ছবি। রেশমি আর দীপু

গৌনাপের বুড়ি দিদিমা

‘কে আমাকে ডাকল, আমি জেগে উঠলাম’

স্মৃতিফুল

সবুজের ড্রয়িংরুমে

আসলে, এখনও, ওখানেই

 

*শিরোনাম ও পঙক্তিঋণ: ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ – শঙ্খ ঘোষ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...