গ্রামটি

ডোনাল্ড বার্টিন ’শ

তর্জমা: সাধন দাস

 

১৯৫০-এর শুরুতে ঐ বছরই লেখা ছোটগল্পের এক প্রতিযোগিতা হয় পৃথিবী জুড়ে। উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে মি. এম সি প্যাট্রিক থমসন। ২৩টি দেশ অংশগ্রহণ করে। ভারতবর্ষের দায়িত্বে ছিল হিন্দুস্থান টাইমস।

হাজার হাজার গল্প বাতিল করেও প্রায় ২,৫০,০০,০০০ পড়ুয়ার মনোনয়নে প্রায় ৬০,০০০ গল্প প্রতিযোগিতায় উঠে আসে। সেখান থেকে ৫৯টি গল্প বেছে নেওয়া হয়। হিন্দুস্থান টাইমস গল্পগুলি ‘ইন্টারন্যাশনাল শর্ট স্টোরিজ’ গ্রন্থে প্রকাশ করে। নিউজিল্যান্ড থেকে নির্বাচিত ডোনাল্ড বার্টিন ’শ-এর লেখা ‘দ্য ভিলেজ’ গল্পটি ওই গ্রন্থের প্রথম খণ্ড থেকে নেওয়া। লেখকের পরিচয় কিছু মেলেনি।

 

সাদাসিধে ভোলেভালা গ্রাম। ফলে ফুলে পাহাড়ে, চলন্ত মানুষে বাহার। আয়নামুখী নদী আর সেই ঝুঁকে পড়া হাড়জিরজিরে মানুষটি বাদ দিলে, হাবাগোবা মানুষেরা ছিল সরল জীবনে মুগ্ধ। খেয়ে পরে ঢেঁকুর তুলে, স্বপ্ন দেখে তৃপ্ত। আমরা যুদ্ধবাজ। আমাদের চোখে নেহাতই সেকেলে সেই এঁদো জনপদ।

আমাদেরও চমকে দিয়ে, ঝুঁকে পড়া সেই মানুষটি বুক চিতিয়ে মরে গেল। পাহাড়চূড়া থেকে দেখছিলাম, একটা দীর্ঘ সরল গাছের আড়ে বয়ে যাওয়া নদী যেখানে ক্রুশ তৈরি করেছে, তার নীচে যন্ত্রণাদগ্ধ ঢ্যাঙা মানুষটি, নতজানু হতে হতে মারা যাচ্ছে।

সেটা ছিল জুডাসের দেশ। এটা গ্রিস। খ্রিস্ট জন্মের উনিশশো একচল্লিশ বছর পর,  ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো, সেই হাঁদাগঙ্গারাম গাঁয়ে একটি মৃত্যুর ছবি আমাদের বুকে যোগচিহ্নের মতো সেঁটে গেল।

আমরা একদল আগুনখেকো জঙ্গি যোদ্ধা, মেশিনগানের পল্টন। বন্দুকে মানুষে ঠাসাঠাসি গাড়ি ভর্তি হয়ে গ্রিসের এই পাহাড়ে উঠে এলাম। তখন বিকেল। একটা অন্তর্লীন খরস্রোতা নদীর বাঁকে, গম্বুজের মতো ওক গাছগুলো বিকেলের শেষ রোদে নিজেদের তাতিয়ে নিচ্ছিল। মেজর বললেন— এইখানে  আমাদের তিনদিনের ঠেক।

কনকনে পাহাড়ি নদীতে হাত মুখ ধুয়ে রগড়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম। গরম গরম বিকেলের ভোজ পেটে ঢুকতেই শরীর অন্য কিছুর জন্য চনমন করে উঠল। কন্নরকে নিয়ে মুশকিল। এ বেলায়ও মুখে কিছু তুলল না। যেটুকু না ছুঁলে নয়, ভেড়ার মাংস রুটি সবই পড়ে থাকল। আঙুলে খুঁটে খুঁটে ঠোঁট এঁটো করে উঠে পড়ল।

বললাম— একটু মদ খাওয়া দরকার। পাশেই গ্রাম মনে হচ্ছে। চলো তো খুঁজি।

বিষণ্ণ কন্নর পিছু নিল। উদ্দাম বয়স। মদের নাম শুনলেই ঢুকুঢুকুতে গলে যেতে ইচ্ছে করে। কন্নরেরও করে। তবে ও গলে যায় না। ডুবে যায়। কোন এক দুঃখের অতলে। দিনরাত মদে বুঁদ হয়ে থাকে। সমুদ্রের গভীরে একটা টর্পেডো ওকে ছুড়ে দিয়েছে নেশার অতলে। তখন যুদ্ধ সবে শুরু। বউ, ফুলের মতো দুটো বাচ্চা নিয়ে ঘরে ফিরছিল। শুধুমুধু একটা সাবমেরিন, কন্নরের সংসার নিয়ে সবশুদ্ধু ডুবে গেল। টর্পেডো কন্নরকে ছিটকে ফেলল মদের সমুদ্রে। সেখানে সে ডুবে যাচ্ছে, ডুবেই যাচ্ছে, ডুবে যাওয়া সংসারের কাছে।

আমাদের হুল্লোড়বাজির মধ্যেও কন্নর আলাদা, চুপচাপ। একটানা ওর নিঃসঙ্গতা, নিস্তব্ধতা আমাদের উদ্দাম জীবনকে ব্যঙ্গ করত, বিরক্ত করত। তবু ওর মধ্যে  ভালোবাসার এমন তীব্র আবেগ বইত, যা আমাদের সব সময় ছুঁয়ে থাকত। ওর ভিতরের আগুনে, তেজে আমরা জ্বলে উঠতাম, যুদ্ধে, বিপদে ওর উপস্থিত বুদ্ধিকে  অনুসরণ করতাম নিশ্চিন্তে। খরচের মাতাল খাতায় নাম লিখালেও শেষ দিন পর্যন্ত ওকে সমীহ করে যাব।

তাঁবুর কিনার ঘেঁষে নদীর পাড় ধরে, গ্রামে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পেলাম। প্রায় মাইলটাক ছবির মতো পথ। ঘুরে ঘুরে মজাসে নামছি। দু’পাশে পাহাড়, গাছপালা। পেছনে, হব হব সন্ধের রঙিন টকটকে আকাশ। মদ খাওয়ার আগের আবহ তৈরি করছিল। প্রকৃতি কন্নরকে আর সঙ্গ দেয় না। সে ওক গাছের সারিতে, কাঁটা ঝোপঝাড়ে, এমন কি আলো-আঁধারি বাতাসেও বউ ছেলে মেয়েকে খুঁজে বেড়ায়। শোকে সন্তাপে একটু হাঁটলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

মোটর লাগানো একটা গরুরগাড়ি পাশ কাটাচ্ছিল। একটু নীচু হয়ে লাফ মেরে সে উঠে বসল। যেন ওর জন্যেই আসছিল, আর জানে, গাড়িটা কোথায় যাবে। ক্রমাগত যাওয়ার পথ ওকে নিয়ে নেমে গেল পাহাড়ের খাদে, সমতলে। প্রাচীন ঐশ্বর্যে ভরপুর সেই গ্রামখানা। জনজীবনে বৈকালিক উচ্ছ্বলতা, রোদ্দুরে উজ্জ্বল। কন্নরের গাড়ি একাকার হয়ে মিশে গেল প্রাণিত অভ্যন্তরে। বিভোর হয়ে দেখছিলাম। গোধূলির বিস্তীর্ণ এলাকা বড় মায়াময়। যেন বহু যুগ ধরে চিনি। আপন। খুব নিজের।

নদীর উপরে পাথরের ব্রিজ। ইতস্তত একঝাঁক পাথরের কুঁড়েঘর। শ্যাওলা মাখামাখি। রোদ্দুর মেখে সবুজ মখমল যেন চকচক করছিল। মনে হচ্ছিল, আস্ত গ্রামখানা পাহাড় ফুঁড়ে গজিয়ে উঠেছে, প্রকৃতির সন্তান। চারপাশে গাছপালা মাঠঘাট পাহাড়ের সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে গেছে। এখানে ওখানে কতগুলো খামারবাড়ি। গ্রামের মাঝখানে বাড়িগুলোর চেয়ে উঁচু লম্বা একটা বিল্ডিং। দেখে মনে হল, ওখানেই গ্রামের দরকারি মালপত্তর পাওয়া যায়। খোঁজ করলে, মদও মিলবে। বিল্ডিংটার পিছনে ছড়ানো গাছপালা, নীচে ছিটানো কিছু চেয়ার, টেবিল।

গ্রামের সীমানা জুড়ে ভেড়া, ছাগল চড়ানোর মাঠ। মাঠের শেষে অরণ্য কাঁধে পাহাড়, উঠে গেছে আকাশের কাছাকাছি। ইউরোপে এ রকম স্নিগ্ধ গ্রাম এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে। যাযাবর জীবনে ঘুরি আর দেখি, বিস্ময়ে মুগ্ধ হই।

লম্বা বিল্ডিংয়ের দোরগোড়াতেই কন্নর দাঁড়িয়েছিল। দেখতে পেয়ে ইশারায় ডাকল। কাছে গেলে বলল— চলে এসো। কগনাক (ফরাসি ব্রান্ডি) পেয়ে গেছি।

পাহাড়ি পথে দু’পা নাচিয়ে মদের দোকানে ঢুকে পড়লাম। মুথাঘাসের মতো মোরগ, আর বুনোফুলের মতো মুরগিগুলো পায়ে পায়ে তিড়িংবিড়িং করছিল। কাউন্টারের নীচে তেলচুকচুকে একটা শুয়োর। বেকন, চিজ, আর শুয়োরের বোঁটকা গন্ধে জিভে জল সুড়সুড় করছে। দোকানদারটা মাথামোটা, বেজায় কালো, ভুঁসকো। মুখের রঙ আরও কালো। তার চেয়েও কালো আলো ছিটকানো স্যুট পরে বসে আছে। শহুরে আমেরিকান কায়দায় ভুল ইংরিজিতে বলে উঠল— হুই জেন্টিলম্যানেরা, খাইবেন কী বলো?

সরল নির্মল পাহাড়ি গাঁয়ে কথাগুলো এমন উদ্ভট শোনাল আমরা তো ছাড়, কন্নর পর্যন্ত হেসে উঠল। এমনকি শুয়োরটা ঘোঁত ঘোঁত শব্দে হাসতে হাসতে পিছনের বাগানে নেমে গেল। কগনাক হাতে আমরা শুয়োরের পিছন পিছন বেরিয়ে এলাম বাইরে। ছড়ানো চেয়ার টেবিলে বসে পড়লাম হাত পা ছড়িয়ে।

নতুন মানুষদের সঙ্গে ভাব জমাতে একে একে গ্রামের  মানুষেরা এসে বসছিল আমাদের টেবিলে। আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল। আমাদের সঙ্গে নির্দ্বিধায় মদ খেল। ওদের গাঁইয়া ভাষা না বুঝলেও হাসি আর মদ পৃথিবীর সব ভাষাতেই কথা বলে। ওদের আন্তরিকতায় কোনও খাদ পাচ্ছিলাম না। পল্টন থেকে আরও অনেকেই এসেছে। গ্রামবাসীরা সবার সঙ্গে মিশে এমন আড্ডা দিচ্ছিল, গ্রিসের এই গাঁয়ে যেন আমরা থাকতেই এসেছি। আমি বসেছি কন্নরের টেবিলে। সে গোগ্রাসে মদ গিলছিল। যেন বুকের ভিতর গজিয়ে ওঠা বিষণ্ণতাকে খুন করছে।

গুটিকয় ছেলে-ছোকরাও ছিল। ওরা গ্রিক সৈনিক। যুদ্ধে আহত। ঘা, ব্যথা, ব্যামো সারাতে গাঁয়ে ফিরেছে। বেশিরভাগই বৃদ্ধের দল। বাকি পুরুষেরা যুদ্ধে। আনকা সৈনিক দেখে, বুদ্ধিমতী মহিলারা ঘরের জানালা, দরোজা সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু প্রচুর কাচ্চাবাচ্চা, কুচোকাঁচাদের ভিড়ে বাগানের বাইরেটা সরগরম। লক্ষ করলাম, একটা কুচো আর একটা কুচি প্রায় একই রকম দেখতে, দুই ভাইবোন হবে, খুব মায়াবী, হেজিপেজি সবার চেয়ে আলাদা। খুব ভালো লাগছিল ওদের দুজনকে। এই ঝগড়া, এই ভাব। এই ছুটছে, তো ওই পড়ছে, ঘ্যান ঘ্যান কাঁদছে, আবার হাসছে।  মনটা ওদের সঙ্গে নরম হয়ে দুলছিল। কন্নর টেবিল ছেড়ে উঠে গেল ওদের কাছে। দুই ভাইবোনকে দুই কোলে জড়িয়ে আদরে পিষে ফেলতে চাইছিল। ওরা হাঁসফাঁস করে ছিটকে বেরিয়ে কেবলই পালাচ্ছে। কন্নর ওদের পিছু পিছু ছুটছে। সে একটা মজার খেলা জমে উঠল। শেষ পর্যন্ত কন্নরের সঙ্গে জমে উঠল ভাব। কন্নরের হাত ধরে ওরা দুই ভাইবোন আমাদের নাচগানের আসরে মেতে উঠল। সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইল, ক্র্যাসি (স্থানীয় মদের নামে গান)। খুশিতে ডগমগ হয়ে কন্নরের হাত ধরে নাচল। যেন অনেকদিন পর যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছে ওদের বাবা। গ্রামীন তালের অচেনা সুরে, গানের ধুঁয়ো ধরে, এলোমেলো নেচে, হুজ্জুতিকে আমরা মিলন উৎসব বানিয়ে ফেললাম।

ঠিক তখনই দেখলাম, দয়ালু, করুণ মুখচ্ছবির সেই মানুষটিকে। কোঁকড়া চুলদাড়িতে ভর্তি প্রশান্ত মুখ, লম্বা ঢ্যাঙা। গোড়ালি পর্যন্ত ঝোলা জোব্বা। ভালোবাসার প্রতিমূর্তি, শিশুদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। বালকবালিকারা গান গাইছে, তাঁর মুখে স্নিগ্ধ হাসি। চোখে স্নেহচ্ছায়া। কুতকুতে চোখের দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম— মানুষটি কে?

বলার জন্য দোকানির মুখ চুলকাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল— মহা খচ্চর। একপয়সার মদ খাবে না। হঠাত হঠাত কোত্থেকে উদয় হয়। মুখে উল্টিস পুল্টিস শান্তির বাণী। এলেবেলে কাচ্চাবাচ্চা, হাঁদাভোদা গাঁইয়াগুলোর মাথা খায়। আর আমার ব্যবসার বারোটা বাজায়। যাচ্ছেতাই খ্যাপা গোছের একটা ভবঘুরে। একদম পাত্তা দিও না।

দোকানিটা বকবক করেই চলেছে— কী বলে জানো, টাকা নাকি অপয়া, টাকার বাঁটোয়ারা ফয়সালা করতেই যুদ্ধ বাঁধে। আস্ত গবেট একটা, শালাবাবু তো ওকে নিয়ে মস্করা ফাঁদে।

তবে হ্যাঁ, মিস্ত্রি বটে ছুতোর। দোকানের কাউন্টারখানা দেখেছ? ওর হাতে বানানো। ছাদ থেকে ফেলে দিলেও জোড় খুলবে না। গায়ে খোদায় করা, ক্রুশে ঝোলানো যীশুর মূর্তিখানা? আহা! রোজ দেখি, তবু না দেখলে মন খারাপ হয়। দেখলেই দু’পেগ বেশি খেয়ে ফেলি। গাঁইয়া খরিদ্দারগুলো মাল টেনে হাউ হাউ কাঁদে আর কাউন্টারের সামনে বসেই কনফেস সারে। দোকানটাকে ব্যাটারা গির্জা পেয়েছে! আর আমি হচ্ছি ওদের পুরুত মশাই। যত্তসব উৎপাত!

ছেলেপুলেগুলো দেখছ, ওর পুষ্যি। মাবাপ খোয়ানো, যুদ্ধের গাঁ গঞ্জ থেকে কুড়িয়ে এনেছে। অপগন্ডটা ওদের মানুষ করে। এসবে একপয়সা কামাই নেই, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। জ্বালিয়ে খায়। দোকানে একটা বেওয়ারিশ মেয়ে জুটিয়েছিলাম তোমাদের ফূর্তির জন্য। ভুজুং দিয়ে ভাগিয়ে নিয়েছে! এলাকায় অবশ্য আমার প্রচুর চেনাজানা। যুদ্ধের দৌলতে রেটও অনেক কমে গেছে। ঘরে ঘরে উপোসী বিধবা, ডবকা ডবকা মেয়েদের লাট লেগে আছে। চাইলে ওর চেয়ে সুন্দরী পেয়ে যাবে।

সেয়ানা দোকানি গলা নামিয়ে চুপি চুপি বলল— খবর্দার শয়তানটার পাল্লায় পড়ো না। তুকতাক জানে, মাথা ঘুরিয়ে দেবে। একদিন ঘুম ভেঙে দেখবে ওর পেছন পেছন হুড্ডু হুড্ডু করে ঘুরে বেড়াচ্ছ। খুব সাবধান! আমার বিক্রিবাটা শিকেই তুলেছে। বুড়ো আঙুল চোষো আর ওনার প্রেমের বাণী শুনে পেট ভরাও। বিটলে, হাড়েবজ্জাত কোথাকার!

বকবকানি সহ্য করতে না পেরে টেবিল ছেড়ে কন্নর ওই ঝুঁকে পড়া মানুষটার কাছেই গেল আর ভাব জমিয়ে ফেলল। টেবিল থেকে আমিও কাট মারব বুঝতে পেরে দুঁদে ব্যাবসাদারটা রেহাই দিল। মেয়ে গছানোর ধান্দায় অন্য টেবিলের দিকে চলে গেল। কন্নর আর বিনয়ী মানুষটিকে লক্ষ রাখছিলাম। হঠাৎ দেখি, ওরা দু’জন হাওয়া। ওদের সঙ্গে কুচো আর কুচিকেও খুঁজে পেলাম না।

মাথার টিকি পর্যন্ত মদ গিলে সকালে হ্যাং ওভারে ভুগছিলাম। যন্ত্রণায় মাথা তিতো হয়ে আছে। খাওয়ার  টেবিলে বসতেই হল। কন্নরকে দেখলাম, দিব্যি হাসিখুশি। শিস দিয়ে সকালের টিফিন খাচ্ছে। আশ্চর্য, বহুকালের পুরনো কন্নর যেন খাওয়ার টেবিলে ফিরে এসেছে! নিশ্চয়ই বিনয়ী মানুষটার কীর্তি। ফূর্তিতে রাখার জন্য আমরা সদাই ওর পিছনে লেগে আছি। অথচ পাহাড় ঠেলেছি এ্যাদ্দিন! আর উনি এক দেখাতেই কামাল করেছেন! কানের পোকা নাড়ানো দোকানি কাল রাতে বলেছিল, লোকটা ভেলকি জানে। ভেলকি টেলকি শেখার শখ নেই, বন্ধুকে ফিরে পেয়ে বর্তে গেছি।

কন্নর স্নান করেছে। সাজুগুজু করে ফিটবাবু। কিছুই বলল না। টিফিন খেয়ে গাঁয়ের পথে মিলিয়ে গেল।

নেই কাজ তো খই ভাজ। রাস্তা শুঁকে শুঁকে ঠিক খুঁজে বের করলাম কন্নরকে। কুঁজো মানুষটি তখন হেঁইয়ো হেঁইয়ো র‍্যাঁদা ঠেলছে আর গল্পে মশগুল। দুই হাত থুতনিতে খাটিয়ে কন্নর কথা গিলছে হাঁ করে। ছেলেপুলেগুলো ওদের চারপাশে কিলবিল করছে। আশ্চর্য! কন্নর উঠে এল না। ওখান থেকে আমাদের দেখে হাত নাড়ল। আমরা ওকে বিব্রত করলাম না। কন্নর হাসছে। আমরা তো তাই চেয়েছিলাম। বন্ধুর বহুদিনের জমাট বাঁধা কষ্টের অন্ধকার, আলোর এক শিখাতেই ঝলমল করে উঠেছে। হিসেব কষে দেখলাম, কুচো আর কুচির বয়স ওর মরে যাওয়া বাচ্চাদের সমান।

আমরা আমাদের মাতলামির দিকে পা চালিয়ে মদের দোকানে ঢুকে পড়লাম। বেলা গড়িয়ে এল। তাকিয়ে ছিলাম দূরে। মুখে মাছি পড়ার মতো হাঁ করে দেখলাম, কন্নর, কুচো আর কুচি তিনজন পাশাপাশি নদীর তীর ধরে হেঁটে চলেছে। হাত পা নাড়িয়ে কন্নর কিছু বলছে। আর পাহাড়ি বাতাসে আকুলি বিকুলি দোলখাওয়া গুল্মলতায় ফোটা জোড়াফুলের মতো শিশুদুটো হেসে গড়িয়ে পড়ছে। নাচতে নাচতে চলেছে কন্নরের ছায়ার সঙ্গে। নদী আর ওদের এগিয়ে চলা দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে দুটো আনন্দের ধারা পাশাপাশি বয়ে চলেছে। মদো-মাতাল আমরা, ফেরার সময় দেখলাম, নদীর পাড়ে সবুজ ঘাসের বিছানায় এলিয়ে বসেছে কন্নর। কুচো আর কুচি ওর কোলে চিত হয়ে শুয়ে আছে। সে একহাতে ঠেকনো দিয়েছে পিঠের পিছনে, আর একহাতে আকাশ বোঝাচ্ছে দুই ছেলেমেয়েকে।

পাল্টে গেছে কন্নর, আমূল বদলে গেছে। দলছুট হয়ে হারিয়ে গেছে খ্যাপা মানুষটার দলে। যতটুকু ক্যাম্পে থাকে, হৈ হুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখে, বেশিরভাগ সময় তারার মতো দিনের আলোয় লুকিয়ে থাকে, খুঁজলে পাওয়া যায়, ঘেমো পরিশ্রমী কুঁজো মানুষটার আড্ডায়, কচিকাঁচাদের মাঝখানে।

মদেই খেয়ে ফেললাম তিনটে দিন। পাহাড়ি নদী, গ্রাম, আর ওক গাছের সারি পেছনে ফেলে চললাম পাহাড়ের আরও উপরে। ট্রেঞ্চের আড়ালে। যুদ্ধবাজ জার্মানদের মুখোমুখি হব এখানেই। বসে বসে আরও সপ্তাহখানেক কেটে গেল। মনে হচ্ছিল, ভুল খবর। জার্মানরা এ পথে আসবে না।

পুরনো কন্নর পাল্টে নতুন এক বিস্ফোরক কন্নরের জন্ম হয়েছে। মদ খেতে ভুলে গেছে। তাঁবু, ট্রেঞ্চ, বন্দুক ঠিকঠাক রাখতেই এখন ব্যস্ত। নিশানা নবিশিতে আমাদের মজিয়ে রাখে হুল্লোড়ে। নতুন সাহস, ভরসা, আর বুদ্ধিতে ওর বেশি অনুগত হয়ে পড়লাম আমরা।

একসময় সত্যি সত্যি জার্মানরা এসে গেল। কন্নরের যুদ্ধছক অনুযায়ী ক্যাম্প খালি করে দিলাম। গাছের মাথায় পতাকা বেঁধে রাখা হল, যেনো তাঁবুতে ফেরার নিশানা। আর মিছিমিছি ধোঁয়া তৈরি করার জন্য একজন সাধারণ যোদ্ধাকে রেখে পাহাড়ি গ্রামেই পিছু হটলাম। ভেবেছিলাম, ফাঁদ তৈরি করে যাচ্ছি। এখানেই আছি ভেবে লটবহর নিয়ে ওরা উঁচুতে উঠে যাবে। গ্রামটাকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র বানাবে টঙে। পাহাড়ের নিপথ দেওয়ালের পিঠে তুলে দিতে পারলে পিঁপড়ের মতো টিপে মারব ওদের। গ্রামটাও রেহাই পাবে।

সে গুড়ে বালি। ওদের গুপ্তচর অনেক বেশি সুলুকসন্ধানী। ওরা গ্রামের নীচ দখল নিয়েছে। সুজলা সুফলা গ্রামটাকে লুটেপুটে খাবে। গ্রামকে মাঝখানে রেখেই যুদ্ধ হবে। উপায় নেই। কন্নরের কপালে ভাঁজ। কিছু কিছু উদ্বাস্তু, যাযাবর মানুষেরা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে সরে যাচ্ছিল। গরুর গাড়ি বোঝাই হয়ে ওদের লোটাকম্বল, কাচ্চাবাচ্চা, বুড়োবুড়ি চলেছে। উল্টোদিকে আমরা পাশ কাটিয়ে পুরনো ডেরার দিকে যাচ্ছি। কচিকাঁচারা কিছুই বোঝেনি। কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়েছে। খিদে ক্লান্তিতে কেউ কেউ পথে লুটিয়ে পড়ছে, তবু হাঁটছে। কন্নর ছুটে গেল, ওদের পাশে। ব্যাগ থেকে চিজ, বিস্কুট, শুকনো খাবার যা ছিল বিলিয়ে দিয়ে ফিরে এল। দুশ্চিন্তায় কথা বলছিল না। পাশে পেয়ে আমাকেই প্রশ্ন করল— এরকম শিশু পৃথিবী জুড়ে রয়েছে। কী সাংঘাতিক নিষ্ঠুর! যুদ্ধের জন্য নিরপরাধ শিশুদের খাবার জুটছে না। ঘুমুতে পারছে না। ওরা তো যুদ্ধের কেউ নয়। বড়দের ভাগবাঁটোয়ারার জন্যে ওরা কেন শাস্তি পাবে?

সুন্দর শান্ত মানুষটি কন্নরকে উলটে পালটে দিয়েছে। মৃত্যুর শেষ প্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সে। জীবনের কথা, বাঁচার কথা বলছে। দু’একদিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হবে। যুদ্ধ মানেই হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে লোফালুফি।  বেঁচে থাকার আকুলতায় আমরাও ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।

পাহাড়ের গর্তে কেটে রাখা ট্রেঞ্চে আমরা ঢুকে পড়লাম। দু’দিন টানা বৃষ্টিতে নাজেহাল অবস্থা। খাওয়া থাকার আয়োজন করতেই নাওয়া ঘুম পালিয়ে গেল। একঝাঁক ছেলেমেয়ে আর তাদের কুঁজো অভিভাবকের কথা বেমালুম ভুলে গেছি।

তিন দিনের দিন আকাশ পরিষ্কার হয়ে এল। ঝকঝকে দিন। পাহাড়ের নীচে সোজা সমুদ্র পর্যন্ত দেখা গেল। জার্মানদের সাঁজোয়া বাহিনী গ্রামের নীচের জঙ্গল জমি দখল নিয়েছে। আক্রমণ শানাবার আয়োজন করছে। কিন্তু আমাদের গুলির আওতার বাইরে।

আমার দায়িত্ব জার্মানদের চোখেচোখে রাখা। বাইনোকুলারের চেয়ে ঢের শক্তিশালী একটা যন্ত্রের চোখই আমার চোখ। জঙ্গলে লতাপাতার জবরজং ফাঁকে যন্ত্রের নল বসিয়ে দিনরাত দেখা ছিল আমার কাজ। নলের নাকে বসানো একটা চাকা ঘুরিয়ে ঠিকঠাক সেট করতে পারলে পাহাড়ে ওঠা নামার রাস্তা বরাবর ওদের বুকের লোম পর্যন্ত দেখতে পাই।

যদিও দুটো মাত্র ছবিই ধরা পড়ত যন্ত্রে, একটা উঠে যাওয়ার পথ আর একটা নেমে যাওয়ার রাস্তা। যতক্ষণ না দুটোকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারতাম, চাকা দুটো ঘুরিয়েই যেতাম। আর যন্ত্রের ডায়ালে ফুটে উঠত শত্রুর অবস্থান, দূরত্ব, নিশানার মাপ। ক্যাম্পের সবচেয়ে এক্সপার্ট রেঞ্জারের মতো চটপট বলে দিতাম বন্দুকের নল কোথায় রাখলে নিখুঁত নিশানায় পাওয়া যাবে জার্মানদের।

জঙ্গলের ফাঁক গলিয়ে পিঠে এসে পড়ত মিষ্টি রোদ্দুর, আদুরে অন্ধকার। আর নলে চোখ রেখে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা, প্রত্যেকটা মিনিট, সেকেন্ড দেখতাম আহামরি সব ছবি, দৃশ্য, জীবনযাপন। এই কাজেই নিজেকে উত্তেজিত মনে হত।

সুলুকসন্ধানী যন্ত্র দিয়ে দেখতাম, ফেলে আসা সেই গ্রাম। মদের দোকান। ছোট ছোট পাথুরে কুঁড়ে, মানুষজন আসছে, যাচ্ছে, কত স্বাভাবিক, কত দৈনন্দিন নিশ্চিন্ত জীবন! শিশুরা, মুরগির বাচ্চারা, উড়ন্ত পাখির মতো খেলছে। দয়ালু মানুষটি ডানা মেলে ওদের সামলাচ্ছেন।

কন্নরের নিজস্ব একটা কাচের দূরদেখা মেঠো যন্ত্র আছে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে ওটা দিয়ে গ্রাম পর্যন্ত দেখা যেত, ও দেখত আর নতুন নতুন দুশ্চিন্তায় ঘেমে উঠত।

বলত— গ্রাম ছেড়ে ওরা চলে যাচ্ছে না কেন? কী জন্য পড়ে আছে! মেজর এখনও গ্রাম খালি করার অর্ডার পাঠাচ্ছে না, আশ্চর্য! গুলিগোলা ছুটতে শুরু করলে পোড়া ক্ষেত ছাড়া গ্রামটার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

আরও বলত— পাহাড়ে লুকিয়ে পড়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। বেশিদূর যাওয়ার ফুরসত পাবে না।

আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে ওরা গ্রামেই রয়ে গেল।

পরদিন জার্মানরা আক্রমণ শুরু করল। মহড়াতেই বাইক বাহিনী পাঠাল। আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা পরখ করতে চাইছে। বাইকওয়ালাদের সাহস বলিহারি। গাঁক গাঁক করে আমাদের এলাকায় ঢুকে পড়তেই দিলাম সবকটাকে জন্মের মতো শুইয়ে। ফিরে প্রতিরোধ বোঝাবার কাউকে রাখিনি। পেছন পেছন পাঠাল গোটাকয়েক ট্যাঙ্ক, ছোট এক পায়দল বাহিনী। হাঁদাগঙ্গারামেরা ঢুকে পড়ছিল আমাদের দুর্ভেদ্য ক্যাম্প এলাকায়। এদিক সেদিক ফাঁকফোঁকর গলিয়ে আমাদের ঝাঁকঝাঁক গোলাগুলি ছুটছিল ওদের কলজে লক্ষ করে। উত্তেজনায় ভুলেই গিয়েছিলাম গ্রামের কথা। জার্মানরা উঠে আসছিল গ্রামের দিকে। অদ্ভুতভাবে খেয়াল করলাম, ওরা আমাদের ট্রাক, ট্যাঙ্কের ক্ষতি করছে না। গ্রামের প্রাচীন কুঁড়েগুলোকে ভাঙছে। বহুকালের পুরনো শিকড়শুদ্ধু ঘর বাড়ি সংসার উপড়ে দিচ্ছে। অত সাধের মদের দোকানটা গোলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিল। খামারবাড়িগুলো তছনছ করছে। একটা ছবির মতো গ্রামকে শান্তিহীন, স্বস্তিহীন, প্রাণহীন শ্মশান করে ফেলছে। বিন্দুমাত্র মায়াদয়া নেই।

সুলুকসন্ধানী যন্ত্রটা ঘুরিয়ে দুটো দৃশ্যই দেখছি। একদিকে ধ্বংস, অনাচার অন্যদিকে গ্রামের স্বাভাবিক জীবন। নিশ্চিন্ত মনোরম জীবনে হানা দিচ্ছে মৃত্যু। এখানে ওখানে নারী পুরুষের মৃতদেহ পড়ে আছে। বুঝতে পারছি, আনপড় গ্রামের ভোলেভালা মানুষগুলো গ্রাম ছাড়তে কষ্ট পাচ্ছে। ঘর বাড়ি খালি করতে গা লাগছে না।  বহুকালের শান্তিময় ভিটে, চোদ্দপুরুষের মায়া, ছেড়ে যেতে মন কিছুতেই সরছে না। জানে না কী ঘটছে, কী ঘটতে চলেছে। স্লথ গতিতে পিঁপড়ের মতো সার বেঁধে ওরা পাহাড়ের গা বেয়ে চলেছে। আর ফিরে ফিরে দেখছে। পড়ে থাকছে জীবন স্পন্দনের টুকরো টুকরো হাসি, কান্না, হুতাশন।

দয়ালু পিতৃহৃদয় মানুষটি তার শিশুদের তাঙড়ে তুঙড়ে একজায়গায় জড়ো করছেন। দোকানের পয়সাপিশাচ মালিক অসহায়ের মতো ছুটোছুটি করছে। উদভ্রান্ত। গো-ডাউনের ভিতর থেকে বিশাল একটা পোঁটলা বের করেছে। মূর্খ, জানে না ওটা ও বয়ে নিতে পারবে না। আবার দোকানের ভিতর ঢুকে পড়ল। এবার ট্যাঁকবাক্স বয়ে নিয়ে এল। মহিলা, বৃদ্ধরা নিজেদের টেনে নিয়ে চলেছে পাহাড়ের পথে। গ্রামরক্ষী যুবকেরা উৎসাহ দিচ্ছে। একটা শেল এসে ধ্বংস করে দিল নদীর উপরে অনাদি কালের ব্রিজখানা।

তড়িৎগতি কুঁজোলম্বা মানুষটি ততক্ষণে ছেলেপুলেগুলোকে একসারিতে দাঁড় করিয়েছেন।

আহত মানুষদের কাঁধে চাপিয়ে অসহায় মানুষেরা গ্রাম ছাড়ছে। মরা স্বজনদের সঙ্গে নেওয়ার জন্যে কী আকুলিবিকুলি! উপায় নেই! সামর্থে কুলোচ্ছে না। পড়ে রইল রক্তমাংসের প্রিয়মানুষেরা। শিশুগুলো এখনও নিরাপদ আছে।

আবার শেল এসে পড়ল। আমি চিৎকার করছিলাম— ওই বন্দুকগুলোকে থামাও। গ্রামবাসীদের, শিশুদের শেষ করে দেবে।

জার্মান বন্দুকগুলো হড় হড় করে গুলি উগরাচ্ছে। গ্রামের যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর সব কবরে পাঠাবে। শিশুদের সারির সামনে একটা খুনখুনে বুড়ো ধপ করে পড়ে মরে গেল। পাহাড়ের অতল খাদে মরাদেহটা গড়িয়ে যাচ্ছে। দু’একজন মৃত্যু ভুলে বুড়োকে আঁকড়ে ধরছিল। দু’একজন আঁকড়ে ধরা মানুষদের টেনে হিঁচড়ে পালাতে চাইছে। চোখের সামনে মদের দোকানি ক্যাশবাক্স বগলদাবায় শেষবারের মত মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।

শিশুগুলো এখনও সুস্থ। দয়ালু মানুষের তীক্ষ্ণধী কায়দায় ওরা অক্ষত রয়েছে। অন্তত শিশুদের জন্য মানুষের মতো মানুষটি সুস্থ থাকুন। হাতে হাত ধরে শিশুরা মরণ ঝঞ্ঝা পার হয়ে যাচ্ছে। অভিভাবক মানুষটি ওদের পিছনে। বোমার টুকরো, ভাঙাপাথর, ধুলোয় মাখামাখি হয়ে মিছিল চলেছে।  ধুলোর ঝাপসা আড়ালে একটু ঘুরে শিশুরা ঢুকে পড়ল নিরাপদ পাহাড়ের আশ্রয়ে।

দয়ালু মানুষটি অপেক্ষা করেননি। তড়িঘড়ি ফিরে এলেন আহত, মরণোন্মুখ মানুষের মিছিলে। একজন গুলিবিদ্ধ মহিলাকে নিচু হয়ে যখন তুলছিলেন, তখনই গুলি এসে লাগল তাঁর বুকে। মহিলাটির সঙ্গেই পড়ে গেলেন ওক গাছের নীচে। ওই অবস্থায় মহিলাকে জড়িয়ে টেনে হিঁচড়ে চলতে চাইলেন। মহিলাটি সন্তানসম্ভবা। তিনি পারলেন না। দু’জন শিশু ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এসেছে দয়ালু মানুষটির পড়ে যাওয়া লক্ষ করে। ওরা মাঠের মধ্যে দিয়ে ছুটছে। মনে হচ্ছে, কন্নরের জোড়া ফুলশিশু। দয়ালু মানুষটিকে সাহায্য করার জন্য ছুটছে। হায়! মৃত্যু ছাড়া ওখানে কেউ ওপেক্ষা করে নেই।

মেঠো বাইনাকুলারে কন্নর দেখে ফেলল দৃশ্যটা। সে চেঁচিয়ে উঠল,

–জার্মান বুলেটের সোর্স-লোকেশানটা এক্ষুনি বলো।

অনুগত যন্ত্রের চাকা ঘুরিয়ে তক্ষুনি জানিয়ে দিলাম, দূরত্ব, অবস্থান। শত্রুদের নাগালের মধ্যে পেতে হলে অন্তত কুড়ি ফুট কন্নরকে নেমে যেতে হবে। বলার আগেই পাহাড়ের ঢালে গড়িয়ে গেল কন্নর। যে কোনও মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে ওর শরীর। এত কম সময়ে আর কোনও নিরাপদ উপায় ছিল না। অসম্ভব সাহসী, নিঁখুত বন্দুকবাজ কন্নরকে দেখলাম। রেঞ্জে লক্ষ্য রেখে শত্রুর চারপাশে, উত্তরে, দক্ষিণে, উপরে, নীচে একাই গুলিবৃষ্টি চালিয়ে দিল। সে ছিল সাংঘাতিক, নৃশংস, মারাত্মক বন্দুকবাজ। শত্রুপক্ষের গুলি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু ঝুঁকে পড়া কোঁকড়া চুলদাড়ির সেই দয়ালু মানুষটি গাছের নীচে ঝুঁকেই রইলেন। উঠলেন না। তিনি মারা গেছেন। জঙ্গলে লাফিয়ে পড়েছে কন্নর। কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখলাম পৌঁছে গেছে শিশুদুটির কাছে। দু’জনকে বুকে আগলে মাঠ পেরিয়ে ঢুকে গেল পাহাড়ে নিরাপদ শিশুদের আশ্রয়ে। আর ফিরে আসেনি।

মানুষের শান্তি কামনায় মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন খ্রিস্ট। সেই মৃত্যুকে খুঁজে পেলেন, ঝুঁকে পড়া দয়ালু মানুষটি। আশ্চর্য! আমাদের পল্টনে মৃত মানুষের খাতায় কন্নরের নাম কেন লেখা হয়েছিল, জানি না!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...