মধুরিমা

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

ওই রকম মিষ্টি মেয়ের এই রকম পরিণতি হবে কেউ কল্পনা করেছিল?

সবাই বলেছিল এরকম একটা আনফরচুনেট ঘটনা, এত অল্প বয়সে, বেশি আয়োজন করবেন না। এখন কমবেশির সংজ্ঞা লোক ভেদে ভিন্ন। কারও কাছে কম বলতে সাদা বাক্সে ন্যাতা রাধাবল্লভী, শুকনো আলু, দানাদার। কারও কাছে ক্যাটারার ডেকে আত্মীয়, পরিচিত, অল্প পরিচিত, পুরনো বন্ধু, নতুন আলাপী, স্কুলকলেজের বন্ধু, অফিসের কলিগদের নিয়ে সবুজ লনে ঢালাও বুফে।

মধু যা যা খেতে ভালোবাসত, মধুর কাছের মানুষেরা সেগুলো খাচ্ছে জানলে মধুর আত্মা… গলা বুজে আসতে পারে বুঝেই সম্ভবত থেমে গেলেন মিসেস চৌধুরী। গ্রামগঞ্জের দিকে কেউ মারা গেলে এখনও চিৎকার করে কান্না দস্তুর। যে যত জোরে চেঁচায়, প্রমাণ হয় মৃত ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা তার তত বেশি। এ সব বাড়িতে তেমন হয় না। আলাদা ট্রেনিং।

কাজেই আমরা খেলাম। মাছের ডিমের বড়া, তোপসে ফ্রাই, কিসমিস দেওয়া ঝরঝরে বাসন্তী পোলাও, ঝুরি আলুভাজা, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল, মাখা মাখা এঁচোড়, আলু দিয়ে পাঁঠার মাংসের ঘরোয়া ঝোল। শেষপাতে লেডিকেনি আর শহরের প্রাচীন অভিজাত ক্যাটারারের সিগনেচার গরম সন্দেশ। মধুর বিয়েতেও খেয়েছিলাম। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা উপলক্ষে খাওয়া একই খাবার, খেতেও একই রকম চমৎকার। খালি উপলক্ষ আলাদা বলে প্রতিক্রিয়াটা এক দেখানো যাচ্ছে না। উমদা, কেয়া বাত, বাঙালিরা আর কিছু না পারুক মিষ্টিটা পারে বলে টেবিল চাপড়ে ওঠা যাচ্ছে না। গম্ভীর মুখে চিবোলাম, যদিও জিভের ওপর অবিকল সেই চেনা অরগ্যাজম।

তবে সবাই এত সেনসিটিভ হয় না। অল্পবয়সী একজোড়া ছেলে আর মেয়ে। স্বামীস্ত্রী। চোখে পড়েছিল গোড়া থেকেই। সবুজ লন আর দুধসাদা টেবিলক্লথ আর দামি পোশাকআশাকের মধ্যে বেমানান। আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আড়ালে। এ সব পরিবারের একটাদুটো ছেঁড়াখোঁড়া, অভাগা শেকড়বাকড় ছড়িয়ে থাকে এদিকওদিক। তাদেরই প্রতিনিধি।

খেতে খেতে মেয়েটা ছেলেটাকে ফিসফিস করল, এই লেডিকেনিগুলো ক’টাকা পিসের হবে বল দেখি? পনেরো?

ছেলেটা বলল, পাগল? মিনিমাম পঁচিশ।

শৈবাল খুব দৌড়োদৌড়ি করছিল। কাজের বাড়িতে যতই ম্যানেজ করার লোক থাকুক না কেন, বাড়ির লোককে একটু ঝক্কি সামলাতে হয়ই। আর এ বাড়িতে এখন ঝক্কি সামলানোর লোক বলতে শৈবাল ছাড়া আর কেউ নেই।

তখনও খাওয়াদাওয়া শুরু হয়নি। আমরা বসে ছিলাম বাড়ির ভেতর। প্রশস্ত হলে চেয়ারটেবিল সামান্য পিছিয়ে দিয়ে, মার্বেল মেঝেতে পার্সিয়ান ফরাস বেছানো। কার্পেটের প্রান্তে কাশ্মিরি কাজ করা কাঠের টেবিলের ওপর মধুর ছবি। এত জ্যান্ত যে চোখে চোখ রাখা যায় না। ধূপের ধোঁয়ার ওপারে সেই অনাবিল, অকপট, মিষ্টি হাসি। এই পৃথিবীতে যে কোনও খারাপ জিনিস, ঈর্ষা, দ্বেষ, কাড়াকাড়ি, মিথ্যে, থাকতে পারে যেন মধুর জানা ছিল না। এ সবের ছোঁয়াচ পাওয়ার আগেই যেন চলে গেল মধু। মধুরিমা।

মিস্টার চৌধুরী, মধুরিমা চৌধুরীর বাবা, শোকবিজড়িত মৃদু কণ্ঠে বলছিলেন, শৈবাল ইজ আ জেম অফ আ বয়। এত কম সময়ে আমাদের নিজের লোক হয়ে গেছে। আর কী, ওই এক মেয়ে ছিল, আর তো কেউ নেই। এর পর তো জামাই-ই দেখবে সব।

সব বলতে সাদার্ন অ্যাভিনিউর একটা বাড়ি, বালিগঞ্জ পার্কের দুটো বাড়ি যার একটা প্রোমোটারকে দেওয়ার পর গোটা দোতলার ফ্ল্যাট, শান্তিনিকেতনে ‘পলাতকা’ নামের দোল আর পৌষমেলা রিট্রিট, বংশপরম্পরার বনেদি এবং চালু রেস্টোর‍্যান্টের ব্যবসা।

শৈবালের জায়গায় আমরা হলে আমরাও শ্বশুরশাশুড়িকে নিজের বাবামায়ের মতো দেখাশোনা করতাম। যে কেউ হলেই করত।

আপসে চোখ মধুর ছবির দিকে চলে গেল। আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, মিষ্টি হেসে। চোখ নামিয়ে নিলাম। ওর মতো একটা মিষ্টি মেয়ের শ্রাদ্ধে এসে এই রকম বিষতেতো ভাবনা যে আমাদের মাথায় এসেছে, আসতে পারে, ভেবেই শিহরিত হলাম।

শৈবালের সঙ্গে মধুরিমার আলাপ কীভাবে হয়েছিল আমরা জানি না। হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপে প্রথম কে একটা খবর দিয়েছিল, জোরাজুরিতে মধু স্বীকার করেছিল। হ্যাঁ, সব পাকা। অল্পস্বল্প ঝোলাঝুলি করতে ছবিও আপলোড করেছিল। সিনেমাহলে পপকর্ন আর কোক হাতে নিয়ে হাসছে দুজন। আলাপ কোথায় হল টল অত খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ হয়নি, তবে প্রেম নয় বলেই আমাদের ধারণা। চৌধুরীদের চেনাশোনার মধ্যে। পেডিগ্রি, ডিগ্রি, চেহারা সবই ভালো, কাজেই।

ভালো করে খাচ্ছ তো? তোপসে ফ্রাইটা নাও। শৈবালের ফর্সা নাকের ডগায় ঘামের বিন্দু। আজ বাতাসে আর্দ্রতা পঁচাত্তর শতাংশ।

আমরা মুখ বেদনার্ত করলাম। খাওয়ার অকেশন তো নয় ভাই। খাওয়া তো বাধ্য হয়ে…

ওর ফেভারিট ছিল। রওনা দেওয়ার আগের দিনই বাজার থেকে আনিয়েছিলাম। খাবে না খাবে না করছিল, শরীর নাকি ভালো নেই। জোর করে খাইয়েছিলাম দুটো।

মধুর শরীর কোনওদিনই ভালো থাকত না। রোদ উঠল দু’দিন তেড়ে, মধু অ্যাবসেন্ট। বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন হিট স্ট্রোক। মেঘ করতে না করতে মধু নেই। ফোন তুলে হ্যালোর বদলে হ্যাঁচ্চো।

আমরা দুয়ো দিতাম। তুই কী রে।

মধু মিষ্টি হাসত। আমার আসলে ভীষণ অ্যালার্জি রে।

মধুর রোদে অ্যালার্জি, বৃষ্টিতে অ্যালার্জি, ফুচকায়, রোলে, রাস্তার চায়ে; বেসিক্যালি যে সব খাবার হাসপাতালের মতো জীবাণুবিহীন আবহাওয়ায় বানানো হয়নি, সবেতে অ্যালার্জি। ওইরকম তুলোমোড়া হয়ে থাকতে থাকতে ইমিউনিটি ধ্বংস হয়ে গেছে। বলত আমাদের মধ্যে কেউ কেউ। আড়ালে। সামনে নয়। মধুকে কড়া কথা বলার মতো কঠিন হৃদয় আমাদের কারও ছিল না।

শি ওয়াজ ভেরি ডেলিকেট। মধুদের বাড়ির ডাক্তারবাবু বলছিলেন।

মন্ত্রোচ্চারণ থেমেছে। ঠাকুরমশাই, ফাইন গরদের ধুতি সামলে উঠে শান্তিজল ছেটাচ্ছেন। আমরা মাথা নিচু করলাম।

আমাদের মেয়ে মানুষ ছিল না, মানুষের বেশে পরী ছিল। শান্তিজলের ফোঁটা চুলে ঘষে নিতে নিতে মিসেস চৌধুরী বলে উঠলেন। কোনওদিনও কাঁদেনি। এমনকি জন্মের পরের মুহূর্তেও হেসেছিল। ডাক্তাররা পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

মিসেস চৌধুরী ডাক্তারবাবুর দিকে তাকালেন।

এক্সট্রাঅর্ডিনারি। এক্সেপশনালি সুইট। বললেন ডাক্তারবাবু।

কিন্তু পৃথিবীতে সুইট লোকেদের সঙ্গে শুধু যে সুইট লোকেদেরই মোলাকাত হবে তেমন কোনও গ্যারান্টি নেই। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে মধুরিমা প্রেমে পড়ল উদয়ের। উদয় সোমানি, সোমানি বাথরুম ফিটিংস-এর অধিপতি গণেশ সোমানির সাত মেয়ের পর এক ছেলে। গণেশ সোমানি বাগরি মার্কেটে দোকানে দোকানে মাল সাপ্লাই দেওয়া থেকে ধর্মতলায় পনেরোশো স্কোয়্যার মিটারের শোরুম ফেঁদেছিলেন। পুরুষকারের পুরস্কার হিসেবে, কালো বেঁটে মোটা গজপতির কপালে জুটেছিল গ্রামের পড়তি জমিদারের মেয়ে শোভনা। সাতটি মেয়ে পেয়েছিল বাপের চেহারা, উদয় পেয়েছিল মামাবাড়ির। টকটকে রং, কুচকুচে চুল, ঝকঝকে দাঁত। ছ’ফুট শরীর যৌবনের কৃপায় মেদহীন। অনেকেই ওর প্রেমে পড়েছিল, মধুরিমাও। উদয় বাকি অনেকের দিকেই না তাকালেও মধুরিমার দিকে তাকিয়েছিল। মধুরিমার ফর্সা গাল বেদানার মতো লাল হয়েছিল, মনে আছে।

বেশিদিন টিকল না। টেকার কথাও ছিল না। উদয় ভালো খেলোয়াড় ছিল। যেমন মাঠে, তেমনি কলেজে, তেমনি জীবনে। মধুরিমা সুইট হলেও ছিল একমাত্রিক। উদয় আড়ালে আবডালে বলতও। মাতৃভাষা নয় বলেই বোধহয় উদয়ের বাংলা বলতে লজ্জা ছিল না, ঝরঝরিয়ে বলত। বলত, অত মিষ্টি একটানা খেলে দাঁতে পোকা হয়ে যাবে। বলে অকপট, নিলাজ হাসি হাসত। কাজেই মিষ্টির পাশাপাশি ঝাল টক উমামিরও ব্যবস্থা ছিল উদয়ের। উদয়ের একটা গুণ ছিল, সাহস ছিল প্রচুর। আর আত্মবিশ্বাস। যা করত বুক ফুলিয়ে। ছ্যাঁচড়ামো, ছিঁচকেপনার ছিটেফোঁটা ছিল না। আমরা পড়েছিলাম মহা সঙ্কটে। উদয়ের উড়োউড়ি সম্পর্কে মধুরিমাকে সাবধান না করতেও বাধত কারণ ও আঘাত পাবে, কিন্তু উদয়ের প্রতি ওর আস্থার কাঁচের দেওয়াল ভেঙে দিতেও আমাদের বুক কাঁপত।

কিন্তু যা ভাঙার তা তো ভাঙেই।

একদিন পার্ক স্ট্রিটের দামি রেস্টোর‍্যান্টের দরজায় শহরের উঠতি মডেলকে উদয়ের গাড়ি থেকে উদয়ের কণ্ঠলগ্না হয়ে নামতে দেখে আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।

মধুকে গিয়ে বললাম। আমরা একে একে বললাম কী জানি, কী শুনেছি, কী দেখেছি। বললাম, কত ভেবে আমরা অবশেষে মধুকে সত্যিটা জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মধু তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে, কথা বলল না। আমরা ওকে ঘিরে রইলাম। এত প্রতারণাতেও কি মধুর মাধুর্যের বাঁধ ভাঙবে না?

ভাঙল না। আমাদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর চোখের কোলে জমতে শুরু হওয়া আধফোঁটা জল মুছে ফেলে হেসে বলল, ও যাতে সুখী হয় তাতেই আমার সুখ।

আমরাও মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চৌধুরীর মতো একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম, মধু স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক মানুষ এত মিষ্টি হতে পারে না।

ওর সহকর্মীদের মুখেও একই কথা। অফিসে কত কূটনীতি, কত চোরাগোপ্তা ছুরি মারামারি, মধুরিমা সবের ঊর্ধ্বে। সহকর্মীরা যাঁকে এই সমস্ত গেরোর গোড়া বলে আমাদের কানে কানে নিন্দে করে গেল সেই মধুরিমার বস চকচকে টাক নেড়ে আক্ষেপ করলেন, হোয়াট আ ট্র্যাজেডি। আই হ্যাভ নেভার কাম অ্যাক্রস আ পার্সন সুইটার দ্যান ইয়োর ডটার, মিস্টার চৌধুরী।

ক্রমে দিন ঢলে এল। ভিড় পাতলা হল। ক্যাটারারের ছেলেগুলো সারাদিন মুখ যথোপযুক্ত গম্ভীর করে রাখার পর জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে হাসাহাসি করছিল। কেউ কাঁচা গালি দিল কাউকে। শোক এবং সারাদিনের অতিথি আপ্যায়নের ধকলে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চৌধুরী কাহিল হয়ে পড়েছিলেন, শৈবাল ধরে ধরে বাংলোর ওঁদের অংশে পৌঁছে দিয়ে এল।

আমরাও বেরোব বেরোব করছিলাম। শৈবালকে সারাদিন দেখে আমাদের ভালো লেগেছিল। জেনুইন ছেলেটা। কেউ কেউ সাহসী হয়ে ওর কাঁধ ছুঁলাম। তোমাকে এখন শক্ত থাকতে হবে। নিজের জন্য না হলেও শ্বশুরশাশুড়ির মুখ চেয়ে।

শৈবাল বলল, এক্ষুনি যাবে? একটু বসে যাও। বলে লনের এইদিকে মধুরিমা আর ওর অংশের বাংলোর দিকে দেখাল। আমরা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। দোতলার রেলিং ঢাকা ঝুল বারান্দায় আবছা চাঁদের আলো।

বোতল, গ্লাস সব শৈবালই নিয়ে এল। আমরা মানা করলাম না। চৌধুরী পরিবারের শোক সামলাতে সামলাতে বেচারা নিজের ঘা শুকোনোর সময় পায়নি। সব চুকেবুকে যাওয়ার পর ওকে একটু রিল্যাক্স করায় সঙ্গ দেওয়াটা আমাদের কর্তব্য। মধুরিমাও নিশ্চয় এটাই চাইত।

আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম সবাই। পা তুলে দিলাম কফি টেবিলে। ছাতিমগাছের ঝিম ধরা গন্ধ চারদিকে। একটা রাতপাখি টুঁইইই ডেকে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে।

অল্প নেশা হয়েছে আমাদের সবারই। লৌকিক সহবতগুলোর সীমা অল্প অল্প মুছে মুছে যেতে শুরু করেছে।

আমরা বললাম, ঠিক কী হয়েছিল বলো তো? কী করে হল এ সব?

হেয়ারপিন বাঁক ঘুরতে গিয়ে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারায়। ড্রাইভার আর শৈবাল এদিকের দরজা খুলে লাফিয়ে নামে রাস্তায়, ওদিকে বসে থাকা মধুরিমা সহ গাড়ি খাদের অতলে। দাউ দাউ আগুন। পুলিশ যতক্ষণে গেছে, যতক্ষণে আগুন নিভেছে, যতক্ষণে লোক নেমেছে, ততক্ষণে জ্বলাপোড়া লোহা আর আইডেন্টিফিকেশনের অতীত একটা লাশ, ব্যস।

নিটোল গল্পের নিখুঁত শেষ।

শৈবাল সিগারেট ধরাল। নীল আগুনের শিখায় কয়েক মুহূর্তের জন্য চকচক করে উঠল শৈবালের চোখ। ঘন ধোঁয়া। দামি তামাকের কড়া গন্ধ।

ব্যাপারটা যেরকম রাষ্ট্র করা হয়েছে, আমিই করেছি রাদার, আসলে সেরকম ঘটেনি।

আমরা দম বন্ধ করলাম। শুনে ইস্তক যেটা সন্দেহ করছি, সেটা এত সহজে শৈবাল স্বীকার করে নেবে? করলেই বা কী করব। মধুরিমার বাবামা মেনে নিয়েছেন তো বোঝাই যাচ্ছে, ওঁদের যা প্রতিপত্তি আমরা হুলাবিলা তুললে চাপা দিতে ওঁদের এক ঘণ্টার বেশি লাগবে না।

সত্যি বলতে কি, আমরা হুলাবিলা তুলতেও চাই না। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। মধুরিমা চৌধুরী এই ক্লেদাক্ত পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। গিয়ে বেঁচেছে। শুধু যদি কেউ তাকে চলে যেতে বাধ্য করে থাকে, তার মুখ থেকে একটিবারের স্বীকারোক্তি, ব্যস।

শৈবাল বলল, বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানটা হয়েছিল বহুদিন আগে। বাবামা চিন্তায় ছিলেন। মধুরিমার ঠান্ডা লেগে যাবে। পাহাড়ে চড়তে গিয়ে পা মচকে যাবে। যে রকম চিন্তা ওঁদের থাকেই। এই চিন্তার মুখ চেয়ে বিয়ের পর থেকে আমাদের কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। আমিই জোর করেছিলাম। বলেছিলাম, আমি তো আছি।

শৈবালের গলায় আফসোস। যদি বাবামায়ের কথা শুনতাম।

চাঁদ মেঘে ঢেকে গেছে। এখন বারান্দায় শুধু সিগারেটের লাল বিন্দু।

সেদিন বৃষ্টির কোনও ফোরকাস্ট ছিল না। আমি জানি, আমি খুঁটিয়ে দেখেছিলাম। রোদের তাপ কত থাকবে, মধু ঝলসে যাবে কি না, হিউমিডিটি কত, মধু ঘামবে কি না, বাতাসের গতিবেগ কত, মধু উড়ে যাবে কি না। গত দু’বছর ধরে দেখে দেখে আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

কিন্তু এখনও এ পৃথিবীতে ফোরকাস্টের বাইরে কিছু ঘটনা ঘটে। সেদিনও ঘটেছিল। বেরোনোর আগে শেষবারের মতো ওয়েদার অ্যাপ দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ছাতা না নেওয়ার। বেশি দূরও তো যাব না। গাড়ি আসবে আধঘণ্টা বাদে, সাইট সিয়িং-এ বেরোব। এদিকে স্নান ব্রেকফাস্ট সারা। একটুখানি হেঁটে হোটেলের আশপাশটা এক্সপ্লোর করব, ব্যস।

জায়গাটার নাম এখনও বেশি লোকে জানে না, তার ওপর অফ সিজন। পাহাড়ি ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা চলে গেছি। বার বার জিজ্ঞাসা করছি, মধু কষ্ট হচ্ছে না তো? মধু দমে টান পড়ছে না তো? মধু বলছে, না না না, ভীষণ ভালো লাগছে। আমরা আরও ঘন ঘন বেড়াতে আসি না কেন?

একটা বাঁকের মুখে এসে দম নেওয়ার জন্য দাঁড়ালাম। সকালের সূর্যের রোদ উপত্যকার ওই পারের পাহাড়ের গায়ের জঙ্গলের ওপর বাঁকা হয়ে নেমেছে, আহ্‌। নতুন লেন্সওয়ালা ক্যামেরাটা নিয়ে আলোর একটা পার্টিকুলার অ্যাঙ্গেল ধরার চেষ্টা করছি, কত সময় কেটেছে খেয়ালও নেই, হার্ডলি দশ মিনিট, এমন সময় গুড় গুড় গুড়।

চমকে চোখ থেকে ক্যামেরা সরালাম। বিশ্বাস করবে না, মিনিটের মধ্যে আকাশ কালো হয়ে গেল। শোঁ শোঁ হাওয়া। পাতা উড়ছে। টেম্পারেচার নামছে হুড়মুড় করে। আমি ডাকছি, মধু! মধু! আশেপাশে মধু কোত্থাও নেই। তারপর চোখে পড়ল। আমার থেকে প্রায় তিনশো মিটার দূরে একটা লাল রঙের পোঁচ। মধুর শাল।

আমি যখন ছবি তুলছিলাম, মধু এগিয়ে গেছে। দৌড়তে শুরু করলাম ওর দিকে। মাথায় একফোঁটা বৃষ্টি পড়ল। স্পিড বাড়ালাম। চিৎকার করে বললাম, মধু ভয় নেই, আমি আসছি। আমার জ্যাকেটটা দিয়ে তোমাকে ঢেকে দেব। আমি তোমার কোনও ক্ষতি হতে দেব না মধু।

আকাশ চিরে বন্যার মতো জল নেমে এল।

তারপর?

শৈবালের গলা ধরা। ততক্ষণে দূরত্ব অনেকটা কমে এসেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি মধুর মাথার চুল বেয়ে, হাতের আঙুল বেয়ে জলের ফোঁটা। আর… আর… মধু ছোট হয়ে যাচ্ছে।

মানে?

মধু অল্প অল্প করে গলে গেল জলের তোড়ে। শৈবাল আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আবছা অন্ধকারে ওর চোখের মণি জ্বলছে।

মধুর বিস্ফারিত চোখ… আমার দিকে বাড়ানো হাত, সব জাস্ট গলে গেল আমার চোখের সামনে। আমি মধুকে জাপটে ধরতে যাব, মধুর ভেজা জামাকাপড় স্তূপীকৃত হয়ে পড়ল আমার পায়ের কাছে।

গোটা বডি, থুড়ি গোটা মধু হাওয়া?

না হাওয়া নয় তো।

হাওয়া নয়? তবে কী?

শৈবাল বলল, যে পাথরের ওপর মধু যেখানে দাঁড়িয়েছিল, জল জমেছিল। আমি আঁজলা করে সে জল তুলে নিয়ে এসেছি। দাঁড়াও।

উঠে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে একটা শিশি এনে শৈবাল রাখল আমাদের সামনে। ঢাকনা খুলে ধরল আমাদের সামনে। ভালো দেখা যাচ্ছে না, শিশির ভেতর অল্প খানিকটা তরল টের পাচ্ছি।

আমাদের কাঁপা কাঁপা হাতের পাতায় ফোঁটা ফোঁটা করে সে তরল ঢেলে দিল শৈবাল। আমরা সন্তর্পণে জিভ ছোঁয়ালাম।

নির্ভেজাল, খাঁটি মধু।

 

ঋণ: আইজ্যাক আসিমভের ‘রেইন রেইন গো অ্যাওয়ে’।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1856 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. লেখকের যোগমায়া হালদার অন্তর্ধান রহস্য পড়েছিলাম, তারপরে মধুরিমা। বিদেশী গল্পসূত্রের ঋণ স্বীকার করে নিয়ে এবারেও স্বতন্ত্র একটি নির্মাণ- স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ঊজ্জ্বল গল্প-নিজস্ব মহিমা এবং মায়াসমেত।

আপনার মতামত...