বিশিষ্ট নয়, সাধারণ হয়েই থাকতে চাইতেন এভারেস্ট লোকগাথার প্রথম নায়ক

অরণি বন্দ্যোপাধ্যায়

 

এভারেস্ট শিখরে জয়পতাকা উড়িয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসছে জন হান্টের দল। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে বেলা সাড়ে এগারোটায় তাঁরা যে একটা বড়সড় কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা বুঝছেন হিলারি ও তেনজিং। কিন্তু তাঁদের এই কীর্তি যে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনার সৃষ্টি করবে তা ব্রিটিশ এই অভিযাত্রী দলের কেউই আঁচ করতে পারেননি। মোবাইল, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ তখন কল্পবস্তু। নামচেবাজারে সেনাবাহিনীর একটা ছোট্ট রেডিও পোস্ট ছিল। অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পে হাজির ‘টাইমস’-এর তুখোড় সাংবাদিক কিন্তু বুঝেছিলেন এই খবরের গুরুত্ব। তিনি চাইছিলেন যে করে হোক পয়লা জুনের মধ্যে লন্ডনে তাঁদের অফিসে খবরটা পাঠাতে। কারণ ২ জুন রানির ‘করোনেশন’ (রাজ্যাভিষেক)।

দুই পোড়খাওয়া শেরপার সহায়তায় মরিস আইসফলের রাজত্ব পেরিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নেমে আসেন নামচে উপত্যকায়। তারপর বিচিত্র এক সঙ্কেতবার্তায় (snow condition bad stop advanced base abandoned yesterday stop awaiting improvement) মেল রানারের মাধ্যমে এই খবর পৌঁছে যায় কাঠমান্ডুর ব্রিটিশ দূতাবাসে। নামচে বাজারে সেনাবাহিনীর অ্যাওয়ারনেস ট্রান্সমিটারে কাঠমান্ডুতে পাঠানো এই টেলিগ্রাফে এমন সাঙ্কেতিক ভাষা ব্যবহারের কারণ, ‘স্কুপ’ না ফাঁস হয়ে যায়।

যাই হোক, অভিযাত্রী দল তো হেঁটে ফিরছে। নেতা জন হান্ট এগিয়ে গেলেন, কারণ দেশে ফেরার আগে কাঠমান্ডুতে অনেক খুচরো কাজ সারতে হবে। বাকিদের বলে গেলেন, তেমন জরুরি কোনও খবর থাকলে মেল রানারের হাতে পাঠিয়ে দেবেন। হিলারির পাশাপাশি হাঁটছেন জর্জ লো। দুধকোশী নদী পেরিয়ে জুনবেশির দিকে। কাঠমান্ডু তখনও দিন তিনেকের রাস্তা। এমন সময় উল্টো দিক থেকে এক রানার এসে জর্জের হাতে একটা ব্যাগ  তুলে দিল। ব্যাগে নানা কাগজপত্রের সঙ্গে মুখবন্ধ খামে হিলারির একটা চিঠি। জর্জ মুচকি হেসে খামটা হিলারির হাতে তুলে দিলেন। হিলারি দেখেন, খামের উপরে লেখা ‘Sir Edmund Hillary, KBE’। হিলারি বিমূঢ়। ধরে নিলেন গোটা ব্যাপারটাই ঠাট্টা। কিন্তু চিঠি খুলে দেখা গেল, জন হান্ট লিখেছেন, ব্রিটেনের রানি হিলারির অনন্য কীর্তির জন্য তাঁকে নাইট উপাধিতে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ঘটনায় হিলারির প্রতিক্রিয়া? বন্ধু জর্জকে করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘এ তো আচ্ছা বিপদে পড়লাম। আমার জামা-প্যান্ট যা আছে দাগ ধরা পুরনো। নাইটহুড নিতে গেলে তো নতুন কোট-প্যান্টের ব্যবস্থা করতে হবে। কী মুশকিল।’ বন্ধুর প্রতিক্রিয়ায় জর্জ হেসেই খুন। তাঁর হাসি আর থামে না।

শৈশবে আমাদের পড়ানো হত, ‘বড় যদি হতে চাও ছোট হও তবে’। এই নীতিবাক্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বোধহয় স্যার এডমন্ড হিলারি। তাঁর আত্মকথার নাম ‘ভিউ ফ্রম দ্য সামিট’। তেনজিং নোরগের সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষবিন্ধু স্পর্শের ইতিহাস গড়েছেন তিনি, কিন্তু ভোলেননি মাটির পৃথিবী ও মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষদের। সারা বিশ্ব তাঁকে চেনে ‘প্রথম এভারেস্টজয়ী’ হিসাবে। কিন্তু ঘটনা হল, পরবর্তী জীবনে তিনি এই তকমা ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছেন আন্তরিকভাবে। নাইট উপাধি জীবনে একবারের জন্যও ব্যবহার করেননি। বরং তেনজিংকে ‘নাইটহুড’ না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বারবার। তিনি সবসময় চেয়েছেন ‘বিশিষ্ট’ নয়, ‘সাধারণ’ হয়ে থাকতে। এভারেস্ট জয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে রানির অনুষ্ঠান এড়িয়ে নেপালে এসে আড্ডা দিয়েছেন পুরনো পাহাড়ি বন্ধুদের সঙ্গে। নিজেকে জয়ী নয়, এক মাটির মানুষ হিসেবে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন। হিলারি আত্মজীবনীতে একাধিকবার জানিয়েছেন, তাঁর আসল ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় হিমালয়ের গিরিজনের সেবক হিসেবে। অকপটে বলেছেন, ‘আমি জ্ঞানীগুণী বিদ্বান কিছুই নই। চেষ্টা ছিল, স্বপ্নও দেখতাম পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গজয়ের, কিন্তু আমি খুবই সাধারণ। আমার আগে কেউ উঠতে পারেনি বলে এবং ভাগ্যদেবীর কৃপাতেই মিডিয়ার চোখে আমি এভারেস্টের হিরো।’

২০ জুলাই এই মানুষটির শতবর্ষ পালিত হল বিশ্ব জুড়ে। কিন্তু দুঃখের কথা, ভারত, তথা বাংলার সঙ্গে হিলারির বিশেষ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সংবাদমাধ্যম কার্যত তাঁকে ভুলেই থাকল। কলকাতায় অজস্রবার এসেছেন, ভানু ব্যানার্জি, ডেসমন্ড ডয়েগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাঁর, সাগর থেকে আকাশ অভিযানের সময় গঙ্গার দুই তীরে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে থাকত অজস্র মানুষ, ‘ভিউ ফ্রম দ্য সামিট’-এ আছে বারাণসী ও নবদ্বীপের কথা, আশির দশকে দিল্লিতে কয়েকবছর ছিলেন নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হিসেবে। কিন্তু কোটরবন্দি কূটনীতিক হয়ে থাকেননি, প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে দৌড়েছেন সাহারানপুরের আম উৎসবে, আম ও কলা ছিল তাঁর প্রিয় ফল। বড়দিনে নিজের বাংলোয় যে উৎসব পালন করতেন গণ্যমান্য অতিথিদের সঙ্গে সেখানে হাজির থাকত তাঁর প্রিয় মালি, ঝাড়ুদারদের ছেলেমেয়েরাও, প্রাণভরে খাওয়াতেন তাঁদের, কোলে তুলে নিয়ে আদর করতেন। তেনজিংয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে উত্তাল দার্জিলিঙে চলে গিয়েছিলেন প্রশাসনের সকল সতর্কবাণী অগ্রাহ্য করে। ১৯৮৬-র মে মাসে তেনজিংয়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় অঝোরে বৃষ্টি হয়েছিল। তার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সাড়ে ছ ফুটেরও বেশি উচ্চতার এক মানুষের অশ্রুও। জন্মশতবর্ষের ক্ষণে এমন মানুষকেও ভুলে থাকলাম আমরা! এই বিস্মরণ কি তাঁর প্রাপ্য?

 

হিলারি এবং তেনজিং

জীবন-সায়াহ্নে এক সাক্ষাৎকারে হিলারি বলেছিলেন, সাফল্য-ব্যর্থতা, হর্ষ-বিষাদ জীবনে থাকবেই। তবু এরই মধ্যে স্থির করে নিতে হবে জীবনের লক্ষ্যপথটিকে। আর এ কাজে সামিল করতে হবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের। আর এ জন্যই দরকার স্বপ্ন দেখা। তবে সে স্বপ্নকে সাকার করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে সর্বক্ষণ। খেয়াল রাখতে হবে গোটা জীবনটাই আসলে লড়াই।

মনে রাখতে হবে, হিলারির এই উপলব্ধি তাঁর দীর্ঘ পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত। এই হিলারি পরিবর্তিত হিলারি। এভারেস্টজয় তরুণ বয়সী হিলারির মনে সেই মুহূর্তে অন্তত কোনও মহৎ আবেগের জন্ম দেয়নি। নিউজিল্যান্ডের এয়ার-ফোর্সের প্রাক্তন সেনানী হিলারির দেহ-মন জুড়ে তখন শীর্ষজয়ের অহঙ্কার। সঙ্গী তেনজিং যখন চকোলেট দিয়ে সাগরমাতা (এভারেস্ট) শীর্ষে পূজার্চনায় ব্যস্ত, হিলারি তখন দলনেতা জন হান্টের দেওয়া ছোট্ট ক্রুশটি পকেট থেকে বের করে বরফে পুঁতে দেন বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে। তারপরই নির্বিকারভাবে প্রস্রাব করেন এভারেস্টের শৃঙ্গে। নেমে আসার সময়ে বন্ধু জর্জ লো-কে শীর্ষজয়ের কথা জানান উদ্ধত রণজয়ী সেনার ভঙ্গিতে— ‘উই নকড দ্য বাস্টার্ড অফ।’ (এখানে উল্লেখ থাকা দরকার, হিলারির এই উদ্ধত বাক্‌ভঙ্গি মোটেই অনুমোদন করেননি তাঁর মা। অনেক পরে সে কথা নিজের আত্মজীবনীতে উল্লেখও করেছেন এডমন্ড)। কিন্তু এই হিলারি শুধুই এক তুখোড় পর্বতারোহী। পরবর্তী দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে গিরিজন-সেবা সহ বহু বৃহৎ কাণ্ডের নায়ক স্যার এডমন্ডের একটা খণ্ডাংশ মাত্র। নিছক এভারেস্ট-জয়ী পরিচয়ে হিলারিকে বেঁধে রাখা যায় না। অন্য পর্বতারোহীদের সঙ্গে এখানেই হিলারির পার্থক্য। তিনি শুধু পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরেই ওঠেননি, নিজেকে উন্নীত করেছিলেন মানবিক গুণের এমন এক অত্যুচ্চ স্তরে যা শুধু হিমালয়ের সঙ্গেই তুলনীয়।

নিজের সম্পর্কে হিলারি বলেছেন, ‘আই ওয়াজ এ গ্রেট ড্রিমার’। ঘটনা হল, স্বপ্ন দেখে সব মানুষই। জীবনের সাফল্যের, পূর্ণতার। কিন্তু গড়পড়তা মানুষের স্বপ্ন যায় হারিয়ে। সামান্য যে কজন সহজ পরীক্ষায় নিজেকে গড়েপিঠে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে, তারাই হয় নিজ জীবনের স্বপ্ন গড়ার কারিগর। হিলারি এমনই এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি শুধু সফল একজন পর্বতারোহীই নন, তিনি এক পূর্ণাঙ্গ মানুষ। আর তাঁর সমগ্র জীবনটাই তো স্বপ্ন গড়ার কাহিনী।

স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণাও অবশ্য সহ্য করতে হয়েছে হিলারিকে। জয়ের সঙ্গে পরাজয়, অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে মিসঅ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। হিলারির দীর্ঘ ৮৮ বছরের জীবনখাতার পরতে পরতে যেমন আছে জয়ের উল্লাস, জীবনের জয়গান, তেমনই তার সঙ্গে মিশে আছে পরাজয়ের গ্লানি, মৃত্যুর বিধুরতা। এভারেস্ট হিলারিকে দিয়েছে শীর্ষজয়ীর গৌরব, মাকালু পরাজয়ের গ্লানি। মাকালুতে প্রায় মরতে বসেছিলেন তিনি, যেমন অনেক পরে সত্তরের দশকে ‘সাগর থেকে আকাশ’ অভিযানে। ইয়েতির সন্ধান পর্বে এবং দক্ষিণ মেরুতে ট্রাক্টর নিয়ে অভিযানেও বিপত্তি কম ঘটেনি। যে মানুষ ২৯ হাজার ফুটের বাধা টপকেছেন, তিনি জীবনের শেষ কয়েক দশক ৮ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠতেই ভয় পেতেন পালমোনারি বা সেরিব্রাল ইডিমার। এভারেস্টজয়ীকেও মাথা নীচু করতে হয়েছে ভাগ্যের এই পরিহাসের কাছে। তবে স্মিতহাস্যে হিলারিই বলতে পারেন ‘নাথিং ভেঞ্চার, নাথিং উইন’।

 

শিশু এডমন্ড

তিলে তিলে শৈশব থেকে নিজেকে কেমন করে গড়ে তুলেছেন হিলারি তা জানতে পড়তেই হবে হিলারির আত্মকথা। ‘ভিউ ফ্রম দ্য সামিট’ গ্রন্থে বালক হিলারির কথা মনে করাবেই ‘পথের পাঁচালী’র অপুকে। মৌমাছিপালক এক সাধারণ পরিবারের ছেলে হিসেবে হিলারির জীবন শুরু। অকল্যান্ড থেকে চল্লিশ মেইল দূরে ছোট্ট জনপদ টুয়াকাউ। অপুর মতোই খালি পায়ে হেঁটে বালক হিলারি স্কুলে যেতেন। অপুর মতোই যার স্বভাব স্বপ্ন দেখা ও হাতে একটা ছড়ি নিয়ে ঘোরা। মুখচোরা ছেলেটি টিফিনের সময় চলে যেত স্কুলের পেছনে আর স্যান্ডউইচের গুঁড়ো খাওয়াত পিঁপড়ের দলকে। একদিন বিপদে ফেলে দিলেন ভূগোল স্যার। ডেকে বললেন, ‘ম্যাপে এশিয়াটা কোথায় দেখিয়ে দিয়ে যাও।’ এশিয়া? তাদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে হবে কোথাও, ভাবল ছেলেটি। কিন্তু কোথায় সে তো জানে না। স্যার খিঁচিয়ে উঠলেন, ‘হায়েনার মতো দাঁত বের করে থাকলেই হবে?’ গোটা ক্লাসে হট্টরোল। অপমানে বালক হিলারির কান লাল হয়ে উঠল।

এই ঘটনাটা একটা শিক্ষা। এই অপমান ও নিগ্রহ থেকে মুক্তি পেতে ছেলেটি পড়াশোনায় যেমন মন দিয়েছিল, তেমনই মন দিয়েছিল নিজেকে অন্যভাবে গড়ে তুলতেও। একটু বড় হতে মা ছেলেকে ভর্তি করালেন অকল্যান্ড গ্রামার স্কুলে। এই স্কুল বেশ কিছুটা দূরে। ট্রেনে করে যেতে হত। একা ট্রেনে চেপে স্কুলে যাওয়া থেকেই হিলারির স্বাধীন হওয়া শুরু। এরপর বাবার কঠোর শাসনের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে যোগদান সেনাবাহিনীতে। সলোমন আইল্যান্ডে কুমির শিকার এবং টুলাগিতে মার্কিন নৌঘাঁটি থেকে সমুদ্র অভিযান চালাতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া— এই পর্বে তাঁর অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তারই সাক্ষ্য। সেকেন্ড ডিগ্রি দগ্ধ হয়েও অ্যাডভেঞ্চারের নেশা হিলারিকে ছাড়েনি। তাই এই মানুষেরই বারবার অভিযান আল্পসে, হিমালয়ে, মেরুতে।

অপ্রিয় সত্য বলতে জুড়ি ছিল না হিলারির। বিগত কয়েক দশকে কমার্শিয়াল এক্সপিডিশিনের যে হিড়িক চলেছে হিলারি তার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন ফোরামে। ১৯৯৬ সালে রব হল ও স্কট ফিশারের নেতৃত্বে কমার্শিয়াল এক্সপিডিশনে যাওয়া একাধিক পর্বতারোহীর মৃত্যুর পর হিলারি বলেছিলেন, ‘প্রযুক্তির যতই উন্নতি হোক, সবার আগে দরকার পাহাড়কে মান্য করার শিক্ষা। ভুললে চলবে না, স্টিল মাউন্টেন হোল্ডস দ্য মাস্টার কার্ড।’ ২০০৩ সালে কাঠমান্ডুতে এভারেস্ট বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘অভিযানের নামে তো পাহাড়টাকেই বেচে দেওয়া হচ্ছে। এভারেস্টকে এই ভয়াবহ নিগ্রহ ও দূষণ থেকে বাঁচাতে নেপাল সরকারের উচিত বেশ কয়েক বছর আট হাজারি মিটার শৃঙ্গগুলিতে অভিযান বন্ধ রাখা।’ হিলারির এমন ঠোঁটকাটা মন্তব্যতে বেজায় অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল নেপাল সরকারের কর্তাব্যক্তিদের। কিন্তু হিলারি হিলারিই।

আপাতশান্ত মানুষটি বেজায় চটে যেতেন একটি প্রশ্নে। তা হল, এভারেস্টের চূড়ায় কে প্রথম পা রেখেছিলেন, তিনি না তেনজিং? হিলারির বাঁধা উত্তর ছিল, ‘প্রায় একসঙ্গে।’ তারপর বলতেন, ‘শুনে রাখুন, হিমালয়ে পদে পদে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শৃঙ্গ ছুঁতে হয়। সেই মৃত্যুহিম রাজত্বে এমন প্রশ্নটাই অর্থহীন। আর পাহাড়জয় বলে কিছু হয় না। ওটা মিডিয়ার শব্দ। পাহাড়ের শৃঙ্গটা নিজের অবস্থানেই থাকে। শৃঙ্গ স্পর্শ করতে পারলে যেটা হয় তা হল নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার। এ এক নতুন আত্মপরিচয় যা পাহাড়ের দাক্ষিণ্য ছাড়া অর্জন করা যায় না।’

জর্জ লো-র বদলে কেন তেনজিংকে বাছা হয়েছিল হিলারির সঙ্গী হিসেবে, সে প্রশ্নের জবাবেও কোনও রাখঢাক রাখেননি হিলারি। বলেছিলেন, নামেই এটা ব্রিটিশদের অভিযান। চূড়ায় যারা উঠল তারা কেউই খোদ ব্রিটিশ নয়। তবে জর্জ লো-কে নেওয়া হলে শীর্ষাভিযানে দু’জনেই হয়ে যেতেন নিউজিল্যান্ডের লোক। সেটা ভালো চোখে দেখতে পারেননি দলের অধিকাংশ ব্রিটিশ সদস্যই। সে জন্যই বাদ পড়েন জর্জ। তবে যোগ্যতায় তেনজিং যে কিছু কম ছিলেন না সেটা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে।

লুসি আর এডমন্ডের বিয়ের দিন। জর্জ লো টেলিগ্রামগুলি পড়ছেন

হিলারি চরিত্রের সব চেয়ে বড় বৈশিষ্ট তাঁর অকপট মনোভাব। প্রকৃত পাহাড়িয়াদেরই এটা থাকে, নকলনবিশদের নয়। তাই নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে কখনওই গোপন করেননি কিছু। তাই বালক বয়সে বাবার পকেট থেকে পয়সা (ক্রোনার) সরিয়ে গল্পের বই কেনা, সাহারানপুরে গিয়ে লোভীর মতো আম খাওয়া, তাঁর আগে কেউ এভারেস্ট শীর্ষে চলে যাচ্ছে এমন সম্ভাবনায় ঈর্ষা, বটল অক্সিজেন ব্যাগ ফেলে রেখে এসে হিমালয়ের পরিবেশ দূষিত করা, প্রেম করতে গিয়ে ক্যাবলামি, শেষে ভাবী বধূ লুসিকে ভাবী শাশুড়ির মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পেশ— কিছুই চেপে রাখেননি তিনি। পাহাড়ে ছোট বিমানে উঠতে বেজায় ভয় পেতেন হিলারির স্ত্রী লুসি। ভাগ্যের পরিহাস, নেপালে এমন এক দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয় লুসি ও তাঁদের ছোট মেয়ে বেলিন্ডার। এই ঘটনায় হিলারি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে এক সময় আত্মঘাতী হওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। এই ঘটনায় কোনওদিন ক্ষমা করতে পারেননি নিজেকে। লুসিকে ভোলেননি। কিন্তু তাঁর জীবনে এসেছেন যে দ্বিতীয় নারী, সেই জুনের প্রতিও কৃতজ্ঞ থেকেছেন। হিলারি অসঙ্কোচে স্বীকার করেছেন প্রৌঢ় বয়সে এই প্রাজ্ঞ প্রেম তাঁর জীবনে উন্মোচন করেছে এক নতুন দিগন্ত। জীবন হিলারিকে দিয়েছে অনেক, মৃত্যুও। কিন্তু সে তো অনেক সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। তাঁদের সঙ্গে হিলারির তফাৎ কোথায়? তফাৎ এই যে, ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যু, নিজে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া-সহ জাগতিক যাবতীয় আঘাত আরও ঋদ্ধ করেছে তাঁকে মানুষ হিসেবে। সুখ-দুঃখ-অপমানের অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই হিলারি স্থির করে নিয়েছেন তাঁর লক্ষ্যপথটিকে। তাঁর জীবনযুদ্ধ হয়ে উঠেছিল নেপালে দরিদ্র অনগ্রসর অঞ্চলের পাহাড়ি মানুষদের কল্যাণসাধন।

সলোমন দ্বীপপুঞ্জে। আট ফুটিয়া কুমিরের সঙ্গে

 

তিন সন্তান পিটার, সারা এবং সদ্যোজাত বেলিন্ডাকে নিয়ে সস্ত্রীক হিলারি

ইয়েতি সন্ধান অভিযানের সময় দিন শেষের আড্ডার একটি ছোট্ট ঘটনা এক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছিল। তোলাম বাউ হিমবাহের কাছে তাঁবু খাটানো হয়েছে। আগুন জ্বালিয়ে হাত পা সেঁকে নিচ্ছেন হিলারি ও তাঁর সঙ্গী শেরপারা। হিলারি এক সময় এক শেরপা সর্দার উরকেইনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই অভিযান তো শেষ হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই। তারপর? কী করবে তোমরা?’ হিলারির প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন উরকেইন। তারপর বললেন, ‘দ্যাখো সাহেব পাহাড়ে আমরা তোমাদের থেকেও বেশি তাকত রাখি। কিন্তু আমাদের সন্তানেরা চোখ থাকা সত্ত্বেও অন্ধ। তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এই খুমজুং গ্রামে ওদের জন্য যদি একটা স্কুল খোলা যেত সবথেকে ভালো হত।’ আত্মকথায় হিলারি লিখছেন, ‘For the first time there rose in my mind the determination to build a school for the sherpas. It would be the least I could do for my very good friends.’ (‘ভিউ ফ্রম দ্য সামিট’, পৃষ্ঠা ১৯৪)

এক্ষেত্রে যেটা বলা সেটা হল, অন্য ধনী ব্যক্তিদের মতো বদান্যদাতার ভূমিকা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি হিলারি, নেপালের গিরিজনদের যাবতীয় সুখ-দুঃখ-সংগ্রামে সামিল করেছেন নিজেকে। সমমনাদের পাশে নিয়ে গঠন করেছেন হিমালয়ান ট্রাস্ট। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন স্কুল, হাসপাতাল, এয়ার স্ট্রিপ। তাঁর কথায় এভারেস্টজয়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের মানুষ যদি তাঁকে মনে রাখে, তবে তা তাঁর এই কাজের জন্যই।

হিলারির গোটা জীবনটাই আজ ইতিহাস। যিনি জন্মসূত্রে হিমালয়ের সন্তান না হয়েও হিমালয়কে ভালোবেসে শুধু নিজেকেই উন্নত করেননি, অবিচল লক্ষ্যে কর্মের সঙ্গে প্রেমের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। হিলারি আর হিমালয় আজ সমার্থক।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...