এভাবেও ফিরে আসা যায়!

তিষ্য দাশগুপ্ত

 

মেয়েটা গ্রেটা থুনবার্গ-এর থেকে হয়তো সামান্য কয়েক বছর বড়ই হবে। অধুনা আলোঝলমলে লস এঞ্জেলস শহরের প্রাণকেন্দ্রে লা ব্রিয়া জলাশয়ের ধারে আজ থেকে বারো হাজার শীতবসন্ত পূর্বের কোনও এক বসন্ত প্রভাতে হয়ত আঁজলা ভরে জলপান করছে সে। না, আমাজনের বৃষ্টি বনানীর মাংসপোড়া ধোঁয়ায় বিষাক্ত হয়নি তার ফুসফুস দুখানি, রুগ্ন আর্ত মেরুভালুকের সঙ্গে ডাস্টবিনে ডাস্টবিনে খাবার খুঁজে ফিরতে হয় না তাকে, প্লাস্টিক ভর্তি সমুদ্রে মৃতপ্রায় হাম্পব্যাক হোয়েলের কান্না শোনার জন্য প্রস্তুত হয়নি তার কান, তবু এক হাড় হিম করা আতঙ্ক যেন পিছে পিছে ফেরে সর্বত্র। প্রকৃতি মা এই নীলিমায় নীল গ্রহে কোনও অভাবই রাখেননি, আছে পর্যাপ্ত খাবার, পশুর চামড়া থেকে তৈরি বস্ত্র নিবারণ করে তীব্র শীত, সদ্য শিখেছে সে চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালতে, উত্তাপ দেয় আগুন, সামান্য ঝলসে নিলে খাদ্য হয় সুপাচ্য ও সুস্বাদু। রোদ বৃষ্টি ঝড়ে নিরাপদ আশ্রয় দেয় ওই পাথরের গুহা— অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের কোনও অভাব রাখেননি তার ধরিত্রী মাতা, তবু কীসের শঙ্কা তার? প্রতিমুহূর্তে কাঁটা হয়ে থাকে কোন অজানা আতঙ্কে?

এতদিনে সে বুঝেছে সকল বিপদ এড়ানো যায় কিন্তু ওই হিংস্র শ্বাপদ, নিঃশব্দ যার পদচারণা, তার হাত থেকে নিস্তার পাবার উপায় নেই কোনও। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেই গোটা প্লিসটোসিন যুগ জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো সেবর টুথড ক্যাট, এবং আধুনিক বাঘের অতি বৃদ্ধ প্ৰপিতামহ স্মিলোডন— ছিল এক মূর্তিমান বিভীষিকা, মানুষের সঙ্গে যার সংগ্রাম নিরন্তর, কখনও এ জেতে আবার কখনও বা কৌশলী সুচতুর মানুষ আগুনে ঝলসে ভক্ষণ করে তার মাংস— এ শুম্ভ নিশুম্ভের লড়াইয়ে রক্ষিত হয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য। কিন্তু সেই ভীমকায় ব্যাঘ্রের উত্তরপুরুষেরা, যারা আজ থেকে মাত্র কয়েক শত বছর পূর্বেও পৃথিবীর অনেকাংশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াত আপন গরিমায় তারা আজ কোথায়? লা ব্রিয়া টার পিটের মারণ গহ্বরে শিকার ও শিকারি একসঙ্গে তলিয়ে যেতে যেতে যেন শুনতে পায় বারো হাজার বছর ভবিষ্যতের এক দেশ ভারতবর্ষ সগর্বে সদম্ভে ঘোষণা করছে— “গোটা পৃথিবীর প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ বাঘ আজ নিরাপদে নিশ্চিন্তে বসবাস করে এই দেশে, এই একশো চল্লিশ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতবর্ষে!”

                        

বাঘ বাহাদুর

এবার প্রশ্ন হচ্ছে ধান ভানতে কেন এত শিবের গীত গাওয়া, কিই বা প্রয়োজন বাঘের? তাদের বাঁচা মরা ইত্যাদি নিয়ে কেনই বা এত চিন্তিত আমরা! সুপ্রিয় পাঠক, আজ ইন্টারনেটের দৌলতে আমরা সবাই কম বেশি বিভিন্ন বিষয়ে প্রাজ্ঞ, তাই ইকোলজির কচকচানির মধ্যে না গিয়ে খুব সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলি একটি জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রে বাঘ হল আমব্রেলা স্পিসিস। অর্থাৎ, গোটা জঙ্গলকে প্রকারান্তরে ধরে রেখেছে সে, বাঘ উপস্থিত বলে তার খাদ্য হরিণ, বুনো শুয়োর ইত্যাদি অনিয়ন্ত্রিত হারে বাড়তে পারে না, ফলে রক্ষা পায় বিবিধ উদ্ভিদ, বিস্তীর্ণ ঘাসের চারণভূমি বেড়ে ওঠে হাওয়ার তালে তালে। আশ্রয় পায় অসংখ্য ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, কত না নাম না জানা ছোট বড় কীটপতঙ্গ, অক্সিজেন যোগায় সবুজ উদ্ভিদ— সেই শুদ্ধ বাতাস ফুসফুসে ভরে পাশুপত অস্ত্রধারী নির্বোধ মানুষ মেতে ওঠে মারণখেলায়। অতএব, কোনও না কোনওভাবে, প্রকারান্তরে, পরোক্ষে ওরা আছে তাই আপনি আজ মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে এ লেখা পড়তে পারছেন, আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে— আপনার এসি মেশিনটি ক্রমাগত বাতাসে নির্গত করছে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, কার্বনডাইঅক্সাইড আর কার্বনমনোক্সাইড, এই মুহূর্তে আপনি যে প্লাস্টিকের পেট বটলটি থেকে গলায় ঢাললেন ঠান্ডা পানীয়— সেই একই প্লাস্টিক শ্বাসনালীতে আটকে মারা যাচ্ছে কোনও না কোনও সি টার্টল, অথবা কোনও একটি বটলনোজ ডলফিন।

তো এহেন রাজকীয় প্রাণীটিকে আমরা যমদুয়ারে পাঠানোর জন্য প্রায় বদ্ধপরিকর— সারা পৃথিবীব্যাপী বাঘের মোট নয়টি উপপ্রজাতির মধ্যে বালি, কাস্পিয়ান আর জাভান টাইগার ইতোমধ্যে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন। ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রান টাইগার, সাইবেরিয়া ও চিনের কিছু অংশে আমুর অথবা সাইবেরিয়ান টাইগার আর মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বৃষ্টি অরণ্যে কিছু মালয় টাইগার আসন্ন মৃত্যুর দিন গুনছে। কেবলমাত্র ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানে সমগ্র ব্যাঘ্রজাতির কুলপ্রদীপটি সযত্নে যে রক্ষা করছে, সায়েবরা সুন্দরবন অঞ্চলে এসে তার নাম দিয়েছিলেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। শৌর্যে বীর্যে অনন্য সে, সারা ভারতব্যাপী তার অবাধ বিচরণ। এহেন ক্ষীয়মান ব্যাঘ্রকুলের একমাত্র নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই ভারতবর্ষ, শুধু তাই নয়— ২০০৬ থেকে ২০১৮, বারো বছরে তার বৃদ্ধির পরিমাণটাও অবিশ্বাস্য, প্রায় একশো শতাংশ— হ্যাঁ, ঠিকই পড়লেন আপনি, এ ক শো শতাংশ। ২০০৬ সালে যে সংখ্যা ছিল ১৪১১, আর এখন যখন আপনি এ লেখা পড়ছেন তখন ভারতে বাঘের সংখ্যা ২৯৬৭ (Range ২৬০৩-৩৩৪৬), দ্বিগুণের কিছুটা বেশি! গ্লোবাল ওয়ার্মিং আর ক্লাইমেট চেঞ্জের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে এহেন সাফল্য চন্দ্রযান ২ অথবা পি ভি সিন্ধুর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার থেকে কম গৌরবজনক নয় বৈকি! কিন্তু কাজটা এতটাও সহজ ছিল না।

 

ইতিহাস কথা কও

জয় জয় মা মনসা জয় বিষহরি গো
বন্দনা করি মা গো মা মনসার চরণে।

ইতিহাসের হলুদ পানসি চেপে আসুন বেশ কিছুটা পিছিয়ে যাই, সেই মুঘল কিংবা ব্রিটিশ আমলে, স্থান জলে জঙ্গলে ভয়াল সুন্দরবন— যেখানে মা মনসা আর দক্ষিণরায়ের কৃপায় সাপে জলে বাঘে কুমীরে এক ঠাঁই ভীত শঙ্কিত মানুষের। মুঘল জমানায় শাহেনশাহ আকবরের অন্যতম প্রিয় বিনোদন ছিল গেম হান্টিং বা শিকার। বাদশাহদের এই নির্বিচারে পশুহত্যা চরম আকার ধারণ করে ব্রিটিশরাজের অধীনে। ঐতিহাসিক মহেশ রঙ্গরাজনের হিসেব অনুযায়ী ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫, এই পঞ্চাশ বছরে বাঘ শিকারের সংখ্যাটা প্রায় ৫০,০০০ ছুঁই ছুঁই। শুধু ব্রিটিশ কেন, ভারতবর্ষের রাজস্থান থেকে শুরু করে মধ্যভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক দেশীয় জমিদার ও রাজাদের ট্রোফি রুমগুলি ভরে উঠতে লাগল মুণ্ডসহ বাঘছালে। জনৈক ব্রিটিশ আইননিয়ন্ত্রক মহা সোৎসাহে সুন্দরবনে প্রতি বাঘ পিছু পুরস্কার ঘোষণা করলেন, কোলকাতা থেকে ভিড় লেগে গেল শিকারির, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মাত্র পাঁচ বছরে সুন্দরবনে নিধন হয় প্রায় আড়াই হাজার বাঘ। এই মহাহত্যালীলার কুশীলবদের দাক্ষিণ্যে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে যে সংখ্যাটা ছিল প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত শিশু রাষ্ট্রে তা নেমে এসে দাঁড়াল এক হাজারের কিছু বেশি। ১৯৫০ সালে রাজধানী দিল্লিতে খোলাবাজারে অবাধে চলত বাঘের চামড়ার তৈরি কোট রপ্তানি এবং তখনকার দিনে যার অর্থমূল্য প্রায় ৫০,০০০ ডলারের কাছাকাছি।

উদ্যোগপর্ব

সালটা ১৯৬৬। সদ্যগঠিত ভারতবর্ষ তখন সবে টলোমলো পায়ে হাঁটতে শিখছে। ভারতবর্ষের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধি। বিখ্যাত ওয়াইল্ডলাইফার বল্মিক থাপড় যাকে পরবর্তীকালে অভিহিত করবেন “The True Savior of Wildlife” উপাধিতে। সবার অলক্ষ্যে বনবিবি হয়ত মুচকি হাসলেন। এরপর ক্রমান্বয়ে বন্ধ হবে বাঘের চামড়া রপ্তানি, কড়া আইন প্রণয়ন হবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে। ইন্দিরা অনুভব করলেন প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসা রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঁচাতে প্রয়োজন কঠিন আইন। ১৯৭২ সালের Wildlife Protection Act-এর হাত ধরে পরের বছর যাত্রা শুরু করল “Project Tiger”, নয়টি টাইগার রিজার্ভের হাত ধরে, যথাক্রমে 1) করবেট টাইগার রিজার্ভ (উত্তরাখণ্ড) 2) মানস টাইগার রিজার্ভ (অসম) 3) পালামৌ টাইগার রিজার্ভ (ঝাড়খণ্ড) 4) সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভ (উড়িষ্যা) 5) কানহা ‌টাইগার রিজার্ভ (মধ্যপ্রদেশ) 6) মেলঘাট টাইগার রিজার্ভ (মহারাষ্ট্র) 7) বন্দিপুর টাইগার রিজার্ভ (কর্নাটক) 8) রণথম্ভর টাইগার রিজার্ভ (রাজস্থান) এবং 9) সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ও টাইগার রিজার্ভ (পশ্চিমবঙ্গ)। তৈরি হল বিশেষ টাইগার টাস্ক ফোর্স, দক্ষিণরায় উপুড়হস্তে আশীর্বাদ করলেন ইন্দিরাকে। সেদিনের সেই নয়টি টাইগার রিজার্ভ ছোট্ট ছোট্ট পায়ে বাড়তে বাড়তে আজ নব সংযোজিত কামলাং টাইগার রিজার্ভকে সঙ্গে নিয়ে মোট পঞ্চাশটি, বিশ্বের বৃহত্তম টাইগার হ্যাবিট্যাট আজ আমাদের স্বর্গাদপি গরীয়সী জননী জন্মভূমি। যাই হোক, আলোর পরেই আসে অন্ধকার, ইন্দিরার মৃত্যুর পরে আবার ফুলে ফেঁপে উঠল চোরাশিকার, অবাধে চলতে লাগল ব্যাঘ্র নিধন। ঢালহীন তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার টাস্ক ফোর্স ২০০২ সালে গর্ব ভরে হিসেব দিলেন ভারতে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি। অচিরেই প্রমাণিত হল সে হিসেবে আশিভাগ জল, কুড়িভাগ স্থল। পাগমার্ক অর্থাৎ কিছু কিছু পায়ের ছাপের ভিত্তিতে আর কিছু মনগড়া তথ্য জুড়ে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক সে হিসেব। ২০০৫ সালে তৈরি হল NTCA বা ন্যাশনাল টাইগার কনজার্ভেশন অথরিটি। দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন বিখ্যাত টাইগার বায়োলজিস্ট ডক্টর রাজেশ গোপাল, ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ডক্টর যাদবেন্দ্রদেব ভি ঝালা এবং প্রফেসর কামার খুরেশি। WII (Wildlife Institute of India) এবং NTCA এর যৌথ উদ্যোগে ২০০৬ সালে সারা দেশব্যাপী প্রথম “All India Tiger Estimation” বা AITE অনুষ্ঠিত হল। অবশেষে উৎকণ্ঠার অবসান, এবার ফলপ্রকাশের পালা, সারা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়ে আমরা জানলাম ভারতে জীবিত বন্য বাঘের সংখ্যা মাত্র ১৪১১। সেখান থেকে মাত্র বারো বছরে আজ ২৯৬৭। রূপকথার গল্প মনে হচ্ছে? সব রূপকথা সত্যি হয় না, কিন্তু এই কাহিনী দিনের আলোর মতোই উজ্জ্বল, বাস্তব। এর পেছনে আছে অসংখ্য মানুষের রক্ত, ঘামের, আত্মত্যাগের ইতিহাস।

 

ওরা কাজ করে

২০০৬ সালে ১৪১১, ২০১০-এ ১৭০৬ এবং ২০১৪-তে ২২২৬ সংখ্যা অতিক্রম করে ২০১৮ আগতপ্রায়। আবার একটা AITE-র বছর, ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ায় সাজো সাজো রব। এতদিনে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জেনে গেছে যে এবারের বাঘশুমারি আকারে বহরে কলেবরে পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রচেষ্টা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষের ভূমিকা রয়েছে এই কর্মযজ্ঞে— বিভিন্ন টাইগার রিজার্ভের অফিসার থেকে শুরু করে ফিল্ড স্টাফ, বিবিধ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি, ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বায়োলজিস্ট, এবং বহু স্বেচ্ছাসেবকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই সমীক্ষা। খুব সহজভাবে বলতে গেলে গোটা সমীক্ষা পদ্ধতিটি মোট তিনটি ভাগে বিভক্ত, প্রথম ভাগ অর্থাৎ ফেজ ওয়ানে সারা দেশের সমস্ত টাইগার রিজার্ভের কর্মচারীরা তাদের জ্ঞাত সূত্রের ওপর ভিত্তি করে গোটা অঞ্চলে বাঘের উপস্থিতির চিহ্নগুলির অনুসন্ধান করেন— যার উদ্দেশ্য ক্যামেরা বসানোর আদর্শ স্থান নির্বাচন এবং বাঘের বিষ্ঠা সংগ্রহ করে ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটে পাঠানো বাঘের ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য। সারা দেশ জুড়ে মোট ৩,৮১,৪০০ বর্গকিমি অঞ্চল জুড়ে সমীক্ষা করেছেন বনকর্মী এবং গবেষকেরা বাঘের উপস্থিতির চিহ্নের সন্ধানে এবং বাঘের খাদ্য যথা হরিণ, বুনো শুয়োর ইত্যাদি গণনার উদ্দেশ্যে, তার মধ্যে পায়ে হেঁটে অতিক্রান্ত পথ প্রায় ৫২২,৯৬৬ কিমি। সমীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রিজার্ভের পাঠানো জিপিএস অবস্থানের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে তাদের প্রয়োজনীয় ম্যাপ, লেয়ার্স, আউটলাইন্স, বনভূমির প্রকারভেদ প্রভৃতি— বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ ফেজ টুর কাজ কারবার জিওইনফরমেশনস-এর উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় রূপরেখা নির্ধারণ করা। তৃতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ ফেজ থ্রি-তে বনাধিকারিক, বনকর্মী, গবেষক এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস পরিশ্রমের ফলস্বরূপ ১২১,৩৩৭ বর্গকিমি জুড়ে মোট ৫৩,৭৭৬ (২৬, ৮৩৮×২)-টি নজরদার ক্যামেরা সর্বমোট ৩৪,৮৫৮,৬২৩টি বন্যপ্রাণীর ছবি তুলেছে যার মধ্যে ৭৬,৬৫১টি বাঘ ও ৫১,৭৭৭টি লেপার্ড বা গুলবাঘের ছবি। সমস্তরকম ফিল্ডওয়ার্কের পরবর্তী পর্যায়ে দেহরাদুনে ইনস্টিটিউটে বসে দিন রাত্রি এক করে বিভিন্ন সফটওয়ারের সাহায্যে আবার কখনও বা খালি চোখে প্রতিটি বাঘের ডোরাকাটা দাগ আলাদা করে গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন একেকটি ইউনিক ইন্ডিভিজুয়াল টাইগারকে। আমার আপনার আঙুলের ছাপ যেরকম কখনওই একে অপরের সঙ্গে মিলবে না, ঠিক সেইরকমই প্রতিটি বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগগুলি স্বতন্ত্র, তাদের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন মার্ক। সমীক্ষার এই অংশ ছাড়াও প্রতিটি সংগৃহীত বিষ্ঠার স্যাম্পেল থেকে আলাদা করা হয়েছে তাদের ডিএনএ, ধারণা হয়েছে তাদের জিনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে, আমরা বিস্মিত হয়েছি জেনে সুন্দরবনের মাছখেকো বাঘের জিনতুতো ভাইয়েরা নাকি এখন মধ্যপ্রদেশের কোনও এক বনানীর গাছের ছায়ায় বসে নিশ্চিন্তে দিবানিদ্রা দিচ্ছে!

 

যবনিকা

অবশেষে আগত সেই দিন, ২৯শে জুলাই, ২০১৯। ঘড়ির বড় কাঁটাটি সকালের আলস্য কাটিয়ে হেলে দুলে এগোচ্ছে সকাল নটার দিকে। বিপুল জনাদেশে জয়ী ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি বোতাম টিপে আমাদের জানিয়ে দিলেন ভারতে বর্তমানে মোট বাঘের সংখ্যা ২৯৬৭! রামভক্ত মোদিজির মুকুটে আরও একটি পালক, বালাকোট, চন্দ্রযানের পরে এও এক বিশাল সাফল্য বটে! দেশ এক বলিষ্ঠ নেতার হাত ধরে হৈ হৈ করে এগিয়ে চলেছে ২০২২, The Year of Tiger-এর দিকে, ২০১০-এ অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল মোট ১৩টি দেশ, ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা আমরা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করবই!

তাহলে সুপ্রিয় পাঠক, এই সাফল্যের শ্রেয় কার? না, “এক থা টাইগার” থেকে “টাইগার জিন্দা হ্যায়” হয়ে আজ “বাঘো মে বাহার”— এই জার্নিটা মোটেই কোনও ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ক্যারিশমা নয়— এই সাফল্য গোটা ভারতের অসংখ্য পরিবেশপ্রেমী মানুষের, তাঁদের পরিশ্রমের, তাঁদের ভালোবাসার। এই পৃথিবীতে বোলসেনোরো থাকবেন, মোদিজি থাকবেন, থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, আবার বিপরীতে সগৌরবে থাকবেন লালগড়ের সেই “অশিক্ষিত” গাঁওবুড়ো, যিনি বলেন “বাঘ আইসলে আবার লতুন হয়া বেঁচে উইঠবেক আমাদের বাপ পিতিমোর জঙ্গল।” স্বপ্ন দেখতে দোষ কী, কারণ কিছু কিছু স্বপ্ন যে সত্যি সত্যিই সত্যি হয়ে যায়!

ছবি সৌজন্য: উপমন্যু চক্রবর্তী, মৌলিক সরকার।

তথ্যঋণ:

১) WII- NTCA Tiger status report 2018
২) ইন্টারনেট

উৎসাহী পাঠকের জন্য:

https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://projecttiger.nic.in/WriteReadData/PublicationFile/Tiger%2520Status%2520Report_XPS220719032%2520%2520new%2520layout(1).pdf&ved=2ahUKEwjI8Ybo_KzkAhUEbisKHbPOBV0QFjACegQIAhAB&usg=AOvVaw0LhpcIfxRTLdxPAS9Ic84E

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...