বিস্মৃত গল্পকার রমেশচন্দ্র সেনের গল্প এবং কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

কৌশিক মিত্র

 

বিগত শতাব্দীর শেষদিকে আমরা যখন মাধ্যমিক দিচ্ছি, তখন নবম-দশম শ্রেণির বাংলার অতিরিক্ত পাঠ্যপুস্তকে যে গল্পটা আমরা রুদ্ধশ্বাসে পড়তাম তা হল রমেশচন্দ্র সেনের “সাদা ঘোড়া”। বার বার মনে হত, বড় হয়ে এঁর লেখা আরও পড়তে হবে, যেমনটা মনে হত তারাশঙ্করের “তাসের ঘর” কিম্বা বনফুলের “বুড়ীটা” পড়ার পর। কার্যত, সেই অতিরিক্ত পাঠ্যপুস্তকের প্রায় সব লেখকের কাজই পরবর্তীকালে পেলেও রমেশচন্দ্র সেনকে, বহু খুঁজেও কিন্তু কোথাও পাইনি। এই পিডিএফ বিপ্লবের যুগে হঠাৎ এক বন্ধুর সৌজন্যে হাতে এল, সমীর রায় এবং সমর চন্দের সম্পাদনায় “রমেশ্চন্দ্র সেনের গল্প” (১৯৮৬, পনেরটি গল্প স্থান পেয়েছে এ সঙ্কলনে)। বলাই বাহুল্য, পাওয়া মাত্র ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস সেটুকু সম্বল করেই সঙ্কলনখানা পড়ে ফেলা এবং এক অপার ভালোলাগার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে যাওয়া।

ইংরাজি সাহিত্যের ছাত্র, যৌবনে অগ্নিযুগের সৈনিক, পরবর্তীতে উত্তর কলকাতা কংগ্রেসের সম্পাদক এবং পেশায় কবিরাজ রমেশ্চন্দ্র তার ঊনসত্তর বছরের জীবনে (১৮৯৪-১৯৬২) কখনও কলকাতার বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন কিনা তা সঠিকভাবে জানা যায় না, অথচ তাঁরই হাত থেকে বেরিয়েছে, ‘ডোমের চিতা’, ‘মৃত ও অমৃত’ বা ‘তারা তিন জন’-এর মত কালজয়ী গল্প; প্রকৃতি, মানব মনন এবং জীবন-মৃত্যুর ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের অনিবার্যতা যেখানে চিত্রিত হয় অপূর্ব স্বতস্ফূর্ততায়। প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক, যে প্রকৃতির নিবিড় নৈকট্য, গ্রামীণ জীবনের বেদনা-বিধুর ধূসরতার নৈমিত্তিক সান্নিধ্য ছাড়াই মৃত্যুচেতনায় আছন্ন রমেশচন্দ্র, মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এই অসম যুদ্ধের ছবিগুলি আঁকলেন কী প্রকারে? আর ঠিক এইখানেই আমাদের মাথা নত করে ডুব দিতে হয় এই বিস্মৃত সাহিত্যিকের লভ্য সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে।

‘ডোমের চিতা’ গল্পে দেখা যায়, মাদারের ভিটা, এক প্রকাণ্ড বিলসংলগ্ন ভূ-ভাগ যা দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে আশেপাশের গ্রামগুলির শ্মশান হিসেবে, এবং এই সেই জনমানব বর্জিত ভূখণ্ড যা হারু এবং বদন দুই ভয়াল দর্শন ডোমের বিচরণভূমি। কাঠ সরবরাহ এবং চিতা জ্বালানোর বিনিময়ে মৃতের আত্মীয়স্বজনের প্রদেয় অর্থ ও সিধার বিনিময়ে অতিবাহিত হয় তাদের জীবন, সম্বল তাদের কেবলমাত্র একটি ডিঙিনৌকা… চিতার আগুনই তাদের কাছে রান্নার চুল্লি, স্বভাবতই, চিতাবিহীন শ্মশান তাদের কাছে উপবাসের নামান্তর। এরকমই উপবাসক্লিষ্ট এক অধ্যায় কাটানোর পর শ্মশানে মৃতদেহ এলে অর্জিত অর্থ নিয়ে ডিঙিখানা করে হারু বেরিয়ে পড়ে প্রয়োজনীয় রসদের উদ্দেশ্যে, অথচ আর ফেরে না সে। কয়েক দিনের ব্যর্থ প্রতীক্ষার পর ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন বদন আর একখানা ডিঙি করে ফিরিয়ে নিয়ে আসে সর্পাঘাতে মৃত, কইমাছের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হারুর মৃতদেহ। শবদাহ শেষে ঐ চিতাতেই বদন সিদ্ধ করে নেয় হারুর ক্রীত চাল এবং কইমাছগুলি… দীর্ঘ কুড়ি বছরের যৌথ জীবনের স্মৃতিগুলি হারুর চিতার পাশে বসে থাকা হতবাক বদনের চোখ দিয়ে নামতে থাকে ফোঁটায় ফোঁটায়। এমনি আর একটি অসাধারণ গল্প ‘মৃত ও অমৃত’। টিয়াঠুঁটি গ্রামের বিপত্নীক সম্পন্ন চাষি বলাইয়ের একমাত্র সন্তান বাঁকা, শৈশবেই মাতৃহীন শিশুটিকে বুকের সমস্ত মমতাটুকু দিয়ে তিলতিল করে সাবালক করে তোলে বলাই, বহুদূর শালিকরাঙার বিলসংলগ্ন জমি ছেলের নামে বন্দোবস্ত নেয় সে। ডিঙিনৌকো করে বলাই একদিন যায় সেই জমির তত্ত্বতালাশ নিতে, সঙ্গে বাঁকা আর বাঁকার প্রিয় পোষা কুকুর ভোলা। শালিকরাঙার বিলে পৌঁছনোর পর অজানা জ্বরে আক্রান্ত হয় বাঁকা, সঙ্গে টানা তিনদিন ধরে চলতে থাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর এরই মধ্যে বলাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে বাঁকার পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া… মালিকের মৃত্যুর পর শোকস্তব্ধ ভোলাও ডিঙিনৌকোটি ছেড়ে কোন অচিনদেশে পাড়ি জমায়। প্রকৃতির জমাট বাঁধা ভ্রূকুটিকে উপেক্ষা করে, শোকে প্রস্তরীভূত নিঃসঙ্গ বলাইয়ের যাত্রা শুরু হয় টিয়াঠুঁটির দিকে, ডিঙিতে শুয়ে থাকে প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রের স্ফীত গলিত শব। গ্রামে পৌঁছবার অনতিকাল আগেই সে বিল থেকে উদ্ধার করে একটি ডুবন্ত মানুষকে, এবং জায়গার স্বল্পতার কারণে তাকে জলে ভাসিয়ে দিতে হয় তার মৃত পুত্রের শব… ছেলেকে সসম্মানে দাহ করার যে স্বপ্ন সে দেখে আসছিল বিগত কয়েকটি দিন ধরে এক লহমায় তা নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রকৃতির সঙ্গে অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধ, নিয়তির চোখরাঙানির কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলেও উপসংহারে মানব প্রকৃতির মহত্তর দিকটিই জয়যুক্ত হয়। একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, ‘তারা তিনজন’ গল্পটিতে। কানাইয়ের নেতৃত্বে দুজন বিবদমান প্রতিবেশী (বিষ্টু ও যাদব) একখানা নৌকোয় করে বিদেশে পাড়ি দেয় ব্যবসার উদ্দেশ্যে, মূলধনের স্বল্পতাই এরকম একটি অসমসত্ব দল নির্মাণের মুখ্য কারণ। ফলত সমস্ত রাস্তা ধরে চলতে থাকে বিষ্টু ও যাদবের খুনসুটি, সামান্য মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে বেধে যায় তুলকালাম ঝগড়া, মাঝে মাঝেই বিবাদ থামাতে হস্তক্ষেপ করতে হয় কানাইকে। বিদেশের কারবার শেষে বাড়ি ফেরার পালা। কিন্তু প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় প্রকৃতি। করাল আবহাওয়ার প্রকোপে দিকভ্রষ্ট নৌকাখানা নদীপথ ছেড়ে এগিয়ে যায় মোহনার দিকে… স্থাবর জঙ্গম, বারিধি সম্ভূত নীল জলে পরিব্যপ্ত, নৌকায় খাবার আছে কিন্তু পানীয় জল নেই… অনাহার ও তীব্র জলাভাব এবং শারীরিক অসুস্থতার প্রকোপে কানাইয়ের জীবনের ইতি, একটি নৌকা এবং দুজন বিদ্বিষ্ট মানব, কোথাও প্রাণের স্পন্দনটুকু নেই, আকাশের কোণে একটুকরো মেঘ… পরিহাস করে বিদায় নেয় সেও… মৃত্যুর সঙ্গে অবিরত এই দাবাখেলা, বেঁচে থাকার তীব্র আর্তি কখন যেন মুছে দেয় বিদ্বেষের রেশটুকু… বিষ্টু ও যাদব ভুলে যায় মাত্র কদিন আগেই তারা তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মারামারি করেছে, অথচ আজ এই ক্রান্তিকালে যেন তারা বহুকাল ধরে পাশাপাশি চলা কোনও বন্ধু… এক সময় বিষ্টু মরে যায়, উদ্ধারকারী জাহাজের সহায়তায় বেঁচে যায় অচৈতন্য যাদব… জ্ঞান ফিরলে বিড়বিড় করতে থাকে সে… “তিনজন আমরা আইছিলাম, তিনটি মানুষ— যাদব, কানাই আর বিষ্টু…”

মানব মনের বিচিত্র গতিবিধি, ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন আশ্চর্যজনকভাবে শাখাপ্রশাখা চারিয়ে দেয় ‘যৈবন’ গল্পটিতে। সম্পন্ন চাষি হীরালাল, নিঃসহায় বিধবা যুবতী সুভদ্রার মধ্যে তৈরি হওয়া অনৈতিক সম্পর্ক, হীরালালের ক্রূরতা এবং পাশবিকতা এবং কাহিনীর শেষে হীরালালের ছেলে গণুর মধ্যে তৈরি হয়ে ওঠা মমত্ব যা শেষ পর্যন্ত সুভদ্রাকে হীরালালের পাশবিকতা থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে… এ গল্প পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় পোয়েটিক জাস্টিসের সামনে। একই নির্যাস পাওয়া যায় ‘কোষ্টাকী পাশা’ গল্পে। বহিঃপরিবেশের সামান্য বিচ্যুতি মানব মনকে কিভাবে বিবশ এবং অন্ধ করে তোলে, পরিণামে সারাজীবন কীভাবে ব্যক্তিমানুষকে তার ভ্রান্ত আচরণের উৎস সন্ধানে ছুটে বেড়াতে হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই গল্পটি। মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কীর্ণতা, দারিদ্র্যপীড়িত গ্লানিময় জীবন, পাপবোধের সতত উৎপীড়ন, পাশাপাশি যে জটিল মনোবিকলন মানুষের প্রতিটি আচরণের অচ্ছেদ্য সঙ্গী তার অপূর্ব বিস্তার লক্ষ করা যায় ‘কাশ্মীরী তুষ’ গল্পখানায়। মানব চরিত্রের নিবিড় এবং নির্মোহ পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির নিখুঁত প্রয়োগ ছাড়া এ ধরনের রচনা কার্যত অসম্ভব। ভাবতে অবাক লাগে আজ থেকে প্রায় আট দশক আগেই বাংলা সাহিত্যে রমেশচন্দ্র মনস্তত্ত্বের উপর এই সূক্ষ্ম কাজগুলি করতে সমর্থ হয়েছেন।

একজন সাহিত্যিকের সমাজবীক্ষণ কী উচ্চতায় পৌঁছতে পারে তা বোঝা যায়, ‘এক ফালি জমি’ কিম্বা ‘জেন্টেলম্যান অ্যান্ড কোং’ গল্পদুটি পড়লে। এক টুকরো জমিকে কেন্দ্র করে দুই ভিখারির লড়াই, অস্তিত্বের সঙ্কট, হাজতবাস, অনভিপ্রেত মৃত্যু এবং শূন্যতা উপন্যস্ত হয় অমলিন কারুণ্যে। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের প্রেক্ষাপটে অবহেলিত ভিক্ষুক জীবনের অবস্থান, গোষ্ঠী-মনস্তত্ত্ব, যা হয়ত শতাধিক বছর ধরে থেকেছে অপরিবর্তিত, কলমের খোঁচায় এক মুহূর্তে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একইরকম প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে কলকাতার পকেটমারদের জীবনের নির্মাণ, শিক্ষা এবং যাপনচিত্র ‘জেন্টেলম্যান অ্যান্ড কোং’ গল্পটির মাধ্যমে। পাঠক নিজের অজান্তেই বুঝিবা পৌঁছে যান কলকাতার অপরাধ জগতের ঠেকগুলিতে, যে ছবির খুব বেশি পরিবর্তন আজও বোধ করি ঘটেনি, শুধুমাত্র অনভিপ্রেত রাজনীতির স্পর্শ পাওয়া ছাড়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তেতাল্লিশের মন্বন্তর এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্লিষ্ট এপার বাংলার বিধ্বস্ত গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের অপূর্ব চালচিত্র পাওয়া যায় ‘হারানী’ এবং ‘প্রেত’ গল্পে। মন্বন্তরক্লিষ্ট কলকাতার লঙ্গরখানা, ফুটপাত, সরকারি ক্যাম্পের নারকীয় পরিমণ্ডল, মানবিকতার নিদারুণ অধঃপতন, মৃত্যুর হাহাকার এ গল্পদুটিতে ফুটে ওঠে অপুর্ব সুষমায়। প্রথম জীবনে রমেশচন্দ্র ছিলেন বৈপ্লবিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, স্বভাবতই কারাবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। বন্দিজীবন চলাকালীন কোনও রাজনৈতিক বন্দির মনের অবস্থা কী হতে পারে, স্বাধীনতাস্পৃহা পোষণ করার দরুণ সেই বন্দিকে জীবনের একটি অমূল্য পর্যায় কী নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হয় তার হিমশীতল বিবরণ ফুটে ওঠে ‘রাজার জন্মদিন’ গল্পটিতে। একটি বিমূর্ত ঘটনাবলম্বনে সাইকোফিজিক্যাল রিয়েলিটির অনবদ্য প্রকাশ এ গল্পে লক্ষিত হয়। তৎকালীন সময়ের সাংস্কৃতিক জগত, আরও ভালো করে বললে লেখালিখির জগতের ভ্রষ্টাচার, নীতিহীনতা, পারস্পরিক খেয়োখেয়ি, উন্মার্গগামিতা খুব সুন্দরভাবেই ধরা পড়ে ‘বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স নং ফোর’ গল্পটিতে।

তবে রমেশচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, বুঝিবা বাংলা সাহিত্যেরও অন্যতম সেরা ছোটগল্প ‘সাদা ঘোড়া’। এ গল্প বহু পঠিত এবং বহুচর্চিত। ‘সাদা ঘোড়া’ দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতা শহরের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের খণ্ডচিত্র। ছেচল্লিশের দাঙ্গার রেশ তখনও মিলিয়ে যায়নি, এ সময়ই একটি পাড়ায় এক বেওয়ারিশ সাদা ঘোড়ার (নাম তার চাঁদ/সোহরাব) আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে দাঙ্গাবিধ্বস্ত জনজীবনে যে আলোড়ন ওঠে তা যেন সাম্প্রদায়িক হানাহানির প্রতি মস্ত এক জিজ্ঞাসাচিহ্ন! ঘোড়ার মালিকের (যে একজন ইসলাম ধর্মালম্বী) আবির্ভাবে আবার পাড়ায় দেখা যায় চাঞ্চল্য, বাইরের জনপদ থেকে রক্তপিপাসুর দাঙ্গাকারীরা পৌঁছে যায় মহল্লায়, মহল্লার ছেলেরা চাঁদের মালিককে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর। এই মুহূর্তেই আবির্ভাব মিলিটারির। গল্পের শেষে মিলিটারির বুলেটে চাঁদের মৃত্যু যেন একথাই জানিয়ে দিয়ে যায়, যে সাম্প্রদায়িক হানাহানি/বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে অখণ্ড শান্তি স্থাপনার লক্ষ্যে আগামী পৃথিবীকে এখনও হাঁটতে হবে বহুদূর!! বহুদূর!!

মোটামুটিভাবে দেখা যাচ্ছে আজীবন সাহিত্য সাধনার ফসল হিসেবে বাঙালি পাঠক রমেশচন্দ্রের কাছ থেকে পেয়েছেন এগারটির মত উপন্যাস (শতাব্দী, চক্রবাক, কুরপালা, ইত্যাদি), পাঁচটির মত গল্প সংকলন। দেখা যাচ্ছে তাঁর অগ্রন্থিত রচনাও প্রচুর। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এই সঙ্কলনেই (প্রকাশকাল— ১৯৮৬) স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে “রমেশচন্দ্র সেনের কোনও উপন্যাস বা গল্পের বই কেউ কিনতে চাইলে হতাশ হবেন” এবং আজ এ লেখার পর তেইশটি বছর পেরিয়ে গেছে, বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে প্রাগুক্ত বক্তব্যের সঙ্গে অমত হওয়ার কোনও জায়গাই নেই। এ সঙ্কলনের মুখবন্ধে শ্রী মানবেন্দ্র রায় লিখছেন, “জীবিতকালে রমেশচন্দ্র সেন কোনও বিশেষ প্রতিষ্ঠানে ভিড়ে পড়েননি, তাঁর অপরাধ তিনি কোনও গোষ্ঠীতে বিশ্বাসী ছিলেন না। সুতরাং মৃত্যুর পর বাধ্যত এক নির্মম অবহেলায় তাঁকে বাংলা সাহিত্য অচ্ছুৎ বলে চিহ্নিত করেছে। কোনও সাহিত্য সমালোচনা গ্রন্থে আলোচনা দূরে থাক, তাঁর নামও উল্লেখ করা হয়নি। দায়িত্বশীল প্রগতিবাদীরা দূরে দূরে সরে থেকেছেন।” বস্তুত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি। ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্রে শ্রী সমর চন্দ (এই গল্প সঙ্কলনের অন্যতম সম্পাদক) জানাচ্ছেন, তাঁর সম্পাদনায় রমেশচন্দ্রের একটি গল্প সঙ্কলন আবার প্রকাশিত হবে। কার্যত ততদিন পর্যন্ত বাঙালি পাঠকসমাজের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1748 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. খুবই আগ্রহোদ্দীপক। রমেশ চন্দ্র সেন মশাইয়ের যে দুর্লভ বইখানি আপনি পেয়েছেন তা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিন, এই অনুরোধ। পিডিএফ অথবা অন্য কোন ফর্মে।

  2. লেখাটা পড়ে রমেশচন্দ্র সেনের গোটা বইখানা পড়ে নেবার আগ্রহ উস্কে উঠলো যে! প্রতিভা সরকারের সাথে আমিও তাই গলা মিলাচ্ছি। প্রায় অচেনা(আমার) একজন অসামান্য লেখক রমেশচন্দ্র সেন সম্পর্কে জানলাম লেখা থেকে কৌশিকদা। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি সে জন্য।

  3. আরও বড়ো করে লিখুন কৌশিকদা। পনেরোটা গল্প নিয়ে বিস্তারিত লিখুন। এত স্বল্প পরিসরে প্রবন্ধ পড়ে শান্তি হয় না। লেখাটা ভালো। শুভেচ্ছা নেবেন

আপনার মতামত...