রবীন্দ্রনাথ, আলবের কান ও ওতুর দ্যু মঁদ

সৈয়দ কওসর জামাল

 

এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে হঠাৎ-ই রবীন্দ্রনাথ লন্ডন থেকে প্যারিসে এসে পৌঁছেছিলেন। পৌঁছোনোর তারিখ ছিল ৬ অগস্ট ১৯২০। ক্যাঁবঁ রোডের মেট্রোপলিটান হোটেলে কোনওরকমে দুটো রাত কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ আলবের কান (Albert Kahn)-এর আমন্ত্রণে ওতুর দ্যু মঁদ (Autour du Monde)-এর অতিথিভবনে এসে ওঠেন। প্যারিসের উপকণ্ঠে ওতুর দ্যু মঁদ-এর ঠিকানা হল সেন নদীর পারে— Boulogne sur Seine। এই অতিথিশালা রবীন্দ্রনাথের যে খুবই ভালো লেগেছিল তা রথীন্দ্রনাথের কথায় আমরা জানতে পারি। তিনি খুশি হয়ে বলেছিলেন, দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম তিনি যেন নিজের ঘরে থাকার আনন্দ লাভ করলেন।

অতিথিশালা ও তার পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় রথীন্দ্রনাথের ‘অন দ্য এজেস অফ টাইম’ গ্রন্থে। রথীন্দ্রনাথের বিবরণীতে পাই যে কান ভ্রমণবৃত্তি নিয়ে আসা অতিথিদের জন্য বাড়ির তিনতলায় দুটো শোয়ার ঘর নির্ধারিত। দোতলায় লাইব্রেরি, যেখানে পৃথিবীর সব দেশের সম্পর্কে জানার বইপত্র সংগ্রহ করে রাখা আছে। আর একটি ঘর নির্দিষ্ট সেক্রেটারি শ্রীগার্নিয়ের জন্য। নীচের তলায় বসার লাউঞ্জ, ডাইনিং রুম ও একটা সুন্দর বসার জায়গা; যেখানে থেকে বাগান দেখা যায়। এই বাগানটি ছিল খুবই মনোরম। শ্রীকান থাকতেন পাশের বাড়িতে এবং বাগানটি তাঁর বাড়িরই সংলগ্ন। রবিবারেই শুধু ওতুর দ্যু মঁদের লোকজনদের বাগানে প্রবেশের সুযোগ থাকত। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গের সবার জন্য প্রতিদিনই বাগানে প্রবেশ অবাধ ছিল। বাগানের ভিতর দিয়ে একটা পথ পেরোলেই পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ত। পাইন ও ফার গাছে ঢাকা পাহাড়। নীচে পাথরের স্তূপ। আসলে ওইসব গাছপালা ও পাথরগুলো পাইয়ারেনি পর্বতমালা থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। জঙ্গলের একদিকে ছোট উপত্যকা ও একটা পুকুর, আর অজস্র ফল ও ফুল। এখানে প্রবেশ করলেই মনে হত যেন এক অত্যাশ্চর্য জগতের মধ্যে পৌঁছানো গেছে। রথীন্দ্রনাথের ভাষায়:

This is a delightful surprise – so hidden is it from the casual wanderer. Emerging from the forest we come to a level ground laid out with fruit trees and flower beds in the typically French style.

(অন দ্য এজেস অফ টাইম)

এই ফলের গাছগুলো ছিল নানা ধরনের ও নানা আকারের, আর বেশিরভাগ গাছেরই ডালপালা ফলভারে নুয়ে থাকত। মাঝখানে ছিল একটা সুন্দর কাচের ঘর ও আরও একটা ছোট পুকুর— যার চারপাশ নুড়িপাথর দিয়ে সাজানো।

অবাক হওয়ার মতো আরও কিছু ছিল। একটা মঙ্গোলীয় দরজা দিয়ে ঢুকলে চোখের সামনে খুলে যায় জাপানি দৃশ্যপটের রঙিন জগৎ। কতগুলো সত্যিকারের জাপানি চা-পানগৃহ, মন্দির ও প্যাগোডা এই বাগান জুড়ে ছড়িয়ে আছে। গাছগুলো বড় থেকে ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে আর গাছের ডালপালাগুলোকে নানা আকৃতি দেওয়া হয়েছে। টবের কিছু ছোটো গাছ জাপান থেকে আনানো হয়েছিল, যা কয়েকশো বছরের পুরোনো। কিন্তু সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ছিলেন ওতুর দ্যু মঁদ-এর প্রতিষ্ঠাতা আলবের কান। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন ইতালি থেকে ফেরার পর ওতুর দ্যু মঁদএ ওঠেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ও তাঁর স্ত্রী নির্মলকুমারী মহলানবিশ। নির্মলকুমারী আলবের কান সম্পর্কে শ্বশুর প্রবোধচন্দ্র মহলানবিশকে ৫ জুলাইয়ের চিঠিতে জানাচ্ছেন:

বাড়ীর কর্তাটি চমৎকার মানুষ। বৃদ্ধ অবিবাহিত এবং লক্ষপতি, কিন্তু থাকেন অতি গরীবের মত। কী একটা রিসার্চ করছেন, সমস্ত টাকাই তার পিছনে ঢালছেন। তাছাড়া এদেশী গরীব মধ্যবিত্ত লোকেদের একটু আনন্দ, কি সাহায্য করবার জন্য কতরকমই না আয়োজন করেছেন। ঠিক শহরের বাইরে একেবারে Seine নদীর ধারে প্রকাণ্ড বাগান এবং তারই ভিতরে অনেকগুলো ছোট ছোট বাড়ী। প্রায় সবকটা বাড়ী অতিথি অভ্যাগত আর কয়েকটা ওঁর পুরনো চাকরবাকর এবং তাদের আত্মীয়স্বজনর জন্য রাখা আছে। নিজে তারই মধ্যে ছোট্ট একটা বাড়ীতে থাকেন, নিরামিষ খান এবং সারাদিন নিজের কাজের মধ্যেই নিমগ্ন হয়ে আছেন।

একই চিঠিতে পুনরায় লিখছেন :

মসিয়ে কান অতি সাদাসিধে মানুষ। কথাবার্তা যেন শিশুর মত সহজ সরল। পোশাক-পরিচ্ছদ ওঁর ভৃত্যদের মতই কমদামী, মোটা গোছের; একেবারে অনাড়ম্বর, সরল জীবনযাত্রা। এতবড় একজন ধনীকে এরকম দেখলে আশ্চর্য লাগে।

(কবির সঙ্গে য়ূরোপে, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৪)

আলবের কান ছিলেন ইহুদি ব্যাঙ্কব্যবসায়ী, অত্যন্ত ধনী এবং আন্তর্জাতিক অর্থজগতে সুপরিচিত। কিন্তু মানবসেবায় কিছু কাজ করে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। মানবতাবাদী, শান্তিকামী উদার মনের এই মানুষটির সঙ্গে ফ্রান্সের লেখক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এঁদের মধ্যে ছিলেন ভাস্কর অগুস্ত রদ্যাঁ ও দার্শনিক আঁরি বের্গসনের মতো ব্যক্তিত্ব। শ্রীকান তাঁর কাজের জন্যই ইজিপ্ট, ভিয়েতনাম ও জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। সম্ভবত এই কারণে ভ্রমণের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত দুর্বলতা ছিল এবং এই ভ্রমণকেই তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের কাজে লাগাতে চান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক এই আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়েই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। এই বিশ্বাস থেকেই ১৮৯৮ সালে তিনি ওতুর দ্যু মঁদ-এর প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্কলারশিপের প্রচলন করেন। নির্বাচিত প্রার্থীদের পনেরো মাসের জন্য নির্দিষ্ট দেশগুলিতে পাঠানো হত সেখানে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। এই ওতুর দ্যু মঁদ-এর সূত্রেই তাঁর বাগান নির্মাণের পরিকল্পনা— যেখানে ফরাসি, ব্রিটিশ, জাপানি ফলচাষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় এই উদ্দেশ্যে যে দর্শকরা অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবেন এবং বিশ্ব সমন্বয়ের মানসিকতা তৈরি হবে।

১৮৯৩ সালে Boulogne sur Seine-এর এই সম্পত্তি কেনেন শ্রীকান। তারপর আট একর জমির বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন। এর পাঁচ বছর পর ওতুর দ্যু মঁদ সোসাইটি। অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিরা এই সোসাইটির সদস্য ছিলেন। শীতকালে প্রায় প্রতি রবিবার তাঁদের নিমন্ত্রণ করে ডাকা হত। তাঁর আরও একটি বিশেষ ভালোবাসার বিষয় ছিল ফটোগ্রাফি। তিনি যখন বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন, তখনই তাঁর এই শখটি গড়ে ওঠে। লুমিয়্যের ভ্রাতৃদ্বয় ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে অটোক্রোম পদ্ধতি উদ্ভাবন করলে শ্রীকান সেই উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে চান। অটোক্রোম পদ্ধতিতে রঙিন ছবি তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এসব ১৯০৩ ও ১৯০৪ সালের ঘটনা। এই ফটোগ্রাফিকেও শ্রীকান তাঁর সম্মিলিত বিশ্বভাবনার কাজে ব্যবহার করতে চাইলেন। ১৯০৯ সালে ‘Les Archives de la planete’ বা বিশ্বের সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। ১৯০৯ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত আলবের কানের ফটোগ্রাফাররা তুরস্ক, আলজেরিয়া, ফরাসি ইন্দোচিন (এখনকার ভিয়েতনাম), সুদান, মঙ্গোলিয়া এবং নিজেদের দেশ ফ্রান্সসহ পঞ্চাশটি দেশে ভ্রমণ করে ছবি তুলে আনেন। এইভাবে সংগ্রহশালায় তিয়াত্তর হাজার অটোক্রোম প্লেট ও একশো ঘণ্টার ভিডিও সংগৃহীত হয়। এমন কয়েকজন ফটোগ্রাফার হলেন— ওগুস্ত লেয়ঁ, স্তেফান পাসে, মারগুরিত মেসপুলে, পোল কাসলনো, ও লেয়ঁ বুসি। এঁদের সমস্ত কীর্তিকে শ্রীকান সুন্দরভাবে ফাইলভুক্ত করে রাখতেন।

প্রতি রবিবার আলবের কান তাঁর বন্ধু ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওতুর দ্যু মঁদ-এ ডাকলে তাঁরা বাগানে ঘুরে বেড়াতেন, আলোচনা করতেন এবং শ্রীকানের বিশ্বসংগ্রহশালা দেখতেন। তাঁর বাগানের মধ্যে ছিল একটি সিনেমা হল, যেখানে বিশ্বের নানা দেশ থেকে আনা ছবির সংগ্রহ দেখানোর ব্যবস্থা ছিল। ১৯২৬-এর জুলাই মাসে শ্রীকান একদিন রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ভ্রমণসঙ্গী সবার জন্য ছবি দেখানোর আয়োজন করেন। নির্মলকুমারী জানিয়েছেন:

ঘরের মধ্যে চেয়ারে বসে দেখলাম তাজমহল। বহুবার আগ্রা গিয়েছি তার আগে, কিন্তু সেদিন প্যারিসে বসে তাজমহল যখন দেখলাম, মনে হল না যে ছবি দেখছি। এমনই অদ্ভুত কৃতিত্বের সঙ্গে ছবি তোলা হয়েছে। মনে হল, তাজমহলের ফটকের মধ্যে ঢুকে হঠাৎ মুখ তুলে চেয়ে দেখছি। ঠিক এমনি করেই পিকিং-এর সামার প্যালেস দেখেছিলাম।

(কবির সঙ্গে য়ূরোপে, পৃষ্ঠা ১০৭)

বিশ্ব সমন্বয়ের যে আদর্শ থেকে শ্রীকান শান্তি ও সৌহার্দ্যের স্বপ্ন দেখতেন, তাতে তিনি প্রথমেই সমাজের গুণীব্যক্তিদের সংযুক্ত করতে চাইতেন। ১৯২০ সালের আগস্ট মাসে উদার-হৃদয় এই মানুষটি রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীদের যখন ওতুর দ্যু মঁদ-এ থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন, তখন তাঁর কাজ পুরোদমে চলছে। তাঁর প্রদত্ত স্কলারশিপ নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে সেসব দেশের সামাজিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে চর্চা করছেন এবং তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করছেন, ছবি তুলছেন, কখনও মুভি ক্যামেরায় ধরে রাখছেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মানুষের জীবনযাত্রা, কীর্তি ও স্থাপত্যের নিদর্শন সংগ্রহ। এই সংরক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল মানবজীবনের অপ্রতিহত যাত্রাপথটিকে তুলে ধরা ও তার অভিমুখটি নির্ণয় করা। শ্রীকানের বিশ্বশান্তির পক্ষে ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান যে ব্যক্তিভাবনা ও আদর্শজাত তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু এই কর্মযজ্ঞের ভিতর দিয়ে এক মহৎ হৃদয়ের সন্ধান মেলে। মানুষ সম্পর্কে ছিল তাঁর অসীম আগ্রহ ও ভরসা। আর ছিল ফ্রান্স সম্পর্কে তাঁর ভালোবাসা। তাঁর ধারণা ছিল, একমাত্র ফ্রান্সেই ভিন্নধর্মী ভাবনার সমন্বয় সাধন সম্ভব হবে। আলবের কানের বিশ্বসংগ্রহশালা এখনও বিদ্যমান। শত শত পর্যটক এখনও ‘আলবের-কান ম্যুজে এ জারদ্যাঁ’ বা আলবের কানের সংগ্রহশালা ও বাগান ঘুরতে যান। ঠিকানা: 10-14 Rue de Port Boulogne – Billancourt, যা Boulogne-Pont de Saint-Cloud মেট্রো স্টেশনের হাঁটা পথে।

রথীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন যে শ্রীকান ইংরেজি বলেন, কিন্তু কথা বলতে বলতে যখন উত্তেজিত হয়ে পড়েন, তখন কথা হারিয়ে ফেলেন এবং হাত নেড়ে ইঙ্গিতে বোঝাতে থাকেন। ওতুর দ্যু মঁদ-এ একদিন বিকেলে কথা প্রসঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে ব্যক্তিগত কথা বলতে থাকেন, যা তিনি বন্ধু আঁরি বের্গসন ছাড়া আর কারও কাছে প্রকাশ করেননি। তিনি জানান যে এক গোঁড়া ইহুদি পরিবারে তাঁর জন্ম, ঠাকুরদা ছিলেন রাব্বি, এই নাম থেকেই তাঁদের যাজক শ্রেণির পরিচয় পাওয়া যায়। ভাগ্যের সন্ধানে তিনি যখন প্যারিসে আসেন, তখন তাঁর পারিবারিক ও গোত্রীয় পরিচয় ছাড়া আর কিছু সঙ্গে ছিল না। যেভাবে তিনি একা তিনি টাকাপয়সা রোজগার করেছেন, সেইভাবে তিনি অর্জন করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্থান। ব্যক্তিগত প্রিয় সমস্ত কিছুকে তিনি যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করেছেন এবং এক এক করে সব বাতিল করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে এরপর তিনি এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন, যার কোনও সরাসরি উত্তর তাঁর কাছে ছিল না। এই অবস্থায় একদিন তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সের মঁতন-এ তাঁর বাড়ির সুদৃশ্য বাগানে হাঁটছিলেন, আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রের সমাবেশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সেই চরম প্রশ্নগুলি করলেন। তখন হঠাৎ-ই তিনি দিব্যদৃষ্টি লাভ করেন এবং চরম বাস্তবকে উপলব্ধি করেন— এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা, যা তাঁর বর্ণনার বাইরে। রবীন্দ্রনাথ শ্রীকানের এই অভিজ্ঞতর কাহিনি শুনে কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন তা রথীন্দ্রনাথ লেখেননি, তবে আমরা জানি একই ধরনের এক অভিজ্ঞতায় কবি রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছিল, যা ছিল তাঁর কাব্যের উৎসারকথা।

শ্রীকান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব কেমন ছিল, এবার আমরা তার পরিচয় জানার চেষ্টা করব। ওতুর দ্যু মঁদ-এর অতিথিশালায় থাকতে শুরু করার কিছুদিন পর, কন্যা মীরাকে রবীন্দ্রনাথ ২০ অগস্ট ১৯২০ এর চিঠিতে লিখছেন:

আমরা এখন প্যারিসে আছি। যাঁর আতিথ্যে আছি তিনি খুব ধনী কিন্তু ভাব-পাগলা। নিজে খুবই সামান্যভাবে থাকেন, নিতান্ত গরীবের মতো খাওয়াদাওয়া বেশভূষা চালচলন। কিন্তু মানুষের উন্নতি ও উপকারের জন্য নানারকম ভাব দিনরাত ওঁর মাথায় ঘুরচে, আর তাই নিয়ে মুক্ত হস্তে টাকা খরচ করচেন। এই যে বাড়িতে আছি এখানে ইনি দেশবিদেশের লেখক ও ভাবুক লোকদের থাকতে দেন— প্যারিস থেকে একটু তফাতে, নিরিবিলি জায়গায়, সেন নদীর ধারে, এর সঙ্গে চমত্কার একটি বাগান আছে, মস্ত একটি লাইব্রেরি, কাছেই একটি ঘর আছে, সেখানে দেশবিদেশের নানা ছবি ম্যাজিক ল্যান্টন দেখাবার বন্দোবস্ত আছে। ইচ্ছে করলে আমরা বন্ধুবান্ধবদের ডেকে নিমন্ত্রণ খাওয়াতে পারি— এ জন্যে আমাদের কোনও খরচ নেই।

(চিঠিপত্র, চতুর্থ খণ্ড)

আদর্শনিষ্ঠ ও অতিথিপরায়ণ আলবের কানকে যে রবীন্দ্রনাথের খুবই ভালো লেগেছিল, তা প্রকাশ পেয়েছে একই তারিখে অ্যানড্রুজকে লেখা এই চিঠিতে:

He is thinking great thoughts, carrying out great ideas, living the abstemious life of a tapaswi. He is devoting his immense resources for the good of humanity – not through any comfortable and respectable path of sentimental charity, but by discovering and systematically attacking the root of the evil from which human beings are suffering. It requires a stupendous amount of organised information in all branches of knowledge and human activity – and his is the kind of work about which he has thought deeply and for long, made plans, and has set a huge host of workers to carry them out. It is an amazingly comprehensive scheme for which an extraordinary power of thinking and organising is needed, above all is required that spiritual love of ideal which does not depend for its fire upon repeated supplies of fuel of immediate success. It is an inspiration for me to know this man and to talk to him. I feel clearly when I am in touch with men of his type that the ultimate reality for man’s life in the world of ideas, where he is emancipated from the gravitational pull of the dust and where he realises that he is spirit.

(রবিজীবনী-৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১)

স্পষ্টতই আলবের কান সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই ধারণার কোনও পরিবর্তন হয়েছে, এমন তথ্য আমাদের নজরে আসেনি। তবে শ্রীকানের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক ছিল। বিশেষ করে, বিভিন্ন দেশ থেকে যে প্রতিবেদনগুলো জমা হত ওতুর দ্যু মঁদ-এ, সেগুলো সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সংশয় ছিল। যেমন, প্রাচ্য দেশগুলো ঘুরে লোয়েস ডিকিনসন যে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন, কবির তা পছন্দ হয়নি এবং তিনি তা শ্রীকানকে জানিয়েওছিলেন। এছাড়া ভারতের কাউকে দেশভ্রমণের বৃত্তি দেওয়া হয়নি, এই অনুযোগও করেন তিনি। শ্রীকান জানান যে ভবিষ্যতে তিনি অবশ্যই কাউকে বৃত্তি দিয়ে ভারতে পাঠাবেন। ১৯২১-এর ১৭ জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক থেকে অ্যানড্রুজকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য বিষয়ে ডিকিনসনের প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আলবের কানের বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ-তৈরির উদ্দেশ্যটি কবির মনঃপুত ছিল। এমনকি, বিশ্বভারতীতেও শ্রীকানের পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা তাঁর মনে হয়েছিল। অ্যানড্রুজকে লেখা চিঠিতেই তার প্রমাণ পাই:

He is gathering information about the life of all humanity – making them vivid by the help of its vast and worldwide organisation for taking cinema pictures and coloured photos. We shall follow his path in our institution restricting our scope within India. We shall take with us some of his best artists and some our students will be trained by them. It will an wonderful opportunity for those who will be ready for such work. If any of our students do not want to learn this let them learn French. It is a profession – taking cinema pictures – which can never be learnt in our country.

(Letters from Abroad, ১৯২৪)

রবীন্দ্রনাথের এই উদ্দেশ্য অবশ্যই ফলপ্রসূ হয়নি, কিন্তু শ্রীকানের সাহায্যে ফ্রান্সের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের একটা যোগসূত্র তৈরির কথা মনে এসেছিল।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলবের কানের ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা। রবীন্দ্রনাথও এই মানুষটির শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ ছিলেন। এই কারণে ১৯২০ থেকে ১৯৩০— যতবার রবীন্দ্রনাথ ফ্রান্সে গেছেন, শ্রীকানের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। প্যারিস থেকে লেখা ২৫ জুলাই ১৯২৬-এর চিঠিতে শ্বশুরমশাই প্রবোধচন্দ্র মহলানবিশকে নির্মলকুমারী লিখেছেন:

মঁসিয়ে কান কবিকে অসাধারণ ভালোবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন। রবীন্দ্রনাথ এখানে এলে ওঁর বাড়িতেই থাকেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোক কবিকে পেয়ে খুব খুশিতে আছেন। আমরাও তাঁর সঙ্গী বলে আদর-যত্ন খুবই পাচ্ছি।

(কবির সঙ্গে য়ূরোপে, পৃষ্ঠা ১০৪)

১৯২০ সালে, অর্থাৎ প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ প্যারিস ত্যাগ করে আমস্টারডামের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার আগের রাতে (১৭ সেপ্টেম্বর) এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল বলে তিনি নিজেই অ্যানড্রুজকে চিঠিতে জানাচ্ছেন:

Our kind host Mr. Kahn is genuinely sorry that we have to go at last. Last night he thanked me with a touch of tears in his voice, for having accepted his hospitality. He said in the generosity of his love that his house has been sanctified by my touch.

হৃদ্যতার পরিধি শুধু যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আতিথেয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা এই ঘটনায় প্রমাণ মেলে। রবীন্দ্রনাথ যখন ইউরোপ ও আমেরিকা ভ্রমণ করে পুনরায় প্যারিসে ফিরে আসেন, তখনও, ১৬ এপ্রিল, ১৯২১, তাঁর প্রথম বিমানভ্রমণ শেষে কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে হাজির ছিলেন শ্রীকান। শুধু তাই নয়, তাঁর উদ্যোগেই বিমান অবতরণের দৃশ্যটির চলচ্চিত্র গ্রহণ করা হয়। তারপর তিনি সবাইকে ওতুর দ্যু মঁদ-এ নিয়ে যান। এই চলচ্চিত্রগ্রহণের কাজ তিনি আগেও করেছেন। প্রথমবারেও তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যখন বাগানে বেড়াচ্ছিলেন, সে দৃশ্যও চলচ্চিত্রে ধরে রাখা হয়েছিল। সে ছবি পরে কবিকে দেখানোও হয়েছে। শ্রীকান এই ফিল্মের কপি শান্তিনিকেতনে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দেন। যদিও শান্তিনিকেতনে এমন কোনও ছবির সন্ধান মেলেনি। ছবিটি যে শান্তিনিকেতনে দেখানো হয়েছিল, তা কারও কারও আত্মকথায় বলা হয়েছে। কিন্তু, ফিল্মটি শান্তিনিকেতনে সংরক্ষিত হয়নি কিংবা কোনওভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে।

আমাদের মনে রাখতে হয় যে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধূকে সঙ্গে করে প্রথমবার যখন আকস্মিকভাবে প্যারিসে এসে পৌঁছোন, তখন প্যারিসের সঙ্গে তাঁদের কোনও পূর্ব যোগাযোগ ছিল না। রোম্যাঁ রলাঁ ও আদ্রেঁ জিদের সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ থাকলেও তাঁদের সঙ্গে চাক্ষুষ আলাপ হয়নি এবং অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র তৈরি হয়নি। ওতুর দ্যু মঁদ–এ বাস ও আলবের কানের আতিথেয়তাই এই অপূর্ণতা পূর্ণ করে দিয়েছে। প্যারিসের সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সব মানুষের সঙ্গেই শ্রীকানের ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক। শ্রীকান ও দার্শনিক আঁরি বের্গসন বয়সের দিক থেকে প্রায় সমান হলেও তাঁদের সম্পর্ক প্রথম দিকে ছিল ছাত্র-শিক্ষকের। পড়াশুনোর জন্যই শ্রীকান spinger প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বের্গসনের সংস্পর্শে আসেন এবং ক্রমশ তাঁদের মধ্যে ‘amitié intellectuelle’ বা ইন্টেলেকচুয়াল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ফলত তাঁদের মধ্যে প্রচুর চিঠিপত্রেরও আদানপ্রদান হয়। বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষিতে তাঁদের কর্মধারা, জীবন ইত্যাদি বিষয়ে একে অপরকে চিঠি লিখেছেন। ২০০৩ সালে এই চিঠিপত্রের একটি সঙ্কলন সম্পাদনা করেছেন সোফি ক্যুরে ও ফ্রেদেরিক ওর্ম— Henri Bergson et Albert Khan: Correspondances, যা এই দুই মানুষের গভীর সম্পর্কের পরিচয় বহন করছে।

রবীন্দ্রনাথ যখন ওতুর দ্যু মঁদ-এর অতিথি, বের্গসন তখন কলেজ দ্য ফ্রাঁস-এ দর্শনের অধ্যাপক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর দর্শন সম্পর্কে অবহিত জেনে শ্রীকান বের্গসনকে আমন্ত্রণ জানান। বের্গসন এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনিও রবীন্দ্রনাথের রচনা আগেই পাঠ করেছিলেন, বিশেষ করে, তাঁদের মধ্যে আলোচনায় তিনি ‘সাধনা’ ও ‘পারসোনালিটি’-র প্রসঙ্গ তোলেন। পরের বারও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে যান বের্গসন।

ওতুর দ্যু মঁদ-এ থাকার সময়ই শিল্পী শ্রীমতী আদ্রেঁ কার্পেলেস ও তাঁর বোন সুজান কবির সঙ্গে রোজই দেখা করতে আসতেন। অধ্যাপক সিলভ্যা লেভি-ও এখানে প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের কাছে আসতেন। শ্রী ওবের নামে এক বিশিষ্ট ব্যক্তি শ্রীকানের আমন্ত্রণেই রবীন্দ্রনাথের কাছে আসেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। শ্রীকান-ই সে সময়ের ফ্রান্সের বিশিষ্ট কবি আনা কঁতেস দ্য নোয়াইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবার জন্য। কঁতেসকে কান ব্যক্তিগতভাবে খুবই পছন্দ করতেন। রথীন্দ্রনাথের কথায়, কানের কাছে কঁতেসই একমাত্র দ্য পোয়েট। রথীন্দ্রনাথের টিপ্পনিও সঙ্গে আছে— এত প্রশংসার কারণ তাঁর কবিত্ব বা বুদ্ধিমত্তা নয়, তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য। রথীন্দ্রনাথের ধারণা, এই নারীটিকে কান নিঃশব্দে ভালোবাসতেন, কিন্তু কখনও প্রকাশ করেননি। কঁতেস কথা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে জানান যে জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণার দিন তিনি প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমঁস-র সঙ্গে ছিলেন এবং ভারাক্রান্ত মনে তাঁরা ফরাসিতে অনূদিত রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পড়তে শুরু করলে যুদ্ধের কথা তাঁদের আর মাথায় ছিল না। আনা দ্য নোয়াইয়ের সঙ্গে পরেও রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছে। ১৯৩০ সালে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনীতে তিনি সহায়তা করেছিলেন এবং ছবির ক্যাটালগের ভূমিকাটি ছিল তাঁরই রচনা।

উনিশশো তিরিশের মার্চ মাসে রবীন্দ্রনাথ যখন ফ্রান্সে গেলেন ফরাসিদের কাছে তাঁর ছবির ডালি হাতে করে, তখন আলবের কানের আর্থিক সচ্ছলতা নেই, বিপর্যয়ের কারণে তাঁর ওতুর দ্যু মঁদ এর কর্তৃত্ব সাময়িকভাবে হাতছাড়া হয়েছে। তবু রবীন্দ্রনাথকে ভোলেননি কান। তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন দক্ষিণ ফ্রান্সের কাপ মাত্যাঁয় তাঁর প্রাসাদোপম বাড়ি ‘ভিলা কান’-এ। এখান থেকে পরে তিনি প্যারিসে গেছেন এবং এই প্রথম তিনি ওত্যুর দ্যু মঁদ-এ ওঠেননি।

মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোত রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ ও সংযোগের মাধ্যম হিসেবে তাঁর প্যারিসবাসের ভূমিকা অপরিসীম। আর এখানেই সোসাইটি ওতুর দ্যু মঁদ ও তার প্রতিষ্ঠাতা আলবের কান-এর গুরুত্ব। শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আন্তরিকতায় আত্মীয়তার বন্ধনে তিনি বাঁধা পড়েছিলেন প্রাচ্যদেশের এই কবির সঙ্গে।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...