দক্ষিণবঙ্গের বন্যা— কার পাপে?

দীপঙ্কর দে

 

অনেকে এখনও এমন ধারণা পোষণ করেন যে বড় বাঁধ, উন্নত সেচ প্রযুক্তি কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলার মানুষের কাজে এসেছে। আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই প্রবন্ধে আমরা বোঝার চেষ্টা করব যে বাংলাভাগের পর কীভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই বাংলার নদী খাল ও সেচ প্রকল্পকে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে।

দক্ষিণবঙ্গে মাত্র কয়েকদিনের তুমুল বৃষ্টিতে অন্যসময় মজে থাকা নদনদীগুলো, যেমন দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী, বরাকর, কংসাবতী, রূপনারায়ণ, হুগলি, এদের কেউ না কেউ অথবা অনেকেই দুকূল ছাপিয়ে যায়। ভাসিয়ে দেয় মাঠঘাট, ফসল, ভিটে, গোয়াল… গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ডিভিসি বাঁধের জল ছাড়ে যখন তখন… জলের তোড়ে ভেসে যায় মানুষ, গবাদি পশু, কাঠের সাঁকো… অতিবৃষ্টি হলে এসব দক্ষিণবঙ্গের মানুষের নিত্যকার অভিজ্ঞতা।

মানুষসৃষ্ট এই সর্বগ্রাসী সর্বনাশা বন্যার হাত থেকে রেহাই পেতে রাজ্য সরকার বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল দামোদরের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন নদীবাঁধ বাঁধাতে, যাতে বন্যার হাত থেকে সাময়িক রেহাই পাওয়া যায় ও প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া নদী-খাল ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার খানিক উন্নতি করা যায়। এতে সত্যি কোনও উন্নতি সাধিত হল কি?

সেই প্রশ্ন যাওয়ার আগে আমরা দেখে নেব কীভাবে পরিকল্পিত উপায়ে শেষ করা হয়েছিল প্রায় ৪০০০ বছর ধরে চলে আসা দামোদর উপত্যকার দেশজ সেচব্যবস্থা!

১৯৪৮ সালে নেহরুর উদ্যোগে সূচনা হয় ‘দামোদর বহুমুখী পরিকল্পনা’। সেই সময় বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য যা যা আশঙ্কা করেছিলেন ঠিক তাই ঘটেছে। উচ্চ দামোদরে বাঁধ দেওয়ায় নিম্ন দামোদরে নদী মজে গেছে। দামোদরের সাথে যুক্ত বহু নদীতে পলি জমে নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে প্রতিবছর। ফলে বন্যার প্রকোপ বেড়েছে, কলকাতা বন্দর ধুঁকছে।

নতুন করে আবার আমরা কপিলবাবুর কথা শুনব। বুঝতে চাইব বাংলা-বিরোধী ষড়যন্ত্রের গভীরতা ও চিনব ষড়যন্ত্রীদের আসল পরিচয়।

যেকথা বলছিলাম, দামোদরে বাঁধ দেয়ার রেওয়াজ নাকি বহু পুরনো, ৪০০০ বছর তো হবেই! তবে সে বাঁধ বেশি উঁচু হত না। আর প্রতিবার বন্যার সময় বাঁধ কেটে কৃষকেরা জমিতে পলি ও মাছ প্রবিষ্ট করিয়ে নিতেন। এই নিয়ন্ত্রিত বন্যার ব্যবস্থা কৃষকেরা নিজেরাই যৌথভাবে সম্পন্ন করতেন। সরকারি কর্তৃত্ব তেমন ছিল না। তাই নিয়ন্ত্রিত বন্যার সুফল ভোগ করার জন্যে তাদের কোনও রাজস্ব বা কর দিতে হত না। রোদ বৃষ্টি ও বায়ুর মতো বন্যার প্রাকৃতিক সম্পদ (পলি ও মাছ) তারা বিনামূল্যেই উপভোগ করতেন।

কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সময় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারি প্রথা প্রচলিত হওয়ার পর বাঁধগুলো জমিদারের অধীনে চলে গেল, ৪০০০ বছর ধরে যা প্রজাদের অধীনে ছিল। বন্যার সময় বাঁধ কেটে পলি ও মাছ প্রবিষ্ট করার হাজার বছরের অধিকার কেড়ে নিল জমিদার। ভেঙে পড়ল প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা।

প্রজাদের হাত থেকে দামোদরের নিয়ন্ত্রিত বন্যার কৌশল কেড়ে নেয়ার ফলে অকস্মাৎ কোনও কোনও বছর দামোদর তার দৃঢ় বাঁধ ভেঙে ফেলে গ্রাম ফসল বসতি ভাসিয়ে নিত। ১৮৫৫ সালের বন্যায় খাস বর্ধমান শহরকেই ভাসিয়ে দেয়। এইসব বাঁধভাঙা বন্যাই আধুনিক কালে দামোদরের উদ্দাম বন্যার ধ্বংসলীলা বলে পরিচিত। কালে কালে দামোদর ‘দুঃখের নদ’ বলে জনমানসে পরিচিত হল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে জিটি রোড ও রেল লাইনগুলোকে দামোদরের বন্যা থেকে বাঁচাতে বামপাড়ের বাঁধগুলোর উচ্চতা ও দৃঢ়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। পলিমিশ্রিত বন্যার জল রাজপথে ও রেলপথের বাঁকে আটকা পড়তে থাকে। এভাবে রাজপথের অপর পাড়ের ভূমি ক্রমশ অনুর্বর হতে থাকে।

১৯৪০ সালে দামোদরের বন্যা ৫০ বর্গ কিলোমিটার জমি নিমজ্জিত করেছিল। রাজপথ ও রেললাইনের ক্ষতি করেছিল প্রচুর। যুদ্ধের সময় রেল ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সরকার আমেরিকার টেনিসি ভ্যালি পরিকল্পনার অন্ধ অনুকরণে দামোদরভ্যালি পরিকল্পনার কথা বিবেচনা করে। ১৯৪৫ সালে ভারত সরকার টেনেসি ভ্যালির এক কর্মচারীকে বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত করে। তাঁর প্রাথমিক রিপোর্ট পড়লে জানা যায় যে তিনি জানতেন দামোদরের উচ্চ উপত্যকায় যতগুলি বন্যানিরোধী বাঁধ নির্ণয় করা সম্ভব হোক না কেন, নিম্নভাগের প্লাবন রোধের ক্ষমতা তাদের থাকবে না। তাই চাই দামোদর-রূপনারায়ণের জলনিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন। উচ্চ দামোদরে যত জলাধারই নির্মাণ করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সর্বনিম্নের বন্যানিরোধী পাঞ্চেত ও মাইথন জলাধার থেকে কোনও না কোনও সময়ে সর্বোচ্চ আড়াই লক্ষ কিউসেক জল ছাড়ার বাধ্যতা থাকবেই। আর দুর্গাপুর ব্যারাজ দিয়ে সেই পরিমাণ জল নিম্ন দামোদরে ছাড়বার সময় যদি নিম্নাঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হতে থাকে এবং দ্বারকেশ্বর, কাঁসাই, রূপনারায়ণ যদি ভরা থাকে, তা হলে নিম্নাঞ্চলে প্লাবন হবেই।

টেনেসি ভ্যালির বিশেষজ্ঞ তাঁর প্রাথমিক রিপোর্টে কিন্তু এই আশঙ্কার কথা স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ ‘স্বাধীন’ হওয়ার একবছরের মধ্যেই নেহরু তড়িঘড়ি দামোদর পরিকল্পনার কাজ শুরু করে দিলেন। নিম্নাঞ্চলের জলনিকাশ ব্যবস্থা সে পরিকল্পনায় স্থান পেল না।

দামোদর-রূপনারায়ণ-হুগলির জলনিকাশ ব্যবস্থা ডিভিসির আওতায় পড়ে না। ওরা প্লাবন করিয়ে খালাস! আগাম জেনেও বাংলাকে প্লাবিত করার নেহরুর এই পরিকল্পনাকে ‘চক্রান্ত’ ছাড়া আর কীই বা বলা যেতে পারে!

দামোদর প্রকল্প শুরুর আগেই ব্রিটিশ সরকার নিয়োজিত বিশেষজ্ঞরা যা যা সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলেন, প্রায় একই ধরনের আশঙ্কার কথা বারবার বলে আসছিলেন বাংলার নদীবিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য। কেউ তাঁর কথা শোনেনি, না নেহরু না বাংলার তৎকালীন নেতৃবৃন্দ। আমরা দেখব ডিভিসির কল্যাণে বাংলার, বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে কী কী ক্ষতি হয়েছে—

১। তৎকালীন বিহার প্রদেশে উচ্চ দামোদরে বাঁধ দিয়ে বন্যা নিরোধের ফলে নিম্নাঞ্চলের অধিবাসীরা গত ৪০০০ বছর ধরে যে সব সহজাত অধিকার পেয়ে আসত তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর সুরাহা করতে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একটা উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে। বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ফলে নদীর দুপাড়ের চাষিরা চিরকালের জন্যে ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধিকারী পলিমাটি থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন। ডিভিসি কর্তৃপক্ষ এই বিশাল ক্ষতির কোনও সুরাহা করেননি, উল্টে সিন্দ্রিতে একটি সার কারখানা নির্মাণ করেছেন রাসায়নিক সার উৎপাদনের জন্যে! ৪০০০ বছর ধরে ব্যবহৃত নদীর পলিমাটি থেকে বঞ্চিত করার জন্যে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারতেন নিম্ন দামোদরের কৃষক সমাজ। সে দাবি কেউ করলেন না।

২। টেনেসি ভ্যালির অন্ধ অনুকরণে ডিভিসি রূপায়ণ করতে গিয়ে গোটা দক্ষিণবঙ্গের যে প্রচণ্ড ক্ষতি হয়েছে তার সমাধান আজও অধরাই থেকে গেছে. সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হল কলকাতা বন্দর, যা প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এমনটি হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু কেন? কোথায় দামোদর আর কোথায় কলকাতা!

কপিলবাবু বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন (১৯৫৩)—

দামোদরের বন্যা নিরুদ্ধ হয়ে গেলে কলকাতা বন্দরের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে… পশ্চিমবঙ্গ সম্পূর্ণ শ্রীহীন পরমুখাপেক্ষী ভিক্ষুক রাজ্যে পরিণত হবে।

একটু ব্যাখ্যা করা যাক—

দামোদরের ছোট ছোট বন্যাগুলি সারা বছর ধরে জোয়ারে আনীত পলি, আষাঢ় মাসে নদীগর্ভ কেটে ভাসিয়ে নিয়ে আবার সমুদ্রে ঠেলে ফেলে দিত। ডিভিসি পরিকল্পনার পূর্ববর্তী সময়ে শ্রাবণ ভাদ্র অশ্বিন মাসে নিম্ন হুগলির ভাটার টান এত জোরালো থাকত যে সে সময় জোয়ারের উজান গতি সামান্যই দেখা যেত। দামোদরের বন্যা হুগলির মোহনার মুখেও পলি জমতে দিত না, তাই কলকাতা বন্দরের বড় জাহাজ সহজেই ভিড়তে পারত।

কিন্তু পাঞ্চেত ও মাইথন-এ বাঁধ দেবার পর ভাগীরথী, হুগলি ও নিম্ন দামোদরের অববাহিকা এলাকায় নদীর গভীরতা হ্রাস পেতে থাকে। কমতে থাকে নদীর জল ধারণ ও নিষ্কাশনের ক্ষমতা। ফলস্বরূপ ১৯৪৩ সালে দামোদরের বন্যায় যেখানে মাত্র ৫০ বর্গমাইল প্লাবিত হয়েছিল, সেখানে গঙ্গা পদ্মার দক্ষিণে প্রায় ৪৭৩৪ বর্গমাইল প্লাবিত হয়েছিল। আর ১৯৪৯ সালের মহাপ্লাবনে প্রায় ১০,৯৩০ বর্গমাইল এলাকায় ধ্বংসলীলা চলেছে।

১৯৫৯ সালে বন্যার সময় দেখা গেল ভাগীরথী হুগলি নদীর সর্বোচ্চ জল নিষ্কাশন ক্ষমতা (maximum discharge capacity) ১৯৫৪ সালের তুলনায় ৫০% বিনষ্ট হয়ে অর্ধেকে পরিণত হয়েছে ডিভিসির বাঁধ নির্মাণের ফলে।

তাছাড়া জলঙ্গি, চূর্ণী, ময়ূরাক্ষী, অজয়, দামোদর, রূপনারায়ণসহ প্রত্যেকটি উপনদীরই জলনিকাশ ক্ষমতা বিশেষভাবে হ্রাস পেয়েছে তাদের ভাগীরথী হুগলির সঙ্গমের কাছে পলির কঠিন স্তর সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৫৪ সালের পূর্বে নিম্ন দামোদরের জলনিকাশ ক্ষমতা ছিল প্রায় ৫০০০০ কিউসেক, ১৯৫৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২০০০০ কিউসেক। ১৯৭০-৭১ সালে দেখা গেল অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। তাই আগে প্লাবনের পর জল নামতে বড়জোর সপ্তাহখানেক সময় নিত। ৭০-৭১ সালে প্লাবনের পর জল নামল প্রায় মাসখানেক পর… ডিভিসির কল্যাণে।

৩। পূর্ব আশঙ্কামতো দামোদর পরিকল্পনার কুফল কলকাতা বন্দর যখন প্রায় অচল হয়ে পড়ল ভাগীরথী হুগলিতে পলি ও চড়া পড়ে, তখন ১৯৫০-এর শেষভাগে কেন্দ্রীয় সরকার বের করল তাদের দ্বিতীয় তাস।

তারা ঠিক করলেন বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজের জন্যে কলকাতার ৬০ মাইল দক্ষিণে হলদিয়ায় একটি নতুন বন্দর গড়বেন। আর তার সাথে ঠিক হল গঙ্গায় ফরাক্কার কাছে বাঁধ বেঁধে একটি খালের সাহায্যে ভাগীরথীর খাতে কিছু গঙ্গাজল প্রবিষ্ট করানো হবে কলকাতা বন্দর সচল রাখতে। ডিভিসিতে বাঁধ দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের নদনদীগুলো ও কলকাতা বন্দর ধ্বংস করার পর শুরু হল উত্তরবঙ্গ ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের নদনদী ধ্বংস করার চক্রান্ত।

যদিও নেহরু বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে বুঝিয়েছিলেন যে ফরাক্কা ব্যারাজ দরকার কলকাতা বন্দরের স্বার্থেই, কিন্তু নদীবিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই বলে আসছিলেন এভাবে সমাধান হবে না। তিনি বলেছিলেন ফরাক্কায় গঙ্গা বাঁধ নির্মিত হলে অবস্থা আরও জটিলতর হবে। কারণ—

(ক) শুকনার মরশুমে ফরাক্কার কাছে প্রয়োজনীয় ৪০ হাজার কিউসেক জল পাওয়া যাবে না। সে সময় খুব বেশি হলে জলের পরিমান দাঁড়াবে ২০/৩০ হাজার কিউসেক। তাই কলকাতা বন্দর বাঁচাতে খাল কেটে ভাগিরথীতে ৪০ হাজার কিউসেক জল প্রবিষ্ট করার পরিকল্পনা আসলে একটি ডাহা ধাপ্পা। বাস্তবে তাঁর কথাই প্রমাণিত হয়েছে। যদিও ফরাক্কা ব্যারাজের বিরোধিতার জন্যে আনন্দবাজার পত্রিকা তাঁকে পাকিস্তানের চর বলে দেগে দিয়েছিল। ফলে তাঁকে চাকরিটিও খোয়াতে হয়েছিল।

(খ) পদ্মাতেও (পূর্ববঙ্গে গঙ্গার নাম পদ্মা) জোয়ার ভাঁটা খেলে। কাজেই ফরাক্কা ব্যারেজে গঙ্গায় শুকনো দিনে জলপ্রবাহ ব্যাহত হলে জোয়ারে আনীত পলি গঙ্গার গর্ভ ভরাট করে দিয়ে পদ্মার খাতের ঢাল হ্রাস এবং বিপরীতমুখী করে দেবে। তার ফলে বন্যার সময় ব্রহ্মপুত্রের জলও পদ্মার উজানে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, জলঙ্গী, চূর্ণী, ইছামতী প্ৰভৃতি মারফত বাংলায় প্লাবন সৃষ্টি করবে। ব্যারাজ নির্মাণের পর ৭০-৭১ সালের প্লাবন প্রমাণ করেছে তাঁর আশঙ্কা কতটা সত্যি ছিল।

(গ) প্রবল বন্যার সময় গঙ্গার জলপ্রবাহ যে গঙ্গার খাতকে কেটে ৫০-১৫০ ফুট পর্যন্ত গভীরতর করে দিত কংক্রিট-এর বাঁধ নির্মাণের ফলে তা আর সম্ভব হবে না। সুতরাং গঙ্গার সর্বোচ্চ জলনিষ্কাশন ক্ষমতা ভীষণভাবে হ্রাস পাবে। গঙ্গায় উদ্বৃত্ত জল প্রবাহ কোথায় যাবে? তিনি লিখেছেন “আমাদের বুঝতে বিলম্ব হয়নি, ফরাক্কা ব্যারেজের বন্যা উপচে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা প্রতিবছরই প্লাবিত করবে। পাটনা, বারুনী, উত্তর মুঙ্গের, ভাগলপুর ও পূর্ণিয়া জেলাও প্রতিবছরই ডুববে। বিহারে গঙ্গার খাত ক্রমশ আরও মজে যাবে, ব্যারেজের প্রতিবন্ধকে জলের গতি মন্থর হবে। বন্যায় বাহিত পলি নদীগর্ভে পতিত হবে।” (সূত্র: ‘বিচিত্রা’, এপ্রিল-মে ১৯৭৩) ১৯৭১-৭২ সালের বন্যা তাঁর আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। তার পাঁচ দশক পর বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও ঠিক একই কথা বলেছেন।

(ঘ) ফরাক্কা ব্যারাজের কাছে মালদহ জেলাকে রক্ষার তাগিদে গঙ্গার পাঁড়ে বাঁধের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির ফলে বিহারের পূর্ণিয়া জেলায় কুশি নদীর মোহনার পথে গঙ্গার জল প্রবেশ করবে। ক্রমে ওই পথে গঙ্গা তার নতুন খাত সৃষ্টি করে ফরাক্কা ব্যারাজকে পরিক্রমণ করে গঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।

গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে নদী ভাঙন কি তারই ইঙ্গিত?

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ফরাক্কা ব্যারাজ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। বাংলার দুর্ভাগ্য ছয় দশক আগে রাজ্যের কোনও রাজনৈতিক নেতার দামোদর ও গঙ্গা বাঁধের বিরোধিতা করার সৎসাহস ছিল না। থাকলে আজ কলকাতা বন্দর ধ্বংস হত না, গোটা রাজ্য নদী ভাঙন আর বাৎসরিক বন্যায় জেরবার হত না।

 

সূত্র: কপিল ভট্টাচার্য। স্বাধীন ভারতের নদনদী পরিকল্পনা, ১৯৮৬।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...