রায়লসীমায় বালুকা বৃষ্টি

পড়গুম্মি সাইনাথ

 

নিবন্ধটি পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া (পারি)-তে গত ৮ জুলাই ২০১৯-এ প্রকাশিত এবং পারির অনুমতিক্রমে পুনর্মুদ্রিত।

যে কোনও ভারতীয় সিনেমায় মরুভূমিতে মারকাটারির দৃশ্য মনে করুন। বালিয়াড়ি আর নিম্নভূমি, সঙ্গে ইতস্তত লতাগুল্মের প্রেক্ষাপট পেছনে রেখে ধু-ধু প্রান্তরে গনগনে বালি থেকে সিনেমার নায়ক উঠে আসছে খলনায়ককুলকে মেরে তক্তা বানানোর মহান ব্রত নিয়ে! প্রকৃতির বদান্যতায় ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত এবং ধূলিধূসরিত পরিবেশে আরও ধুলো উড়িয়ে, আরও তাপ বাড়িয়ে অবশেষে নায়ক সিনেমাকে সুখ-সমাপ্তিতে নিয়ে যায় (খলনায়কদের অবশ্য কপাল মন্দই!)। অগণিত ভারতীয় চলচ্চিত্রের এইসব দৃশ্যের শুটিং হয়েছে রাজস্থানের জনমানবশূন্য খাঁ খাঁ মরুপ্রান্তরে। কিংবা মধ্যপ্রদেশের চম্বল উপত্যকার ঊষর ঘাঁটিতে।

তবে, ঊষর ধু-ধু প্রান্তরের এই দৃশ্যটি (ভিডিও ক্লিপটি দেখুন) রাজস্থান বা চম্বলের কোনও স্থান মোটেই নয়। এই দৃশ্য অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণের সুদূর বদ্বীপ অঞ্চলের রায়ালসীমা এলাকায় গৃহীত হয়েছে। অনন্তপুর জেলার প্রায় ১০০০ একর বিশিষ্ট এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডটি এককালে বাজরায় ভরে থাকত– বিগত বেশ কয়েক দশকে এই ভূখণ্ড মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নানান পরস্পরবিরোধী কারণে এই ভূখণ্ডের আজ এমন চেহারা দাঁড়িয়েছে যার সন্ধানে চলচ্চিত্র নির্মাতারা নিজেদের শাগরেদদের প্রায়শই পাঠিয়ে থাকেন।

এই ভূখণ্ডটির অধিকাংশ জমির মালিক বসবাস করেন যে দরগা হোন্নুর গ্রামে, সেখানে লোকে বিশ্বাস করতে নারাজ যে আমরা সিনেমার জন্য স্থান নির্বাচন করতে আসিনি! “কোন সিনেমার জন্য? কবে বেরোবে?”— রাখঢাক না করেই এটা জিজ্ঞেস করছিলেন অনেকে, যাঁরা প্রশ্ন করছিলেন না তাঁদেরও যে মাথায় এটাই ঘুরছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই! যেই না জানা গেল আমরা সাংবাদিক, অমনি লোকের আগ্রহে ভাঁটা পড়ল।

জয়ম মানাডে রা (আমাদের জয়) নামের তেলুগু চলচ্চিত্র নির্মাতারা ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সিনেমার মারামারির এই দৃশ্যগ্রহণ করেন, তাতেই এই স্থান বিখ্যাত হয়ে উঠল। যে কোনও অধ্যাবসায়ী বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাতার মতো তাঁরাও মরুভূমির প্রেক্ষাপটকে আরও জোরদার করতে নিজেদের ‘সেট’টিকে সেইমতো দিব্যি প্রস্তুত করে ফেললেন। বছর ৪৫-এর পূজারি লিঙ্গান্নার এই ভূখণ্ডটিতে ৩৪ একর জমি আছে, তিনি বলছেন, “আমাদের সমস্ত ফসল মাটি থেকে উপড়ে ফেলতে হল। এছাড়া বেশ কিছু শাকসবজি এবং ছোট গাছও উপড়ে ফেলা হল যাতে আরও বাস্তবসম্মত দেখায়।” বাকি কীর্তি কুশলী ক্যামেরা এবং ফিল্টারের সুচতুর ব্যবহারের।

জয়ম মানাডে রা-এর নির্মাতারা আজকের দিনে বছর কুড়ি পরের পর্বটির শুটিং করলে এত কাঠখড় পোড়াতেই হত না! কালের প্রকোপ ও বিধ্বস্ত প্রকৃতি এবং মনুষের অবিরাম হস্তক্ষেপ— এইসব মিলিয়ে মরুভূমির এমন বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, যে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মুশকিল আসান হয়ে গেছে!

কিন্তু এ এক অদ্ভুত মরু-খণ্ড। এখনও এখানে চাষবাস হয়— কারণ ভূ-জলের অস্তিত্ব এখনও মাটির খুব কাছাকাছি। লিঙ্গান্নার ছেলে হোন্নুরেড্ডির কথায়, “এই জমিতে আমরা মাটির ১৫ ফুট নিচেই জল পেয়ে যাই। অনন্তপুরের অধিকাংশ জায়গাতেই ৫০০-৬০০ ফুট ব্যতীত বোরওয়েল ভূ-জলের নাগাল পায় না। এমনকি জেলার কোনও কোনও অংশে ১০০০ ফুটের অধিক না খনন করার নিয়মও লঙ্ঘিত হচ্ছে। অথচ এখানে আমরা যখন কথা বলছি, তারমধ্যেই চার ইঞ্চি বোরেওয়েল থেকে গলগল করে জল বেরোতে শুরু করল। এই তপ্ত বালুকাময় ভূখণ্ডে এত জল, তাও আবার ভূপৃষ্ঠের এত কাছে?

নিকটবর্তী এক গ্রামের কৃষক পালথুরু মুকান্না ব্যাখ্যা দেন, “আসলে পুরো এলাকাটাই একটা বিস্তৃত নদী অববাহিকায় অবস্থিত।” নদী? কই, আমরা তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না! “[প্রায় পাঁচ] দশক আগে এই অঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বেদবতী নদীতে হোন্নুর থেকে প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। আমাদের দিকে বেদবতী (তুঙ্গভদ্রার উপনদী— আঘারী নামেও পরিচিত) নদীর যে অংশটা বইত তা শুকিয়ে গেছে।”

“ঠিক এটাই ঘটেছে,” বলেন ইকোলজি সেন্টারের (অনন্তপুরের গ্রামীণ উন্নয়ন পরিষদের অন্তর্গত) মাল্লা রেড্ডি, তাঁর মতো করে এই অঞ্চলকে খুব কম লোকেই চেনে। “তবে নদীটা মৃত হলেও, কয়েক শতাব্দী ধরে এটি একটি ভূগর্ভস্থ জলাধার তৈরি করতে সাহায্য করেছে যেখানে এখন অকাতরে খনন এবং জল নিষ্কাশন চলছে। যে দুর্বার গতিতে এসব হচ্ছে তা আসন্ন দুর্যোগের সঙ্কেত বহন করছে।”

আর এই দুর্যোগ এল বলে। এই মরুপ্রায় অঞ্চলে ১২.৫ একর জমির মালিক ৪৬ বছর বয়সী কৃষক ভি এল হিমাচল বলছেন, “বছর কুড়ি আগে এখানে বড় জোর একটা বোরওয়েল ছিল। এখানে চাষ প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বৃষ্টিনির্ভর ছিল। এখন এই হাজার একর জমিতে ৩০০-৪০০ বোরওয়েল বসেছে। আর মাত্র ৩০-৩৫ ফুট খুঁড়লেই জল পেয়ে যাই, কখনও কখনও আরেকটু বেশি।” অর্থাৎ, প্রতি তিন একর জমিতে একটি করে বোরওয়েল।

মাল্লা রেড্ডির কথা মতো এখানে জমি প্রতি বোরওয়েলের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, এমনকি অনন্তপুর জেলার সামগ্রিক বিচারেও। অনন্তপুর জেলায় ২৭০,০০০ বোরওয়েল আছে, যদিও জেলার বোরওয়েল বহন করার ক্ষমতা মাত্র ৭০,০০০। এই বিশাল সংখ্যার প্রায় অর্ধেক এই বছর শুষ্ক।”

বিশ বছর আগে, পূজারি লিঙ্গান্না (বাঁদিকে: তাঁর পুত্র পি হোন্নুরেড্ডির সঙ্গে ডানদিকে), চলচ্চিত্রটির শুটিংয়ের জন্য গাছগাছালি উপড়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন। কালের প্রবাহ ও বিধ্বস্ত প্রকৃতির দৌলতে মরুভূমির এমন বাড়বাড়ন্ত হয়েছে যে এখন আর আলাদা করে কিছু করার দরকার নেই (ছবি: বাঁদিকে: রাহুল এম/পারি। ডানদিকে: পি সাইনাথ/পারি)

তাহলে এই অভিশপ্ত জমিতে বোরওয়েলের দরকারটাই বা পড়ছে কেন? কী এমন চাষ করা হচ্ছে এখানে? আমরা যে ভূখণ্ডে এসেছি সেখানে যে ফসল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তা এই জেলায় সর্বাধিক চাষ হওয়া ফসল চিনাবাদাম নয়, তা হল বাজরা। এবং এই বাজরা মানুষের খাদ্য হিসেবে বা বাজারে বিপণনের জন্য উৎপাদিত হচ্ছে না, হচ্ছে বীজ বর্ধনের জন্য— যে কাজের জন্য বীজ কোম্পানিগুলি এখানকার চাষিদের চুক্তিচাষের বরাত দিচ্ছে। নিকটস্থ সারিতে সুবিন্যস্ত পুরুষ এবং স্ত্রী চারা দেখা যাবে। কোম্পানিগুলি বাজরার দুইটি ভিন্ন প্রজাতি থেকে সঙ্কর বীজ তৈরি করছে। এই কর্মকাণ্ডের জন্য বিপুল পরিমাণে জল দরকার। বীজ নিষ্কাশনের পরে যা কিছু পড়ে থাকবে তা খুব বেশি হলে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

“নকল বীজ উৎপাদনের জন্য কুইন্টাল প্রতি আমরা ৩,৮০০ টাকা পাই,” জানাচ্ছেন পূজারি লিঙ্গান্না। শ্রম এবং পরিচর্যার নিরিখে এই মূল্য কম বলে মনে হয়— এবং কোম্পানিগুলি এই বীজ একই শ্রেণির কৃষকদের কাছে খুব চড়া দামে বিক্রি করবে। এই ভুখণ্ডে চাষ করেন এমন আরেক কৃষক এস শান্তাম্মা জানান তাঁর পরিবার পায় কুইন্টাল পিছু ৩,৭০০ টাকা।

শান্তাম্মা ও তাঁর মেয়ে ভণ্ডক্ষী বলছেন এখানে চাষের কাজে মুল সমস্যা জল নয়। “আমাদের গ্রামে পাইপলাইন না থাকলেও জল আমরা পাই।” তাঁদের মাথাব্যাথার মূল কারণ বালি, যা ইতিমধ্যে এখানে জমে থাকা বিশাল পরিমাণ বালির পাশাপাশি অতি দ্রুত জমা হতে থাকে। এই কয়েক ফুট গভীর বালুকাময় জমির উপর দিয়ে সামান্য পথ হাঁটাও ক্লান্তিকর ঠেকে।

মা ও মেয়ে জানান, “এর চোটে আপনার যাবতীয় পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যাবে।” তাঁদের কথায় সম্মতি জানিয়ে পি হোন্নুরেড্ডি বালিয়াড়ির গোড়ায় একটা ভূখণ্ড নির্দেশ করেন, এখানে তিনি মাত্র দিন চারেক আগে কঠোর পরিশ্রম করে সারি সারি চারা রোপণ করেছেন। এখন সেগুলি শুধু বালি বোঝাই গর্ত বই কিছু না। এই অংশটি, একটি ক্রমবর্ধমান রুক্ষ ঊষর অঞ্চলের অন্তর্গত যেখান থেকে গ্রামের দিকে প্রায়শই ঝোড়ো বাতাস বয়, ধুলোর ঝড় হয়।

“বছরের তিন মাস এই গ্রামে বালির বৃষ্টি হয়,” জানান অপর এক মরু-চাষি এম বাশা। “আমাদের বাড়ি, আমাদের খাবারদাবার সর্বত্র বালি। এমনকি যে বাড়িগুলো বালিয়াড়ির কাছে অবস্থিত নয়, সেই ঘরের মধ্যেও বালি আছড়ে পড়ে। জাল দিয়ে বা বাড়তি দরজা লাগালেও তা  যে বিশেষ সবসময় কার্যকর হয়, তা নয়। ইসিক্কা বর্ষম [বালুকা বৃষ্টি] এখন আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, এই নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা।”

হোন্নুরেড্ডি কঠোর পরিশ্রম করে যে সারি সারি চারা রোপণ করেছিলেন তা দিন চারেকের মধ্যেই বালিতে ঢেকে গেছে। ওয়াই এস শান্তাম্মা (ডানদিকে) ও তাঁর মেয়ে ভণ্ডক্ষী বলছেন, ‘এর [বালির] চোটে আপনার যাবতীয় পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যাবে’। (ছবি: বাঁদিকে: পি. সাইনাথ / পারি। ডানদিকে: পি. সাইনাথ / পারি)

ডি হোন্নুর গ্রামে বালি মোটেই অজ্ঞাত কোনও বস্তু নয়। “কিন্তু হ্যাঁ, বালির বাড়বাড়ন্ত হয়েছে বড্ড বেশি,” জানালেন হিমাচল। জোরালো বায়ুর প্রকোপ থেকে রক্ষাকারী লতাগুল্ম এবং ছোট ছোট গাছপালা এখন আর নেই। বিশ্বায়নের তথা বাজার অর্থনীতির প্রভাব সম্পর্কে হিমাচল যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। “এখন আমরা সব হিসেবনিকেশ করি নগদ টাকার নিরিখে। লতাগুল্ম, গাছপালা, ঝোপঝাড়— এসব আর কিছুই নেই, কারণ মানুষ প্রতি ইঞ্চি জমি এই চুক্তি চাষের মতো ব্যাবসায়িক বন্দোবস্তে ব্যবহার করেছে।” এবং, ৫৫ বছর বয়সী কৃষক এম টিপ্পাইয়া বলছেন, “বীজের অঙ্কুরোদ্গমের সময় যদি জমিতে বালি পড়ে, তাহলে আর রক্ষে নেই, পুরোটাই খরচের খাতায় গেল।” জলের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ফসলের উৎপাদন কম। ৩২ বছর বয়সী কৃষক কে সি হোন্নুর স্বামী বলেন, “আমরা একর প্রতি জমি থেকে তিন কুইন্টাল চিনাবাদাম পাই, খুব বেশি হলে চার কুইন্টাল।” জেলার গড় উৎপাদন একর প্রতি প্রায় পাঁচ কুইন্টাল।

তবে, কি তাঁরা এই প্রাকৃতিক বায়ু নিরোধক ব্যবস্থার মূল্য বুঝতে পারেননি? হিমাচলের বক্তব্য, “ব্যাবসায়িক দিক থেকে লাভজনক হলে তবেই সেই গাছ তাদের কাছে মূল্যবান।” এখানকার পরিবেশের যা অবস্থা তাতে অবশ্য সেসব গাছপালা না-ই জন্মাতে পারে। “সে যাইহোক, কর্তৃপক্ষ বলছে তারা গাছ লাগাতে সাহায্য করবে, কিন্তু সেসবের কোনও লক্ষণই নেই!”

পালথুরু মুক্কান্না জানাচ্ছেন, “বছর কয়েক আগে, বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা একটি বড় এসইউভি গাড়ি হাঁকিয়ে এই বালিয়াড়ি এলাকা পরিদর্শনে আসেন।” তবে এই মরু-সাফারি বিশেষ সুখকর অভিজ্ঞতা হয়নি এবং তাঁদের গাড়ি বালিতে আটকে গিয়ে দেখার মত ব্যাপার দাঁড়াল! শেষকালে গ্রামবাসীদের বদান্যতায় ট্র্যাক্টর দিয়ে টেনে তোলা হল! “তারপর অবশ্য আমরা আর তাঁদের টিকিটিও দেখতে পাইনি,” মুকান্নার সংযোজন। মোখা রাকেশ নামের জনৈক কৃষক বলছেন, সময় বিশেষে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, “গ্রামের এই এলাকার উপর দিয়ে বাসও একেবারেই চলাচল করতে পারে না।”

লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের অনুপস্থিতি সমগ্র রায়ালসীমা অঞ্চলেরই একটি সমস্যা। শুধু অনন্তপুর জেলাতেই ১১ শতাংশ এলাকাকে ‘জঙ্গল’ বলে চিহ্নিত করা হলেও প্রকৃত অরণ্যের অস্তিত্ব ২ শতাংশেরও কম। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে মাটি, বায়ু, জল এবং তাপমাত্রার উপর অনিবার্য প্রভাব পড়েছে। অনন্তপুরে এখন বড় জঙ্গল বলতে সর্বত্র দিগন্ত জোড়া সারি সারি হাওয়াকল— সংখ্যায় হাজার হাজার— সর্বত্র আকাশবাতাস জুড়ে এই ক্ষুদ্র মরুভূমির সীমানা ঘিরে দণ্ডায়মান। হাওয়াকল কোম্পানিগুলির কেনা অথবা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ইজারা নেওয়া জমিতে এগুলি গজিয়ে উঠেছে।”

এদিকে ডি হোন্নুর গ্রামে মরুখণ্ডে কৃষিকাজে যুক্ত কৃষকদের একটি দল আমাদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে অবস্থা চিরকালই এইরকম ছিল। তারপর অবশ্য তাঁরা অবস্থার বিপরীত ছবিটির সাপেক্ষেই অকাট্য প্রমাণ দিয়ে বসলেন! বালি এখানে সর্বদাই ছিল ঠিক কথা, কিন্তু বালির শক্তিবৃদ্ধি হয়ে এখন বালুঝড়ের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। আগে লতাগুল্ম এবং সবুজের আচ্ছাদন বেশি ছিল। এখন তা একেবারেই হ্রাস পেয়েছে। জল সর্বদাই এখানে মজুদ ছিল, ক্রমশ আমরা জানতে পারি তাঁদের নদীর মৃত্যুর কথা। দুই দশক আগে গুটিকয় হলেও, এখন এখানে বোরওয়েল শত শত। তাঁদের প্রত্যেকেই জানালেন বিগত দুই দশক ধরে আবহাওয়ার চরম পর্বগুলির সংখ্যায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়েছে।

বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন হয়েছে। হিমাচল বললেন, “বছরের সময় বিশেষে যখন আমাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টি দরকার, তখন বৃষ্টি হবে প্রয়োজনের থেকে ৬০ শতাংশ কম। “বিগত কয়েক বছরে উগাদির [তেলুগু নববর্ষ, সাধারণত এপ্রিল মাস] সময়ে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে।” দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অনন্তপুরে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত হলেও জেলা এই দুইয়ের কোনওটা থেকেই সুবিধা করতে পারেনি।

উপরের সারি: এখানে বালি সর্বব্যাপী, জানালেন এম. বাশা নামে অপর এক মরু-কৃষক। তিনি বলছেন, ‘আমাদের বাড়ি, আমাদের খাবারদাবার সর্বত্র বালি।’ নিচের সারি: অনন্তপুরে এখন  বড়ো জঙ্গল বলতে সর্বত্র দিগন্ত জোড়া সারি সারি হাওয়াকল। (ছবি: রাহুল এম/পারি)

এমনকি যে বছরগুলোতে নিয়মমাফিক ৫৩৫ মিমি বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত হয় তখনও বৃষ্টিপাতের সময়, বিস্তার এবং বণ্টন চূড়ান্ত অনিশ্চিত। কোনও কোনও বছরে বৃষ্টি ফসলের মরশুম থেকে বিনা ফসলের মরশুমে সরে এসেছে। কখনও কখনও, প্রথম ২৪-৪৮ ঘন্টায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হয় এবং তারপরে ভয়ঙ্কর শুষ্ক এক পর্ব শুরু হয়ে যায়।। গত বছর, চাষের মরশুমে (জুন থেকে অক্টোবর) বেশ কিছু মণ্ডলে টানা ৭৫ দিন এই শুষ্ক, বর্ষাহীন পর্ব চলেছিল । যেহেতু অনন্তপুরের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় এবং শতকরা ৮০ শতাংশই কৃষিতে নিয়োজিত (কৃষক কিংবা কৃষিশ্রমিক হিসেবে), অতএব এই প্রাকৃতিক অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই বিধ্বংসী আকার নেয়।

“অনন্তপুরে বিগত দুই দশকের প্রতিটিতে মাত্র দুটি করে বছর জলবায়ুর নিরিখে ‘স্বাভাবিক’ ছিল বলা যায়,” জানালেন ইকোলজি সেন্টারের মাল্লা রেড্ডি। “বাকি ১৬ বছরে, দুই-তৃতীয়াংশ থেকে তিন-চতুর্থাংশ জেলাকে খরাগ্রস্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তার আগের ২০ বছরে, প্রতিটি দশকে তিনবার করে খরা হয়েছিল। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে যে পরিবর্তনগুলি দেখা যাচ্ছিল সময়ের সঙ্গে তীব্র গতিতে তা বেড়ে চলেছে।”

একদা অপরিমিত বাজরা উৎপাদনে সক্ষম ছিল যে জেলাটি তা ক্রমাগত চিনাবাদামের মত বাণিজ্যিক ফসলের দিকে ঝুঁকেছে। যথারীতি ফলস্বরূপ বোরওয়েলের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। (ন্যাশনাল রেনফেড এরিয়া অথরিটির একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, “এলাকা বিশেষে ভূ-জলের অপব্যবহার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।”)

“চল্লিশ বছর আগে, আমাদের এখানে একটা স্পষ্ট ধরন ছিল— ১০ বছরে তিনবার খরা— এবং কৃষকরা এই ব্যাপারে অবগত ছিলেন যে এমতাবস্থায় কী চাষ করতে হবে। একটি স্থিতিশীল কৃষিচক্রে ৯ থেকে ১২টি রকমারি ফসল উৎপাদিত হত,” বলছেন সি কে ‘বাবলু’ গাঙ্গুলি। তিনি টিমবাকটু কালেক্টিভ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন যা বিগত তিন দশক ধরে এই অঞ্চলে গ্রামীণ দরিদ্রদের অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে মনোনিবেশ করেছে। অঞ্চলে তাঁর নিজের চার দশকের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই এলাকার কৃষি বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছেন।

“চিনাবাদাম [অনন্তপুরের মোট কর্ষিত জমির শতকরা ৬৯ শতাংশে এখন চিনাবাদাম চাষ হয়] আমাদের এখানে ঠিক সেটাই করেছে যা আফ্রিকায় সাহেল। আমরা এই যে একফসলি চাষে মনোনিবেশ করলাম, তা যে শুধুমাত্র জলের পরিস্থিতি পরিবর্তন করে ক্ষান্ত দিয়েছে এমন মোটেই নয়। চিনাবাদাম ছায়া সহ্য করতে পারে না, অগত্যা মানুষ গাছ কাটতে শুরু করল। অনন্তপুরের মাটি ধ্বংস হল। বাজরা চাষে ভাঁটা পড়ল। আর্দ্রতা হারিয়ে গেল, বৃষ্টিনির্ভর চাষে ফেরার আর কোনও পথই রইল না।” ফসল বদলে কৃষিতে নারীর ভূমিকাকেও খর্ব হল। অঞ্চলে বৃষ্টিনির্ভর চাষ থেকে পাওয়া রকমারি ফসলের বীজ-রক্ষকের ভূমিকায় পরম্পরাগতভাবে ছিলেন মহিলারাই। কৃষকরা বাজার থেকে (চিনামাদামের মতো) অনন্তপুর ছেয়ে যাওয়া সঙ্কর প্রজাতির অর্থকরী ফসলের বীজ কিনতে শুরু করায় নারীর ভূমিকা মূলত কৃষিমজুরে পর্যবসিত হল। সেই সঙ্গে দুই প্রজন্মের মধ্যেই অসংখ্য কৃষক একই জমিতে বহুফসলি চাষের জটিল পারম্পরিক প্রশিক্ষণটি হারালেন।

লিঙ্গান্নার নাতি হোন্নুর স্বামী (উপরের সারিতে বাঁদিকে) এবং নাগারাজু (উপরের সারিতে, ডানদিকে) অধুনা মরুচাষি, যাঁদের ট্র্যাক্টর এবং গরুর গাড়ির (নিচের সারি) চোটে বালিতে গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। (ফটো: উপরের সারিতে বাঁদিকে এবং নিচে বাঁদিকে: রাহুল এম/পারি। উপরে ডানদিকে এবং নিচে ডানদিকে: পি. সাইনাথ/পারি)

মোট কর্ষিত জমির মাত্র শতকরা ৩ শতাংশে এমন ফসল উৎপাদিত হয় যার থেকে পশুখাদ্য মেলে। গাঙ্গুলি বলেন, “এককালে সারাদেশের মধ্যে অনন্তপুরেই সর্বাধিক সংখ্যায় ক্ষুদ্র রোমন্থনকারী পশু ছিল। কুরুবা-দের মতো প্রাচীন পশুপালক জনগোষ্ঠীগুলির কাছে এরাই ছিল সেরা সম্পদ— চলমান সম্পত্তি। এই গোষ্ঠীগুলির গবাদি পশুর গোবর এবং মূত্র সার হিসেবে কৃষকদের জমিতে ফসল কাটা পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয়ে উর্বরতা বৃদ্ধি করত— এটাই ছিল প্রাকৃতিক চক্র। ফসলের পরিবর্তিত ধরন এবং রাসায়নিক নির্ভর কৃষির দৌলতে এই চক্রও ব্যাহত হয়েছে। এই অঞ্চলের জন্য যাবতীয় পরিকল্পনাই প্রান্তবাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য প্রতিকূল প্রমাণিত হয়েছে।”

হোন্নুরে এই ক্রমশ ভেঙে পড়তে থাকা কৃষি বৈচিত্র্যের জগতটিকে নিজের চতুর্দিকে পর্যবেক্ষণ করে চিনতে পারেন এবং তার ফলাফল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হিমাচল। “এককালে, এই গ্রামে আমরা বাজরা, বরবটি, অড়হর, রাগি, কাওন দানা, ছোলা, সিম ফলাতাম…” তিনি ফসলের একটি ফর্দ তুলে ধরেন। “চাষ করা অনেক সহজ ছিল, তবে বৃষ্টিনির্ভর কৃষিতে টাকা ছিল না।” চিনাবাদাম চাষ করে নগদ টাকার হাতে এল— অবশ্য তা ক্ষণকালের জন্যই।

চিনাবাদামের শস্যচক্র প্রায় ১১০ দিন। এর মধ্যে, শুধুমাত্র ৬০-৭০ দিনের জন্যই তা মাটিকে ধরে রেখে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। যে যুগে নয়টি ভিন্ন ভিন্ন বাজরা এবং ডাল উৎপাদিত হত, সেযুগে এই ফসলগুলি জমির উপরের মৃত্তিকাস্তরকে প্রতি বছর জুন থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছায়াদান করত, সেইসময়ে এক বা একাধিক অপর ফসল জমিতে বেড়ে উঠত।

ওদিকে হোন্নুর গ্রামের হিমাচল খতিয়ে দেখেন। তিনি জানেন যে বোরওয়েল এবং অর্থকরী ফসলের দৌলতে কৃষকদের প্রচুর লাভ হয়েছে। আবার এর নিম্নমুখী যাত্রাও তিনি দেখেছেন— সঙ্গে জীবিকার পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসায় অভিবাসন বেড়ে চলেছে। হিমাচল জানান, “সর্বদাই মোটামুটি ২০০টিরও বেশি পরিবার বাইরে কাজের সন্ধান করছে।” অনন্তপুরের বোমমানহাল মণ্ডলের গ্রামটিতে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ১২২৭টি পরিবারের নিরিখে অভিবাসী পরিবারের অনুপাত প্রায় এক ষষ্ঠাংশ। তাঁর সংযোজন, “পরিবারগুলির প্রায় শতকরা ৭০-৮০ শতাংশ ঋণদায়গ্রস্ত।” দুই দশক ধরে অনন্তপুরে কৃষি সঙ্কট বেড়ে চলেছে— এবং এটিই কৃষক আত্মহত্যায় অন্ধ্রপ্রদেশের সর্বাধিক জর্জরিত জেলা।

বাঁদিকে: পূজারি লিঙ্গান্না (ছবি: পি. সাইনাথ/পারি)। মাঝখানে: পলথুরু মুকান্না (ছবি: রাহুল এম./ পারি)। ডানদিকে: ভি. এল. হিমাচল (ছবি: পি. সাইনাথ/পারি)

মাল্লা রেড্ডি বলছেন, “বোরওয়েলের সুদিন আর নেই। অর্থকরী শস্য এবং এক ফসলি কৃষির বাড়বাড়ন্তও নেই।” উপযোগ বা খাদনের জন্য উৎপাদন থেকে “অজ্ঞাত বাজারের জন্য পণ্য সৃষ্টি”— এই মূলগত পরিবর্তনের জন্য তিনটির রমরমা এখনও বজায় আছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি যদি কেবলমাত্র প্রকৃতির রিসেট বোতাম টেপার ব্যাপারটুকু মাত্র হয় তাহলে আমরা হোন্নুর এবং অনন্তপুরে যা দেখলাম তাকে কেমন করে ব্যাখ্যা করব? এছাড়াও, বিজ্ঞানীরা আমাদের বলে থাকেন, জলবায়ুর পরিবর্তন বিশাল পরিধি জুড়ে ব্যাপ্ত প্রাকৃতিক অঞ্চল এবং এলাকা জুড়ে ঘটে— অথচ হোন্নুর ও অনন্তপুর প্রশাসনিক অঞ্চলগুলি খুবই ছোট এলাকা, ব্যাপ্ত প্রাকৃতিক অঞ্চলের ধারেকাছেই আসে না। এমনটা হতেই পারে যে অনেক বড় অঞ্চল জুড়ে ঘটা বিবর্তন আসলে তার অন্তর্গত ছোট ছোট অঞ্চলের ভেতর বিদ্যমান প্রকৃতির খামখেয়ালি বৈশিষ্ট্যগুলিকে বাড়িয়ে তুলেছে।

এখানে পরিবর্তনের যাবতীয় নিদর্শনই মানুষের হস্তক্ষেপের পরিণতিতে ঘটেছে। ‘বোরওয়েল মহামারী’, বাণিজ্যিক ফসল চাষ এবং একমুখী কৃষি সংস্কৃতির দিকে প্রবলতর ঝোঁক; জলবায়ু বিবর্তনের বিরুদ্ধে অনন্তপুরের জীববৈচিত্র্যের সেরা প্রতিরোধটির ধ্বংসপ্রাপ্তি; ভুগর্ভস্থ জলস্তরগুলির যথেচ্ছ ব্যবহারে পঞ্চত্ব প্রান্তি; এই শুষ্ক ঊষর অঞ্চলে যে সামান্য অরণ্য-আচ্ছাদনটুকু ছিল তার নিধন; তৃণভূমি নির্ভর বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস সাধন এবং মৃত্তিকার ক্ষয়সাধন; শিল্প নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক নির্ভর কৃষির তীব্রতা; জমি ও জঙ্গল এবং পশুপালক ও কৃষকদের মধ্যে গড়ে ওঠা পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্কে ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে জীবিকা ধ্বংস এবং নদীগুলির মৃত্যু। এইসকল কারণে স্পষ্টতই তাপমাত্রা, আবহাওয়া এবং জলবায়ু প্রভাবিত হয়েছে– ফলস্বরূপ এই প্রক্রিয়াগুলি আরও জটিল চেহারা নিচ্ছে।

অর্থনীতি ও উন্নয়নের মডেল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানুষের অসমঞ্জস কর্মকাণ্ড যে আমাদের আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেই বিষয়ে এই অঞ্চল এবং এইরকম আরও নানান অঞ্চলের অবস্থা থেকে প্রচুর কিছু শেখার থাকে।

হিমাচল বলেন, “হয়তো আমাদের বোরওয়েল ব্যবহার বন্ধ করে বর্ষানির্ভর চাষে ফিরে যাওয়া উচিত। যদিও সেটা খুব কঠিন কাজ।”

 

পি. সাইনাথ পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

পারি-র জলবায়ু বিবর্তনের উপর দেশব্যাপী রিপোর্টিং সংক্রান্ত প্রকল্পটি ইউএনডিপি সমর্থিত একটি যৌথ উদ্যোগের অংশ যার লক্ষ্য জলবায়ুর বিবর্তনের প্রকৃত চিত্রটি দেশের সাধারণ মানুষের স্বর এবং অভিজ্ঞতায় বিবৃত করা। 

তর্জমা: স্মিতা খাটোর/পারি
হেডার ছবি: রাহুল এম/পারি

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1754 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...