জঙ্গল পুড়ছে, তাতে আমাদের কী

সত্যব্রত ঘোষ

 

সাধারণ শিক্ষিত শহরবাসীদের পরিবেশ নিয়ে কিছু বলাটা ঝক্কি। কারণ, গুগলের দৌলতে তাঁদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী। সম্প্রতি, মহারাষ্ট্রে যখন আগুনে বনাঞ্চল জ্বলছিল তখনও দেখেছি মানুষদের রাগ, দুঃখ এবং উত্তেজনা। জনসমক্ষে হাহাকার তুলে, সোশ্যাল মিডিয়ার এলোমেলো ঝঞ্ঝাটে সামিল হয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে ফিরে আসেন নিজের ঘরে। এবং সেই অগাধ তত্ত্ব এবং তথ্যের ভিড় থেকে আলাদা হবার পর সুখী গৃহকোণে আশ্রয় নিয়ে তাঁদের অনেকেই স্বস্তি অনুভব করেন। যা পুড়ছে, তা অনেক দূরে। আমার ঘরটুকু তো এখনও নিরাপদ। অর্থাৎ, আগুনের আঁচে আমার তো কিছু ঝলসায়নি। ঈশ্বর আমাকে ও আমার পরিবারকে নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন সব বিপদ থেকে। সত্যিই তো, ঈশ্বর শহরবাসীর প্রতি যথেষ্ট সদয়। গরমে এসি, দূষণে এয়ার আর ওয়াটার পিউরিফায়ার, মশা-মাছি থেকে বাঁচতে গ্যামাক্সিন— আর কত চাই? চাই তো অনেক আর সেই চাওয়ার থেকেই সব অনর্থ।

চলে যাই, অনেক দূরে। গ্রেটা থুনবার্গ নামে মেয়েটি সোলার পাওয়ার রেস বোটে অতলান্ত মহাসাগর অতিক্রম করে পৌঁছাল আমেরিকায়। আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে এক সম্মেলনে নিজের বক্তব্য পেশ করবে সে। এমন একটা সময় যখন আমাজন রেনফরেস্ট পুড়ছে। নিজের বক্তব্যের শুরুতে সে বলে উপস্থিত বয়স্করা নিশ্চয়ই নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে এই সঙ্কটের বিরুদ্ধে লড়ছেন না। প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধে আমরা শুধুমাত্র দর্শক। কারণ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো ইতিপূর্বেই কয়েক বছর ধরে জলা জঙ্গল জমি ইজারা দিয়েছে শাসক ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য। সেখানে অবাধে তেল এবং গ্যাসের সন্ধান চলছে লাগাতার। এই বিধ্বংসী কাজে যে পরিমাণ কার্বন নির্গত হয়ে চলছে, সারা ইউরোপে নির্গত কার্বনের চেয়ে তা বহু গুণ বেশি।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিরীক্ষণে জানাচ্ছেন যে ১৯৬১ থেকে ২০১০— এই সময়সীমার মধ্যে সেই দেশগুলিই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যেখানে তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নির্গত হয়ে এসেছে। সেই গবেষণাপত্রে এটাও বলা হয়েছে যে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে দরিদ্র দেশগুলি আরও দরিদ্র হয়েছে, এবং ধনী দেশগুলি বেশি কার্বন নিগত করে আরও ধনী হয়েছে। বিশ্বাসীদের মধ্যে ধনী মানুষদের রোজগারের দশ শতাংশের পাশাপাশি দরিদ্রদের আয়ের দশ শতাংশের তুল্যমূল্য বিচার করে গবেষকরা জানাচ্ছেন উষ্ণায়নের অভিঘাত না এলে ঐ নির্দিষ্ট ৪৯ বছরে দুই শ্রেণির রোজগারের অনুপাতে পচিশ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটত।

আরেকটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যে দেশের মানুষ আবহাওয়া সঙ্কটে যত বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে, তাঁরা সেই সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি পীড়িত। উন্নয়নশীল দেশগুলির গ্রামীণ এলাকায় যে মানুষরা বসবাস করেন, তাঁদের উপরেই আবহাওয়া সঙ্কটের প্রভাব সব থেকে বেশি পড়েছে। তাঁরা যে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করেন, যে জল ব্যবহার করেন, যে শিল্পোদ্যোগগুলিতে কর্মরত এবং সর্বোপরি, নিজেদের স্বাস্থ্যের চূড়ান্ত অবনতি ঘটিয়ে এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মাশুল চুকিয়ে চলেছেন। সেই কারণ শুধু বিভিন্ন দেশে নয়, একটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসাম্য বেড়েই চলেছে। ভারতের ক্ষেত্রে, হিসেব করে দেখা যাচ্ছে আবহাওয়া পরিবর্তন যদি না ঘটত, তাহলে আমাদের জিডিপি প্রায় একত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, কানাডার ক্ষেত্রে বত্রিশ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে ৯.৫ শতাংশ বাড়ত।

এই অনুসন্ধানগুলি থেকেই যে বিতর্কটার জন্ম হচ্ছে কারা আবহাওয়া সঙ্কটের জন্য মূল দায়ী এবং তারা এই সঙ্কট ঘোচানোর জন্য কতটুকু পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, যে দেশগুলি গ্রিনহাউস গ্যাস এমিশনে সর্বাগ্রে, তাদেরই আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্কট ঘোচাতে যতটা এগিয়ে আসবার কথা ছিল, তা তারা আসেনি। তাদের উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক আবহাওয়ার যে অবনমন ঘটেছে, তাতে উন্নয়নশীল দেশের বৃদ্ধির সম্ভাবনা শুধু কমেইনি। উল্টে, ধনী দেশগুলি তাদের উপর আবহাওয়া সঙ্কটের দায়িত্ব চাপিয়ে দাবি করছে, এই ঝামেলা তোমাদেরই মেটাতে হবে।

সব দেশ যদি নিজেদের উৎপাদন এবং তার ব্যবহারকে টেকসই করবার জন্য নিজস্ব একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারত, নিশ্চয়ই তারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য শুধু দায়িত্বই নয়, অতীতে যা বিপর্যয় ডেকে এনেছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণও দিতে বাধ্য হত। ২০১৫ সালে যে গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ড তৈরি করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলি প্রভাবিত হলে, তাদের জন্য গ্রান্ট, লোন এবং গ্যারান্টির মাধ্যমে তা খরচ করা হবে। আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি তাদের গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন টেকনোলজি সহায়তা জুগিয়ে তাদের গ্রিন ইকোনমির অংশ করে তোলবার প্রচেষ্টা চলবে। এমন সাস্টেনবল বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই দেশগুলিতে একটি আবহাওয়া-সহনশীল ইনফ্রাস্ট্রাকচার নির্মাণে হাত লাগানো হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সব কথার কথাই রয়ে গেছে।

তাই, সহায়তা এবং সমন্বয় ঘটিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষমতা কাগজে-কলমে বিতরণ করবার কথা যতই লেখা থাক, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলি ট্রেড এগ্রিমেন্টে পরিবেশ বান্ধব হওয়ার শর্ত যতই চাপিয়ে দিক না কেন ট্রাম্প এবং বোলসোনারো-র মতো রাষ্ট্রনায়করা সাধারণ শহুরে মানুষদের মতোই ‘মনে এক, মুখে আর এক’ ভাব নিয়ে বিশ্বপরিবেশকে নিজের জাগির ধরে নিয়ে তছনছ চালিয়ে যাবেন নির্বিকারে। এবং তাঁদের দিকে অন্যরা যদি আঙুল তোলে, সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের দায়ভার নির্দ্বিধায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাঁরা এই সঙ্কটের থেকে মুনাফা তোলার কাজে লেগে যাবেন। সাধারণ মানুষ এদের থেকেই তো শিখছে, নিজের লোভ সংযত করে সমগ্র বিশ্বকে এবং সর্বোপরি নিজের দেশকে পরিবেশ বান্ধব করে তোলার দায়টা শুনতে যতই ভালো লাগুক না কেন, দুনিয়াদারির ক্ষেত্রে বিপদ থেকে ফায়দা তোলাটাই আপাতত বুদ্ধিমানের কাজ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...