কৃষি ও জীবন জীবিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

সফিউল

 

 

এই বছর দক্ষিণবঙ্গে বর্ষা প্রায় স্কিপ করে শরতের প্রবেশ শহর কোলকাতার মানুষের জীবন অসহ্য করে তুলেছিল। শহুরে বর্ষার খামখেয়ালিতে শহুরে নাগরিকদের হাহুতাশের খবর হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের কৃষিতে বর্ষার এই খামখেয়ালি কী প্রভাব পড়েছে সেই নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নাগরিক সমাজে দেখা যায়নি। খবরের পাতায় স্থানও পায়নি। অথচ ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। দেখা গেল, দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্য যখন বন্যার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, পশ্চিমবঙ্গ একেবারে বিপরীত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এমনিতেই খাদ্যশস্যের লভ্যাংশ ক্রমাগত কমতে থাকায় পশ্চিমবঙ্গের কৃষকেরা অন্যান্য অর্থকারী ফসলের বিকল্পগুলি যথাসম্ভব গ্রহণ করেছেন। অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ধান ও ফুলের উত্পাদনকে সবথেকে বেশি প্রভাবিত করেছে। শৃঙ্খলার প্রত্যেকেই— কৃষক, বিক্রেতা বা রফতানিকারক— লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। আবহাওয়া অধিদফতরের মতে, রাজ্যে ১ জুন থেকে ১২ আগস্ট, ২০১৯ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বৃষ্টিপাতের ঘাটতি হয়েছে। বিলম্বিত বর্ষা এবং জুন ও জুলাই মাসে যথাযথ নিম্নচাপ গঠনের অভাবে দক্ষিণবঙ্গে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়েছিল, আবার পরবর্তী দিনগুলিতে অধিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে, সেটাও রাজ্য জুড়ে অভিন্ন নয়। আমাজনের জঙ্গল আগুনে পুড়ছে যখন, তখন নাগরিকদের মধ্যে যে স্বল্পকালীন হাহুতাশ দেখা গেল, সেটার যদি একটা ধারাবাহিকতা থাকত তাহলে পরিবেশ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রে থাকতে পারত।

আমরা আলোচনা করতে চাইছি আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা ও কৃষিতে তার প্রভাব নিয়ে। এই আলোচনা শুরুর আগে প্রথমেই বলে নেওয়া উচিত, পরিবেশ আদ্যন্ত একটি রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু পরিবেশ রাজনৈতিক বিষয় হলেও তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যথেষ্ট উৎকৃষ্ট ও তীক্ষ্ণ না হলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলিতে এই রাজনীতির বিরোধিতা যথাযথ হয় না। তাই ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে দেশজুড়ে অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টাকে উলঙ্গ করে শান্তির বার্তা দিয়ে নির্মিত একটি সিনেমা রাজনৈতিক আখ্যা পেয়ে ঘুনধরা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু পরিবেশ নিয়ে আলোচনা এখনও পর্যন্ত সেইভাবে বাধা পায় না। এখানেই পরিবেশ নিয়ে চর্চার গভীরতার অভাব অনুভূত হয়। নানা ভাষা ও নানা জাতির মানুষের সঙ্গে যে বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক ও প্রানী বৈচিত্র্য পরিবেশের আওতায় আসে তাতে পরিবেশ সবথেকে জটিল রাজনৈতিক বিষয়। তা সত্ত্বেও পরিবেশ আলোচনা ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার কেন্দ্রে ঢুকতে পারেনি একটাই কারণে, তা হল পরিবেশ চর্চায় যে পরিমাণ প্রকৃতির কথা আলোচনা করা হয় সেই তুলনায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের কৃষি, অর্থনীতি, ও রাষ্ট্রনীতিগুলো এক সূত্রে গাঁথা হয় না। রাষ্ট্রনায়করা পরিবেশ নিয়ে মিটিং করলে সেই নিয়ে নাগরিক সমাজের আগ্রহ সব থেকে তলানিতে থাকে। পরিবেশ নিয়ে চর্চায় আমাদের রাষ্ট্রনেতারাও কৃষি, উৎপাদন ব্যবস্থার বিবর্তন ও চ্যালেঞ্জগুলিকে গুরুত্ব দেন না। এই বছরে খামখেয়ালি বৃষ্টি, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও স্বল্পবৃষ্টি নিয়ে আমাদের নেতারা কতগুলি বিতর্ক, সভা, বক্তব্য রেখেছেন তা খুজে পাওয়াই মুশকিল।

অথচ আবহাওয়া কৃষি উত্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফসলের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং ফলনের উপর এর গভীর প্রভাব রয়েছে। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে পোকামাকড়, রোগ, জলের প্রয়োজন; এবং সারের প্রয়োজনীয়তা। জলের ঘাটতি থাকলে পুষ্টির সংশ্লেষণের যে পার্থক্যের সৃষ্টি হয় তার সঙ্গে ফসলের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সরাসরি যুক্ত এবং শস্য এবং মাটির ক্ষয়ের ফলে শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। ক্ষেত থেকে স্টোরেজ এবং বাজারে পরিবহণের সময় ফসলের উৎপাদনের গুণমান আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। খারাপ আবহাওয়া পরিবহনের সময় উৎপাদনের গুণমান এবং স্টোরেজ চলাকালীন বীজ এবং রোপণ উপাদানগুলির কার্যকারিতা এবং পোটেনশিয়ালকে প্রভাবিত করতে পারে। সুতরাং, ফসল সংস্কৃতির এমন কোনও দিক নেই যা আবহাওয়ার প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। আবহাওয়ার কারণগুলি সর্বোত্তম শস্য বৃদ্ধি, বিকাশ এবং ফলনে অবদান রাখে। এগুলি কীটপতঙ্গ ও রোগের প্রকোপ ও সংক্রমণেও ভূমিকা রাখে।

স্থানীয় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মাইক্রোস্কেলে সতর্কতার সঙ্গে কৃষি পরিকল্পনা নিলেও, বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়ার ঘটনাগুলি বছরের পর বছর বিদ্যমান থাকে। সাধারণ আবহাওয়া থেকে বিচ্যুতি প্রায় সমস্ত বছর, অঞ্চল এবং ঋতুতে হামেশাই ঘটে। সর্বাধিক সাধারণ বৃষ্টিপাতের ফসলের ক্ষেত্রে বৃষ্টিপাতের অনিয়মের কারণে ফসলের মরসুম শুরুতে বিলম্ব হয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল বিভিন্ন আবহাওয়ার উপাদানগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি থেকে বিচ্যুতি।

এবার দেখে নেওয়া যেতে পারে কী ধরনের আবহাওয়ার বিচ্যুতি বিশ্বজুড়ে ঘটার সম্ভাবনা এবং কৃষিক্ষেত্রে তার প্রভাব। ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে বর্ষায় বৃষ্টিপাতের হ্রাস ইতিমধ্যে দেখা গেছে। অন্য সময়ে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাতের ফ্রিকোয়েন্সিও বেড়েছে। বিশ্বের গড় তাপমাত্রায় আরও ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি হলে তা ভারতের গ্রীষ্মকালীন বর্ষাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। বর্ষার এই আকস্মিক পরিবর্তন আরও বড় সঙ্কটকে ডেকে আনবে, আরও ঘন ঘন খরার পাশাপাশি ভারতের বৃহৎ অংশগুলি আরও বন্যার কবলে পড়বে।

দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের থেকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে বেশি গড় বৃষ্টিপাত দেখা যাবে। যা মুম্বাইয়ের মতো শহরের বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে। শুকনো বছরগুলিরও শুষ্কতর হওয়া আশঙ্কা করা যায়।

১৯৭০-এর দশক থেকে খরার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলগুলি শুষ্ক হয়ে উঠছে। ১৯৮৭ এবং ২০০২-০৩ সালে, খরার ফলে ভারতের অর্ধেকেরও বেশি ফসলি অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ফসলের উত্পাদন হ্রাস পেয়েছিল। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী বছরও কম ফলন হওয়ার। এই মুহূর্তে সরকার ও মিডিয়া প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে যে পরিমাণ চর্চা করছে সে তুলনায় ফসলের ফলন, ফসল থেকে আয় সর্বোপরি কর্মসংস্থানের ক্রমাগত পতন নিয়ে চর্চার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের ৬০%-এরও বেশি কৃষিক্ষেত্র বৃষ্টিনির্ভর, যা দেশকে ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াই, ভারতের ভূগর্ভস্থ জল ১৫% অতিরিক্ত ব্যবহারে ন্যুব্জ। যদিও ভবিষ্যতের ভূগর্ভস্থ জলের স্তর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, তবুও চেন্নাই সহ বেশ কিছু শহরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জলের চাহিদা দেখিয়ে দেয় জলতলগুলি আরও হ্রাস পাবে।

যদিও গত কয়েক দশকে সামগ্রিক ধানের ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু মৌসুমীতে কম বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ভারতের ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন না হলে গড়ে ধানের ফলন প্রায় ৬% বেশি হতে পারত বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। একই জিনিস গম চাষের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। ২০০১ সালের দিকে ভারত ও বাংলাদেশে গমের ফলন শীর্ষে ছিল। তারপর থেকে তা কমছে এবং সার প্রয়োগের পরেও বৃদ্ধি পাচ্ছে না। পর্যবেক্ষণগুলি দেখায় যে উত্তর ভারতে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা গমের আবাদে যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা পরিস্থিতি আরও সঙ্কটজনক করে তুলতে পারে। মৌসুমী জলের ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং সমুদ্রের জলের অনুপ্রবেশ ফসলের ফলনকে হুমকির মুখে ফেলবে, দেশের খাদ্য সুরক্ষাকে হুমকিতে ফেলবে। যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে তবে নিকট ও মাঝারি মেয়াদে চাল এবং গম উভয় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট ফলন হ্রাস আশঙ্কা করা যায়। ২০৫০ দশকের মধ্যে ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ওয়ার্মিংয়ের আওতায় দেশকে বর্তমান প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতে পারে।

খাদ্য সুরক্ষা বিপর্যয়ের সঙ্গে শক্তির সুরক্ষাও বিপর্যস্ত হওয়ার দিকে। জলসম্পদের উপর জলবায়ু সম্পর্কিত প্রভাব ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি প্রভাবশালী রূপ— জলবিদ্যুৎ এবং তাপবিদ্যুৎ উত্পাদন— উভয়ই কার্যকরভাবে পর্যাপ্ত জল সরবরাহের উপর নির্ভর করে। নদীর প্রবাহে ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি হ্রাস জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ভূমিধ্বস, ঝড়, বন্যা, হিমবাহ হ্রদ প্রবাহ এবং জলবায়ু সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকিও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মনে রাখা দরকার, দক্ষিণ এশিয়া হল দুর্যোগ-ক্ষতিগ্রস্ত বা অবনমিত অঞ্চলগুলি থেকে অন্যান্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঞ্চলে লোকের স্থানান্তরের হটস্পট।

এখানে সিন্ধু ও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা হল প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদী, এবং জলের চাহিদা ক্রমবর্ধমান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জল ভাগ নিয়ে ইতিমধ্যে দেশগুলির মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশে নাগরিকতা ও উদ্বাস্তু হিংসা ও রক্তপিপাসাকে ক্রমাগত হাওয়া দিয়ে বাড়িয়ে তুলে শাসনক্ষমতার বৃদ্ধি করতে একটি চক্র যখন সক্রিয়, তখন উপেক্ষিত থেকে যায় অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য পরিযায়ী শ্রমিক, মানুষ ও শরণার্থীরা। অথচ ধর্ম ভাষার বিভিন্নতার থেকেও আগামী দিনে কৃষিক্ষেত্র ও জীবিকার উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জলবায়ু শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলতে চলেছে।

তাই এখনই পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষির ও অর্থনীতির পরিবর্তন অতি দ্রুত প্রয়োজন সেই নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা কোথাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...