পাঠ্যপুস্তক না ফ্যাসিস্ট ইস্তেহার: প্রসঙ্গ ‘বৈচিত্রপূর্ণ অসম’- নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্য দ্রুত পঠন

সঞ্জীব দেবলস্কর

 

অসমে ১৯৮৯ সালে ভাষিক সম্প্রসারণবাদী প্রবলপ্রতাপী এক চক্রের ঘোষণা ছিল: “এখন ….  সভার দায়িত্ব হচ্ছে কম দামের কিছু বই প্রকাশ করার পরিকল্পনা তৈরি করা, যে বইগুলো অসমিয়া ভাষায় রচিত হবে না, রচিত হবে বরাক উপত্যকার মানুষের কথ্য ভাষায় (অর্থাৎ সিলেটি উপভাষায় আর কি, এদের উৎসাহে আবার আরেকদল সিলেটিকে উপভাষা নয় মান্য চলিত বাংলাভাষার প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র একটি ভাষা হিসাবে খাড়া করার স্বপ্ন দেখছেন আজকাল)। মাঝে মাঝে কিছু অসমিয়া ভাষার অনুচ্ছেদ তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে.. এভাবে অসমিয়া ভাষার সঙ্গে তাদের ভাষার যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হবে”। গত তিনটি দশক প্রতিরোধ সত্ত্বেও নানাভাবে এ প্রয়াস চলছে। সে সঙ্গে বাংলাভাষায় অহেতুক অসমিয়া শব্দের, পরিভাষার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, অসমিয়া বাক্যরীতি অনুসারে উদ্ভট বাংলা বাক্য গঠন করে/করিয়ে অসমের জন্য একটি নতুন বাংলাভাষার জন্ম দেওয়ার প্র‍য়াস জোরদার হচ্ছে। এ ভাষাটি হবে বাংলার মতো, তবে বাংলা নয়, অসমিয়ার মতো, তবে অসমিয়া নয়। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল একসময় শিশুদের জন্য ‘প্রাইমার’গুলো প্রথমে অসমিয়া ভাষায় লিখে বাংলায় অনুবাদ করিয়ে নেওয়াও হয়েছিল৷ শুভবুদ্ধির ফলে এটা পরিত্যক্ত হলেও সম্প্র‍তি মাধ্যমিক স্তরের বাংলা ভাষা-সাহিত্য পাঠের বইগুলোও যাতে অসমিয়া পাণ্ডুলিপি থেকে বাংলায় অনুবাদ করিয়ে নেওয়া হয়- তার প্রস্তাবও এসেছিল। অনূদিত ভাষা-সাহিত্য পাঠের বই যে একটি উদ্ভট পরিকল্পনা এটা বোঝানোর চেষ্টা অবশ্য আংশিকভাবে সফল হয়েছে। কিন্তু এর পরবর্তীতে যে পদক্ষেপ সেটা বড়ো মারাত্মক। ইতিহাস, সমাজতত্ত্বের তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাঙালি পরিচিতিটি অস্পষ্ট, ঝাপসা করে দেওয়া৷

এ পরিপ্রেক্ষিতেই মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ষদ প্রকাশিত এ বইটি আমাদের নজরে এল। একনজরেই মনে হল, বাংলা পাঠক্রমে এরকম একটি বই নিতান্তই একটি অতিরিক্ত বোঝা৷ ১৪/১৫ বছরের পড়ুয়াদের উপর সামাজিক নৃতত্ত্ব, জনবিন্যাস, লোকাচার, ধর্মাচার নিয়ে ২২টি পাঠ, সেটা আবার অসমিয়া বা অন্য কোনও ভাষায় রচিত নিবন্ধের বঙ্গানুবাদ, সব মিলিয়ে এক নিরতিশয় দুষ্পাচ্য বিষয়৷ এ ধরনের পাঠক্রমই এ প্রজন্মকে মাতৃভাষা থেকে সরাসরি Alternative English/Hindi অর্থাৎ বিকল্প ইংরেজি/হিন্দি গ্রহণ করতে বাধ্য করে৷ কোথায় ইংরেজিতে ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ টোটো’, ‘দ্য হ্যাপি প্রিন্স’-এর মতো গল্প আর বাংলার জন্য বরাদ্দ কঠিন তত্ত্বকথা, গুচ্ছের তথ্যভাণ্ডার। অথচ ‘ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার কৌশল- শ্রবণ, কথন, পঠন ও লিখনের অনুশীলন ও উন্নতিকরণ’ হল শিক্ষাপর্ষদের অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য। ওই একই নির্দেশনামায় বলা হয়েছে: ‘ভাষা শিক্ষকের উদ্দেশ্য ভাষাটিকে ব্যকরণ, বানান ইত্যাদি নীতি সহকারে শুদ্ধভাবে শিক্ষা করা’ (পড়ুন দেওয়া) ইত্যাদি৷ (অপটু হাতে লেখা বাক্যটিতে অসংলগ্নতা লক্ষণীয়)। তাছাড়াও বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে, ‘নিজের মনে উদিত হওয়া ভাব (এরকম উদ্ভট বাংলার নমুনা দেখলে হাসি পায়), এবং অন্য লোকের প্রশ্ন কথা(!) ধৈর্য্য সহকারে শুনে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিতে সক্ষম এবং নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে সক্ষম হওয়া (২.৬)’। (এখানে বাক্য অসংলগ্ন, কারণ শিক্ষাপর্ষদ সুযোগ্য ব্যক্তিকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিতে পারেননি।)

এ কথাটা ইতিমধ্যে অনেকবার বলেছি, ভাষা-সাহিত্য পাঠে অনূদিত পাঠ্যপুস্তক একটি অবাস্তব ধারণা। অথচ এখানে ওই একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি। এ নিয়ে যথাসময়ে আবার আসার আগে এখানে সংযোজিত ‘কাছাড়ের জনগোষ্ঠী’ পাঠটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

যে কারণে ‘কাছাড়ের জনগোষ্ঠী’সহ পুরো বইটিকেই আমরা মানতে পারছি না তা হল এতে কাছাড় তথা বরাক উপত্যকার একটি খণ্ডিত চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে। সম্ভবত শিক্ষাপর্ষদের নির্দেশেই লেখককে বিষয়টির প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। শিরোনাম যদি হত কাছাড়ের জনজাতি(tribes), তবে যে-২৪ টি জনজাতির কথা এখানে বলা হয়েছে তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু এখানে শব্দটি হচ্ছে ‘জনগোষ্ঠী'(people)। আর ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী বরাক উপত্যকার(তদানীন্তন অখণ্ড কাছাড়) ৩,৬২ ৪,৫৯৯ জনসংখ্যার সিংহভাগ যে বাঙালি, এদের কথা তো অগ্রাধিকার পাবে সঙ্গত কারণেই। সেন্সাসে কোনও অজ্ঞাত কারণে ভাষা নয় ধর্মভিত্তিক পরিসংখ্যান  হাজির করলেও, বাঙালিরা যে ৯০ শতাংশের উপরে এটা সহজেই অনুমেয়।

এ অবস্থায় অঞ্চলটির প্রধান ভাষিক গোষ্ঠীকে প্রায় অস্তিত্বহীন করে একতরফা ক্ষুদ্র, মাঝারি, ভাষিক নৃগোষ্ঠীর (এদের জনসংখ্যা, গৌরব, ও শ্রীবৃদ্ধি আমরা আন্তরিকভাবে কামনা করি) কথা বললে তো উপত্যকার জনবিন্যাস, সমাজ ও সংস্কৃতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হবে যা ছাত্রদের জন্য রচিত পাঠ্য বইতে কখনও কাম্য হতে পারে না। ভৌগলিক দিক থেকে ‘গাঙ্গেয় সমভূমির স্বাভাবিক সম্প্রসারণ’ এই কাছাড়(বর্তমানের বরাক উপত্যকা)। এ অঞ্চলে সমাজ ও জাতিগঠন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক স্তর থেকে ঐতিহাসিক যুগের সূচনায় বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, কামরূপ, শ্রীহট্ট রাজ্যের বিস্তৃতির ফলে বাঙালিরাই এখানকার অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে৷ বাঙালিদের অবস্থিতি ছিল কাছাড়ে ত্রিপুরি, কোচ এবং ডিমাসা রাজত্বকালেও। ইংরেজ রাজত্বকাল পেরিয়ে স্বাধীনতার পরবর্তী দিনগুলিতেও এটা স্বীকৃত সত্য বরাক উপত্যকার প্রধান জনগোষ্ঠী বাঙালি। সংখ্যার নিরিখে এর পরেই সম্ভবত আসছে ডিমাসা, মনিপুরী(মৈথেই ও বিষ্ণুপ্রিয়া), হিন্দিভাষী এবং চা শিল্পের সূত্রে আগত দক্ষিণী, উত্তর ভারতীয় একাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এ পাঠে সুস্পষ্টভাবে পাঁচশত বৎসর ধরে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর যদি কোনও উল্লেখই না থাকত, তবে কোনও ক্ষতি ছিল না। বোঝা যেত, রচনাটি একান্তভাবেই জনজাতি বিষয়ক। আর আপত্তি হল ‘বঙ্গীয় সমাজ’ শব্দগুচ্ছটি নিয়ে। পুরো বইটিতে আহোম, মনিপুরী, ডিমাসা এসব শব্দের প্রয়োগ রয়েছে, কেবল বাঙালি শব্দটি প্রয়োগে এত দ্বিধা! এ শব্দগুচ্ছের প্রয়োগ থেকে বোঝা যায় হাতে গোনা কতিপয় প্রবাসী বঙ্গীয় সমাজের প্রতিনিধিও এখানে বসবাস করেন, যাঁদের মধ্যে একজন ইংরেজিতে অসমের সংস্কৃতি-বিষয়ক একখানি বই লিখেছেন, একজন ছিলেন একটি ফুটবল ক্লাবের কর্মকর্তা, আর আরেকজন নৃত্যশিল্পী লাভ করেন সরকারি পুরষ্কার, সর্বশেষ যে ব্যক্তিটির উল্লেখ রয়েছে তিনি মাত্র কয়েকটি প্রকাশিত সংখ্যা বিশিষ্ট স্বল্পায়ু একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। (তিনি যে একজন স্বনামধন্য ভাষা-গবেষক এবং সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে অসমে নাগরিকত্ব সমস্যা, বিদেশি অনুপ্রবেশকারী সনাক্তকরণ নিয়ে উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে একজন সোচ্চার ব্যক্তিত্ব, সেটা বোঝা গেল না।)

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে লোকসংস্কৃতির যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে পুথিসাহিত্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার, তা কিন্তু কোনও আগন্তুক ‘বঙ্গীয় সমাজ’-এর দান নয়, স্থানীয় বাঙালি সমাজেরই সৃষ্টি; এখানকার আউল-বাউল-মারফতি-জারি-সারি -দেহতত্ত্ব-মরমিয়া-ভাটিয়ালী-কীর্তন-পাঁচালি আর ভাসান গানের পদকর্তারা বাঙালি ছাড়া আর কিছুই নন; এখানকার রাজসভাআশ্রিত সাহিত্য, প্রস্তরলিপি, রাজকীয় দানপত্র, দলিল, দণ্ডবিধি ছাড়াও আহোম রাজদরবার, কোম্পানি প্রশাসকদের কাছে প্রেরিত চিঠিপত্রের ভাষাও বাংলা, আর কিছু নয়।

রাজতন্ত্রের অবসানে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও সেই চিত্র অপরিবর্তিত ছিল। শিলচর শহরকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে রেখে যে সব সরকারি অফিস আদালত, স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এতে বাংলা ভাষায় স্বীকৃত ভাষা এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীই ছিল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। ইংরেজ প্রশাসক- ঐতিহাসিকদের সঙ্গে স্থানীয় পণ্ডিতেরাও এখানকার সমাজ-ইতিহাস-ভাষা-সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন। সমগ্র বরাক উপত্যকার ২৩২২ টি গ্রামের নামগুলো পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে এখানকার বাঙালিদের অস্তিত্বের ভিত্তি সুপ্রাচীন৷ ডিমাসা রাজত্বের অবসানে (১৮৩২) বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সঙ্গে সংযুক্তি এবং চিফ কমিশনার শাসিত অসম প্রদেশ গঠনকালে (১৮৭৪) অসমের সঙ্গে কাছাড়ের সংযুক্তি পর্যন্ত কাছাড়ের (বরাক উপত্যকা) ভাষিক চরিত্র অক্ষুন্ন ছিল, কাছাড়ের প্রধান জনগোষ্ঠী তো বাঙালিই। পাঠ্যপুস্তকের সংকীর্ণ পরিসরে এসবের অন্তর্ভুক্তির দাবি অবশ্য অবাস্তব, আমরা তা করছিও না। কথাগুলো বলতে হচ্ছে কাছাড়ের জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিদের অবস্থানটি সুস্পষ্ট করার জন্যেই।

তবে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, গোবিন্দচন্দ্রের পদাবলি, বাচস্পতির রসামৃত থেকে সাম্প্রতিককালের সাহিত্যকৃতির সামান্য উল্লেখ হতে পারত। ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ-উপেন্দ্রচন্দ্র থেকে দেবব্রত দত্ত, সুজিৎ চৌধুরী, সুবীর করের উল্লেখ থাকতে পারত। কামিনী চন্দ, অরুণকুমার চন্দ, রাশিদ আলী লস্কর, শ্যামাচরণ দেব, গঙ্গাদয়াল দীক্ষিৎ, সতী-যতি-সনৎ,কাজি হমান বকস, মৌলানা মহসীন আলী, মাহমদ আলী, তবারক আলী, হুরমৎ আলী বড়লস্কর থেকে মহিতোষ পুরকায়স্থ, অচিন্ত্য ভট্টাচার্য-এর মতো স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং একষট্টির ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিত্বরা, সত্তর-আশির দশকের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাসংরক্ষণ, বঙ্গসাহিত্য, বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের অগ্রণী পুরুষেরা বরাক উপত্যকার উজ্জ্বল নক্ষত্র, এঁরা এ অঞ্চলের সমাজজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এঁরা এখানকার একান্তভাবে স্থানীয় মানুষ- ভারতীয় নাগরিক, বিদেশি নন, একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীও নন। আলোচ্য পাঠটি পড়লে ছাত্রদের ধারণা হবে এ অঞ্চলটি বাঙালিবিহীন একটি জনজাতি এলাকা। আর মুসলিম ধর্মীয় জনগোষ্ঠীও যে এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা তাও বোঝা যায় না৷

নিবন্ধটির চুলচেরা বিচারের স্থান এটা নয়। ছাত্রপাঠ্য এ বইয়ের মূল পরিকল্পনার মধ্যেই একটা উদ্দেশ্য প্রচ্ছন্ন, এটা বুঝতে না পারার মধ্যেই সমস্যা। পেছনে বরাক উপত্যকার প্রধান জনগোষ্ঠীকে গৌণ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। বরাক উপত্যকার বাঙালিরা তো কখনও প্রতিবেশি জনজাতিদের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি উদাসীন ছিল না। মনিপুরী, ডিমাসা, হিন্দিভাষী সবাই একসঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী দিনে সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কৃষক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, একষট্টির ভাষা আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি-মনিপুরী-ডিমাসা -রা পথে নেমেছে। প্রতিটি ভাষিক গোষ্ঠীর প্রতি সংবেদনশীল বাঙালিরা শুধু বাংলার নয়, প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা অধিকারের দাবি তুলেছে। এগারজন শহিদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালিরা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা করার পরও এ অধিকার হরণ করার প্রয়াশ দেখা গেছে দশকে দশকে। ইতিমধ্যে উপত্যকার ভাষা শহিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে পনেরোতে, এবং এতে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ভাষার দাবির আন্দোলনে সংযোজন হয়েছে দ্বিতীয় মহিলা শহিদ সুদেষ্ণা সিনহার নাম(১৮৮৬)। প্রতিবেশি একটি রাজ্যের স্বভাষী সম্মানিত রাজ্যপাল যতই ভাষা আন্দোলনকে অপ্রাসঙ্গিক ও ভুলে যাওয়ার মতো বিষয় বলে প্রচার চালিয়ে যান না কেন, এ আন্দোলন আজও প্রাসঙ্গিক।

তবে অতশত বিষয়ে না গিয়েও আমরা বলব, বাংলা পাঠক্রমে দ্রুত পঠন হিসেবে জটিল বিষয়টি দেওয়াটা জবরদস্তি। কোনও সৃজনশীল শিশু-কিশোর রচনা, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, প্রকৃতি, শিকার বা অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি না এনে social anthropology -র মতো বিষয়  দিয়ে কিশোর পড়ুয়াদের পীড়িত করাটা শিক্ষানীতির পরিপন্থী নয়, প্রতিপন্থী।

এই একই ব্যাপারটি অসমিয়া, বড়ো, মনিপুরী, নেপালি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও হয়েছে। দ্রুত পঠন হিসেবে এদেরও গেলানো হচ্ছে এসব বিষয়। লক্ষটা আর যা’ই হোক না কেন ভাষা শিক্ষা এবং নৈব্যক্তিক বৌদ্ধিক বিকাশ বোধহয় নয়। সামগ্রিকভাবে, এটা অসমের সমস্ত ভাষিক গোষ্ঠীর পড়ুয়াদের উপরই একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ– বইয়ের সত্য, তথ্য, ভ্রান্তি-বিভ্রান্তির কথা বাদ দিয়েই বলা যায়।

আর এখানে ডিমাসাদের ওপরে লিখিত অপর একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, এরা অসমের ডিমা হাসাও জেলায় বাস করেন। এটা যেমন সত্যি, তেমনি ডিমাসারা যে কাছাড় অর্থাৎ বরাক উপত্যকারও স্থায়ী বাসিন্দা, এ ও তো সত্যি। এ খবর লেখক নেননি। নিলে হয়ত এসব কথাও  লিখতে হত যে, ডিমাসা রাজসভায় বাংলা ভাষার একটা সম্মানজনক স্থান ছিল, রাজসভার আনুকূল্যে উন্নতমানের বাংলা কাব্য রচিত হয়েছে, রাজকীয় দানপত্র, অনুজ্ঞাপত্র, প্রস্তরলিপি, মুদ্রায় বাংলাভাষার প্রয়োগ ঘটেছে। এটাও ছাত্রদের জানাতে হত যে, ডিমাসা রাজারা কেবল বাংলা ভাষারই পৃষ্ঠপোষকতা করেননি, বাংলায় কীর্তন, গীতিকবিতাও রচনা করে গেছেন।

আর মনিপুরীদের সম্বন্ধে রচিত পাঠটিতে কোথাও উল্লেখ নেই যে পৃথিবীতে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী বলে একটি ভাষিক গোষ্ঠীর অবস্থিতি আছে, এবং অসম সরকার ইতিমধ্যেই এ ভাষাকে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে চালু করার অনুমতিও দিয়েছেন৷

এ প্রসঙ্গে ‘আসাম ট্রিবিউন’ পত্রিকায় (১ জুন, ১৯) একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছে যেখানে এ বইতে সংকলিত ‘চা জনগোষ্ঠী’ শীর্ষক নিবন্ধে ওরাঙ, মুন্ডা, খারিয়া, সাঁওতাল, কোল, সোয়ারা জনগোষ্ঠীকে একত্রে ‘চা জনগোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করাটা যে ওঁদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে অস্বীকার করার নামান্তর, এটা উপলব্ধি করে সারা অসম আদিবাসী ছাত্র সমিতির (AAASA) প্রতিবাদী কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্র সংগঠনটি সম্পূর্ণ পুস্তকটি উঠিয়ে নিয়ে এবং সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট নিবন্ধটি পুনর্লিখন করার দাবি জানিয়েছে, উপজাতীয়দের অবমাননার জন্য লেখককে ক্ষমা চাইতে হবে- এ দাবিও রেখেছে। অন্যথায় তারা যে কোর্ট পর্যন্ত যাবে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছে। এখানে যেমন রাজ্যের সংখ্যালঘু ছয়টি জনগোষ্ঠীর স্বাভিমান আহত হয়েছে, তেমনি বরাক উপত্যকার অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠীকে অস্বীকারের প্রয়াস বরাকবাসীকে আহত করেছে বই কি! এই বই অনতিবিলম্বে পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে এই কথাটি বলে নেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না বোধহয়, এই বই নিয়ে সমস্ত আবেদন নিবেদনের ওপর জল ঢেলে বিগত ২৬ শে জুলাই মাধ্যমিক শিক্ষাপর্ষদের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি [No. SEBA/SB/ER/26/96/PT(420)] জারি করে ওই আপত্তিকর ‘কাছাড়ের জনগোষ্ঠী’ (সঙ্গে আরও দুটি) পাঠ যাতে অতি অবশ্যই পড়িয়ে আসন্ন পরীক্ষাতে প্রশ্ন তৈরি করাও হয়, এ জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ‘চা জনগোষ্ঠী’ শীর্ষক রচনাটির সম্বন্ধে ওই নির্দেশে কিছুই বলা হয়নি। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাভিমানের প্রতি মান্যতা যে দেখানো হয়েছে এটাই বা কম কীসে?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...