মুখার্জিদার বউ: যে গল্প নিজের পরিচয় খুঁজে নেবার ইচ্ছে জাগায়

নাহার তৃণা

 

দৃশ্যকল্প ১

পোস্টম্যানের দিয়ে যাওয়া চিঠির উপর লেখা নামটা এ বাড়ির অনেকের অপরিচিত ঠেকায় বেশ কয়টা হাত ঘুরে অবশেষে মেয়েটার হাতে যখন এল, শ্বশুরবাড়ির ভরা সংসারের মাঝে দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে বুঝি খানিক ভাবতে হয়, নামটা তার এত পরিচিত, অথচ কেমন একটু অচেনার মিহি আস্তরণে ঢাকা। কে এই শোভারানি দাসী! দূরাগত এক পশলা বাতাস কী যেন বলে যায় কানে কানে। চোখের ভাঁজে ব্যথা উথলে ওঠবার ছুতো খুঁজে…. মেয়েটার মনে পড়ে যায় তার দাদু খুব ঘটা করে রেখেছিলেন নামখানা। সে গল্প বহুবার শোনা।

প্রিয় সে নাম ধরে এখন এ বাড়িতে কেউ ডাকে না তাকে। এখন সে বউমা, মা, শুনছ, সম্বোধনে অভ্যস্ত। মা বাবা গত হবার পর সে নাম ধরে ডাকার পাট প্রায় চুকেবুকে গেছে। হঠাৎ পুরনো বন্ধুর অবাক করা চিঠিটা না এলে শোভারানি নামটার হয়ত বিস্মৃতির আস্তরণ সরিয়ে উঠে আসাই হত না!

দৃশ্যকল্প ২

খুব ভালো গান করত অদিতি। স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত গানের জন্য আলাদা একটা পরিচিতি গড়ে ওঠেছিল ওর। বন্ধু-স্বজনেরা ভাবত খ্যাতনামা শিল্পীদের পাশে একদিন অদিতির নামটাও জ্বলজ্বল করবে। গানের সূত্রেই বিয়ের প্রস্তাব আসে। পাত্রপক্ষ এমন পাত্রী হাতছাড়া করতে চায়নি কিছুতে। সাততাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায়। দশ বছরের বিবাহিত জীবনে অদিতি সোনায় মোড়া একটা জীবন পেয়েছে। তবুও কখনও কখনও বিবাগী বাতাসের হাত ধরে ছুটে আসা প্রিয় কোনও গানের টুকরো সুর অদিতিকে আনমনা করে দেয়। বুকের গোপন অলিন্দে জমতে থাকে তার সুরহীন জীবনের নোনাজল। অদিতি আর গান করে না। প্রথম ছেলেটা হবার পর শ্বশুরবাড়ির কেউ, এমনকি স্বামী পর্যন্ত চায়নি সে আর গান করুক। অদিতির হাত গলে ভাসানে গেছে আজন্মের ভালোবাসা…

উপরের দৃশ্যকল্প দুটি বানোয়াট হলেও এমন ঘটনা হয়ত রোজ ঘটে বাস্তবে। হেথা-হোথার নানা সংসারে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলে নারী নামের সংখ্যালঘু শ্রেণিটিকে ঘিরেই।

 

অতপর চলচ্চিত্রের গপ্পো কিংবা বাস্তবতা

বিয়ের পর একজন নারীর হয়ত আলাদা করে নিজস্ব পছন্দ কিংবা ভালোলাগার বিলাসিতা থাকতে নেই। শ্বশুরবাড়ির চাওয়াই শেষ কথা। মেয়েটির চাওয়া যদি তাদেরও চাওয়া হয়, তবে ধন্য জীবন। অলিখিত এমন নিয়মের খাতায় ভিড় জমায় শোভারানি, অদিতি, পুতুল, আরও কত কত নাম। শুধু শ্বশুরবাড়িই বা বলি কেন? অনেক অনেক বাবার বাড়িতেও মেয়েদের নাচ, গান, আঁকাআঁকি ইত্যাদি পছন্দ বা ভালোলাগাকে আদিখ্যেতা বৈ ভাবা হয় না। মেয়ে লাল শাড়ি পরে শখ করে ফাংশনে নাচবে বলে লাল টুকটুক শাড়িখানা পরবার আগেই উধাও হয়ে যায়। সেই সঙ্গে চিরদিনের জন্য উড়ালপঙ্খী হয় মেয়েটির ভালোলাগা। বুকের ভাঁজে পাখির পালকের কোমলতা নিয়ে জেগে থাকে স্মৃতিটুকু। তখন মুখ ফুটে কিছু বলবার সাহস হয়নি। প্রচলিত নিয়ম চোখ পাকিয়ে চুপ করিয়ে রাখে। নিজ গৃহে বনবাস সয়ে নেয় শোভারানি কিংবা আরও আরও নারীর জীবন।

মেয়েদের তো নিজস্ব বাড়ি থাকে না। বিয়ের আগে বাবার বাড়ি, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির বাইরের চৌহদ্দিতে মেয়েরা উদ্বাস্তু। অনেক সাধ্য সাধনায় উদ্বাস্তু নারী জীবন নিজস্ব ভালোবাসা আঁকড়ে থাকার অধিকার পায়। একই পরিবারে জন্ম নেয়া ছেলের জন্য যেটা খুব স্বাভাবিক, মেয়েটির জন্য সেটি বাড়তি সুযোগ দেয়া কিংবা পাওনা। পইপই করে বুঝিয়ে দেবার পায়তারা চলে, “লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম ‘করুণা’ শিশির!” খেতে বসে ভাইয়ের পাতে বড় মাছের টুকরো কিংবা মুরগির রান চলে যাওয়ার দুঃখ জাগানিয়া ঘটনা ঘরে ঘরে রচিত হতে দেখা ‘স্বাভাবিক’ কাহিনি। আজকে, এই ২০১৯ এসেও সে চিত্র পালটে গিয়ে ভ্যান ঘগের সূর্যমুখী হয়ে ওঠেনি বাপ।

স্বামীহারা হিন্দু নারীর পাতে মাছের টুকরো তুলে দেয়াকে তাই আজকের সময়ে ব্যাপক বিপ্লব ভাবতে হয়। অথচ স্ত্রীহারা হিন্দু পুরুষটির খাদ্য তালিকা থেকে যায় অটুটযৌবনা সাকীর মতো। আজও, এখনও। সব্বাই হয়ত একই পংক্তিতে পড়েন না। সেরকমটা ভেবে নেয়া বড্ড সরলীকরণও হয়ে যায়। তবে মুখার্জিদার স্ত্রী কিংবা ছেলে বউয়ের ভেতর বাড়িতে উঁকি দিয়ে দেখে ফেলা আজকের সময়ের চালচিত্র মনকে বিষাদক্লান্ত করে। নিজের নিজের নাম খুইয়ে শুধুই মুখার্জিদার বউ হয়ে এ কীরকমভাবে বেঁচে থাকা নারী জন্ম তাদের! নিখিলেশ পারলে উঁকি দিয়ে দেখে যেও, তোমার দুঃখ খানিকটা হলেও কর্পূরজীবন পাবে।

গ্রামীণ প্রবাদে আছে নিজের ছেলে ছেলে, আর পরের ছেলে ছেলেটা। শ্বশুরবাড়ি আসা পরের বাড়ির মেয়েটাকে সে বাড়ির মেয়ে হয়ে ওঠার পরীক্ষায় বাদরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে ওঠানামার জটিলাঙ্কে বার বার গোল্লা খেতে হয়। অন্যদিকে মেয়েটিও শাশুড়িকে নিজের মায়ের মতো সাদরে গ্রহণ করতে ব্যর্থ। তাদের দু’জনের মাঝে বয়ে যায় ‘অকুল জলধি।’ দু’জন দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে একে অন্যের প্রতি কেবলি মনের বিষ ঝাড়তে থাকে ক্লান্তিহীন। একের জন্য অন্যের বুকের ভেতর জেগে থাকে না গাঢ় সহানুভূতি। তাই নিজের পছন্দমতো টিভি দেখতে না পাওয়ার ক্ষোভে ভীষণ দুঃখে দুঃখী মেয়েটা ছুটে যায় টিভি কিনতে। একবারও ভাবে না সদ্য শ্বশুর হারানো একাকী হয়ে পড়া শাশুড়ি তাতে মনে কষ্ট পেতে পারেন। আমিই আমার আপন, আত্মকেন্দ্রিক এই ভাবনা পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকে যে! অন্যদিকে শাশুড়ি মা কাজের লোকটিকে পছন্দের টিভি সিরিয়াল দেখবার জন্য ডেকে নিলেও বউমাটিকে গণনায় নিতে ভুলে যান বেমালুম।

বাবার বাড়িতে ভাইয়ের তুলনায় মেয়েটির সবকিছুতেই নিষেধের আঙুল তোলা, খাওয়ার বেলায় সবচে ছোট মাছ-মাংসের টুকরো বরাদ্দের ক্ষোভক্লান্ত স্মৃতি শাশুড়িকে দিয়ে পুনরাবৃত্তি করিয়ে নিতেও ভুল করে না। সেই বিষাদস্মৃতি ভুলে না গিয়ে বুকের খাঁজে লেপ্টে রাখে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে বউ। পড়শি পুতুলের লাগাতার প্রশংসা ছেড়ে একবারের জন্যেও পরের বাড়ির যে মেয়েটা সব ছেড়ে তার বাড়িতে এসেছে তার প্রশংসায় যান না শাশুড়ি। তা নিয়েও ছেলে বউয়ের দুঃখ অপার।

আপাত হাসিখুশি পুতুল নিজের ব্যক্তিগত রাজ্যপাটে যেন বা রানির মতো, অন্যদের কাছে এমন ভাবনার ছবি ফুটিয়ে তোলায় নিরন্তর ব্যস্ত থাকে। সে ব্যস্ততাকে পিড়ি পেতে একটু শ্রান্তি আর চোখ ফোটানোর দীক্ষা দেবার আন্তরিকতায় এগিয়ে আসে অদিতি। অনেকক্ষেত্রে, নারীদের বড় শত্রু নারীরা নিজেও, বন্ধুও কী নন!  কিন্তু শেষমেশ শেষ রক্ষা হয় কী পুতুলের?

মনের ঘরে বিষাদ ঘন হয়ে এলে জীবন বড়ই যন্ত্রণার হয়ে পড়ে। মনের ভেতর বসত করা বিষাদপাখিদের উড়িয়ে দেবার জন্য চাই এক চিলতে আকাশ। মনস্তত্ত্ববিদ আরাত্রিকা সেই আকাশ হয়ে দেখা দেয়। আর দশটা কুটনামী সমৃদ্ধ বাংলা/হিন্দি টিভি সিরিয়ালের মতো ছেলের বউ তার আলাভোলা স্বামী, যে কিনা কর্মক্ষেত্রে মহিলা বসের ধ্যাতানির উপর থাকে তার সঙ্গে কুপরামর্শ করতে বসে যায়না। এটা বিরাট বাঁচোয়া। সহমর্মিতা নিয়ে বরং শাশুড়িকে রাজী করাতে চেষ্টা করে, আমরা কেউ ই তো ভালো নেই মা!

মনের চাপ উজারের উপযুক্ত জায়গায় বউ শাশুড়ির নিত্য একসঙ্গে যাওয়ার বিরল উপস্থাপনা বাংলা চলচ্চিত্রে সম্ভবত প্রথম। একই সঙ্গে মনস্তত্ত্ববিদ বা সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যাওয়া মানেই পাগলের ডাক্তারের কাছে ধর্না দেবার যে ট্যাবু আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে গ্যাট হয়ে বসে আছে, তাকেও আচ্ছা মতো বুড়ো আঙুল দেখানোর সদিচ্ছা দর্শক মাত্রই সাদরে নেবেন।

মনের ভেতর ঘাপটি দিয়ে থাকা একে অন্যের প্রতি বীতরাগটুকুর উড়ান ঘটতে থাকলে দুজন মানুষ কাছাকাছি বন্ধু হয়ে ওঠে। শোভারানি, অদিতিও শাশুড়ি বউয়ের আগল ভেঙে বন্ধুর মতো হয়ে যায়। ছেলে আর স্বামীকে লুকিয়ে আরাত্রিকার চেম্বারের সেশন শেষে মুঠো মুঠো আনন্দ কুড়িয়ে ঘরে ফেরে। কত অজানা গল্প বেরিয়ে আসে দু’জনের বুকের পাঁজর ফুঁড়ে। নির্মম এক সত্যি আবিষ্কারে তব্দাও খেতে হয় অদিতিকে।

…… আমাদের দৈনন্দিন জীবনে শব্দ ব্যবহারের সামান্য হেরফেরে পরিবেশ কতভাবে বদলে যায়— যেতে পারে, তারও উদাহরণ চমৎকারভাবে এসেছে গল্পে।

কিন্তু নিজেদের বিষাদমুক্তির আনন্দ গেলাসে গেলাস ঠুকে ‘চিয়ার্স’ বলার উপস্থাপনাটুকু বড্ড আরোপিত, ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা’র নারী চরিত্রগুলোর নিজেদের স্বাধীনতা উদযাপনের আনন্দ হিসেবে ঠোঁটে সিগারেট গুঁজে দেবার হাস্যকর দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর মতো করে এসেছে যেন। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে ওটার কোনও প্রয়োজন ছিল না।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বিবাহিত নারীর নাম পুরুষের নামের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন মিসেস অমুক, মিসেস তমুক কিংবা মুখার্জি, ব্যানার্জি, রহমান, আহমেদের বউ। নিজেদের চাপা পড়ে যাওয়া নামের উৎসমুখে দাঁড়িয়ে মুখার্জিদার স্ত্রী আর ছেলে বউ আবারও শোভারানি আর অদিতি হয়ে ওঠার এই যে সেলুলয়েডীয় জার্নিটা, সেটা বেশ উপভোগ্য, বলতেই হয়। শাশুড়ির চরিত্রে অনসূয়া মজুমদার নিজের সবটুকু উজার করে দিয়েছেন। একবারও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে যুঝে গেছেন ছেলে বউ চরিত্রে কনীনিকা ব্যানার্জী। অন্যরকম একটা চরিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত নিজের অভিনয় প্রতিভার জাতটা আরও একবার প্রমাণ করলেন। পুতুল চরিত্রে অপারাজিতা আঢ্য, স্বামী চরিত্রে বিশ্বনাথ তুমুল সঙ্গত দিয়ে গেছেন। ‘মুখার্জিদার বউ’ পরিচালক পৃথা চক্রবর্তীর প্রথম প্রয়াস। তাকে সহ ‘মুখার্জিদার বউ’-এর পুরো টিমকে উপভোগ্য উপস্থাপনার জন্যে টুপিখোলা অভিনন্দন জানাচ্ছি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...